শশীকাহন: পৌরাণিক উপাখ্যান:ফ্যান্টাসি থ্রিলার সিরিজ,পর্ব- চার

ড. রাজুব ভৌমিক
 | প্রকাশিত : ০৪ আগস্ট ২০১৯, ২২:০৮

সন্তায়ুর ভালবাসার গভীরতা বুঝতে পেরে যুবরাজ নিম্ব তার বিনতি তে রাজী হয়ে যায়। ‘ঠিক আছে সন্তায়ু, তুমি ঐ ভাস্কর্য নির্মাতাকে খবর পাঠাও।’ নিম্ব বলল। সন্তায়ু হাসি মুখে তার চোখের অশ্রু মুছে তাড়াতাড়ি ভাস্কর্য নির্মাতাকে ডেকে আনতে চলে যায়। সন্তায়ু ভাস্কর্য নির্মাতাকে আগে কখনো দেখে নি। কিন্তু তার নাম বহুবার শুনেছে। ভাস্কর্য নির্মাতার নাম কলুনা। সারা চন্দ্রগ্রহে কলুনার ভাস্কর্যশিল্পের দক্ষতার বড়ই সুনাম। সন্তায়ু অনেক খোঁজাখুঁজি করে কলুনার বাড়িতে পৌঁছে।বেলা তখন প্রায় দুপুর।  কলুনার বাড়িতে এসে সন্তায়ু বিস্মিত। এত বড় একজন শিল্পীর ছোট্ট একটি কুঁড়ে ঘর। সে দেখে ছোট্ট কুঁড়ে ঘরের সামনে এক জন বৃদ্ধ মাটির উপর বিছানা করে শুয়ে আছে। সন্তায়ুকে দেখে একটি মেয়ে এগিয়ে আসে। ‘আপনি কি কাউকে খুঁজছেন?’ মেয়েটি বলল। ‘হ্যাঁ, আমি বিখ্যাত ভাস্কর্যশিল্পী কলুনার সাথে দেখা করতে এসেছি।’ সন্তায়ু বলল। মেয়েটি পরে পরিচয় দেয় তার নাম ইত্তনি। ইত্তনি কলুনার মেয়ে। ইত্তনি বলে, ‘বাবা এখন শয্যাশায়ী। অভাবে অনটনে বাবার জন্য কিছু করতে পারছি না। ঠিক মত দুবেলা খেতে পারা অনেক সময় সম্ভব হয় না।’ 

ইত্তনির কথা শুনে সন্তায়ুর মন খারাপ হয়ে যায়। কলুনা তার বার্ধক্য রোগা শরীর নিয়ে কুঁড়ে ঘরের সামনে শুয়ে আছে। সন্তায়ু ধীরে ধীরে কলুনার কাছে যায়। কলুনা চোখে দেখতে পারে না। ‘কে তুমি? আমাকে দেখতে এসেছে মা?’ কলুনা আস্তে আস্তে বলল। ‘হ্যাঁ, আমি এক ভীষণ বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি শিল্পী। ভেবেছিলাম আপনাকে দিয়ে আমার জীবনের সকল কষ্ট দূর করব কিন্তু আপনার এ অবস্থা দেখে নিজেকে সামলাতে পারছি না।’ সন্তায়ু বলল। কলুনা সন্তায়ুকে বুঝিয়ে বলে যে গত কয়েক বছর ধরে তার শারীরিক অসুস্থতার কারনে কোন কাজ করতে পারে নি। তাই এখন আর কেউ তার খোঁজ নেয় না। সংসারে অভাব অনটনে পরিপূর্ণ। ‘মারে, আমার একমাত্র মেয়েটির কথা ভেবে ভেবে শেষ নিশ্বাস এখনো ত্যাগ করতে পারছি না। আমি মারা গেলে আমার মেয়েটির কোন গতি হবে রে মা।’ এই বলে কলুনা কেঁদে ফেলে। ‘আপনি চিন্তা করবেন না। সব ঠিক হয়ে যাব।’ সন্তায়ু বলল। কলুনা সন্তায়ুকে জিজ্ঞেস করে কেন সে আজ তাকে দেখতে আসল। সন্তায়ু কলুনাকে সব খুলে বলে। 

সন্তায়ুকে দেখে ও তার কথা শুনে কলুনার মন গলে যায়। সন্তায়ুও গরির ঘরের মেয়ে। একলা থাকে, কোনমতে তারও জীবন চলে যাচ্ছে। ‘মা রে, তুই যদি আমার মৃত্যুর পর আমার মেয়েকে দেখে রাখার কথা দিস তাহলে আমার নিশ্বাস যাওয়া পর্যন্ত তোর শিল্প কর্মটি করে যাব।’ কলুনা বলল। ‘আপনি চিন্তা করবেন না। ইত্তনিকে আমার বোনের আদর দিয়ে নিজের কাছে রাখব।’ সন্তায়ু বলল। কলুনা শোয়া অবস্থা থেকে উঠার চেষ্টা করে। সন্তায়ু তাকে সাহায্য করে। কিন্তু সন্তায়ু মনে মনে ভাবছে শিল্পী কলুনা তো অন্ধ, তার উপরে উনার শরীর খুব ভাল না। রোগাক্রান্ত বার্ধক্য শরীর যেন যে কোন মুহূর্তে ভেঙে পড়ে যাবে। ‘মারে তুই ভাবিস না। আমি জন্মান্ধ। সৃষ্টিকর্তার কৃপায় আমি সারাজীবন শশীদের ভাস্কর্য গড়েছি।’ কলুনা বলল। সন্তায়ু শিল্পী কলুনার কথা শুনে বিস্মিত। ‘জন্মান্ধ হয়েও এই ভদ্রলোক এত সুন্দর ভাস্কর্য গড়তে পারে? নিশ্চয় এখানে সৃষ্টিকর্তার হাত আছে।’ সন্তায়ু ভাবল। কিন্তু কলুনাকে কিভাবে সন্তায়ু তার বাড়িতে নিয়ে যাবে? এদিকে যুবরাজ নিম্ব কথা দিয়েছে সে শুধুমাত্র একদিন থাকবে। তারপর সুমেরু বনে দেবী আজ্রিয়ার সাথে দেখা করার জন্য নিম্ব চলে যাবে। 

দুপুর প্রায় শেষ। সন্তায়ু এবং কলুনা ধীরে ধীরে সন্তায়ুর বাড়ির উদ্দেশে হেটে চলছে। কলুনার জন্য মাঝে মাঝে তাকে পথে বিরতি নিতে হয়েছে। কিছুক্ষণ পর সন্তায়ু কলুনাকে নিয়ে তাদের বাড়িতে পৌঁছে। যুবরাজ নিম্ব তখন বিশ্রাম করছে। যুবরাজ নিম্ব শিল্পী কলুনা কে দেখে উঠে বসে। বহু বছর আগে লাগগিন্তা রাজ্যের রাজসভায় শিল্পী কলুনাকে যুবরাজ প্রথম দেখে। তাই শিল্পী কলুনাকে দেখে যুবরাজ নিম্ব সহজেই চিনতে পারে। শিল্পীর বর্তমান অবস্থা দেখে যুবরাজ অনেক কষ্ট পায় এবং সে কথা দেয় যে লাগগিন্তা রাজ্যে পৌঁছে সে রাজ্যের সবচেয়ে বড় ডাক্তারকে কলুনার চিকিৎসার জন্য পাঠাবে। কলুনার রোগাক্রান্ত শরীর যেন প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে। বহু কষ্টে সে যুবরাজ নিম্বের পাশে বসে। তারপর কলুনা তার হাত দুটি যুবরাজের মুখের উপর দিয়েই আঁতেক উঠে। কলুনা বুঝতে পারে এ তার ছেলে নিসম্ব। ‘পুত্র নিসম্ব’ বলে কলুনা যুবরাজ নিম্বকে জড়িয়ে ধরে।  

সে বহু বছর আগের কথা। শিল্পী কলুনা তখন মহারাজা শশাঙ্কের আদেশে রাজপ্রাসাদে অনেকগুলো ভাস্কর্য তৈরি করার কাজ করছে। হঠাৎ প্রায় কয়েক সপ্তাহ ধরে শিল্পী কলুনাকে রাজপ্রাসাদে দেখা যাচ্ছে না। মহারাজা এ খবর শুনে ভাবল সে কলুনার বাড়িতে গিয়ে তার সাথে দেখা করে আসবে। ‘নিশ্চয় কলুনা কোন বিপদের মধ্যে আছে। না হলে শিল্পী কলুনা এভাবে অদৃশ্য হয়ে যেত না।’ মহারাজা শশাঙ্ক ভাবল।

মহারাজা শশাঙ্ক মন্ত্রী সিনাতিকে কে সঙ্গে করে কলুনার বাড়িতে যায়। বাড়িতে পৌঁছে মহারাজা জানতে পারে শিল্পী কলুনার স্ত্রী জমজ সন্তান প্রসবের সময় মারা যায়। রাজা শুনে খুব দু:খ পায়। মহারাজা শশাঙ্ক দেখছে জন্মান্ধ শিল্পী কলুনা তার জমজ দুই সন্তানকে লালন-পালন করতে অনেক সংগ্রাম করছে। মহারাজা শশাঙ্ক তার বাড়িতে এসেছে শুনে কলুনা তো আনন্দে আত্মহারা। মহারাজা শশাঙ্ককে বসতে দেয়। এদিকে তার জমজ দুই সন্তান নিসম্ব ও ইত্তনি কান্না করছে। জমজ হলেও নিসম্ব ও ইত্তনির চেহারা ভিন্ন। নিসম্ব দেখতে অনেক ফর্সা আর ইত্তনি শ্যাম বর্ণের। জন্মান্ধ কলুনা তার জমজ দুই সন্তানকে লালন-পালন করতে হিমশিম খাচ্ছে দেখে কলুনা কে মহারাজ বলল, ‘কলুনা তুমি কিছু মনে না করলে একটি কথা তোমাকে জিজ্ঞেস করতাম।’ উত্তুরে কলুনা বলল, ‘মহারাজ, আদেশ করুন।’ 

‘না মানে, বলছিলাম যে যদি তুমি কিছু মনে না কর তাহলে তোমার একটি সন্তানকে আমাকে দিতে পার। তাকে আমি আমার নিজের সন্তানের মত গড়ে তুলব।’ মহারাজা শশাঙ্ক বলল। মহারাজা কথা শুনে কলুনা মনে খুব কষ্ট পায়। নিজের অক্ষমতার কথা ভেবে বারবার কলুনা নিজেকে দোষ দিচ্ছে। কিন্তু পরে সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে মহারাজের কথায় রাজী হয়ে যায়। কলুনা একমাত্র পুত্রের ভাল ভবিষ্যতের কথা ভেবে সে মহারাজের হাতে নিসম্বকে তুলে দেয়।

মহারাজ পরে নিসম্বের নাম পরিবর্তন করে নিম্ব নামটি রাখে। এই ঘটনা শুধু কলুনা, মন্ত্রী সিনাতি, মহারাজা শশাঙ্ক, ও মহারাণী কুর্নষা ছাড়া আর কেউ জানে না। মহারাজা ও মহারাণী নিম্বকে নিজের সন্তানের মত আদর করে গড়ে তুলে। কখনো তাকে কিছু বুঝতে দেয়নি। আজ কলুনা যখন নিম্বকে জড়িয়ে ধরে তখন যুবরাজ নিম্বের মন যেন কেমন উতলা হয়ে যায়। কেন জানি তার মনে হচ্ছে কলুনার সাথে যুবরাজ নিম্বের সম্পর্ক যুগ ও যুগের। 

যুবরাজ নিম্ব কলুনার কাছ থেকে পুরো ঘটনা শুনে। সে মনে খুব দু:খ পায়। পিতা পুত্রকে আলিঙ্গন আবার করল। এরপর কলুনা বলে, ‘পুত্র, আমার আর বেশি সময় নেই। মনে হচ্ছে তোকে শেষ একবার দেখার জন্য আমার এখনো মৃত্যু হয় নি। পুত্র, আমায় তুই ক্ষমা করে দিস।’ 

এদিকে রোগাক্রান্ত কলুনা সন্তায়ুকে ভাস্কর্য নির্মানের জন্য সরঞ্জামাদি আনার জন্য ডাকল। সরঞ্জামাদি আনার পর কলুনা তাড়াতাড়ি তার জীবনের শেষ ভাস্কর্যটি নির্মাণ করতে শুরু করে। কলুনা বারবার সৃষ্টিকর্তাকে ডাকছে যেন সে মারা যাবার পূর্বে অন্তত তার জীবনের শেষ এবং প্রধান ভাস্কর্যটি শেষ করতে পারে। রাত তখন অনেক গভীর। এক চেয়ারে বসে আছে নিম্ব, এবং পাশাপাশি চেয়ারে বসে আছে কলুনা। 

কলুনা তার সামনে ভাস্কর্য বানানোর সরঞ্জামাদি দিয়ে তার পুত্রের ভাস্কর্য তৈরি করছে। কলুনা বারবার তার ছেলের মুখে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে আর ভাস্কর্য নির্মাণ করছে। নিম্ব ও বারবার তার জন্মদাতা পিতার মুখের দিকে চেয়ে আছে। ‘আমায় ক্ষমা করুন পিতা। আপনার সন্ধান আগে পাই নি।’ নিম্ব তার জন্মদাতা পিতা কলুনাকে বলল। ‘যুবরাজ, তোমার কোন দোষ নেই। তাছাড়া মহারাজ শশাঙ্কের দোষও নেই। আমার ইচ্ছা তুমি মহারাজের উপর কোন মনক্ষেপন করিবে না। মহারাজের কাছে তোমাকে নিয়ে আমার একটাই ইচ্ছে ছিল আর সে হচ্ছে তোমাকে একজন আদর্শ শশী হিসেবে গড়ে তোলা। লোকের মুখে তোমার বহু বার সুনাম শুনেছি। সত্যি, গর্বে আমার বুক ভরে যায়।’ কুলনা বলল। 

‘তাহলে কয়েক মাস আগে আমার রাজা হবার ঘোষণার সময় লাগগিন্তা রাজ্য দরবারে আসেননি কেন।’ নিম্ব  বলল। ‘মহারাজ আমার কাছে দূত পাঠিয়েছে নিমন্ত্রণ করার জন্য। কিন্তু আমার শারীরিক অবস্থার অবনতি হবার কারনে যেতে পারিনি। যাবার বড়ই ইচ্ছা ছিল।’ কলুনা বলল।  ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ। নিম্ব তার নিজের ভাস্কর্য দেখে বিস্মিত। কি নিখুঁত এ শিল্পকর্ম। ভাস্কর্যটি এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। হঠাৎ করে শিল্পী কলুনা চেয়ার থেকে মাটিতে পড়ে যায়। কিছুক্ষণ পরে শিল্পী কলুনা তার দেহত্যাগ করে। যুবরাজ নিম্ব এতে অনেক ভেঙে পড়ে। 

পরের দিন সকালে যুবরাজ নিম্ব তার পিতার দাহকার্য সম্পন্ন করে। যুবরাজ ঐ এলাকার সবাইকে জড়ো করে সবার সম্মুক্ষে একটি ঘোষণা দেয়। ঘোষণায় যুবরাজ নিম্ব বলেন, ‘আজ এই স্থান থেক চারিদিকে যত দূর চোখ যায় তত দূর এ স্থানকে সবাই কলুনা রাজ্য বলে জানিবে। কলুনা রাজ্য লাগগিন্তা রাজ্যেরই একটি গুরুত্ব পূর্ণ অংশ। এই রাজ্যের রাণী হিসেবে আমি আমার বোন ইত্তনিকে ঘোষনা করছি এবং তাকে মন্ত্রী হিসেবে সহযোগিতা করবে সন্তায়ু।’ এই ঘোষনা শুনে সবাই জোরে হাততালি দেয়।  ইত্তনিকে যুবরাজ নিম্ব বুকে নিয়ে আলিঙ্গন করে। এরপর নিম্ব সন্তায়ুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কিছুক্ষণ পর সুমেরু বনের উদ্দেশে চলে যায়। এদিকে সন্তায়ু কলুনা রাজ্যের মাঝখানে যে স্থান থেকে যুবরাজ নিম্ব সবার উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছে সে স্থানে নিম্বের মূর্তি স্থাপন করে। এ স্থাপনার সামনে সন্তায়ু প্রতিদিন সকালে এবং সন্ধ্যায় কিছু সময় ব্যয় করে। তাছাড়া যুবরাজের এই মূর্তি স্থাপনের খবর বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিদিন শিল্পী কলুনা নির্মিত যুবরাজ নিম্বের এ মূর্তিটি দেখার জন্য বহু শশীদের সমাগম হয়। এভাবে একদিন কলুনা রাজ্য চন্দ্রগ্রহে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। 

এদিকে যুবরাজ নিম্ব আকাশপথে ভ্রমন করে সুমেরু বনে পৌঁছে। পৌঁছে নিম্ব দেখে দেবী আজ্রিয়া একটি বিশাল গাছের নিচে গভীর তপস্যায় মগ্ন। দেবী আজ্রিয়াকে গভীর তপস্যা থেকে কিভাবে জাগ্রত করবে নিম্ব তা বসে বসে ভাবছে। বহু চেষ্টা করেও নিম্ব দেবী আজ্রিয়ার তপস্যা ভঙ্গ করতে পারছে না। যুবরাজ নিম্ব হতাশ হয়ে পড়ে। যুবরাজ নিম্বের এ বৃথা চেষ্টা দূর থেকে সর্দার অউনাক দেখে। সর্দার অউনাক এক যাযাবর গোষ্ঠীর প্রধান। এ গোষ্ঠীর সবাই সাধারণত নানা সাজগোজ করে শশীদের মনোরঞ্জন করে। তা দেখে শশীরা খুশি হয়ে কিছু মুদ্রা দেয়। এতে অউনাক গোষ্ঠীর জীবন চলে যায়। সর্দার অউনাক আজ তার দলবল নিয়ে পাশের একটি রাজ্যে শশীদের মনোরঞ্জন করতে যাচ্ছে। সর্দারের আজকে রাক্ষসের সাজ নেয়। তার সঙ্গীরা সবাই অন্য সাজ নিয়ে একত্রে সুমেরু বনের ভিতরের রাস্তা দিয়ে অন্যত্র যাচ্ছে। সর্দার অউনাক যুবরাজের ব্যর্থ চেষ্টা দেখে তার দলের সবাইকে রাস্তার পাশে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে বলে। এরপর সর্দার যুবরাজের কাছে যায়। 

‘কে আপনি? কেনই বা আপনি এই তপস্যীর তপস্যা ভঙ্গ করতে চান?’ সর্দার নিম্বকে বলল। সর্দার নিম্বকে চিনেনি। দেবী আজ্রিয়াকেও চিনেনি কারণ দেবী আজ্রিয়া সাধারণ এক তপস্যীর বেশে তপস্যা করছে। যুবরাজ তখন তার পরিচয় সর্দারকে দেয় কিন্তু দেবী আজ্রিয়ার পরিচয় সঠিকভাবে দেয়নি। ‘আমি লাগগিন্তা রাজ্যের যুবরাজ নিম্ব। এই দেবীর সাথে আমার বিবাহ শীঘ্র হবে। তাই তাকে তপস্যা থেকে জাগ্রত করার চেষ্টা করছি।’ যুবরাজ নিম্ব বলল। সর্দার অউনাক ভেবেছে দেবী বলতে একজন মহিলা কে সম্বোধন করা হয়ছে। সে ভাবেনি একজন সাক্ষাৎ দেবীকে যুবরাজ দেবী বলছে। তাই কোন কিছু না ভেবেই যুবরাজকে বলে, ‘যুবরাজ আপনি চিন্তা করবেন না। শশীদের নেচে, গেয়ে, সেজে মনোরঞ্জন করাই আমাদের কাজ। আমার বিশ্বাস আমার কর্মদক্ষতার মাধ্যমে দেবীর তপস্যা ভঙ্গ করতে পারবো।’  যুবরাজ বলল, ‘ঠিক আছে। চেষ্টা করে দেখ। আমি নানাভাবে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। যদি তুমি সফল হও তাহলে তোমাকে উপযুক্ত বখশীশ দিব।’

আর দেরী না করে সর্দার অউনাক রাক্ষসের সাজে নানা ধরনের নাচ ও গান করে যাচ্ছে। এভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা চলে যায়। দেবী আজ্রিয়া এখনো গভীর তপস্যায় মগ্ন। সর্দার অনেকক্ষণ দেবী আজ্রিয়ার সামনে নাচ গান করে। কিন্তু কোনভাবেই দেবী আজ্রিয়ার ধ্যান ভঙ্গ হচ্ছে না। ক্লান্ত হয়ে সর্দার যুবরাজ নিম্ব কে বলল, ‘যুবরাজ, অনেক চেষ্টা করেছি। মনে হচ্ছে দেবীকে তপস্যা থেকে জাগ্রত করা সম্ভব হবে না। আমার যতটুকু সামর্থ ছিল চেষ্টা করেছি।’  যুবরাজ নিম্ব বলল, ‘ঠিক আছে। তোমার চেষ্টায় কোন ক্রটি ছিল না। আমি তোমার প্রচেষ্টায় খুশি। তবে সফল হলে আরো ভাল লাগতো।’ তখন সর্দারের মাথায় আরেকটি বুদ্ধি আসে। সর্দার বলল, ‘যুবরাজ, আমরা নানা প্রজাতি প্রাণীদের কন্ঠস্বর নকল করে শশীদের শুনাই। এতে অনেক ভীষণ খুশি হয়। আপনি অনুমতি দিলে আমি তা চেষ্টা করতে পারি।’ যুবরাজ তাতে রাজী হয়ে যায় এবং সর্দারকে অনুমতি দেয়। সাথে সাথে সর্দার বিভিন্ন প্রাণীদের কণ্ঠস্বর দেবীর সামনে নকল করে শুনাচ্ছে। যুবরাজ পাশের একটি গাছের ছায়াতে বসে তা উপভোগ করছে।

দেবী আজ্রিয়ার প্রিয় প্রাণী হচ্ছে ঈগল পাখি। সর্দার অউনাক যখন অন্যান্য প্রাণীর কণ্ঠস্বর নকল করে শোনাবার পর ঈগলের কণ্ঠস্বর নকল করে শোনাচ্ছে তখন দেবী আজ্রিয়ার তপস্যা ভেঙে যায়। দেবী আজ্রিয়া যুবরাজ নিম্বের হিতের জন্য তপস্যা করছে কিন্তু সর্দার অউনাকের কারণে দেবী আজ্রিয়ার তপস্যা ভেঙে যায়। এতে দেবী আজ্রিয়া ক্রোধিত হয়। ‘কোন অভাগারে তুই!! যে দেবী আজ্রিয়ার তপস্যা ভঙ্গের সাহস করেছে!!! আজ তোকে ধ্বংস করে দেব।’ দেবী আজ্রিয়া সর্দার অউনাককে বলল। সাক্ষাৎ দেবী আজ্রিয়ার ক্রোধিত রূপ দেখে সর্দার খুব ভয় পেয়ে যায়। দেবী আজ্রিয়া যুদ্ধ ও বিচারের দেবী। ‘দেবী, আমার ভুল হয়েছে। আমাকে দয়া করে ক্ষমা করুন। আপনি দেবী আজ্রিয়া জানলে কখনো এই দুঃসাহস করতাম না দেবী। আমার প্রাণ ভিক্ষা দিন।’ সর্দার অউনাক কাকুতি মিনতি করে বলল। যুবরাজ নিম্ব দেবী আজ্রিয়াকে বুঝাতে চেষ্টা করে কিন্তু দেবী কোন অজুহাত শুনতে রাজী নয়। যুবরাজ নিম্ব অনেক বার বুঝানোর পরে সর্দারের প্রাণ-ভিক্ষা দিতে দেবী আজ্রিয়া রাজী হয়। কিন্তু দেবী আজ্রিয়া সর্দার অউনাক কে অভিশাপ দেয়। দেবী আজ্রিয়া সর্দারের উদ্দেশে বলল, ‘আজ তুই যে রাক্ষসের সাজ ধরে আমার তপস্যা ভেঙেছিস সেটা আর তোর সাজ হবে না। আজ থেকে তুই ও তোর গোষ্ঠীর সবাই প্রকৃত রাক্ষসে পরিণত হবি। আর নকল কন্ঠে ছলনা করে আমার তপস্যা ভঙ্গ করেছিস তাই আজ থেকে রাক্ষস বংশের সবাই ছলনাময়ী হবে।’ 

চলবে...

লেখক: কবি ও লেখক, অধ্যাপক: অপরাধবিদ্যা, আইন ও বিচার বিভাগ, জন জে কলেজ, সিটি ইউনিভার্সিটি নিউইর্য়ক, মনস্তাত্তিক বিভাগ, হসটস কলেজ, সিটি ইউনিভার্সিটি, নিউইর্য়ক। কাউন্টার টেরোরিজম কর্মকর্তা, নিউইর্য়ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট (এনওয়াইপিডি)।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :