বিকট শব্দে উদয়নে উঠে পড়ে তূর্ণা

মনিরুজ্জামান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
| আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২২:০২ | প্রকাশিত : ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২০:৫৪
  • মুহূর্তেই দুমড়ে মুচড়ে যায় উদয়নের তিনটি বগি
  • যাত্রীদের অধিকাংশই ছিলেন ঘুমন্ত
  • কিছু বুঝে উঠার আগেই মৃত্যু ১০ জনের, হাসপাতালে আরও ৬
  • ১৬ মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর
  • আহত অর্ধশতাধিক বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন
  • হতাহতদের পরিবারকে অর্থ সহায়তা

রাত তখন প্রায় তিনটা। নিজ নিজ গন্তব্যের পথে ট্রেনে চেপে বসা যাত্রীরা ছিল গভীর ঘুমে। কিন্তু ঘুমন্ত কয়েকশ যাত্রীর হঠাৎ জেগে উঠেন বিকট শব্দে। তাদের মনে হয়েছিল শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণ। আঁতকে ওঠেন আশপাশের এলাকার বাসিন্দারাও। এরপরের ঘটনা বড়ই নির্মম, নিষ্ঠুর ও বেদনার। কারণ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় ততক্ষণে অনেকের জীবনপ্রদীপ থেমে যায়। লণ্ডভণ্ড ট্রেনের ভেতরে জীবিতদের একে অন্যের কানে ভেসে আসতে থাকে আর্তনাদ আর করুন চিৎকার। কিন্তু অসহায় যাত্রীদের কেউ কাউকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসতে পারেননি।

গতকাল ভোররাতে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী আন্তনগর ট্রেন তূর্ণা নিশীথা সিলেট থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী আন্তনগর উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের উপরে ওঠে যায়। এতে উদয়ন এক্সপ্রেসের তিনটি বগি পুরো ধুমড়েমুচড়ে যায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজলার মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনে ক্রসিং পার হতে দুই ট্রেনের মধ্যে এই ভয়াবহ সংঘর্ষটি ঘটে।

পরে আশপাশের মসজিদের মাইকে দুর্ঘটনার কথা ঘোষণা হলে স্থানীয়রা ছুটে এসে আহতদের উদ্ধার করতে শুরু করেন। পরে খবর পেয়ে দ্রুত ছুটে আসে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও রেলের লোকজন। উদ্ধার কাজে অংশ নেয় পাশে থাকা ক্যাম্পের বিজিবি সদস্যরাও। উদ্ধার করে আহতদের কাউকে কসবা উপজেলা হাসপাতালে, কাউকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, গুরুতর আহতদের নিয়ে যাওয়া হয় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ও কুমিল্লা সিএমইএচে।

এই ঘটনায় ১৬ জনের মধ্যে ১৫ জনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আহত হয়েছেন ৭৪জন। তারা কসবা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।

দেশে প্রায়ই ট্রেন দুর্ঘটনার কথা শোনা গেলেও আগে নিকট অতীতে এমন সংঘর্ষের কথা শোনা যায়নি। যে কারণে এ নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে সর্বত্র। দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে ছুটে গেছেন রেলমন্ত্রী, সচিবসহ সরকার এবং রেল বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। মন্ত্রী বলেছেন, ‘তূর্ণা নিশীথার চালক সিগনাল না মানায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।’ এ ঘটনায় ট্রেনটির তূর্ণার চালকসহ তিনজনকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

এদিকে এই ঘটনার পর রেলের চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণের তাগিদ দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংঘর্ষের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, ‘অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। এ ব্যাপারে আমাদের রেলের যারা কাজ করেন তাদের সতর্ক করা উচিত। সেই সঙ্গে যারা রেলের চালক তাদেরও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।’

দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেন দুটি সরিয়ে লাইন আবার চলাচলের উপযোগী করতে লাকসাম ও আখাউড়া থেকে দুটি রিলিফ ট্রেন কাজ করে। সাত ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর গতকাল বিকালে চট্টগ্রামের সঙ্গে সিলেট ও ঢাকার রেল যোগাযোগ শুরু হয়।

যেভাবে ভয়াবহ সংঘর্ষ

সিলেট থেকে ছেড়ে উদয়ন এক্সপ্রেস যাচ্ছিল চট্টগ্রামে। আর তূর্ণা নিশীথা চট্টগ্রাম থেকে যাচ্ছিল ঢাকায়। তূর্ণা নিশীথা সোমবার দিবাগত রাত ২টা ৪৮ মিনিটে শশীদল রেলওয়ে স্টেশন অতিক্রম করে মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশনের দিকে যাত্রা করে। ট্রেনটিকে আউটারে থামার জন্য সংকেত দেওয়া হয়। আর উদয়ন এক্সপ্রেস কসবা রেলওয়ে স্টেশন ছেড়ে মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশনে প্রবেশ করার পথে ট্রেনটিকে মেইন লাইন ছেড়ে ১ নম্বর লাইনে আসার সংকেত দেওয়া হয়। উদয়নের ছয়টি বগি প্রধান লাইনে থাকতেই তূর্ণা নিশীথার চালক সিগন্যাল অমান্য করে ট্রেনটির মাঝামাঝি ঢুকে পড়ে। এতে উদয়নের তিনটি বগি দুমড়ে-মুচড়ে যায়।

ঘটনার ভয়াবহতার কথা তুলে ধরে কুমিল্লা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন কাওছার নামের এক ট্রেন যাত্রী বলেন, হঠাৎ শব্দে সবার ঘুম ভেঙে যায়। মনে করছিলাম শক্তিশালী কোনো বোমার বিস্ফোরণ ঘটেছে। পরে দেখি চারিদিকে অন্ধকার। চোখের সামনে অনেককে মারা যেতে দেখেছি। কেমনে বেঁচে আছি জানি না।’

মরদেহ হস্তান্তর

গতকাল সন্ধ্যার মধ্যে নিহত ১৬ জনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এই ১৬ জন হলেন মৌলভীবাজারের জাহেদা খাতুন, হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের আল-আমিন,  আনোয়ারপুরের আলী মোহাম্মদ ইউসুফ,  ভোল্লার ইয়াছিন আরাফাত,  চুনারুরঘাটের তিরেরগাঁওয়ের সুজন আহমেদ, বানিয়াচংয়ের আদিবা,  সোহামনি,  হবিগঞ্জের রিপন মিয়া,  হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের পিয়ারা বেগম; চাঁদপুরের কুলসুম বেগম, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের পশ্চিম রাজারগাঁওয়ের মুজিবুল রহমান,  চাঁদপুরের উত্তর বালিয়ার ফারজানা,  হাইমচরের কাকলী ও মরিয়ম,  চাঁদপুর সদরের ফারজানা ও নোয়াখালীর মাইজদির রবি হরিজন।

আহত  অনেককে ঢাকায় ও সিলেটে স্থানান্তর

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শওকত হোসেন জানান, ট্রেন দুর্ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরা হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আহতদের বেশির ভাগেরই হাত-পা ভাঙা কিংবা মাথায় আঘাত। তাদের  ঢাকা মেডিকেল,  ঢাকা পঙ্গু হাসপাতাল ও সিলেট উসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

নিহত-আহতদের জন্য অর্থ সহায়তা

নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ১ লাখ করে টাকা করে দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন। মন্ত্রী বলেন, নিহতের পরিবারের ক্ষতি টাকা দিয়ে পূরণ করা সম্ভব না। তবুও রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে এই আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে।  আহতরা প্রত্যেকে পাবেন দশ হাজার টাকা করে।

অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক হায়াত উদ- দৌলা খান। আহতদের চিকিৎসা খরচও বহন করবে জেলা প্রশাসন।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক

ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনায় শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পৃথক শোকবার্তায় দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। এছাড়াও সংসদের স্পীকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও শোক জানিয়েছেন।

(ঢাকাটাইমস/১২নভেম্বর/বিইউ/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :