একটি লাগেজ এবং একজন অসহায় বাবার হাসি

হাফিজ আল ফারুক
| আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:০৫ | প্রকাশিত : ২০ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৮:২২
হাফিজ আল ফারুক

মোহাম্মদপুরে উপ-পুলিশ কমিশনারের ( তেজগাঁও বিভাগ) কার্যালয়ের গেটের উত্তর পাশে ফুটপাথে একটি লাল রঙের লাগেজ পড়ে থাকতে দেখেন কনস্টেবল আল মামুন।  বুধবার বিকাল ৬টা ২০ মিনিটে তিনি এটি দেখতে পান। ৭-৮ মিনিট লাগেজটির পাশে কাউকে না দেখে সন্দেহ হয় কনস্টেবল আল মামুনের। তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার বিপ্লব বিজয় তালুকদারকে জানায় সে।

অফিস কক্ষে বিভিন্ন থানা থেকে আগত দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন উপ-পুলিশ কমিশনার বিপ্লব বিজয় তালুকদার। কনস্টেবল আল মামুনের মুখে লাগেজটির কথা শুনে অফিসের গেটের বাইরে বের হন তিনি। গেটের বাম পাশেই ফুটপাথে প্রাচীর ঘেঁষে আনএটেন্ডেড (পরিত্যক্ত) অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন লাগেজটি।

প্লাস্টিকের কোণ দিয়ে কর্ডন (পরিবেষ্টন) করা হলো লাগেজটির চারপাশ। মোতায়েন করা হলো পুলিশ। কর্ডনকৃত ফুটপাথ পরিহার করে লাগেজ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায়  রেখে চলাচলের জন্য অনুরোধ জানানো হলো পথচারীদের। বিষয়টি অবহিত করা হলো  ডিএমপির ঊর্দ্ধতন কতৃর্পক্ষকে।

উপ-পুলিশ কমিশনার (তেজগাঁও বিভাগ) এর কার্যালয়ের চারপাশে সিসিটিভি’র ফুটেজ এনালাইসিস শুরু হলো। কে, কখন, কিভাবে রেখে গেল এই লাগেজ? পায়ে হেঁটে নাকি গাড়িতে চড়ে রেখে গেল?  ভুলে নাকি প্ল্যান করে? কি থাকতে পারে এই লাগেজে? বিস্ফোরক নাকি খন্ডিত মৃতদেহ? নাকি স্রেফ ভূলবশত কেউ ফেলে গেছে লাগেজটি?

গত ২৪ জুলাই ঢাকার পল্টন মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সামনে পরিত্যক্ত কার্টনের ভেতরে বোমা এবং ২১অক্টোবর ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ ব্রহ্মপুত্র সেতুর পাশে পড়ে থাকা একটি ট্রলি ব্যাগ থেকে খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

পরে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় আসলো ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ টিম। প্রথমে দূর থেকে, তারপর একদম কাছ থেকে- প্রায় মিনিট দশেক লাগেজটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলো বোমা নিষ্ক্রিয়করণ টিমের সদস্যরা।

তারা নিশ্চিত হলেন লাগেজে খারাপ কিছু নেই। খোলা হলো লাগেজটি। দেড়-দুই বছর বয়সী বাচ্চার বেশকিছু জামা-কাপড়ের সাথে একটি লুঙ্গি ও একটি শাড়ি। এগুলোর নিচে বেশকিছু ফাইল। ফাইলে ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, মাদারীপুর, বরিশালের কয়েকটি হাসপাতালে কর্মরত কয়েকজন ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন। রোগীর নাম: মাশফি, বয়স ১৬ মাস।

প্রেসক্রিপশনগুলোতে রোগীর ঠিকানা, অভিভাবকদের নাম ও মোবইল নম্বর নেই। উপ-পুলিশ কমিশনার বিপ্লব বিজয় তালুকদার নিজেই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলেন এসব।

তিনি এডিসি (পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত) ওয়াহিদুল ইসলাম ও এডিসি হাফিজ আল ফারুককে নির্দেশ দিলেন যেভাবেই হোক লাগেজের মালিককে খুঁজে বের করে তার কাছে লাগেজটি পৌঁছে দিতে।

লাগেজে পাওয়া প্রেসক্রিপশনগুলো দেখে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের ফোন করে জানতে চাওয়া হয় মাশফির কোনো গার্ডিয়ানের এড্রেস বা মোবাইল নম্বর তাদের কাছে আছে কি না। তারা মাশফির কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

কাপড়ের ভাঁজের মধ্যে পাওয়া একটি প্রেসক্রিপশনে দেখা যায়, এপ্রিল ২০১৯ তারিখে মাদারীপুরে অবস্থিত নিরাময় হাসপাতালের ডা. পি. কে. বৈদ্য (বিপ্লব) এঁর কাছে

মাশফি’কে দেখানো হয়েছে। ফোন করা হলো নিরাময় হাসপাতালে। মাশফি’র চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য জানিয়ে নিরাময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হলো

মাশফি’র গার্ডিয়ানের এড্রেস বা মোবাইল নম্বর দিতে। প্রায় ৫০ মিনিট পর নিরাময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ফোন করে জানালো মাশফি’র বাবার নাম মাসুম। তার মোবাইল নম্বর ০১৯১৩......।

০১৯১৩...... নম্বরে ফোন করলেন এডিসি (পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত) ওয়াহিদুল ইসলাম। অপরপ্রান্তের ব্যক্তি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানালো তার নাম মাসুম। মাশফি তার ছেলে। ছেলের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসে লাগেজ হারিয়ে ফেলেছেন। যে লাগেজে ছিল তার ছেলের চিকিৎসা সংক্রান্ত সব কাগজপত্র।

মাশফি’র বয়স ১৬ মাস। ওজন ৭.৫ কেজি। বয়সের তুলনায় শারীরিক বৃদ্ধি কম হওয়ায় প্রায় বছর খানেক ধরে মাশফি’র মা-বাবা নিজেদের সর্বস্ব বিক্রি করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুর, বরিশালের হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরেছে ছেলেকে নিয়ে। আজকেই মাদারীপুর থেকে ঢাকা এসেছে। পরদিন শেরেবাংলা নগরস্থ নিউরোসায়েনস হাসপাতালে মাশফিকে দেখানোর কথা।

ঢাকায় কোনো আত্মীয়-স্বজন না থাকায় আগারগাঁওয়ে দূর-সম্পর্কের একজন আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করে স্ত্রী-পুত্র ও লাগেজসহ তেতুলিয়া পরিবহনে কৃষি মার্কেটে অবস্থিত সেই

আত্মীয়ের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয় মাসুম। আগারগাঁও থেকে শ্যামলী হয়ে কৃষি মার্কেটের দিকে যাওয়ার পথে উপ-পুলিশ কমিশনার (তেজগাঁও বিভাগ) এর কার্যালয়ের সামনে টার্নিংয়ের সময় মাসুমের অগোচরে কেউ লাগেজটি বাস থেকে নামিয়ে ফেলে। আশেপাশে পুলিশের উপস্থিতির কারণে হয়তো লাগেজটি নিতে পারেনি সে।

লাগেজটি হারিয়ে পাগলের মতো কাঁদছিল মাসুম ও তার স্ত্রী। পরে মাসুমকে জানানো হয় লাগেজটি এখন তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার বিপ্লব বিজয় তালুকদার মহোদয়ের অফিসে। লাগেজটি মাসুমের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন তিনি।

২০ মিনিট পর সেই আত্ময়সহ হাজির হলো মাসুম। অক্ষত অবস্থায় লাগেজটি পেয়ে আবেগাপ্লুত মাসুম ছেলের সুস্থ্যতার জন্য দোয়া চায় সবার কাছে।

লেখক: অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি), তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল বিভাগ।

ডিএমপি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফেসবুক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :