ক্যানসার নিয়ে ঘুরছেন, অথচ জানেন না

ঢাকাটাইমস ডেস্ক
 | প্রকাশিত : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১১:৪২

আজ বিশ্ব ক্যানসার দিবস। এই মারণরোগ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি এবং আক্রান্ত রোগীদের সাহায্য করার জন্য মানুষকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে প্রতি বছর ৪ ফেব্রুয়ারি নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা হয়। ইউনিয়ন ফর ইন্টারন্যাশনাল ক্যানসার কন্ট্রোল নামক একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থার নেতৃত্বে পালন করা হয় দিবসটি। এর সংস্থা আগে ক্যানসারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন নামে পরিচিত ছিল। এর সদর দপ্তর জেনেভায়। ১৭০টিরও বেশি দেশে প্রায় দু’হাজার সদস্য রয়েছে এ সংস্থার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী বিশ্বে প্রতিবছর ৮২ লাখ মানুষ মারা যায় ক্যানসারে। বিশেষ করে সাড়ে ১০ কোটি নারী ব্রেস্ট ক্যানসারে আক্রান্ত হন। এ মারণব্যধিতে আক্রান্তদের বেশিরভাগই বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের নাগরিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে সচেতনতা ও শিক্ষার অভাব এবং অর্থনৈতিক অবস্থাকে বাংলাদেশে ক্যানসার ও এ রোগে মৃত্যুর হার বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

ক্যানসার একটি বড় রোগ। এর চিকিৎসাও ব্যবয়বহুল, যা সময়মত না করালে মৃত্যু ঘনিয়ে আসতে পারে। বাংলাদেশের মতো একটি স্বল্পোন্নত দেশে ক্যানসার প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই। দুধরনের সচেতনতাই অবলম্বন করা জরুরি। প্রথমত প্রতিরোধের জন্য হতে হবে স্বাস্থ্য সচেতন, দ্বিতীয়ত লক্ষণগুলো জানতে হবে, যাতে করে প্রাথমিক পর্যায়েই ধরা পড়ে রোগটি।

চিকিৎসকরা মনে করেন, নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ক্যানসার তাড়াতাড়ি ধরা পড়ে এবং সেক্ষেত্রে চিকিৎসা সহজ হয়। ক্যানসারের লক্ষণগুলোর ওপর নির্ভর করে এটি কোথায়, কতটা বড় এবং এর কাছাকাছি কোনো অঙ্গ বা টিস্যুকে কতটা প্রভাবিত করে।

ক্যান্সার যখন ছড়িয়ে পড়ে তখন শরীরের বিভিন্ন স্থানে লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এজন্য এটা কী ধরনের রোগ, কী কী কারণে ঝুঁকি বাড়ে, প্রতিরোধের জন্য কী কী করণীয় সে বিষয়ে সচেতনতা জরুরি বলে মনে করেন চিকিৎসকরা।

ক্যান্সার প্রতিরোধে নিয়মিত ব্যায়ামের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পরিহার করতে হবে ধুমপান। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোসহ নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করতে হবে। ক্যানসার যেন না হয় সেজন্য মানুষের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। বলছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ।

লক্ষণ ও প্রতিরোধ

পেটে ব্যথা অথবা কাশি- অনেকদিন চিকিৎসা করিয়েও সেরে উঠছেনা। তাহলে ধরে নিতে হবে এটা ক্যানসারের উপসর্গ হতে পারে। ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা এনএইচএসের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, এরকম উপসর্গ থাকলে অনতিবিলম্বে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।

তারা বলছেন, এসব উপসর্গ উপেক্ষা করে চিকিৎসা গ্রহণে বিলম্ব কোর কারণে হাজার হাজার মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

চিকিৎসকদের মতে, করোনা মহামারির মধ্যে ক্যানসারের এসব লক্ষণ বা উপসর্গ সম্পর্কে লোকজনের আরও বেশি সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

ব্রিটেনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজনের মধ্যে তিনজনই এসব উপসর্গকে গুরুত্বের সাথে নেন না। ক্যানসারের সাধারণ যেসব উপসর্গ আছে সেগুলোর ব্যাপারেও অনেকে সচেতন নন। এসব উপসর্গ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাও নেই।

অনেক সময় দেখা যায় একজন ব্যক্তি হয়তো সুস্থভাবে জীবন যাপন করছেন। হঠাৎ করেই দেখা গেল যে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। পরে পরীক্ষা করে দেখা গেল তার ক্যানসার হয়েছে। এর মধ্যে তার কিছু লক্ষণও হয়তো শরীরে দেখা দিয়েছিল কিন্তু সেগুলো তিনি বুঝতে পারেন নি, অথবা গুরুত্ব দেননি।

বিলম্ব করার কারণে ক্যানসার ইতোমধ্যে তার শরীরে অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়েছে। তখন চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে সারিয়ে তোলা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে।

চিকিৎসকরা বলছেন, উপসর্গ যদি ছোটখাটোও হয়, তার পরেও সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কেননা কিছু কিছু ক্যান্সার শনাক্ত করা কঠিন এবং অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পরেই এবিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়। কিন্তু এর মধ্যেই অনেক সময় পার হয়ে যায়।

চিকিৎসকরা বলছেন, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বর্তমানে ডাক্তার বা হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে আর একারণেই ক্যানসারের উপসর্গ বা লক্ষণের ব্যাপারে এখন সতর্ক হওয়া আরও বেশি জরুরি।

উপসর্গ

কিছু কিছু উপসর্গ সাধারণত সব ক্যানসারের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। বিশেষ করে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার পর এসব উপসর্গ মোটামুটি একই রকমের হয়ে থাকে।

‘এসবের মধ্যে রয়েছে কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া, অনেকদিন ধরে খাওয়ায় অরুচি ইত্যাদি। তার পর সব পেটের ক্যানসারের বেলায় একটা সাধারণ উপসর্গ হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে পেটে ব্যথা। বাউল ক্যানসারের ক্ষেত্রে তিন থেকে চার সপ্তাহ ধরে ডায়রিয়া’- বলেন ডা. ইমতিয়াজ আহমেদ, যিনি ব্রিটেনে একজন ক্যান্সার চিকিৎসক এবং সাউথেন্ড ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের কনসালটেন্ট ক্লিনিক্যাল অনকোলজিস্ট।

তিনি আরও বলেন, ‘কিছু কিছু উপসর্গ আছে একবার দেখা দিলেই গুরুত্বের সাথে নিতে হবে। যেমন প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া যা ব্লাডার ক্যানসারের একটি লক্ষণ যা কখনোই উপেক্ষা করা উচিত নয়।’

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গলা, পাকস্থলি, বাওল, প্যাংক্রিয়াটিক, ওভারি- এ ধরনের অ্যাবডোমিনাল ক্যান্সার এবং ইউরোলজিক্যাল যেসব ক্যানসার আছে- যেমন প্রোস্টেট, কিডনি এবং ব্লাডার- এসব ক্ষেত্রে উপসর্গগুলো অনেকটা আড়ালেই থেকে যায়।

সাধারণভাবে এসব ক্যান্সারের যেসব উপসর্গ দেখা যায় তার মধ্যে রয়েছে, কয়েক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় ধরে পেটের ভেতরে অস্বস্তি,অনবরত ডায়রিয়া, সবসময় অসুস্থ বোধ করা, প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত।

চিকিৎসকরা বলছেন, এসব উপসর্গের কোনো একটি তিন সপ্তাহ কিম্বা তার চেয়েও বেশি সময় স্থায়ী হলে দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

এছাড়াও আরও কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তন- যেমন পেটে বাড়তি কোনো মাংসপিণ্ড বা লাম্প অথবা মেনোপোজের পরেও রক্ত যাওয়া, বিনা কারণে ওজন কমে যাওয়া- এসবও ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে।

ফুসফুসের ক্যানসারের ক্ষেত্রে কিছু উপসর্গ রয়েছে, যেগুলোকে রোগীরা তেমন একটা গুরুত্ব দেয় না।

এমন উপসর্গগুলো হল- তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কাশি (কোভিড ছাড়া), বারবার চেস্ট ইনফেকশন বা বুকে সংক্রমণ, কাশির সঙ্গে রক্ত, ক্লান্ত বোধ করা, শক্তি না পাওয়া কিম্বা সবসময় দুর্বল বোধ করা।

অনেক উপসর্গ বোঝার কোনো উপায় নেই। একারণে এসব লক্ষণের ব্যাপারে সতর্ক হওয়া আরো বেশি জরুরি।

ডা. ইমতিয়াজ বলছেন, ‘অস্পষ্ট লক্ষণগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। যেমন কাশি যদি দুই তিন সপ্তাহ ধরে থাকে, অথবা বার বার ফিরে ফিরে সংক্রমণ হচ্ছে, তাহলে সেটা লাং ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে।’

প্যাংক্রিয়াটিক ক্যানসার প্রাথমিক স্তরে ধরা পড়ার ঘটনা খুবই কম। অন্য কোনো কারণে সিটি স্ক্যান করার সময় হয়তো ধরা পড়ে, যখন এটি অ্যাডভান্সড স্টেজে চলে গেছে।

তবে বাওল ক্যানসার, ব্লাডার ক্যানসার, লাং ক্যানসার একটু সতর্ক হলে আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব।

কী খাবেন ক্যানসার প্রতিরোধের জন্য

সবুজ সবজি

বিভিন্ন ধরনের সবুজ সবজি ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করে। পালং,মেথি ইত্যাদি আপনার খাদ্য তালিকায় প্রতিদিনই রাখতে পারেন। স্যুপ, রুটি-পরোটা এবং ডাল তৈরিতে এসব সবজি ব্যবহার করতে পারেন। তাজা সুবজ সবজি ক্যানসারের উপাদানগুলোর কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে সাহায্য করে।

পুরনো প্রবাদে রয়েছে, খাবারের থালা যদি বেশি রঙিন হয় তবে সুস্বাস্থ্যের আশা করতে পারেন আপনি। তাই খাবারের থালাকে সাজিয়ে তুলুন বিভিন্ন রঙের সবজি দিয়ে। সবজিতে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন যেগুলো ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করে। তাই খাবারের থালাকে সাজিয়ে তুলুন ফুলকপি, গাজর, বিট-পালং ইত্যাদি সবজি দিয়ে।

পেঁয়াজ ও রসুন

খাবারের তালিকায় অবশ্যই পেঁয়াজ এবং রসুন রাখুন। এগুলো ক্যানসার প্রতিরোধে ভালো কাজ করে।

নিরামিষ

গরু, খাসি বা লাল মাংস খাওয়া এড়িয়ে চলুন। এ ধরনের মাংসগুলো ক্যানসার তৈরিতে সাহায্য করে। একটি গবেষণায় বলা হয়, মাংস খাওয়া বাদ দিয়ে খাদ্যাভ্যাসে প্রচুর পরিমাণ সবজি রাখা হলে ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করবে। এ ছাড়া বেশি পোড়া খাবারও এড়িয়ে চলুন।

ভেষজ

কিছু ভেষজ জাতীয় খাবারে এন্টি অক্সিডেন্ট থাকে। যা ক্যানসারের কোষ ঝিল্লি তৈরি ব্ন্ধ করতে কার্যকরী। ভেষজ জাতীয় খাবার যেমন অশ্বগন্ধা, তুলসি, ত্রিফলা ইত্যাদি। তাই এ ধরনের খাবারের অভ্যাস করতে পারেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত কিছু ব্যাপার মেনে চললে ক্যানসারের ঝুঁকি অনেকখানি কমানো যায়। যেমন:

ব্যায়াম

প্রতিদিন নিয়মিত কিছু ব্যায়াম করা যেমন-দৌড়ানো, সাইকেল চালনো, নাচ করা, হাঁটা। সপ্তাহে কমপক্ষে ২ দিন ভারী ব্যায়াম করতে হবে।

খাদ্যভ্যাস

ধূমপান বা মদ্যপান ছেড়ে দেয়া বা পরিমাণ কমিয়ে আনা। পান-সুপারি জর্দা, তামাকপাতা খাওয়া বন্ধ করা। চর্বিজাতীয় পদার্থ কম খাওয়া। সম্ভব হলে মাংস খাওয়া বন্ধ করে দেয়া বা কমিয়ে দেয়া। প্রচুর পরিমাণে শাক-সবজি, ফলমূল এবং আঁশজাতীয় খাবার খাওয়া।

ক্যানসার প্রতিরোধে ঘরোয়া মশলার ওপর জোর দিচ্ছেন গবেষকরা। সেইগুলো নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস করলেই ক্যানসার রোগ না হওয়ার সম্ভবনা থাকে না।

আদা

স্টমাক ক্যানসারের জন্য আদা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ভেষজ ওষুধ।

হলুদ

আদার মতো হলুদও একটি প্রাকৃতিক ওষুধ। মূলত রান্নায় স্বাদ ও রঙ আনার জন্য হলুদ ব্যবহার করা হয়। হলুদে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমিটরির বৈশিষ্ট্য, যা ক্যানসার রোগকে প্রতিরোধ করে। গবেষকদের মতে, প্রস্টেট, ব্রেস্ট, স্কিন ও কোলন ক্যানসারের জন্য উপযুক্ত ওষুধ হল এই হলুদ।

রসুন

স্টমাক ক্যানসারের জন্য উপযুক্ত হল এই রসুন। এছাড়া কোলন, ব্রেস্ট, খাদ্যনালী ও অগ্ন্যাশয় ক্যানসার সারাতেও রসুন খুব কাজে দেয়।

পিপারমিন্ট

স্টমাক ক্যানসারের রোগীরা চেষ্টা করবেন প্রতিদিন পিপারমিন্ট চা খেতে। মুখের বা ঠোঁটের সমস্যাতেও মিন্ট অনেক উপকারী।

(ঢাকাটাইমস/০৪ফেব্রুয়ারি/এফএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :