ডেঙ্গু আতঙ্কে গাছবিমুখ নগরবাসী

তানিয়া আক্তার, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২০ আগস্ট ২০১৯, ১৭:১৯ | প্রকাশিত : ২০ আগস্ট ২০১৯, ০৮:৪০

হাসপাতালগুলোতে উপচে পড়েছে ডেঙ্গু রোগী। প্রাণ হারানোর সংখ্যাটি সরকারি হিসাবে প্রায় অর্ধশত। তবে বেসরকারি হিসাবে এটি এক শ ছাড়িয়েছে আগেই। ডেঙ্গুর এই আগ্রাসনে এর বাহক এডিস ইজিপ্টি মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতাও বেড়েছে। তবে এর মধ্যে কিছু বিভ্রান্তিও দেখা দিয়েছে। ঘরের গাছ কেটে ফেলা, নতুন করে গাছ নেয়া কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

বাড়ির ভেতর টবে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার জন্ম হতে পারে জানার পর ফুলের গাছ কেনা কমিয়ে দিয়েছে নগরবাসী। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাছ কেনা থামিয়ে দেওয়া বা কমিয়ে দেওয়ার চেয়ে সতর্ক থাকাই সমাধান।

রাজধানীর ইস্কাটন এলাকার নার্সারিগুলো ঘুরে দেখা গেছে ক্রেতার সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। ঈদের ছুটির কারণে এমনটি হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে একাধিক বিক্রেতা জানালেন, ঈদের ছুটি শুরুর আগেও ছিল একই চিত্র।

আগে ক্রেতার সংখ্যা ১০ জন হলেও এখন দুই থেকে তিন জনে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছেন নার্সারির মালিকরা। আর বিক্রি কমায় হতাশ তারা।

আবার বহু বাড়িতে গড়ে তোলা ছাদবাগান কেটে ফেলার মতো তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে, সেটা আবার সবুজের অভাব থাকা নগরের জন্য ক্ষতিকর হচ্ছে।

একজন পরিবেশ আন্দোলনকারী এবং একজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলছেন, ঘরে টব বা গাছ থাকলেই ঝুঁকি তৈরি হয় না। সেখানে যেন পানি জমতে না পারে, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া উচিত। গাছবিমুখতা নতুন ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করছেন তারা। 

তবে নার্সারির গাছের টবগুলো দূর থেকে দেখে পানি জমতে পারে বলে মনে হলেও খুব কাছে গিয়ে দেখা গেছে প্রতিটি টবের নিচেই ছিদ্র করা। কারণ পানি জমে থাকলে গাছের গোড়া পচে যাবে। তাই এসব টবে কোনোভাবেই পানি জমতে পারে না। ঝুলন্ত টব ছাড়াও নিচে রাখা টব উঠিয়ে দেখা গেছে সেগুলোতেও ছিদ্র করা।

ইস্কাটনের বাহার নার্সারির বিক্রেতা বাহার ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘বেচাকেনা কম। ‘কিন্তু এইগুলাতে তো পানিই জমতে পারে না। তাইলে মশা জন্মইবো কেমনে?’

এডিস মশা তাদের জীবিকা হুমকির মুখে ঠেলে দেবে এটা মেনে নিতে পারছেন না মিরা নার্সারির বিক্রেতা পারুল বেগম। তিনি বলেন, ‘এহন তো মানুষই আহে না। একজন কইলো, মশায় নাকি কামরাইব। ডেঙ্গু মশায় নাকি ফুলের বাটির পানিতে হয়। এই হালে বেচা কমতে থাকলে পোলাপান নিয়া কই যামু? মশায় তো আমাগো খাওন বন্ধ কইরা দিতাছে।’

তবে ফুলের টব নিয়ে শঙ্কিত না হয়ে টবের নিচের প্লেটে নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট-আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। তিনি ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমরা গাছের বিপক্ষে বলছি না। ফুলের গাছ, ঔষধি গাছ বা যেকোনো গাছ নগরীর সবুজ বাড়াতে সহায়ক। তবে ফুলের টবের নিচে যেহেতু ছিদ্র রয়েছে, তাই টবের নিচে অনেকেই প্লেট রাখে। তো সেখানে পানি জমে এডিস মশা জন্মাতে পারে। তাই বরাবরই আমরা সেই পানি পরিষ্কারের কথা বলে আসছি। কিন্তু মানুষ সাবধান না হয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে বলেই এ ধরনের সমস্যা হচ্ছে।’

ফুলের টব ফেলে দেবেন কি না এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে ফ্লোরাকেও। তিনি বলেন, ‘আমাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে ফুলের টব কি ফেলে দেব? অথচ মূল ব্যাপারটি হলো পানিসহ টব না রাখার ব্যাপারে সচেতনতা দরকার।

‘ঘর সাজিয়ে রাখতে ফুলের টবেও পানি রাখা যাবে। তবে স্কচটেপ দিয়ে টবের মুখটি ভালোভাবে আটকে রাখতে হবে, যাতে এডিস মশা কোনোভাইে ডিম না পাড়তে পারে। তাই সৌন্দর্যবর্ধন কিংবা প্রয়োজনে গাছ বা ফুলের টবের জমানো পানি পরিষ্কার রাখলেই এডিসমুক্ত থাকা যাবে।’

ছাদবাগানের কাজও কমছে

ছাদবাগান করেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তারাও আতঙ্কের মুখে রয়েছেন। গত ২ আগস্ট বিকালে ডেঙ্গু প্রতিরোধের নাম করে কণ্ঠশিল্পী অণিমা রায়ের ছাদবাগান ধ্বংস করেছে অ্যাপার্টমেন্টের কমিটির কজন। তার অ্যাপার্টমেন্টের ছাদের প্রায় শতাধিক গাছ শিল্পীর বিনা অনুমতিতে ধ্বংস করা হয়।

নগরবাসীর মধ্যে বাগানের শখ বা আগ্রহটা দিন দিন কমে যাচ্ছে বলে মনে করেন গ্রিন সেভার্সের সভাপতি আহসান রনি। তিনি ছাদবাগানের কাজের সঙ্গে জড়িত। কয়েক মাস ধরে ৪০ ভাগ কাজ কমে এসেছে বলে জানান তিনি।

এক টাকায় গাছের সেবা দিয়ে থাকে এই সংগঠনটি। কারণ, দীর্ঘ কোনো ছুটিতে নগরবাসী তাদের গাছের যত্ন করতে পারে না। তাই তাদের ‘গাছের হাসপাতালে’ সেগুলো রেখে যান। ছুটি শেষে সেখান থেকে নিয়ে যান। কিন্তু এবার অনেকেই তাদের প্রিয় গাছগুলো নিতে আসছেন না।

আহসান রনি ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘এই আতঙ্ক অমূলক। টবে দেওয়া পানি ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যেই মাটি শুষে নেয়। এছাড়া পুরো ছাদবাগানের পানির ব্যবস্থাই এমন করে রাখা যে পানি নানা মাধ্যমে বের হয়ে যায়।’

টবের নিচের প্লেটের জমানো পানি কোনোভাবে এডিসের জন্ম দেয় কি না সে প্রশ্নে রনি বলেন, ‘টব থেকে যে পানি প্লেটে চুইয়ে পড়ছে সেগুলো তো কাদামাটিসহ পানি। সেই পানিতে মশা জন্মালেও সেটা পরীক্ষা করে দেখতে হবে এডিসের লার্ভা কি না।’

প্রতিদিন পানি দেওয়ার কারণে বা বৃষ্টির কারণে মাটির স্তর নিচে নেমে যেতে পারে। সেখানে পানি জমে এডিস মশা যাতে না জন্মায় সে ক্ষেত্রে অবশ্যই মাটি দিয়ে টবটি ভরে দিতে বলেন এই বৃক্ষপ্রেমী।

মশা প্রতিরোধী কিছু গাছও রয়েছে। পুদিনা, তুলসি, গাঁধা ফুল, রসুন, লেভেন্ডারের মতো গাছ মশা থেকে দূরে রাখতে পারে। তাই টবে এই ধরনের গাছ রোপণের পরামর্শও দিয়েছেন রনি।

নিরাপদ উপায় কী?

রাজধানীর পরিবাগ ওভারব্রিজের লাগোয়া ভবন ইউনিক হাইটস। ভবনটির একপাশে আবাসিক ও অন্যপাশে বাণিজ্যিক এলাকা। দূর থেকেই এর ছাদের ফুল ও গাছের সৌন্দর্য দৃশ্যমান। সেই ছাদেও গিয়ে দেখা গেছে পানি যাতে জমতে না পারে এর জন্য রয়েছে নানা ব্যবস্থা।

সেখানকার গাছ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন তাইজুল ইসলাম। প্রায় ১০ বছর ধরে বিভিন্ন ভবনের ছাদের বাগানে কাজ করছেন তিনি।  ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘পানি জমে থাকার কোনো কারণই নাই। এই যে ছাদবাগান দেখছেন এর নিচে প্রথমে ভাঙা ইট, তার ওপর কার্পেট বিছানো। বৃষ্টির পানি সেগুলো কার্পেট শুষে নেয়। এ ছাড়া চিকন লেন দিয়া পানি বের হয়ে যায়। আর নিচের দিকে আলাদা পাইপের ছিদ্র আছে। গাছে পানি দিলে সেখান দিয়ে বের হয়।’

ঢাকাটাইমস/২০আগস্ট/টিএ/এমআর

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :