জাপার নিয়ন্ত্রণ চান রওশনপন্থিরা

রুদ্র রাসেল, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২:৪৮ | প্রকাশিত : ০৭ অক্টোবর ২০২২, ১২:৪৪

জাতীয় পার্টির ভেতরে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্য। বিশেষ করে দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার দলীয় পদ থেকে বহিষ্কৃতরা সংবাদ সম্মেলন করে তাদের অবস্থান জানান দিয়েছেন। প্রদর্শন করেছেন সাংগঠনিক শক্তি। রওশন এরশাদের ডাকা ২৬ নভেম্বরের কাউন্সিল (সম্মেলন) সফল করারও প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। আর ওই কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে চান রওশনপন্থীরা। বিশেষ ছক করে সেই পথেই এগুচ্ছেন তারা।

কিন্তু রওশন গ্রুপের এই কার্যক্রমকে পাত্তা দিচ্ছেন না জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের। তার বক্তব্য হচ্ছে, যারা রওশন এরশাদকে ব্যবহার করতে চায়, তারা দলের কেউ নয়। বহিষ্কৃত কিছু লোক বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করছে। তবে এতে দলে কোনো প্রভাব পড়বে না।

এদিকে গতকালের সংবাদ সম্মেলনে যে ভিডিও বার্তা দেখানো হয়েছে, সেখানে রওশন এরশাদ আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও কথা বলেছেন। ইভিএমে ভোটের বিষয়ে উৎসাহ প্রদর্শন করেছেন।

অপরদিকে জিএম কাদের ইভিএমের বিরোধিতা করে আসছেন। সম্প্রতি ঢাকা টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারেও ইভএমের প্রতি মানুষের বিশ^াস নেই জানিয়েছিলেন তিনি। ইভিএমের বিপক্ষে দলের অবস্থান স্পষ্ট করেন জিএম কাদের।

১১ মাসের বেশি সময় ধরে ব্যাংককের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রওশন এরশাদ শারীরিকভাবে এখনও পুরোপুরি ফিট না হলেও সাবেক রাষ্ট্রদূত ও জাপা নেতা গেলাম মসীহ্ ও কাজী মামুনুর রশিদসহ দলের বেশ কয়েকজন বহিষ্কৃত নেতার নেতৃত্বে দলের একটি অংশ রওশনকে রাজনীতির মাঠে রাখতে সাংগঠনিক তৎপরতা চলাচ্ছেন।

অন্যদিকে রওশন এরশাদ ওই ভিডিও বার্তায় দলের আসন্ন সম্মেলন ঐক্যবদ্ধভাবে সফল করতে নেতা-কর্মীদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।

জাপার একটি সূত্র জানিয়েছে, যারা আসন্ন কাউন্সিল নিয়ে প্রকাশ্যে বা গোপনে মাতামাতি করছে তাদের তালিকা করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে জাতীয় পার্টির পদধারী কেউ থাকলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিষ্কৃতদের যারা এসব করছেন দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও তাদের বহিষ্কারের বিষয়ে চিন্তাভাবনা চলছে।

রওশনের ভিডিও বার্তা প্রচার করা সংবাদ সম্মেলনের পরপরই কিচেন-কেবিনেট (অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ নেতা) মিটিং করেছেন জিএম কাদের। ওই সভায়ও এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

সূত্র জানায়, দলীয় সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে যারা প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করছে, তারা ইতোমধ্যেই দলের পদ থেকে বহিষ্কৃত। তাদের মধ্যে যাদের দলের প্রাথমিক সদস্যপদ রয়েছে, তারা তাও হারাতে পারেন এই কার্যক্রমের জন্য। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সভা ডাকার কথা ভাবছেন দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের।

দলীয় কাউন্সিল ডেকে তাতে অংশ নিতে নেতাকর্মীদের প্রতি রওশনের আহ্বানের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে গতকাল জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এতে দলে কোনো প্রভাব পড়বে না।’ তার দাবি, রওশন এরশাদ অসুস্থ। একটি চক্র তাকে দিয়ে এসব করাচ্ছে। তবে এতে লাভ হবে না।’ তিনি বলেন, ‘দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করায় ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কৃতরাই এসব করছে।’

জিএম কাদের আরও বলেন, ‘যে গোলাম মসীহ্ সংবাদ সম্মেলন করেছে, সে দলের কেউ নয়।’

তবে জাতীয় পার্টির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব হাসিবুল ইসলাম জয় গতকাল রাতে ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘গোলাম মসীহ্ জাতীয় পার্টির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। পল্লীবন্ধু এরশাদ তাকে রাষ্ট্রদূত বানিয়েছিলেন। পল্লীমাতা রওশন এরশাদও তার ওপর ভরসা করেন। আর সেই ব্যক্তিকে দলীয় কেউ নয় বলে জিএম কাদের সাহেব বা মুজিবুল হক চুন্নুর দেওয়া বক্তব্যে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা ব্যথিত হয়েছেন, দুঃখ পেয়েছেন।’

হাসিবুল ইসলাম জয় বলেন, ‘রওশন এরশাদের ডাকে দলকে সুসংগঠিত করতেই আমরা মাঠে নেমেছি। দলকে শক্তিশালী করাই লক্ষ্য। রওশন এরশাদ অনেকটা সুস্থ। এ মাসেই দেশ ফিরবেন। তিনি দেশে ফেরার পর বড় ধরণের সাংগঠনিক বিপ্লব ঘটবে।’

সকলের জন্য চমক অপেক্ষা করছে জানিয়ে হাসিবুল ইসলাম জয় বলেন, ‘কিছু ব্যক্তি জিএম কাদেরকে ব্যবহার করে, দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করছেন, যা রওশন এরশাদের দৃষ্টিতে এসেছে। এ কারণেই তিনি (রওশন) দলের সব বিভক্তি ঘুচিয়ে অভিমানে সরে থাকা ও অন্যায়ভাবে বহিষ্কারের শিকার সকল নেতাকর্মীকে ফিরিয়ে এনে আসন্ন কাউন্সিলের মাধ্যমে দলকে আরও শক্তিশালী ও সুসংগঠিত করার কাজে হাত দিয়েছেন।’

সব কিছুর সমুচিত জবাব দেওয়া হবে বলেও রওশনবিরোধীদের সতর্ক করেন হাসিবুল ইসলাম জয়।

এদিকে বিরোধীদলীয় নেতার প্রেস উইংয়ের সদস্য, জাতীয় যুব সংহতির সাবেক দপ্তর সম্পাদক কাজী শামসুল ইসলাম রঞ্জন ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘যারা সংবাদ সম্মেলন করেছন বা রওশন এরশাদের ডাকা দলীয় কাউন্সিল সফল করতে মাঠে নেমেছেন, তারা সকলেই দলের সদস্য। জিএম কাদের স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে আমিসহ পল্লীবন্ধু এরশাদের আদর্শের অনুসারীদের বহিষ্কার করলেও দলে প্রাথমিক সদস্যপদ রয়েছে।’

বিরোধীদলীয় নেতার রাজনৈতিক সচিব সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ্ বলেন, ‘কোনো বিভেদ বা বিভ্রান্তি নয়, বেগম রওশন এরশাদের আহ্বানে জাতীয় পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে আসন্ন সম্মেলন ডাকা হয়েছে।’

রওশন এরশাদ ভিডিও বর্তায় বলছেন, ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পরে পার্টি অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে, হেলে পড়েছে। আমার মনে হয় এখন পার্টি ঠিকমতো পরিচালিত হচ্ছে না। সেজন্য, পার্টিকে সঠিকভাবে দাঁড় করাতে হবে। কাউন্সিল ডেকেছি এর অনেক কারণ আছে। বিশেষ করে গত কাউন্সিলে আমাদের গঠনতন্ত্রকে পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে। যেখানে যেখানে যার যার ক্ষমতা ছিল, সে ক্ষমতা খর্ব করে দেয়া হয়েছে। অনেক জায়গায় সংশোধন করে নতুন করে গঠনতন্ত্র আনা হয়েছে। এটা ঠিক হয়নি।’

প্রসঙ্গত, গত দুইমাস ধরেই বিবৃতিতে সরব দেখা গেছে রওশন এরশাদকে। সবশেষ ২১ সেপ্টেম্বর রওশনের নামে গোলাম মসীহ্ স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জাপা থেকে অব্যাহতি, বহিষ্কার এবং কমিটি থেকে বাদ দেওয়া সবাইকে দলে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে ‘আদেশ’ দিয়েছেন জাপার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জি এম কাদেরের কাছে পাঠানো নির্দেশনামূলক এক চিঠিতে তিনি এ আদেশ দেন। চিঠিতে জাপার গঠনতন্ত্রের ২০ ধারার কয়েকটি উপধারাকে ‘গণতন্ত্রপরিপন্থী ও স্বেচ্ছাচারমূলক’ আখ্যা দিয়ে সেগুলো স্থগিতেরও ‘নির্দেশ’দেন রওশন।

যেসব নেতাকে দলে ফিরিয়ে নিতে রওশন বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন তারা হলেন, সদ্য অব্যাহতি পাওয়া প্রেসিডিয়াম সদস্য মসিউর রহমান (রাঙ্গা) ও সাবেক সংসদ সদস্য জিয়াউল হক মৃধা, এর আগে দল থেকে বাদ পড়া সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল গাফফার বিশ্বাস, এম এ সাত্তার, দেলোয়ার হোসেন খান, জাফর ইকবাল সিদ্দিকী, ফখরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, কাজী মামুনুর রশিদ ও ইকবাল হোসেন, সাবেক উপদেষ্টা মাহবুবুল আলম, ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম ও নুরুল ইসলাম নুরু।

(ঢাকাটাইমস/০৭অক্টোবর/এফএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :