ফিরে কি পাবো আগের সেই প্রেসক্লাব!

কামরুল ইসলাম চৌধুরী
 | প্রকাশিত : ১৫ জুলাই ২০২০, ২০:৪৩

কয়েক ঘণ্টা পর খুলছে জাতীয় প্রেসক্লাব। অবসান হচ্ছে দীর্ঘ প্রতীক্ষার। করোনা মহামারির আকালের এই অবরুদ্ধকালে চার মাস ক্লাব রয়েছে লকডাউনে। অবশেষে সীমিত আকারে খুলছে ১৬ জুলাই। আমরা যাব আমাদের প্রিয় প্রাঙ্গণে। সদস্যদের পদচারণায় মুখরিত হবে আবার আমাদের দ্বিতীয় গৃহ। ফিরে কি পাবো আগের সেই প্রেসক্লাব!

একাত্তরের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধশেষে ক্লাবে ফিরে যেমন পাওয়া যায়নি রেখে যাওয়া পুরোনো দ্বিতীয় গৃহ। আবার ক্লাবে যাবো। কিন্তু আমাদের নিত্যদিনের সেই আড্ডায় আমাদের মাঝে আর থাকবেন না বেশ কজন অগ্রজ, আমাদের শ্রদ্ধেয় মানুষ! এক দুজন নয়! নজন প্রিয় জ্যোর্তিময় সাংবাদিক। দিকপাল সাংবাদিক ভিপি বড়ুয়া, দ্যুতিমান সাংবাদিক আবু জাফর পান্না, রং ছড়ানোর কারিগর রওশন উজ্জামান, মুক্তিযোদ্ধা কবি মাশুক চৌধুরী, মুক্তিযাদ্ধা কাজপাগল মোহিতুল ইসলাম রনজু, পরিশ্রমী ফারুক কাজী, সিদ্ধহস্ত রশিদ উন নবী বাবু, গেদুচাচাখ্যাত খোন্দকার মোজাম্মেল হক চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

এই করোনা মহামারিকালে মায়াভরা এই পৃথিবী ছেড়ে আকাশের তারা হয়ে গেছেন। কেউ সাংবাদিকতা শুরু করেছেন পঞ্চাশের দশকে, কেউ উত্তাল সত্তরের শুরুতে, মাঝে বা শেষে রক্তঝরা সময়ে। সাংবাদিকতা পেশায় নিখাদ পেশাদার এই মানুষগুলো রেখেছেন অনন্য অবদান। কতো অম্লমধুর স্মৃতি আমাদের। কত যুগ দশক মমতায় জড়িয়ে ছিলাম।

সজীব হাসিখুশি একানব্বই বছর বয়সী বড়ুয়া দা ছিলেন আমার প্রধান সম্পাদক। চমৎকার ইংরেজি লিখতেন। ১৯৫৮ সালে মর্নিং নিউজ দিয়ে তার সাংবাদিকতা শুরু।

বাংলাদেশ অবজারভার আর লন্ডনের ফিনান্সিয়াল টাইমস খ্যাত পান্না ভাই আশি ছুঁই ছুঁই বয়সেও কি চৌকস সাংবাদিক! ‘কী মিয়া কামরুল, খবর আছেনি’ বলে আর কোনদিন কাছে ডাকবেন না আমাদের তারকা পান্না ভাই। দেবেন না আর সংবাদের নানা টিপস। পরিচয় করিয়ে আর দেবেন না হরেকরকম মানুষের সাথে। সুদর্শন রওশন ভাই কত অসাধারণ মিষ্টি রিপোর্ট করেছেন, অন্যের কপি যত্ন নিয়ে এডিট করেছেন। লন্ডনে প্রশিক্ষন পাওয়া জেমিনি নিউজের সংবাদদাতা রওশন ভাই ছিলেন অনেকের গুরু! কবিতার মতো স্নিগ্ধ ছিল তার লেখা। আমার বক্তৃতার খসড়া আর তিনি করে দেবেন না।

মনে পড়ে কবি মাশুক ভাই কি তাক লাগানো হেডিং করতে পারতেন। কপি দেখতেন নীরবে! ছিল না বার্তা সম্পাদকের হাঁকডাক, ঠাটবাট, তর্জন গর্জন। বাবু টেনশন না নিয়ে টিম ওয়ার্ক করতো। অনুজ সহকর্মীদের কি মমতায় না ও আগলে রাখতো! সহসম্পাদক থেকে ধীরেধীরে হয়েছিল সম্পাদক। রঞ্জু মাঠের রিপোর্টার থেকে সম্পাদক। কী মিষ্টভাষী, নিরহংকারী।

ফারুক কাজী হাড়ভাঙা পরিশ্রমী রিপোর্টার হিসেবে নমস্য। আইন আদালত রিপোর্ট ছিল ঝরঝরে। পেশাদার সৎ এবং মহতী এই নির্ভেজাল সাংবাদিকদের কি আমরা ভুলতে পারবো। জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদক , যুগ্ম সম্পাদক এবং ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য থাকাকালীন তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছি। ভোট দিয়েছেন, ভোট চেয়েছেন! কতো মমতা ছড়িয়েছেন। হাজারো স্মৃতি। মোজাম্মেলের সাপ্তাহিক কাগজে গেদুচাচার কলাম ছিল তুমুল জনপ্রিয়। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আমাদের সময়ে ২০১৫ সালে ক্লাব সদস্য হতে পেরেছিল বলে বেশ সমীহ করতো মোজাম্মেল। ক্লাবের দক্ষিণের বারান্দার সেই বিখ্যাত টেবিলে সাংসদ মুহম্মদ শফিকুর রহমান আর আমার সামনে এসে আর কোনোদিন বসবে না। হায়রে জীবন।

এই নির্ভেজাল তারকা সাংবাদিকদের পায়ের চিহ্ন আর পড়বে না জাতীয় প্রেসক্লাবে। আর তো কখনো দেখা হবে না তাদের সাথে। ভাবতেই চোখ অশ্রু সজল হয়ে যায়। ক্লাব অঙ্গন থেকে তাদের আমরা শেষ বিদায়ও জানাতে পারিনি। এদের অবদানের স্বীকৃতিও আমরা দিইনি। এরাই সত্যিকারের 'আনসাং হিরোজ অব আওয়ার প্রফেশন।' আমাদের ক্ষমা করে দিন! জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। মওলানা রুমির কথা দিয়ে বলি, সঠিক বেঠিকের ঊর্ধ্বে হয়তো আবার দেখা হবে বেহেশতের বাগানে।

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেসক্লাব

সংবাদটি শেয়ার করুন

পাঠকের অভিমত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :