‘প্রকাশকের জন্য তাত্ত্বিক জ্ঞানটাও জরুরি’

কামরুল হাসান শায়ক
 | প্রকাশিত : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৪:৪০

কামরুল হাসান শায়ক। পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান। প্রকাশনা ও মুদ্রণ বিশেষজ্ঞ হিসেবেও খ্যাতি আছে তার। এ বিষয়ে একাধিক বই লিখেছেন। লিখছেন আরও।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পড়াশোনা শেষ করে প্রকাশনাশিল্পে মন দেন। নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে সফলতার শিখরে পৌঁছান। পরবর্তীতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান পাঞ্জেরী এবং তার লেখালেখি নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকা টাইমসের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাবিবুল্লাহ ফাহাদ

অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০-এর সার্বিক আয়োজন আপনার কেমন লাগছে?

বিগত যে-কোনো সময়ের চেয়ে এবারের বইমেলা বেশ পরিকল্পিত, সুন্দর। সামগ্রিক বিষয়গুলোকে বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা করার প্রচেষ্টা স্পষ্ট প্রতীয়মান।

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেড এবার মেলায় কতগুলো বই আনছে? এর মধ্যে বড়দের জন্য কী কী বই থাকছে? আর ছোটদের জন্য কী কী থাকছে?

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স এবারের বইমেলায় ১০৩টি বই প্রকাশ করছে। বড়দের ৬০টি, ছোটদের ৪৩টি। এক- তৃতীয়াংশ বই-ই বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক । দেশের অধিকাংশ সেরা লেখকের উপন্যাস, গল্প, কবিতা এবং প্রবন্ধের বই প্রকাশ করেছি এবার আমরা। এছাড়া গ্রাফিকস নভেল, কমিকস, শিশুতোষ গল্প- উপন্যাস- ক্লাসিকস, কিশোরদের গল্প- উপন্যাস - ক্লাসিকস তো আছেই। উপরন্তু সামাজিক সচেতনতা ও আত্ম উন্নয়নমূলক বেশকিছু বইও প্রকাশ করেছে পাঞ্জেরী।

মুজিববর্ষ উপলক্ষে পাঞ্জেরীর বিশেষ কোনো আয়োজন রয়েছে কি না?

মুজিববর্ষ উপলক্ষে 'বঙ্গবন্ধু বীক্ষণ' বারো খণ্ডে প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। এছাড়া বঙ্গবন্ধুবিষয়ক আরও বেশ কিছু বই ইতিমধ্যে বইমেলায় পাঞ্জেরীর প্যাভিলিয়নে পাওয়া যাচ্ছে, বেশ কিছু প্রকাশের প্রক্রিয়ায় আছে। আশা করছি ১৭ মার্চের মধ্যেই পরিকল্পিত সব বই প্রকাশ করা সম্ভব হবে। মাসব্যাপী বইমেলার শুরুতে সব সময়ই একটু ঢিলেঢালা ভাব থাকে। এখন তো জমজমাট।

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি. দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঞ্জেরীর বইয়ের বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। সেটি একাডেমিক বইয়ের ক্ষেত্রে। মেলায় সৃজনশীল প্রকাশনায় পাঠকদের সাড়া কেমন?

আমরা প্রতিটি বই প্রকাশনায় অত্যন্ত যত্নশীল। প্রতিটি বই প্রকাশের আগে যথেষ্ট গবেষণা করা হয় প্রকাশনার স্তরে স্তরে। আমরা শুধু মানসম্পন্ন বই উৎপাদনই করি না, বইয়ের বিপণন এবং পাঠক তৈরিতেও নিবেদিত। পাঠক পাঞ্জেরীর বই কিনে আশাতীত উপকৃত হয়। একাডেমিক এবং সৃজনশীল সব ক্ষেত্রেই তাই আমরা সমান জনপ্রিয়। অমর একুশে বইমেলায় পাঞ্জেরীর প্যাভিলিয়নে পাঠকের উপচেপড়া ভিড় এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

অন্যান্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করলে পাঞ্জেরীকে এগিয়ে রাখতে হয়। এই অর্থে যে, পাঞ্জেরী বড়দের জন্য সৃজনশীল প্রকাশনার পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের জন্য বই প্রকাশ করছে। এর পেছনের ভাবনা সম্পর্কে যদি বলতেন।

আমরা বাংলাদেশে একটা শক্তিশালী পাঠকশ্রেণি গড়ে তোলার অভিপ্রায়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রথম টার্গেট শিশু-কিশোর পাঠক। এই বয়সটি সৃজনশীল মনন গড়ে তোলার উপযুক্ত সময়। তাদের মনোবিকাশের সকল স্তর গবেষণা করে বয়স উপযোগী বই প্রকাশের উদ্যোগ নেয় পাঞ্জেরী আজ থেকে দুই দশক আগে। এ ধরনের উদ্যোগ বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতে প্রথম। আমরা এ জায়গাটায় বেশ সফল। পাঞ্জেরীর সুনির্দিষ্ট একটা পাঠকশ্রেণি গড়ে উঠেছে। শিশু-কিশোর অথবা বড় যাদের জন্যই আমরা বই প্রকাশ করি, তারাই সাদরে গ্রহণ করছে। সুতরাং সুস্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান যে, শুরুতে শিশু-কিশোর উপযোগী বই প্রকাশের পেছনে আমাদের সুদূর প্রসারী ভাবনা ছিল।

প্রকাশনা ও মুদ্রণ বিশেষজ্ঞ হিসেবে আপনার পরিচিতি রয়েছে। প্রকাশনা বিষয়ে এরই মধ্যে আপনার লেখা দুটি বই পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশ হয়েছে। ঢাকা বা কলকাতা, কোথাও এ নিয়ে এত বড় দাগে অতীতে কাজ হয়নি। বইগুলো লেখক, পাঠক ও নীতিনির্ধারকদের মাঝে সমাদৃত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য হয়েছে। প্রকাশনাবিষয়ক সিরিজের আরও একটি নতুন বই আমরা শিগগির মেলায় পেতে যাচ্ছি, এমনটা জেনেছি। নাম- ‘পুস্তক উৎপাদন এবং ব্যবস্থাপনা’। এই বইটি সম্পর্কে কিছু বলুন।

প্রকাশনা বিষয়ে তাত্ত্বিক জানাশোনাটা না থাকলে শুধুমাত্র ব্যবহারিক জ্ঞান দিয়ে ভালো প্রকাশক হওয়া দুরূহ ব্যাপার বলে আমি মনে করি। তাছাড়া এখন আমরা গ্লোবাল ভিলেজে বাস করছি। প্রকাশক হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক জানাশোনার একটা চমৎকার রসায়নের মাধ্যমে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। খন্ডিত জানাশোনায় পৃথিবীর মেধাবী প্রকাশকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাও কষ্টকর হয়ে উঠবে একটা সময়। আমাদের তরুণ মেধাবী যারা এ পেশায় আসতে চায়, তাত্ত্বিক জানাশোনাটা আগে রপ্ত করে নিতে পারলে তাদের জন্য জয়ী হওয়া সহজ হয়, আর প্রকাশনাশিল্পটাও সমৃদ্ধ হয়। এই সব কিছু বিবেচনায় রেখেই বইগুলো লিখছি।

বাংলাভাষায় এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে এ ধরনের বই আমি দেখিনি। ফলে বাংলাদেশ এবং পশ্চিম বাংলার যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রকাশনা, সম্পাদনা, প্রিন্টিং বিষয়ক বা ডিপার্টমেন্ট রয়েছে, সেখানেই এ বইগুলো সাদরে গৃহীত হচ্ছে।

প্রকাশনাবিষয়ক সিরিজে আরও কী কী বই যুক্ত করার পরিকল্পনা আপনার আছে?

প্রকাশনাবিষয়ক এই সিরিজের মোট ছয়টি বই লেখার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতি বছর একটি করে প্রকাশিত হচ্ছে। এ পর্যন্ত তিনটি প্রকাশিত হয়েছে। আরও তিনটি প্রকাশিতব্য। এই ছয়টি বইয়ের মাধ্যমে প্রকাশনার এ টু জেড মোটামুটি জানতে পারবেন আগ্রহী পাঠক।

এ বছর প্রকাশ পেল - পুস্তক উৎপাদন ব্যবস্থাপনা। এই বইয়ে বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রি-প্রোডাকশন, পোস্ট-প্রোডাকশন, উৎপাদন খরচ, বাজেট, মূল্য নির্ধারণ, উৎপাদনের সকল সামগ্রী ও উৎপাদন যন্ত্রের সঙ্গে পরিচয় করানো, ইনভেন্টরি, ওয়্যার হাউজিং ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। প্রকাশনাবিষয়ক সিরিজের বাকি তিনটি বই হচ্ছে- ‘পুস্তক বিপণন ব্যবস্থাপনা’। ‘পুস্তক কপি রাইট ও আন্তর্জাতিক স্বত্ব ক্রয়-বিক্রয়’ এবং ‘প্রকাশনা ব্যবসা ব্যবস্থাপনা’।

বিভিন্ন ধরনের কর্মব্যস্ততা আপনার। তারপরও লেখার জন্য সময় কী করে বের করেন?

প্রতিদিন রাত বারোটার পর পড়ালেখায় ব্যস্ত হয়ে যাই। লেখার চেয়ে আমি প্রচুর পড়তে পছন্দ করি। প্রচুর না পড়ে আমার লিখতে ভীষণ ভয় হয়। আমি পারি না। আমার লেখা যদি পাঠকের কোনো উপকারেই না লাগে, সেরকম লেখা আমি কখনো লিখি না। গতানুগতিক লেখাও আমার পছন্দ নয়।

বইয়ের পাঠক দিন দিন বাড়ছে বলে কী আপনি মনে করেন?

বইয়ের পাঠক বাড়ছে। অবশ্যই বাড়ছে। আমাদের পাঠক এখন শুধু বাংলাভাষার বইয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। ভালো বই পাঠের জন্য পাঠক মুহূর্তেই চলে যাচ্ছে সফট ভার্সনে অথবা অভিজাত বুক স্টোরগুলোতে। পিবিএস বুক শপের সেলস রিপোর্ট বলে দেয় - কী পরিমাণ ভালো ইংরেজি বইয়ের পাঠক রয়েছে আমাদের এখানে। সুতরাং লেখার প্রতি লেখকদের অত্যন্ত সিরিয়াস এবং যত্নশীল হতে হবে, একইভাবে বইয়ের মানসম্মত প্রকাশনা নিশ্চিত করে প্রকাশককে বইয়ের যথাযথ বিপণনের মাধ্যমে পাঠকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে।

তরুণ লেখক-প্রকাশকদের জন্য আপনার অভিজ্ঞতালব্ধ পরামর্শ প্রত্যাশা করছি।

তরুণ লেখক- প্রকাশকদের প্রচুর পড়াশোনা এবং গবেষণা করা প্রয়োজন। প্রতিমুহূর্তে গ্লোবাল নেটওয়ার্কে আপডেট থাকতে হবে যার যার সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে। নিজস্ব স্বকীয়তায় উদ্ভাসিত হওয়ার মেধা, শক্তি ও সাহস অর্জন করতে হবে। ওদের অনেকের মাঝেই আমি এ বিষয়গুলো দেখতে পাচ্ছি। আমাদের এই তরুণ লেখক- প্রকাশকরা প্রচুর সম্ভাবনাময়।

সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

ঢাকা টাইমস এবং আপনাকেও ধন্যবাদ।

(ঢাকাটাইমস/১৭ফেব্রুয়ারি/এজেড)

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :