ভ্রমণ

পর্বতচূড়ায় মেঘেদের ঘরবসতি

হাবিবুল্লাহ ফাহাদ
| আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২২, ১০:৫২ | প্রকাশিত : ২৮ এপ্রিল ২০২২, ০৯:৪০

পাহাড়ের মতো এত টকটকে রক্তজবা দেখিনি কখনো। গাঢ় সবুজের মাঝে লাল ফুলের ঝালর। কী সুন্দর! চৈত্রের রোদ্দুরে ঝিমিয়ে পড়া পাহাড়ের গায় ওইটুকুই সজীবতা। বসতের আঙিনা থেকে উঁকি দিচ্ছে পথে। ঠিক দুরন্ত শিশুদের মতো। যেন শোনে না কোনো বারণ। সর্পিল পাহাড়ি পথ। তার ধারে সেগুন, গর্জন, চম্পা-জারুলের সংসার। কখনো ঢালুতে, কখনো প্রান্তে। এই পথ ভেঙে চাঁদের গাড়ি চলছে নীলাচলে। যেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে পাহাড়। আমরা কজনা প্রকৃতিপ্রেমী গাঁথা পড়েছি এক সুতোয়। পাহাড় আর প্রকৃতি দর্শনে।

এক রাতের দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে পৌঁছেছি সকালে। রেইচা আর্মি ক্যাম্পের দুয়ারে যেতেই হাত তুললেন একজন সেনাসদস্য। রাতের দীর্ঘ ভ্রমণে গান-গল্প আর আড্ডায় যারা ঘুমোতে পারেননি, তাদের চোখ লেগে এসেছিল ভোরে। ভাঙল এক্ষণে। বাসের দুয়ার খুলে গেলে উঠে এলেন ওপরে। ‘আপনাদের কারা বান্দরবানে বেড়াতে এসেছেন?’ প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গেই একযোগে উঠে গেল সব কটি হাত। ‘কোনো ভিনদেশি সফরকারী এসেছেন কি না সঙ্গে?’ এই প্রশ্নে একবাক্যে ‘না’ বলতেই বাসের আগাপাশতলা একবার পায়চারি করে নেমে গেলেন সেনাসদস্য। ‘আপনাদের ভ্রমণ আনন্দদায়ক হোক।’

সদ্য ঘুম ভাঙা মনিষ্যিরা আড়মোড়া ভেঙে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছেন জানালার ওপাশে। দুপাশে অভেদ্য প্রাচীর। তাতাপোড়া বুকটা চিতিয়ে রেখেছে পাহাড়। একেবারে রুখু নয় অবশ্য। সেগুন, জারুল, পিয়াল, মহুয়ার সতেজ স্নিগ্ধতাও আছে কোথাও কোথাও। কিছু দূর যেতেই হাতের বাঁয়ে হাতছানি দিল মেঘলা পর্যটন স্পট। হাত নেড়ে কেউ কেউ বলল, ‘আসছি বাবা। দেখা হবে শিগগির।’ বলতে বলতে থেমে গেল নীল বাসের চাকা। ভেনাস রিসোর্ট। আয়োজকেরা জানিয়ে দিলেন, এখানেই হবে যাপন। দুই দিন, এক রাত। স্বল্পদৈর্ঘ্য এই ভ্রমণে সবাই সংবাদকর্মী। আয়োজক পিআর সংস্থা ইনফো পাওয়ার লিমিটেড।

পাহাড়ের সমতলে বেশ গোছানো ভেনাস রিসোর্ট। প্রাকৃতিক নৈসর্গকে কাজে লাগিয়ে দারুণ সজ্জা তার। খালের মতো ছোট্ট একটা জলাধারে ঘেরা রিসোর্টের একপাশ। তার পাশে পাশে ফুটে আছে রাধাচূড়া। অন্য পাশে পাহাড়। তার বুক কেটে ধাপে ধাপে সিঁড়ি উঠেছে ওপরে। সেখানেও ছোট্ট কটেজ। আছে টকটকে ঝুমকো লতা, বাগানবিলাস আর নাম না জানা বুনোফুল। কৃত্রিম ফোয়ারা চত্বর। তার গায়ে শুভ্র পাখার পাথুরে দেবদূত শিশু। সকালের প্রাতরাশ, হোটেলের কক্ষ বরাদ্দ আর স্বল্প বিশ্রাম শেষে এবার বেরিয়ে পড়ার পালা। এরই মধ্যে হোটেলের আঙিনায় বসেছে চাঁদের গাড়ির হাট। উঠে পড়ার পালা। যে যার মতো চড়ে বসলে ছাড়ল গাড়ি। প্রথম গন্তব্য নীলাচল।

ঢালু আঁকাবাঁকা পথ। সাপের মতো বেয়ে বেয়ে উঠে যাচ্ছে চাঁদের গাড়ি। দক্ষ চালক না হলে কুপোকাত হওয়ার শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দক্ষতা যে বয়সে হয় না, এখানকার চালকদের দেখলেই তা সহজে অনুমেয়। এখনো দাড়ি-গোঁফের রেখা ভাসেনি মুখে, এমন কয়েকজনও আছে আমাদের বহরে। চালকজীবনের অভিজ্ঞতাও খুব যে বেশি তা নয়, তিন-চার বছর। তারপরও কী দুর্দান্ত সাহস তাদের!

পথের দুপাশে ঢালু পাহাড়ের গায়ে বসতি। কোনোটা পাকা। কোনোটা খড়, বাঁশ, বেতের। তার ছোট্ট উঠোন। ফল-ফলাদির গাছ। ফুল গাছ নেই, এমন বাড়ি চোখে পড়ল না মোটেও। উদরের খোরাকের মতো মনের খোরাকেও এঁরা খুব যত্নবান, বোঝা গেল তা। ছোট ছোট বাড়িগুলো একেকটা স্বর্গপুরীর মতো। তবে বর্ষায় পাহাড়ি ধসের ঝুঁকিও বাইরে নয়। উঠোনের কোথাও গবাদি পশু। জাবর কাটছে আপন মনে। কোথাও ডালিম গাছের ছায়ায় বসে কোমর তাঁতে চলছে পিনন-হাদি বুনন কাজ। মাঝবয়সী কর্মঠ নারী। তার পাশে বসে আছে ছোট্ট মেয়েটি। দেখছে কীভাবে এপাশ-ওপাশে দৌড়ে বেড়ায় চঞ্চল মাকু। হয়তো তার কোমরেও একসময় ঝুলবে এই তাঁত। নয়তো শিক্ষার আলো দেখাবে নতুন দিগন্তরেখা।

নীলাচলের দুয়ারে পা ফেলতেই হাত নাড়ে রক্তজবা। তার পাশে বুনোফুল। তাতে বসেছে প্রজাপতির মেলা। হলদে ফিনফিনে পাখায় কালচে আল্পনা। পাখায় পাখায় ছড়িয়ে দিচ্ছে রং। ফুলে ফুলে। পাতায় পাতায়। একটু উঠতেই নীলাচল লাভ পয়েন্ট। এখান থেকে নিচে তাকালে পাখির চোখে ধরা দেয় শহর। পাহাড়ের গায়ে অজগরের মতো পেঁচিয়ে আছে ঘর-বসতি, লোকালয়, পথ। বান্দরবান শহরটা এমনই। পাহাড়ের বুক কেটে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা লোকালয়। জন্ম পাহাড়ের ঔরসেই। লাভ পয়েন্ট কিংবা ঝুলন্ত নীলা থেকে দেখতে শহরের স্থাপনাগুলো একেকটি মিনিয়েচার। ঘন অরণ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে বড় বড় দালান। যেমন মা পাখির ডানায় আশ্রয় খোঁজে ছানারা। প্রকৃতির কাছে মানুষ আর তার আবিষ্কার যে কতটা ঠুনকো, মনে পড়ে সে কথাই।

ঢালু পথ বেয়ে আরও কিছু দূর উঠতেই নজর কাড়ে ‘ব্র্যান্ডিং বান্দরবান’। ছোট্ট একটা বাঁশের কুটি। নিচের দিকটা বেশ প্রশস্ত। বিক্রয়কেন্দ্র। তার ওপরে দোতলা কটেজ। ঝুলবারান্দা। বাঁশের তৈরি স্থাপনা, তবে সবুজাভো কাচ বসানো জানালায়। তার পাশেই ল্যাম্পপোস্ট। এই পার্বত্য জেলার উদ্যোক্তাদের তৈরি পণ্যের বিক্রয় ও প্রদর্শনী করা হয় এখানে। খুব যে সাজানো-গোছানো, তা নয়। ঝুলছে বাঁশ আর বেতের তৈরি কিছু সরঞ্জাম। বিনি ধানের চাল আর মস্ত এক শুকনো গিলা ফল। খুব বেশি আগে করা হয়নি। এ বছরের শুরুতে হয়েছে উদ্বোধন। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এখানকার দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসকদের অনেকের নাম খচিত আছে পাহাড়ের বুকে, ছোট ছোট নামফলকে। চোখে পড়ে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, জ্যেষ্ঠ সচিব পদমর্যাদার কর্তাদের দু-একজনের নামও।

নীলাচলে বিভিন্ন পয়েন্টে আছে নিরিবিলি সময় কাটানোর ব্যবস্থা। ছোট ছোট বেঞ্চি, কংক্রিটের সেন্টার টেবিলের চারপাশে আসন দেখলে একবার হলেও বসতে চাইবে মন। আমাদেরও ব্যতিক্রম হলো না। ক্লান্ত-পরিশ্রান্তদের অনেকেই কিছুটা সময় কাটালেন এখানে। কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়লেন মুহূর্তটা বন্দি করতে ফ্রেমে। এস এম আতিক ভাই উড়িয়ে দিলেন ড্রোন। পাহাড়ের চূড়া থেকে আরও কয়েক ওপরে, শূন্যে। যেতে যেতে একটা সময় হারিয়ে গেল সাদা মেঘের দেশে। আতিক ভাইয়ের হাতে রিমোট কন্ট্রোল। মুঠোফোনের স্ক্রিনে উবু হয়ে খুঁজছেন দুষ্টু ড্রোনটাকে। কোথায় গেল ফাঁকি দিয়ে! চোখেমুখে উদ্বেগ তার। অবশেষে মিলল সন্ধান। একটা পাখির সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উড়ে গিয়েছিল দূরে! কান ধরে (রিমোট কন্ট্রোলে) হিড়হিড় করে টেনে আনলেন কাছে। স্বস্তির ফুল ফুটল তবে। গাজী মনসুর আজিজ ভাই। শান্তশিষ্ট মানুষ। বাংলাদেশের নাম খচিত টি-শার্ট তার গায়ে। ঘুরে বেড়াচ্ছেন ক্যামেরা হাতে। আপন মনে ক্লিক করছেন পছন্দের নিরিখে। তুলছেন পাহাড়, ফুল, পাখি আর প্রজাপতি। সঙ্গীদের অনুরোধ-উপরোধও দিচ্ছেন না ফিরিয়ে। তারপরও অনেকেরই অনুযোগ, ‘গাজী ভাই, আমার তো একটাও নিলেন না!’