সাক্ষাৎকারে এস এম কামাল হোসেন

জননেত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করলে তৃণমূল সাজানো কঠিন হবে না

কাজী রফিক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২২:২৭ | প্রকাশিত : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:৩৬

স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেক ভূমিকা রয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে তৃণমূলের কমিটিতে নেতা নির্বাচনে নিজের পছন্দ চাপিয়ে দিলে তাতে সংগঠন ক্ষতি হয় বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন। তিনি বলেন, জেলা-উপজেলা কমিটির ক্ষেত্রে কোনো কেন্দ্রীয় নেতা কারও প্রতি দুর্বলতা প্রকাশ বা পক্ষপাত করলে অন্যদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে, যার প্রভাব পড়ে দলে।

এস এম কামাল বিশ্বাস করেন, জেলা কমিটিতে কেন্দ্রীয় কারও পছন্দ কিংবা সুপারিশে নেতা নির্বাচন না করলে, দলীয় সভাপতির নির্দেশনা অনুযায়ী সবাই যদি নিজেদের দায়িত্ব পালন করে, তাহলে স্থানীয় পর্যায়ের সাংগঠনিক সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা সম্ভব।

দৈনিক ঢাকা টাইমসের সঙ্গে এক একান্ত আলাপচারিতায় এসব কথা বলেন আওয়ামী লীগের এই কেন্দ্রীয় নেতা। তিনি দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন।

নিজের এলাকার যেকোনো ধরনের সমস্যা ব্যক্তিগত-সাংগঠনিক যোগাযোগ ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেন এস এম কামাল হোসেন। বলেন, ‘নওগাঁ উপনির্বাচনে ৩৩ জন মনোনয়ন চেয়েছিলেন। অনেকে মনোনয়নের আগে মানববন্ধন করেছেন। আমি সেখানে গিয়েছি, তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি দেখেছি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কিন্তু জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আস্থাশীল। আমরা সবাই হচ্ছি শেখ হাসিনার কর্মী। তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করাই আমাদের দায়িত্ব।’

‘রাজনীতিতে সবারই শুভাকাক্সক্ষী বা ঘনিষ্ঠ শুভাকাক্সক্ষী থাকতে পারে। কারও সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক থাকতে পারে। এর অর্থ এই নয়, যার যোগ্যতা নেই তাকে নেতা বানাব। এটা যখন বানাতে যাব, তখনই বিতর্কিত হব। উপজেলাগুলোতে কাজ করার ক্ষেত্রে উপজেলা নেতা প্রশ্নবিদ্ধ হবেন। জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাদের যাদের দায়িত্ব দিয়েছেন, আমরা যদি নিরপেক্ষ থাকি, তৃণমূলকে ঢেলে সাজানো আমি মনে করি কোনো কঠিন কাজ না।’

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্বাভাবিক ব্যাপার বলে মনে করেন এস এম কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমার দায়িত্বাধীন বিভাগে আমি চাই, দলের সবাইকে নিয়ে সমন্বয় করতে। জননেত্রী শেখ হাসিনা যেটা বলে দেন, সে অনুযায়ী আমরা কেন্দ্রীয় নেতারা যদি কাজ করি, কোনো ব্যক্তিগত লোক পছন্দ না করি, তাহলে যেকোনো জেলায় কেন্দ্রীয় নেতারা সমস্যার সমাধান করতে পারেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আগেও নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা প্রতিযোগিতা ছিল। ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু প্রতিহিংসা নয়। আমরা প্রতিহিংসা বন্ধ করার জন্য চেষ্টা করছি। মারামারি বন্ধ করার চেষ্টা করছি।’

একটি নির্বাচনী এলাকায় ৫-১০ জন প্রার্থী থাকতেই পারে। তারা একসঙ্গে দলকে সংগঠিত করবেন। বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার যে উন্নয়নের কর্মকাণ্ড সেগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরবেন। দলকে সুসংগঠিত করে জনমত তৈরি করবেন। এস কামাল বলেন, ‘কিন্তু ১০ জন মনোনয়ন-প্রার্থীকে যাচাই-বাছাই করে নেত্রী যাকে বলবেন, নেত্রী যাকে মনোনয়ন দেবেন, আমরা তার পক্ষে কাজ করব। আমরা দলবদ্ধভাবে তার জন্য কাজ করব।’

রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বে থাকা এস এম কামাল হোসেনের কাছে তার বিভাগের বিভিন্ন স্তরের কমিটি, তাদের সাংগঠনিক অবস্থান এবং সম্মেলন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি দায়িত্ব পাওয়ার আগে দুটি জেলায় সম্মেলন হয়েছে। বাকিগুলো আমি করার উদ্যোগ নিয়েছি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সব কটি উপজেলায় সম্মেলন করেছি। সেখানে যারা সভাপতি-সম্পাদক হয়েছে, তারা তুলনামূলকভাবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য।’

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ইউনিয়ন থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত দলের সম্মেলন করার নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু কোথাও সম্মেলন শুরু হয়নি। এ ব্যাপারে এস এম কামাল বলেন, ‘আগামী ৩ অক্টোবর কেন্দ্রীয় একটি সভা রয়েছে। অক্টোবর মাসে কয়েকটি উপনির্বাচন আছে। নির্বাচন শেষে আমরা সাধারণ সম্পাদকের নির্দেশনা অনুযায়ী ইউনিয়ন পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করব।’

রাজশাহী বিভাগের সাংগঠনিক কার্যক্রমের বিষয়ে তার পরিকল্পনাও আলাপচারিতায় উঠে আসে। বলেন, ‘আমার নভেম্বর মাসের পরিকল্পনা হলো, নেত্রীর অনুমতি ও সাধারণ সম্পাদকের সহযোগিতায় বর্ধিত সভা করে ইউনিয়ন-উপজেলা সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করে দেব। নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে লাগাতার জেলাগুলোর বর্ধিত সভা করব। প্রতিটি উপজেলায় ইউনিয়ন সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করে দিয়ে আসব। চেষ্টা করব ডিসেম্বরের আগে রাজশাহী বিভাগের সব কটি জেলা-উপজেলার সম্মেলন শেষ করতে।’ তৃণমূল পর্যায়ে দলের বিভিন্ন কমিটির নেতৃত্ব নির্বাচনে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সেখানকার নেতাকর্মীদের পছন্দের ভিত্তিতে চ’ড়ান্ত হবে। সেখানে কেন্দ্রীয় নেতাদের কোনো পছন্দ-অপছন্দ না থাকাই ভালো মনে করেন এস এম কামাল।

তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আমি যদি সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে কারও জন্য সুপারিশ করি, আর এটা যদি বাকি পাঁচজন জানতে পারে, পরে কিন্তু তারা আমার কথা শুনবে না। আমার তো সুপারিশ করার দরকার নেই। নেত্রী যাকে মনোনয়ন দেবে, তার পক্ষে কাজ করা আমার দায়িত্ব।’

কমিটিতে স্থান দেওয়ার ক্ষেত্রে কাদের কোন কোন বিষয় দেখা হচ্ছে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের এই সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, ‘যারা দুঃসময়ে আওয়ামী লীগ করেছে, তাদের কমিটিতে নিয়ে আসা হয়েছে। যারা মাদকের সঙ্গে জড়িত, চাঁদাবাজ, যাদের গ্রহণযোগ্যতার নেই, বিভিন্ন দল থেকে আসা, সুবিধাবাদী- এ ধরনের লোককে আমরা নেতা বানাচ্ছি না। অনেক ক্ষেত্রে যেটা হয়, আমরা তো সবাইকে চিনি না। জেলা সভাপতি-সম্পাদক প্রস্তাব দিলে তদন্ত করে খোঁজখবর নিয়ে বাদ দেয়ার চেষ্টা করি।’ ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে যেটা মনে করি, নেত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ২০০১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত যারা রাজপথে লড়াই করেছে, দুঃসময়ে আওয়ামী লীগ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে যদি এই আমলে কোনো মামলা না থাকে, মাদক, চাঁদাবাজি এবং তাদের জন্য দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন না হয়, তাহলে তাদের দলে স্থান দেওয়ার জন্য আমরা চেষ্টা করি। এটা নেত্রীর নির্দেশ। আমি সেটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করি।’

এ ছাড়া যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে পছন্দ করেন, শ্রদ্ধা করেন; যারা সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত, সমাজে একটা ইতিবাচক অবস্থানে আছে, মানুষ তাকে পছন্দ করে, তাহলে ওই ব্যক্তি আগ্রহ দেখারে তাকে কমিটিতে ঢুকানোর ব্যবস্থা করা হয় বলে জানান এস এম কামাল।

তিনি বলেন, ‘আমার দরকার হলো একজন ভালো মানুষ, যিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন। কিন্তু কোনো সুবিধাবাদী লোক, কোনো দলের মস্তান ছিল, সন্ত্রাসী, জামাত-শিবির সঙ্গে যুক্ত ছিল- এই ধরনের লোক আমরা দলের কোনো স্তরে জায়গা দেব না। আমরা সেভাবেই কাজ করছি।’

এস এম কামাল হোসেন ছাত্ররাজনীতি থেকে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে উঠে এসেছেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে ছাত্ররাজনীতি করতে কী ধরনের যোগ্যতা প্রয়োজন? জানতে চাইলে এই দক্ষ রাজনীতিক বলেন, ‘যারা আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ করতে চায়, আমি মনে করি তাদের বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে, শেখ হাসিনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ জানতে হবে। ছাত্ররাজনীতি করলেও তার মূল লক্ষ্য থাকবে লেখাপড়া। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হবে। সততা নিয়ে রাজনীতি করতে হবে। মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করতে হবে। এই লক্ষ্য নিয়ে যারা রাজনীতিতে আসবে, আমি মনে করি তাদের দলে জায়গা পাওয়া সহজ। তাদের জায়গা দেওয়া উচিত।’

এস এম কামাল বলেন, ‘একজন রাজনীতিবিদের মূল লক্ষ্য মানুষের কল্যাণে কাজ করা। মানুষের কল্যাণের উদ্দেশ্যে সততা নিয়ে যদি কেউ আসতে চায়, জননেত্রী শেখ হাসিনার চোখের ভাষা যারা বুঝবে, তার কথাগুলো যারা বুঝবে, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ার উদ্দেশ্যে আসবে, বঙ্গবন্ধুকে যারা ধারণ করবে, আমি মনে করি ছাত্রলীগ হোক বা যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ কিংবা আওয়ামী লীগ, তাদের নেতৃত্বে আনা উচিত।’

করোনাকালে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রম বন্ধ ছিল না। তারা বিভিন্ন সেবা ও সহযোগিতামূলক কাজে নিয়োজিত ছিল বলে জানান এস এম কামাল। সেই তৎপরতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘করোনার সময়ে আমাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সবচেয়ে বেশি ছিল। কেননা বিপদের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো একজন রাজনীতিবিদের অন্যতম উদ্দেশ্য। সে ক্ষেত্রে আমরা মনে করি জননেত্রী শেখ হাসিনা সে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন এবং তার নির্দেশে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগও কিন্তু এই করোনার সময় ভালো কিছু উদ্যোগ নিয়েছে।’

করোনাকালে কোথাও কোথাও অনিয়মের খবর এসেছে গণমাধ্যমে। অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে দলীয় ও সরকারের নেয়া পদক্ষেপের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যারা যারা ত্রাণের চাল আত্মসাৎ করেছে, অনিয়ম করেছে, তারা দলের কেউ হলে আমরা কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়েছি, দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সরকারিভাবে যারা চেয়ারম্যান ছিল, তাদের চেয়ারম্যান পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের কেউ যদি দলের কোনো ইউনিটের সভাপতিও হয়ে থাকেন, তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’

(ঢাকাটাইমস/২৯সেপ্টেম্বর/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :