‘ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্টের চেয়ে ব্রিলিয়ান্ট মানুষ জরুরি’

মমিনুল ইসলাম
 | প্রকাশিত : ১১ অক্টোবর ২০১৯, ১২:১৮

ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। এই দুটি ইংরেজি শব্দ আমার সারাজীবনের আফসোস।আমাকে কেউ কোনদিন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট বলে অভিহিত করেনি। আমি ক্লাসে কখনো ভালো ছাত্র ছিলাম না, বেশি নাম্বার পেয়ে ভালো রেজাল্ট করতে পারিনি।

আমাদের দেশে যারা ক্লাসের সিলেবাস অনুযায়ী পরীক্ষায় ভালো নাম্বার পায়, তাদেরকে ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট বলে। তারা উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পায়। উচ্চতর শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ভালো বেতনে চাকরি করতে পারে।

উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির শর্তগুলি কী? এই পরিমান নাম্বার পাওয়া সার্টিফিকেট তোমার আছে কি না? আর এই যে একটি প্রশ্ন তোমাকে দেয়া হলো, এই প্রশ্নের উত্তর লিখে তুমি এত পার্সেন্ট নাম্বার ক্যারি করতে পারলে কি না! ব্যস এইবার তুমি মেডিকেলে, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যাও। সবার স্বীকৃতি অনুযায়ী তুমি এখন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট।

ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট হওয়া বেশি জরুরি? না কি ব্রিলিয়ান্ট মানুষ হওয়া বেশি জরুরি? যারা ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট তাদেরকে ব্রিলিয়ান্ট মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কোনো ইচ্ছা, উদ্যোগ, পরিকল্পনা বা পদ্ধতি কি আমাদের সমাজের, রাষ্ট্রের, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আছে? আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কি একই সাথে ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ও ব্রিলিয়ান্ট মানুষ হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করা আছে? আমি বলছি নেই। কারণ আমাদের সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় এথিকস,এসথেটিকস আর লজিকের গুরুত্ব নেই।

যুক্তি,নৈতিকতা ও সৌন্দর্য বিবর্জিত শিক্ষা কখনোই ব্রিলিয়ান্ট মানুষ তৈরি করে না।

আমাদের স্কুল-কলেজ পর্যায়ে যে সিলেবাস প্রণয়ন করা হয়েছে,যে সিলেবাসে জাতীয় শিক্ষাক্রম পরিচালিত হচ্ছে, সেটা কোনোভাবেই ভালো মানুষ,নৈতিক মানুষ, সৎ নাগরিক তৈরি করবে না। পুরো সিলেবাসটাই লোভ আর টোপ দিয়ে তৈরি। শুধু নাম্বার ক্যারি করো, নাম্বার নাম্বার। ছাত্র নাম্বার চায়,গার্জিয়ান চায়,শিক্ষক চায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চায়,শিক্ষা বোর্ড চায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় শুধু নাম্বার চায়। কিসের উপর নাম্বার পাচ্ছে, কেন নাম্বার পাচ্ছে, এই নাম্বার দিয়ে জাতির কী উন্নতি-উপকার হবে, এটা ভাবার কেউ নেই।

আমাদের পুরো দেশটাই এখন একটি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। সমস্ত সেক্টরে দুর্নীতির মহোৎসব চলছে। ওইসব সেক্টরে যারা দুর্নীতি করছে তারা সবাই ছাত্র জীবনে ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিল। কেউ ব্রিলিয়ান্ট মানুষ হওয়ার শিক্ষা পায়নি।

এখন সারা দেশে বুয়েট স্টুডেন্ট আবরার হত্যাকাণ্ড নিয়ে ঝড় চলছে। এই ঝড়ের দোলা পৃথিবী তথা জাতিসংঘ পর্যন্ত লেগেছে। আবরার এবং তার খুনীরা সবাই বুয়েটের ছাত্র, ব্রিরিয়ান্ট স্টুডেন্ট। এতটাই ঠান্ডা মাথার ব্রিলিয়ান্ট যে, বন্ধুকে খুন করে লাশ সিঁড়িতে ফেলে রেখে সবাই বসে বার্সেলোনার ফুটবল খেলা দেখে।

আমার দুঃখটা হচ্ছে, এই খুন হওয়া ছেলেটি আর খুনীরা- দুজনেই আমার সন্তান। এই খুনের সমস্ত দায়ভার আমাকে বহন করতে হবে। কারণ আমার সন্তানকে আমি শুধু বেশি নাম্বার পাওয়া ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট বানানোর কাজে সমস্ত চিন্তা চেতনাকে ব্যয় করেছি। আমি একবারও ভাবিনি, তাকে ভালো মানুষ বানাতে হবে। তাকে নৈতিক মানুষ, মানবিক মানুষ করে গড়ে তোলার কোনো পদক্ষেপ আমি গ্রহণ করিনি। যে কারণে আমার এক পুত্র আরেক পুত্রকে খুন করেছে। এবার বিচারে খুনী পুত্রটিও মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হবে। তা হলে আমার থাকল কী? আমার তো সবই গেল। এই হত্যাকাণ্ডের দায়ভার কার উপর বর্তায়?

আমি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করব, দয়া করে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে বসুন। আমাদের সমাজ ব্যবস্থার সাথে জাতিয় সংস্কৃতি আদর্শ আর মূল্যবোধের সাথে সংগতি রেখে সিলেবাস প্রণয়ন করুন। আমাদের সন্তানদের সামনে সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠার ক্ষেত্র বিস্তৃত করে দিন। নীতি বিবর্জিত শিক্ষা আর ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্টের কোনো দরকার নেই। সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষিত হওয়ার চেয়ে সৎ মানুষ হওয়া বেশি জরুরি।

লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক

সংবাদটি শেয়ার করুন

নির্বাচিত খবর বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :