বিএনপিতে মহাসচিবকে ‘মহা-উপেক্ষা’!

বোরহান উদ্দিন
| আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ | প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারি ২০২১, ০৯:৫৯

উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেড় বছর আগে দলের সব পদ স্থগিত করা হয় টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি কাজী শহীদুল ইসলাম মুন্সীর। পরবর্তিতে টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক শহীদুলের বিরুদ্ধে আনা ‘অভিযোগ সঠিক নয়’ বলে তার পদ ফিরিয়ে দেয়ার সুপারিশ করেন। খোদ বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ছাত্রদল থেকে উঠে আসা শহীদুলের পদ ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা দেন। প্রায় দেড় বছর আগে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে দেওয়া সেই নির্দেশনা আর বাস্তবে রূপ লাভ করেনি।

বাসাইলের শহীদুলের মতো এমন ঘটনা বিএনপিতে ঘটছে অহরহ। ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দকে কেন্দ্র করে বহিষ্কার, অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনা হরহামেশা দলটিতে। এসব নিয়ে নান সময় অভিযোগও জমা পড়ে শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে।

এদিকে করোনার কারণে দেশে লকডাউন শুরু হলে বেশ কয়েক মাস সাংগঠনিক সব কার্যক্রম বন্ধ রাখে বিএনপি। কিন্তু এই নির্দেশনা অমান্য করে গত ২২ জুন শূন্যপদের বিপরীতে ঢাকা মহানগর উত্তরের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হয় আবদুল আলীম নকীকে।

অভিযোগ আছে, বিএনপির নেতা রুহুল কবির রিজভী দলের সিদ্ধান্তের ব্যত্যয় ঘটিয়ে নকীকে এই পদে বসান। যা নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়েছেন অনেকে। অথচ রিজভীর ওই সিদ্ধান্তের কথা জানতেন না মির্জা ফখরুলসহ সিনিয়র নেতারা। শুধু তা-ই নয়, পদ দেয়ার পরদিন নকীসহ নেতাকর্মীদের নিয়ে জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানান রিজভী। অন্যদিকে গত সেপ্টেম্বরে ঢাকা-১৮ আসনের উপনির্বাচন নিয়ে জল কম ঘোলা হয়নি বিএনপিতে। মনোনয়ন নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষও হয়েছে। তবে ভোটের দিনে কোনো তৎপরতাই ছিল না নেতাকর্মীদের। অভিযোগ আছে, তারেক রহমান এবং দলের মধ্যম সারির নেতাদের পছন্দের প্রার্থী নিয়ে বিরোধের জেরে শেষ স্থানীয় নেতারাও জাহাঙ্গীরের জন্য মাঠে নামেননি।

এসব ঘটনায় এক যুগের বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ দ্ব›দ্ব এখন অনেকটা প্রকাশ্যে। দলের শীর্ষ নেতারাও একে-অন্যের বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যে প্রকাশ্যে ক্ষোভ ঝাড়ছেন। অভ্যন্তরীণ দ্ব›েদ্বর জেরেই দলের মহাসচিবের সুপারিশ আমলে নেওয়া হয় না বলে কানাঘুষা আছে।

নীতিনির্ধারকদের মতামতকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ঘটনাও আছে বিস্তর। ফলে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীদের মধ্যে অবিশ^াসের জন্ম হয়েছে। স্থবির হয়ে পড়েছে সাংগঠনিক তৎপরতা।

অভিযোগ আছে, বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খানের পছন্দের প্রার্থীকে মেনে না নিয়ে উপজেলা নির্বাচন করায় এতদিন ধরে পদ-পদবি ছাড়াই রাজনীতি করছেন বাসাইলের শহীদুল। একপর্যায়ে ২০১৯ সালের ১৩ জুলাই তিনিসহ তিন নেতাকে দলের সব পদ স্থগিত করার চিঠি দেয় বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর। দলের সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু সেই চিঠিতে স্বাক্ষর করেন। এতে বলা হয়, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙের অভিযোগে দলের সব পর্যায়ের পদ স্থগিত করা হলো। স্থগিতের খবরের দিনেই টাঙ্গাইলে বিক্ষোভ হয়। আহমেদ আযম খানকে সেসময় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছিল।

দল থেকে বাদ পড়া শহীদুল দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের কাছে ধর্ণা দিলেও ফয়সালা করতে না পেরে চিঠি লেখেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে। ওই বছরের ২৪ অক্টোবর লেখা চিঠিতে তিনি দাবি করেন, বিনা অপরাধে তার দলের পদ স্থগিত করা হয়েছে। এটি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান তিনি। এই আবেদনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের সুপারিশ করে লিখেন, ‘জনাব রিজভী, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, অনুগ্রহপূর্বক বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের ব্যবস্থা নিন।’

আর জেলা বিএনপির সভাপতি কৃষিবিদ শামসুল আলম তোফা আবেদনে লিখেন, ‘স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের সুপারিশ করছি।’ অন্যদিকে জেলা সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফরহাদ ইকবাল সুপারিশ করে লিখেন, ‘বর্ণনাকারীর বক্তব্য সঠিক। স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের সুপারিশ করছি।’

এতদিনেও এই নেতার স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ফরহাদ ইকবাল ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘জন্মসূত্রেই শহীদুল ইসলাম বিএনপির সঙ্গে জড়িত। এদের মতো লোক দলে দরকার আছে। কিন্তু আহমেদ আযম খানদের বিরোধিতার কারণে সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।’

মহাসচিবের সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তৃণমূলের এই নেতা। বলেন, ‘দলের তিন নম্বর শীর্ষ নেতার কথা যদি কাজে না আসে তাহলে কার কথা গুরুত্ব পাবে?’ যদিও অভিযোগ নিয়ে কথা বলার জন্য একাধিকবার চেষ্টা করলেও আহমেদ আযম খানের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে একাধিকবার রুহুল কবির রিজভীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলেননি। আর বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘বাসাইলের এই নেতার বিষয়ে মহাসচিবের সুপারিশের বিষয়টি আমরা জানি। কিন্তু কেন তার পদ এখনো স্থগিত রাখা হয়েছে সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’ এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির ঢাকা বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘মহাসচিবের সুপারিশের পরও তা বাস্তবায়ন না হওয়ার ঘটনা অবশ্যই দুঃখজনক। আমি বিষয়টি জানলাম। এ নিয়ে রিজভী আহমদের সঙ্গে কথা বলব।’

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইলে কিছুটা বিব্রতবোধ করেন তিনি। ঢাকা টাইমসকে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আসলে এত নেতার ব্যাপারে এত অনুরোধ করতে হয় কখন কোনটা কার্যকর হয়, কোনটা কার্যকর হয় না এটা মনে রাখা অসম্ভব। বিষয়টি খোঁজ নেব।’

বিএনপির মহাসচিব ও রিজভী আহমদের মধ্যে দ্ব›দ্ব নিয়েও মাঝেমধ্যে বিএনপির ভেতরে-বাইরে আলোচনা ওঠে। অবশ্য তারা বরাবরই বিষয়টি উড়িয়ে দিয়ে আসছেন। গত ২ জুলাই ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট পাস প্রতিক্রিয়া জানাতে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন করেন বিএনপির মহাসচিব। সেখানে একজন সাংবাদিক রিজভী আহমদের সঙ্গে দ্ব›েদ্বর বিষয়টি সত্য কি না জানতে চান।

জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমার সঙ্গে দলের কারও দ্ব›দ্ব নেই। আপনারা অযথাই দলের খবর কোথায় পান। আমি ঠিক জানি না।’ সেদিন এ নিয়ে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলেন তিনি।

(ঢাকাটাইমস/১৬জানুয়ারি/মোআ/কেআর)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :