অপকর্মে বিদ্ধ চার ওসি

আশিক আহমেদ, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৮:০১

দায়িত্বপালনকালে পুলিশের কতিপয় সদস্যের বিরুদ্ধে নানা সময়ে অপেশাদার বা অনৈতিক কোনো কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আসে। কিন্তু একটি থানার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার গুরুদায়িত্ব যাদের হাতে সেই ওসিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে পুলিশের ভূমিকা নিয়েই দেখা দেয় নানা প্রশ্ন।

সম্প্রতি ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে পদচ্যুত হয়েছেন চারজন ওসি। তারা হলেন ঢাকার পল্টন থানার অপসারিত ওসি মাহমুদুল হক, কুমিল্লার কোতোয়ালি থানার অপসারিত পরিদর্শক (তদন্ত) সালাহউদ্দিন, রাজশাহীর পুঠিয়া থানার পদচ্যুত ওসি শাকিল আহমেদ এবং খুলনা রেলওয়ে থানার পদচ্যুত ওসি ওসমান গণি পাঠান। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো তদন্তাধীন।

বিভিন্ন সময়ে ওসিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে তা তদন্ত করা হয়। সাজাও পান কেউ কেউ। কিন্তু এরপরও কতিপয় কর্মকর্তা জড়িয়ে পড়েন অপরাধে। বিশাল একটা বাহিনীর কতিপয় সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসাকে অস্বাভাবিক মনে করছেন না পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অন্যদিকে বাহিনীর কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারক করার পরামর্শ দিয়ে সাবেক পুলিশপ্রধান বলছেন, নিয়মিত তদারক করলে পুলিশের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা একেবারে নির্মূল না হলেও কমে আসবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (ডিসিপ্লিন) জালাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘যেকোনো অর্গানাইজেশনের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসাটা অস্বাভাবিক নয়। তবে অভিযোগ আসলে তা নিয়মানুযায়ী তদন্ত করে অভিযুক্তের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হয়।’

এ ব্যাপারে সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘ভালো-মন্দ নিয়েই তো মানুষ। পুলিশ সদস্যদের কর্মকাণ্ড ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকি করতে হবে। ভালো কাজের জন্য পুরস্কার আর মন্দ কাজের জন্য সাজার ব্যবস্থা করতে হবে। অপরাধীরা যেন বুঝতে পারে- অপরাধ করে পার পাওয়া যায় না। তবে এমন অপরাধ একবারেই নিমূল করা সম্ভব নয়।’

অপকর্মের দায়ে অপসারিত চার ওসির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ

খুলনা রেল থানার ওসি ওসমান গণি: চলতি বছরের ১০ আগস্ট খুলনায় এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ খুলনা রেলওয়ে থানার পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসমান গণিসহ পাঁচ পুলিশের সদস্যের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী ওই গৃহবধূর অভিযোগ আমলে নিয়ে মামলাটি তদন্ত করতে পিবিআইকে আদেশ দেয় আদালত।

ওই নারীর অভিযোগ, গত ২ আগস্ট যশোর থেকে ট্রেনে খুলনায় আসার পথে রেল পুলিশের সদস্যরা কোনো কারণ ছাড়াই প্লাটফর্ম থেকে তাকে আটক করে। এরপর এদিন রাতে ওসি লাঠি দিয়ে তাকে মারধর করেন। পরে রাত দেড়টার দিকে ওসি চোখ বেঁধে তাকে থানার একটি কক্ষে নিয়ে যায়। প্রায় দেড় ঘণ্টায় তাকে তিনবার ধর্ষণ করেন ওসি।

ওই নারী তার আরজিতে বলেন, ওসি ওই কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ডিউটি অফিসার তাকে ধর্ষণ করেন। ডিউটি অফিসারের পর তিন কনস্টেবল পর্যায়ক্রমে ওই কক্ষে গিয়ে তাকে ধর্ষণ করে। পরদিন তাকে পাঁচ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধারের মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।

গত ২৮ আগস্ট খুলনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে মাদক মামলায় জামিনে মুক্ত হন তিনি।

খুলনা জেলার পিবিআইয়ের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘ওই মামলা এখনো তদন্তাধীন। আরও কয়েকজন সাক্ষী বাকি আছে। তাদের সাক্ষ্য নিয়ে এই মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়ে দেব।’

পুঠিয়া থানার ওসি সাকিল উদ্দিন আহমেদ: এজাহার পাল্টে দেয়ার অভিযোগে রাজশাহী পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাকিল উদ্দিন আহমেদকে দোষী সাব্যস্ত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) আদেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। একইসঙ্গে তার বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন-সংক্রান্ত নথিপত্র দিয়ে দুদককে সহায়তা করতে রাজশাহী মহানগর মুখ্য হাকিমকে (সিএসএম) নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গত ১ ডিসেম্বর এই আদেশ দেয়া হয়।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাজশাহী পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাকিল উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে একটি রিট করেন পরিবহন শ্রমিক নেতা মৃত নূরুল ইসলামের মেয়ে নিগার সুলতানা। তার অভিযোগ, পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি সাকিল উদ্দিন নিগারের বাবার হত্যা মামলার এজাহার পাল্টে দিয়েছেন। বিষয়টি তিনি রাজশাহী পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।

এ ছাড়াও মামলাটি বাতিলের জন্য রাজশাহীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্টেট ও আমলি আদালত-২ এ আবেদন করেন। গত ২৪ এপ্রিল উপজেলার মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনে নুরুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে নূরুলকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে পুঠিয়া থানার ওসি পরাজিত করান।

এ ফলাফলের বিরুদ্ধে নিহত নূরুল ইসলামসহ পরাজিত তিন প্রার্থী আটজনকে আসামি করে আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালত শ্রমিক ইউনিয়নের সব কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। পরে এ আদালতের জারিকারক পুঠিয়া মোটরশ্রমিক ইউনিয়নের কার্যালয়ে গিয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। সেসময় নিহত নুরুল ইসলাম জারিকারকের সঙ্গে যান। এতে আসামিরা ক্ষিপ্ত হয়ে নুরুল ইসলামের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। ওই রাতেই নুরুল ইসলাম নিখোঁজ হন।

পরদিন সকালে শ্রমিক ইউনিয়নের সামনের ইটভাটায় তার লাশ পাওয়া যায়। সেসময় নিহত নুরুল ইসলামের মেয়ে নিগার সুলতানা পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে একটি এজাহার দেন। সেই এজাহার ওসি সাকিল উদ্দিন আহম্মেদ পাল্টে দিয়েছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।

পুলিশ এ মামলায় এক কিশোরকে আটক করে যা মামলাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য করা হয়েছে বলে নিগার সুলতানা অভিযোগ করেন। বর্তমানে সেই মামলা জেলা ডিবি পুলিশের গোয়েন্দা শাখা তদন্ত করছে।

আর এজাহার পাল্টে ফাঁসিয়ে দেয়া সেই কিশোরকে গত সোমবার মিথ্যা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয় আদালত। তাকে জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছে।

মামলাটির বিষয়ে দুদকের রাজশাহী জেলা সম্মনিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘সত্য মিথা উদঘাটনের জন্য অনুসন্ধান চলছে।’

কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সালাউদ্দিন: গত ৩ আগস্ট এক ব্যবসায়ীকে থানায় ধরে আনেন কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সালাউদ্দিন। তারপর ওই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে জোর করে দেড় কোটি টাকার চেক লিখে নেয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। মহিউদ্দিন নামের ওই ব্যবসায়ী গত ১ ডিসেম্বর পরিদর্শক সালাহউদ্দিনের বিরুদ্ধে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল আদালতে মামলা করেন। আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে পিবিআইকে মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দেয়।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, ব্যবসায়িক প্রয়োজনে মহিউদ্দিনের জমি বন্ধক রেখে তার চাচাতো ভাই এই মামলার ২ নম্বর আসামি মাহাবুব আলম ইউসিবিএল ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে। ওই ঋণ সময়মতো পরিশোধ করতে না পারায় মাহাবুবের বিরুদ্ধে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অর্থ ঋণ আদালতে মামলা করে। এ নিয়ে মাহাবুব ও মহিউদ্দিনের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়।

পরে কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) সালাহউদ্দিন এবং আসামি মাহাবুব আলম যোগসাজশে টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে গত ৩ আগস্ট রাতে পুলিশ পাঠিয়ে মহিউদ্দিনকে থানায় তুলে নিয়ে যায়। এরপর পুলিশ পরিদর্শক সালাহউদ্দিনের রুমে মহিউদ্দিনকে আটকে রাখে এবং তার ভাইয়ের মাধ্যমে বাড়ি থেকে চেকবই নিয়ে এক কোটি ৫০ লাখ টাকার চেক লিখিয়ে নেন।

কুমিল্লা জেলার পিবিআইয়ের প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ওসমান গণি ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এই মামলার কাগজপত্র এখনো আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়নি। কাগজপত্র দেখে পরে বিস্তারিত বলতে পারব।’

রাজধানীর পল্টন মডেল থানার ওসি মাহমুদুল হক: রাজধানীর পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুলের বিরুদ্ধে অভিযোগটি গুরুতর। চাকরি দেয়ার এবং বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। পুলিশ সদরদপ্তর তদন্ত করে অভিযোগের ‘সত্যতা’ পায়। পরে তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়। মাহমুদুল হকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সদরদপ্তরে বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

ওই নারীর অভিযোগ, পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাকে চাকরি দেয়ার কথা বলে নওগাঁ থেকে ঢাকায় ডেকে এনে একটি হোটেলে তোলেন ওসি। সেখানে খাবারের সঙ্গে ‘চেতনানাশক জাতীয় কিছু খাইয়ে তাকে ধর্ষণ করেন’ পুলিশ কর্মকর্তা মাহমুদুল।

পুলিশ সদরদপ্তরে করা লিখিত অভিযোগে ওই নারী বলেছেন, চেতনা ফেরার পর ঘটনা বুঝতে পেরে তিনি প্রশ্ন করলে মাহমুদুল হক তাকে ‘ভালোবাসার কথা, বিয়ে করার আগ্রহের কথা’ বলেন। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরেও বিভিন্ন সময় ওই পুলিশ কর্মকর্তা ধর্ষণ করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন বর্তমানে একটি ব্যাংকে চাকরিরত ওই নারী।

এক পর্যায়ে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। কিন্তু মাহমুদুল হক তাকে গর্ভপাতে ‘বাধ্য করেন’। বিয়ের জন্য চাপ দিলে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। এক পর্যায়ে অফিসে গেলে আবারও বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দেন। এই পরিস্থিতিতে ওসি মাহমুদুলের বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করেন ওই নারী।

তার দাবি, মাহমুদুলের বাবা প্রথমে বিষয়টি সহানুভূতির সঙ্গে দেখলেও পরে ছেলের সঙ্গে মিলে নানাভাবে হুমকি দিতে শুরু করেন। আর কোনো উপায় না দেখে এক সময় আত্মহত্যার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগে লিখেছেন ওই নারী।

জানতে চাইলে পুলিশ সদরদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) মীর সোহেল রানা ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘পল্টনের সাবেক ওসি মাহমুদুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

প্রসঙ্গত, অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অভিযোগ নিতে ২০১৭ সালে বিশেষ সেল গঠন করে পুলিশ সদরদপ্তর। একজন অতিরিক্ত ডিআইজির তত্ত্বাবধানে ‘আইজিপি কমপ্লেইন্ট সেল’ নামে পরিচিত এই সেল ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে। যেকোনো পদের পুলিশ সদস্য অপেশাদার বা অনৈতিক কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে এখানে অভিযোগ করা যায়।

(ঢাকাটাইমস/১১ডিসেম্বর/এএ/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :