সাক্ষাৎকারে মাহবুবউল আলম হানিফ

শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ধারেকাছেও কেউ এখনো তৈরি হয়নি

বোরহান উদ্দিন
| আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২০, ১১:৩৮ | প্রকাশিত : ২৭ আগস্ট ২০২০, ১০:৩২

আগস্ট বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির জন্য এক শোকাবহ মাস। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির দোসরদের নির্মম হত্যাযজ্ঞে আমরা হারিয়েছি জাতির পিতা ও তাঁর পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যকে। এই মাসেই তাঁর কন্যা, বাংলাদেশের সফল রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাকে হত্যার অপচেষ্টা হয়েছে। কিন্তু দমিয়ে রাখতে পারেনি ষড়যন্ত্রীরা। আজ তিনি একজন বিশ্বনেতা।

শোকাবহ আগস্ট, রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব, দেশের রাজনীতি, বৈশ্বিক মহামারি করোনা মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকাসহ দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে দৈনিক ঢাকাটাইমসের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ। কুষ্টিয়া-৩ আসনের এই সংসদ সদস্যের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সিনিয়র রিপোর্টার বোরহান উদ্দিন

ঢাকাটাইমস: মহামারি করোনাকালে রাজনীতিসহ দেশের পরিস্থিতি কেমন দেখছেন?

মাহবুবউল আলম হানিফ: সারা বিশ্ব আজ করোনা দুর্যোগের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব আজ বিপর্যস্ত। করোনা মহামারি শুরুর পর ছয় মাসের বেশি হয়ে গেল। এখনো বিশ্বের অনেক দেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ। এই পরিস্থিতির শিকার বাংলাদেশও। তবে দুর্যোগের মধ্যেও আমাদের সবার ভরসার জায়গা হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার নেতৃত্বে আমরা এই করোনার মধ্যেও যথেষ্ট সক্ষমতার সঙ্গে মোকাবেলা করছি। মানুষের জীবন-জীবিকা দুটোই গুরুত্ব দিয়ে দেশের কার্যক্রম চলছে। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে চলছে। মানুষজন কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসছে। আশা করি সরকারের নানা পদক্ষেপের ফলে করোনার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারব।

করোনার শুরু থেকেই সরকারের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা সাধ্যমতো মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তিগতভাবেও অনেকে সহযোগিতা করেছেন। দলীয়ভাবে ২ কোটি মানুষকে সহায়তা করা হয়েছে। এখনো করে যাচ্ছে। এছাড়াও করোনা থেকে রক্ষায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শগুলো মানুষের কাছে পৌঁছাতে কাজ করেছে নেতা-কর্মীরা। কর্মহীন মানুষ যাতে খাবারের কষ্টে না থাকে সেজন্য সরকারের পাশাপাশি দলীয় ও ব্যক্তিগতভাবে তাদের ত্রাণ সহায়তা দেয়া হয়েছে।

ঢাকাটাইমস: এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এবারের শোকাবহ আগস্ট মাস যাচ্ছে।

মাহবুবউল আলম হানিফ: আগস্ট বাঙালি জাতির জন্য শোকের, কষ্টের এবং বেদনার মাস। ১৯৭৫ সালের এই আগস্ট মাসেই আমরা হারিয়েছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যকে। সেদিন পাকিস্তানের পরাজিত শক্তি তাদের এদেশের এজেন্টদের দিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালায় শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, এর মূল লক্ষ্য ছিল দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে নষ্ট করা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং যে স্বপ্ন নিয়ে বঙ্গবন্ধু এদেশ স্বাধীন করেছিলেন, সেই স্বপ্নকে ধ্বংস করে দেয়া। সেটাই তারা করেছে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর যারা দখল করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছিল, তাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের সব স্মৃতি মুছে দেয়া। যেমন- মুক্তিযুদ্ধের মূল স্লোগান ছিল ‘জয় বাংলা’, তা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, যা মূলত আমাদের স্বাধীনতার ডাক, কোটি কোটি মানুষকে উজ্জীবিত করেছিল মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে, এখন বিশ্বের সব রাজনৈতিক ভাষণের মধ্যে সেরা, সেটাও নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল।

পাকিস্তানের আদলে বাংলাদেশের সবকিছু পরিবর্তন করা হয়েছিল। রেডিও বাংলাদেশ করা হয়েছিল পাকিস্তানের আদলে। এভাবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় একে একে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করে পাকিস্তানের চেতনাকে বসানো হলো। স্বাধীন বাংলাদেশের যারা বিরোধিতা করল, সেই শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী করা হলো; কুখ্যাত রাজাকার আব্দুল আলিম, মাওলানা মান্নান, রজব আলীদের মতো লোক যারা নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল, তাদের মন্ত্রিপরিষদে ঠাঁই দিয়ে মূলত বাংলাদেশকে একটি তাঁবেদার রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্র করেছিল। প্রায় ১২০০ মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তাকে বিনাবিচারে রাতের অন্ধকারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।

জননেত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। অনেক চেষ্টার পর তারা দেশে ফিরে আসেন। ১৯৮১ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন দেশে এলেন, তখনো তাদের আসতে না দিতে অনেক চেষ্টা করা হয়েছিল। এমনকি বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ রেহানার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তা নবায়ন করতে দেয়া হয়নি জিয়াউর রহমানের সরাসরি নিষেধাজ্ঞার কারণে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে আসতে দিতে বাধ্য হয়েছিল তখনকার সরকার। তিনি যখন দেশে এলেন তখন বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত ৩২ নম্বর বাড়িতে, যেখানে ঘাতকরা তাকে হত্যা করেছিল, সেখানে তারই বড় মেয়ে শেখ হাসিনাকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। তিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করেছিলেন। এমন একটি নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু-কন্যার প্রতি ।

জিয়াউর রহমান চিহ্নিত খুনিদের পুরস্কৃত করেছিলেন। ইনডেমনিটি দিয়ে তাদের দায়মুক্তি দেয়া হয়েছিল। এসব করে জিয়াউর রহমান নিজেই প্রমাণ করেছিলেন ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কথা। কেউ যদি কোনো হত্যার সঙ্গে জড়িত না থাকেন, তাহলে এর সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় না এনে পুরস্কৃত করতে পারেন না। জিয়াউর রহমান চক্রান্তকারী হিসেবে ছিলেন বলেই এটা করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন ঠান্ডা মাথার অত্যন্ত ধূর্ত প্রকৃতির খুনি। পাকিস্তানের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের উপর শুধু আঘাত করেননি, এসব ধ্বংস করতে যা যা করণীয় সব করেছিলেন।

এরই ধারাবাহিকতায় খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমান জিয়াউর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলেন। জিয়াউর রহমান যেমন আলবদর-রাজাকার দিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন, খালেদা জিয়াও একইভাবে মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদের মতো কুখ্যাত রাজাকারদের মন্ত্রিসভায় জায়গা দিলেন। এ দিয়ে বুঝিয়েছেন তিনিও একই চেতনা বাস্তবায়ন করছেন। শুধু তাই নয়, ১৫ আগস্ট ভুয়া জন্মদিন পালন করে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের যে ক্ষোভ, সেটা তারা প্রকাশ করেছে।

বিএনপির সব সময় একটা ধারণা বা লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনাকে হত্যা করা গেলে আওয়ামী লীগ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। ১৯৭৫ সালেও ষড়যন্ত্রীরা ভেবেছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা গেলে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করা যাবে। কিন্তু তার কন্যা বেঁচে থাকায় আওয়ামী লীগ আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে। দেশের মানুষের মূল কান্ডারি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বারবার শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। সবশেষ ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তাকে হত্যার জন্য বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলা করা হয়। আল্লাহর রহমতে তিনি বেঁচে গেছেন। সেদিন আমাদের ২৪ জন নেতা-কর্মীকে হারিয়েছি। আহত ৫০০-এর মতো নেতা-কর্মী এখনো সেই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছে।

এই ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে একটা বিষয় জাতির সামনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং দলের নেতৃত্ব যারা দিচ্ছে, তারা এই দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী নয়। তারা এখনো পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতে চায়। এর মধ্য দিয়েই তারা জাতি ও মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করেছে। একটা হলো- স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি, আরেকটা হলো বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি, যেটা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

আমি মনে করি, বাংলাদেশে আগস্ট মাস ষড়যন্ত্রের মাস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই আগস্ট মাসেই জাতির ওপর বারবার আঘাত এসেছে। বাংলাদেশকে যদি উন্নত ও ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, তাহলে এই অপশক্তিকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে হবে। প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত এবং এর নেপথ্যে যারা ছিল, তাদের প্রত্যেকের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে। তাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে। তাদের বিভ্রান্তি দূর হবে এবং জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার পথ সহজ হবে।

এবারের আগস্ট মাসের মূল দাবি হলো ১৫ আগস্ট ও ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, নেপথ্যের চক্রান্তকারী, তদন্ত করে তাদের মুখোশ উন্মোচন করা হোক। এর মাধ্যমে জাতির কাছে পরিষ্কার ইতিহাস উঠে আসুক।

কারণ বিএনপি বাংলাদেশের অস্তিত্বে বিশ্বাসী না। এরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই ধারণ করে না। এরা মিথ্যাচার করে জনগণকে সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত করতে পারে, এরা সেটাই করছে। একজন দেশের বাইরে থেকে পলাতক হিসেবে নানা সময়ে কিছু কিছু বক্তব্য পাঠায়, যা নির্লজ্জ মিথ্যাচার। আর তাদের মহাসচিব ১৫ আগস্ট, ২১ আগস্টের পর যে বিবৃতি দিলেন, সেটিও মিথ্যাচার। ১৫ আগস্টের ঘটনার সঙ্গে জিয়াউর রহমান জড়িত এটা তো ইতিহাসের প্রমাণ।

আবার ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার পরিকল্পনা হয় হাওয়া ভবনে বসে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী মিলে বৈঠক করে মাস্টার প্লান করেছে। যারা হামলা করেছে তাদের জবানবন্দিতে এ কথা এসেছে। এরপর তারা এই হামলা নিয়ে কত ধরনের নাটক করেছে তাও স্পষ্ট। সেসব ঘটনাই তো হামলার সঙ্গে বিএনপি ও খালেদা জিয়ার সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে। এমন জঘন্য হামলা নিয়ে খালেদা জিয়া সংসদে রসিকতা করে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, কোনো সুস্থ মানুষ তা দিতে পারে? কোনো চিন্তাশীল, বিবেকবান মানুষ দিতে পারে? তাদের সম্পৃক্ততা ছিল বলে তারা এগুলো করেছে। তারা জজ মিয়া নাটক সাজিয়েছে। নিজেদের সম্পৃক্ততা ছিল বলেই ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল। এগুলো ইতিহাস হয়ে আছে।

ঢাকাটাইমস: বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের ফিরিয়ে এনে এখনো বিচার কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে?

মাহবুবউল আলম হানিফ: বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যারা তখন ক্ষমতায় ছিল, তারা খুনিদের পুরস্কৃত করেছিল। শুধু তাই নয়, এদের বিদেশে পালিয়ে যেতে সুযোগ করে দিয়েছিল। আওয়ামী লীগ ২১ বছর আন্দোলন-সংগ্রাম করে ১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসার পর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা করতে পেরেছিল এবং বিচার শুরু করা হয়েছিল। মাঝে আবার বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে মামলার বিচারকাজ বন্ধ করে দেয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সেই মামলা পুনরায় চালু হলে একপর্যায়ে রায় হয় এবং তা বাস্তবায়ন হয়। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে অনেক খুনি বিদেশে পালিয়ে গেছে। বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছে। অনেকের সম্পর্কে তথ্য-উপাত্তও পাওয়া যায়নি। তাদের পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এরপরও সরকার নানাভাবে বারবার চেষ্টা করে যেসব দেশে খুনিদের পাওয়া গেছে, তাদের অনুরোধ করেছে এসব খুনিকে ফেরত দিতে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো- মানবতা, সভ্যতা, বিবেকের কথা বলা সেসব দেশ খুনিদের ফিরিয়ে দিতে টালবাহানা করছে। তবে সরকারের জোর তৎপরতা চলছে। আমরা আশা করি, পলাতক খুনিদের ফিরিয়ে এনে শিগগিরই সাজা কার্যকরে সক্ষম হব।

ঢাকাটাইমস: দল হিসেবে আওয়ামী লীগ দেশের প্রতি তার দায় কতটুকু পূরণ করতে পেরেছে?

মাহবুবউল আলম হানিফ: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এ দেশের মানুষকে একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। উন্নত আত্মমর্যাদাশীল দেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি কারাগার থেকে বের হয়ে একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের দায়িত্ব নেন জাতির পিতা। পোড়ামাটির ভূখণ্ড ছিল দেশ। পাকিস্তানিরা সব ধ্বংস করে দিয়েছিল। ওদের ভাবনা ছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও যাতে মাথা তুলে না দাঁড়াতে পারে। তারপরও মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে বঙ্গবন্ধু দেশের কোনো সম্পদ ও বিদেশি তেমন সহযোগিতা ছাড়া বাংলাদেশকে পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। রাস্তাঘাট, ব্রিজ তৈরি করেছিলেন; অফিস-আদালত নির্মাণ করেছিলেন। সব বাহিনী গঠন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু যখন পুনর্গঠনের মাধ্যমে দেশটাকে একটি স্থিতিশীল অবস্থায় এনে উন্নতির দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই তার ওপর আঘাত আসে। তাকে হত্যার মধ্য দিয়ে আমাদের সেই অগ্রযাত্রা আবার থামিয়ে দেয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু-কন্যার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় এসেছে, তখনই দেশে উন্নয়ন হয়েছে। আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে তখন মানুষ কিছু পায়। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় যেমন উন্নয়ন করেছিল, আবার ২০০৯ থেকে এখন পর্যন্ত দেশের মানুষের কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়েছে। যখন আমরা দায়িত্ব নিয়েছিলাম তখন দেশের বিদ্যুতের পরিস্থিতি ভয়াবহ ছিল। তখনকার ৩ হাজার থেকে এখন ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হয়েছি আমরা। এটা তো দৃশ্যমান। রাস্তাঘাট, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী ট্যানেল হচ্ছে। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হচ্ছে। ৪০ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য ঘাটতি ছিল, এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বৈদেশিক আয়, মাথাপিছু আয় অনেক বেড়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ করতে সক্ষম হয়েছি আমরা। এখন তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর দেশ বাংলাদেশ।

দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য আমাদের সরকার কাজ করছে। তবে আমাদের আরও অনেক দূর যেতে হবে। সরকার সেই লক্ষ্যে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ওপর মানুষের সেই আস্থা আছে। মানুষ বিশ্বাস করে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কেউ নেই যারা দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি করবে। অতীতে যারা ক্ষমতায় ছিলেন, তারা উন্নয়ন তো দূরে থাক লুটপাট করেছেন। চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই দেশের মানুষের উন্নয়ন-অগ্রগতির জন্য আওয়ামী লীগের বাইরে অন্য কোনো শক্তি দেশে নেই।

ঢাকাটাইমস: রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে এবং দলীয় প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মাহবুবউল আলম হানিফ: আসলে শেখ হাসিনার বিকল্প শেখ হাসিনাই। তার বিকল্প আর কেউ নেই। সেটা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবেও নেই, দলীয় প্রধান হিসেবেও নেই। শেখ হাসিনা যখন ’৮১ সালে দেশে এসে আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নিলেন, তখন আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে দৈন্যদশার মধ্যে ছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আওয়ামী লীগের ওপর যে দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল, তখন কিন্তু নেতা-কর্মীরা বিপর্যস্ত ছিল। যারা নেতৃত্বে ছিলেন, তাদের মধ্যে তেমন আস্থার জায়গা তখনো তৈরি হয়নি। নেতৃত্বের কোন্দল ছিল, কর্মীদের মধ্যে ভয় ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা দায়িত্ব নেয়ার পর এই সংকট কাটিয়ে দলকে সুসংগঠিত করতে শুরু করলেন এবং আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়াল। তারই বিচক্ষণ নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ’৯৬ সালে ক্ষমতায় আসে। এরপর ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত টানা ক্ষমতায় আছে। এটা সম্ভব হয়েছে একমাত্র শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের গুণে। আমরা বলতে পারি, নেতা হিসেবে, আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনা অতুলনীয়, তার সমপর্যায় তো দূরের কথা, ধারেকাছেও কোনো নেতৃত্ব এখনো তৈরি হয়নি। তিনি সবার থেকে অনেক ঊর্ধ্বে।

সরকাপ্রধান হিসেবে তার গত ১০ বছরের কর্মকাণ্ড যদি দেখি, দেশকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে কীভাবে নিয়ে এসেছেন শেখ হাসিনা। ৭০০ ডলার মাথাপিছু আয় থেকে আজ কীভাবে ২ হাজার ডলারে নিয়ে এসেছেন। এটাই তো তার বড় জ্বলন্ত প্রমাণ। তিনি সফল রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নিজেকে প্রমাণিত করেছেন। তাঁর ওপর আস্থার সুফল জনগণ পাচ্ছে। সারা পৃথিবীতে একসময়ের দরিদ্র রাষ্ট্র বাংলাদেশের একটা আলাদা মর্যাদা তৈরি করতে পেরেছেন তিনি।

১৫ বছর আগেও বাংলাদেশকে নিয়ে পৃথিবীর কোনো দেশ খুব একটা মাথা ঘামাত না। গুরুত্ব দেওয়া কিংবা খোঁজখবর রাখত না মানুষ। তারা জানত বাংলাদেশ একটা তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত, সমস্যাগ্রস্ত দেশ। কিন্তু আজকে সারা বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ নিজের একটা গুরুত্বের জায়গা প্রতিষ্ঠিত করেছে। আমরা যদি লক্ষ করি, গত কয়েক বছর বিভিন্ন সামিট হয়েছে। যেমন জি-সেভেন সামিট, জাতিসংঘের অধিবেশন, ওপেকের সামিট- সবখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এটা কেন? সারা বিশ্ব দেখছে শেখ হাসিনা কীভাবে নানা সমস্যার মধ্যেও দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে এবং রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দুটোতেই অত্যন্ত সফলতার পরিচয় দিয়ে শেখ হাসিনা আজ এক অনন্য উচ্চতায় আসীন।

ঢাকাটাইমস: নিজের নির্বাচনী এলাকাসহ গোটা কুষ্টিয়া নিয়ে আপনার ভাবনার কথা জানতে চাইছি।

মাহবুবউল আলম হানিফ: আমার এলাকা সম্পর্কে একটাই কথা বলতে পারি, মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার প্রথম ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়ায় শপথ পাঠ করে। সে হিসেবে বলা যেতে পারে কুষ্টিয়া হলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, সব সময় সব সরকারের আমলে অবহেলিত ও বঞ্চিত থেকে গেছে কুষ্টিয়া। আমরা পিছিয়ে পড়া জেলা। আমাদের কুষ্টিয়া বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় অনেক পিছিয়ে। আমি আমার ক্ষুদ্র চেষ্টার মাধ্যমে এ থেকে কিছুটা অগ্রসর হতে কাজ করছি। কতটুকু পেরেছি এলাকার মানুষ ভালো বলতে পারবেন। আমার লক্ষ্য একটাই- আমার জেলাকে যদি বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া জেলাগুলোর মধ্যে একটা করতে পারি, তাহলে আমার সার্থকতা।

ঢাকাটাইমস: রাজনীতি সচেতন তরুণ প্রজন্মের জন্য আপনার পরামর্শ কী থাকবে?

মাহবুবউল আলম হানিফ: তরুণ প্রজন্মের কাছে আমার আহ্বান থাকবে, এই বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটি, এর স্বাধীনতা কিন্তু এমনিতে আসেনি। এর দীর্ঘ প্রেক্ষাপট আছে। আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, ৯ মাস যুদ্ধ করে, ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত এবং ২ লাখের বেশি মা-বোনের সম্ভ্রমহানির দহন আমাদের সইতে হয়েছে। এটা যে কত নির্মম ও নিষ্ঠুর ছিল, তা যদি কেউ জানে, আমার বিশ্বাস তারা কখনো স্বাধীনতা বিরোধীদের পক্ষে যেতে পারবে না। তাই নতুন প্রজন্ম স্বাধীনতার ইতিহাসটা ভালো করে জানুক, এটা প্রত্যাশা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার মাধ্যমে কারা জাতিকে বিভক্ত করল, সেটাও তাদের জানতে হবে। ইতিহাস জানলে রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মের একটা স্বচ্ছ ধারণা জন্মাবে। দেশের জন্য, জনগণের জন্য কারা কাজ করতে পারে, সেটা তারা জানতে পারবে।

ঢাকাটাইমস: দেশে কেমন রাজনীতি দেখতে চান?

মাহবুবউল আলম হানিফ: দেশে যেভাবে সর্বস্তরে রাজনীতি চলছে, এটা আমাদের দেশ ও জনগণের জন্য কল্যাণকর নয়। বিশেষ করে পেশাজীবী রাজনীতি, শ্রমজীবী রাজনীতি এই মুহূর্তে দেশের জন্য প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। রাজনীতি রাজনীতিবিদদেরই করা উচিত। সর্বস্তরে রাজনীতি দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিতে অনেক সময় বাধার সৃষ্টি করছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অনুরোধ থাকবে, তারা যেন এই রাজনীতির বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে অনুধাবন করে। কোন রাজনীতি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, সেটা যেন তারা ধারণ করেন।

ঢাকাটাইমস: আপনাকে ধন্যবাদ।

মাহবুবউল আলম হানিফ: ঢাকাটাইমসকেও ধন্যবাদ।

ঢাকাটাইমস/২৭আগস্ট/মোআ

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :