রক্তে প্লাটিলেট বাড়াতে যেসব খাবার খাবেন

ফিচার ডেস্ক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৩, ১০:০৩ | প্রকাশিত : ৩০ আগস্ট ২০২৩, ০৯:৫৯

প্রতিদিন ডেঙ্গু আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা গাণিতিক হারে বেড়েই চলেছে। রোগীর সংখ্যা সক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। অপ্রতিরোধ্য ডেঙ্গু কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হলে রক্তে অণুচক্রিকা বা প্লাটিলেট কমে যায়। যাতে করে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। প্লাটিলেট হচ্ছে রক্তের এক ধরণের ক্ষুদ্র কণিকা বা অণুচক্রিকা, যা রক্ত জমাট বাঁধতে ও রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে সাহায্য করে। স্বাভাবিক মানুষের রক্তে প্লাটিলেটের হার প্রতি ১০০ মিলিলিটারে দেড় লাখ থেকে চার লাখ। প্লাটিলেটের মাত্রা এর থেকে কমে গেলে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি দেখা দেয়। ২০ হাজারের নিচে প্লাটিলেটের সংখ্যা নেমে আসলে কোনো প্রকার আঘাত ছাড়াই রক্তক্ষরণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু জ্বর হলে সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা হতে পারে। রক্তে প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকার স্বাভাবিক মাত্রা দেড় লাখ থেকে সাড়ে চার লাখ। প্রায় ৯০ শতাংশ রোগীর প্লাটিলেট কমে যায়।

ডেঙ্গু পজেটিভ হলে না ঘাবড়ে রক্তের প্লাটিলেট যেন কমে না যায় সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। প্লাটিলেট হলো রক্ত কোষ যা অস্থিমজ্জায় উৎপন্ন হয়। প্লাটিলেট কমে গেলে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। তাই ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে রক্তের প্লাটিলেট ঠিক রাখবে, এমন সব খাবার খান। পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলবেন অবশ্যই।

প্লাটিলেট কমে যাওয়ার লক্ষণগুলো হচ্ছে শরীরের যেকোনো স্থান থেকে সূক্ষ্ম রক্তপাত, যা পিনপয়েন্টের আকারে দেখা দেয়। ত্বকে বেগুনি রঙের চিহ্ন দেখা যায়। কারণ ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণ হয়। পিরিয়ডে অতিরিক্ত রক্তপাত হওয়া। মাড়ি বা নাক থেকে রক্তপাত হতে পারে। প্রস্রাব বা মলের সঙ্গে রক্তপাত। শরীরের কোথাও কাটলে অনেকক্ষণ ধরে রক্তপাত।

সাধারণত ডেঙ্গু জ্বর জটিল রূপ নিলে বা রক্তক্ষরণ দেখা দিলে সেটাকে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বলা হয়। এক্ষেত্রে রক্ত নেয়ার প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য থাকে।

প্রথমত প্লাটিলেট এক লাখের নিচে থাকবে, রক্তের হেমাটোক্রিট বা পিসিভি অর্থাৎ প্যাকড সেল ভলিউম বেড়ে যাবে, রক্তনালী থেকে রক্তরস বেরিয়ে আসার সমস্যা দেখা দেবে।

ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারে মূলত রোগীর রক্তনালীগুলোর দেয়ালে যে ছোট ছোট ছিদ্র থাকে, সেগুলো বড় হয়ে যায়। এতে রক্তনালীর দেয়াল ভেদ করে রক্তের জলীয় উপাদান বা রক্তরস নালির বাইরে বের হয়ে আসে।

একে প্লাজমা লিকিংও বলা হয়। এতে রোগীর পেটে–বুকে পানি জমতে পারে। সেইসাথে রোগীর রক্তচাপ কমতে থাকে।

প্লাটিলেট কমার চাইতে, রক্তচাপ কমে যাওয়া ডেঙ্গু রোগীর জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

প্লাটিলেট কমে যাওয়াসহ এমন আরও কয়েকটি কারণে রোগীর মস্তিষ্ক, কিডনি, হৃদপিণ্ডেও রক্তক্ষরণের আশঙ্কা থাকে। এমনকি হেমারেজিক শকের কারণে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

ডেঙ্গু জ্বরের কোনও ওষুধ এখনও নেই। ফলে রোগের আক্রান্তদের উপসর্গের চিকিৎসা করা হয়। পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়লে প্রথম থেকেই প্রচুর পানি, ফলের রস জাতীয় ফ্লুইড গ্রহণ করা উচিত। এর চিকিৎসা বলতে প্যারাসিটামল এবং ফ্লুইড দেওয়া। ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে জ্বর নেমে গিয়ে রোগী যখন সুস্থ হতে শুরু করে তখনই হিমোকনসেন্ট্রেশন হয়ে যেতে পারে। একে বলে রিকভারি ফেজ কমপ্লিকেশন।

জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনার মাধ্যমেই প্লাটিলেটের সংখ্যা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কিছু খাবার আছে যেগুলো প্লাটিলেট বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে। আসুন জেনে নেই সেসব খাবারের নাম।

ড্রাগন ফল

ডেঙ্গু মোকাবিলায় রক্তে প্লাটিলেট বাড়ায় ড্রাগন ফল চিকিৎসকদের মতে, ড্রাগন ফলে প্রচুর অ্যান্টি অক্সিডেন্ট আছে। যা রক্তে অণুচক্রিকা বা প্লাটিলেটের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে ডেঙ্গুর চিকিৎসায় এই ফল খুবই কার্যকর। আমাদের অনেক রোগী সুফল পেয়েছেন। এই ফলে থাকা আয়রন রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদনে সহায়তা করে।

পেঁপে ও পেঁপের পাতা

মালয়েশিয়ার গবেষণা প্রতিষ্ঠান এশিয়ান ইন্সিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলোজিতে করা একটি রিচাস এ দেখা গেছে যে পেঁপে পাতার রসে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর রক্তে কমে যাওয়া প্লাটিলেটের পরিমাণ খুব দ্রুত বাড়াতে পারে। এজন্য ডেঙ্গুর কারণে কারও রক্তের প্লাটিলেটের পরিমাণ কমে গেলে তাকে তাজা পেঁপে পাতার রস ও পাশাপাশি পাকা পেঁপের জুসও খেতে দিতে পারেন।

মিষ্টি কুমড়া এবং কুমড়া বীজ

মিষ্টি কুমড়া রক্তের প্লাটিলেট তৈরি করতে বেশ কার্যকরী। এছাড়াও মিষ্টি কুমড়াতে আছে ভিটামিন ‘এ’ যা প্লাটিলেট তৈরি করতে সহায়তা করে। তাই রক্তের প্লাটিলেটের সংখ্যা বাড়াতে নিয়মিত মিষ্টি কুমড়া এবং এর বীজ খেলে উপকার পাওয়া যায়।

লেবুর রস

লেবুর রসে প্রচুর ভিটামিন ‘সি’ থাকে। ভিটামিন সি রক্তে প্লাটিলেট বাড়াতে সহায়তা করে। এছাড়াও ভিটামিন ‘সি’ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়িয়ে তোলে। ফলে প্লাটিলেট ধ্বংস হওয়া থেকেও রক্ষা পায়।

আমলকী

আমলকীতেও আছে প্রচুর ভিটামিন ‘সি’। এছাড়াও আমলকীতে প্রচুর অ্যান্টি অক্সিডেন্ট আছে। ফলে আমলকী খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং প্লাটিলেট ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা পায়।

বিট

রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ কমে গেলে প্রতিদিন এক গ্লাস বিটের রস পান করুন। বিটের পুষ্টি উপাদান প্লাটিলেটকে নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করে এবং প্রচুর নতুন প্লাটিলেট তৈরি করে।

অ্যালোভেরার রস

অ্যালোভেরা রক্তকে বিশুদ্ধ করে। রক্তের যেকোনো সংক্রমণ দূর করতেও অ্যালোভেরা উপকারী। তাই নিয়মিত অ্যালোভেরার জুস পান করলে রক্তের প্লাটিলেটের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

পালং শাক

আয়রন ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের অন্যতম উৎস পালং। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এ ছাড়া শরীরে প্লাটিলেটের সংখ্যা বাড়াতে পারে।

ব্রোকলি

ভিটামিন ‘কে’– এর দারুণ উৎস ব্রোকলি, যা রক্তে প্লাটিলেট বাড়াতে সাহায্য করে। যদি দ্রুত কমতে থাকে, তবে প্রতিদিনকার খাবারে অবশ্যই ব্রোকলি যুক্ত করবেন। এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও নানা উপকারী খনিজ রয়েছে।

রসুন

উপকারী এই মসলা রক্ত পরিশুদ্ধ করে ও প্লাটিলেট বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, রসুনে থাকা থ্রম্বোক্সেন এ টু প্লাটিলেট বাড়ায়। প্রতিদিনের খাবারে তাই রসুন যুক্ত করুন। দুই তিন কোষ রসুন আলাদা করেও খেতে পারেন।

শিম

ভিটামিন বি নাইন সমৃদ্ধ শিম প্লাটিলেট উন্নত করতে পারে।

কিসমিস

কিসমিসে আছে প্রচুর আয়রন। শরীরে শক্তি যোগায় ও ব্লাড প্লাটিলেট স্বাভাবিক রাখে এটি। ওটমিল বা টক দইয়ের সাথে মিশিয়ে খেতে পারেন কিসমিস।

গাজর

দৃষ্টিশক্তি বাড়াতে উপকারী গাজর। পাশাপাশি রক্তের প্লাটিলেট বাড়ায় এটি। গাজরের জুস খেতে পারেন নিয়মিত। এছাড়া সালাদ বা স্যুপ হিসেবেও খেতে পারেন গাজর।

তিলের তেল

পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ভিটামিন ‘ই’ থাকে তিলের তেলে। এটি ব্লাড প্লাটিলেট বৃদ্ধির দারুণ এক ওষুধ হিসেবেও বিবেচিত।

ডালিম

ডালিমে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, যা রক্তের জন্য উপকারী। এ ছাড়াও ডালিম প্লাটিলেট কাউন্ট বজায় রাখতে সাহায্য করে এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন। এছাড়া ডালিমের রসে থাকা ভিটামিন শরীর দুর্বলতা দূরীকরণেও কাজ করে। তাই রোগীর রক্তে প্লাটিলেট বাড়াতে তাঁকে প্রত্যেকদিন ১৫০ মিলিলিটার পরিমাণ ডালিমের জুস খেতে দিন এবং এভাবে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত চালু রাখুন।

ডাবের পানি

ডেঙ্গু জ্বরের কারণে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। তাই শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে ডাবের পানি পান করলে উপকার পাওয়া যায়। এ ছাড়াও ডাবের পানিতে রয়েছে ইলেক্ট্রোলাইটসের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান।

পানি ও তরল খাবার

কারও ডেঙ্গু জ্বর হলে রোগীকে প্রতিদিন কমপক্ষে আড়াই থেকে তিন লিটার পানি পান করা উচিত। জ্বরের কারণে রোগীর শুধুমাত্র পানি পান করতে ইচ্ছা করে না। তাই দেহে পানির চাহিদা পূরণে রোগীকে বাড়িতে বানানো ফলের জুস ও ডাবের পানি পান করতে দিন।

বিভিন্ন প্রকার শাকসবজি

বিভিন্ন প্রকার সবুজ শাকসবজি যেমন গাজর, শস্য, টমেটো ইত্যাদি মিশিয়ে সবজি করে রোগীকে খাওয়ানো যেতে পারে। এসব সবজিতে পানির পরিমাণ বেশি থাকায় দেহে পানির অভাব দুর করতে সাহায্য করে। অন্যান্য সবজির মধ্যে ব্রকলি অন্যতম কারণ এতে ভিটামিন কে প্রচুর পরিমাণে থাকে। তাই প্রচুর পরিমাণে ব্রকলি খেলে তা ডেঙ্গুজনিত রক্তপাতের ঝুঁকি কমিয়ে আনতে সাহায্য করে।

ডেঙ্গুর লক্ষণসমূহ দেখা দেয়া মাত্রই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে রক্ত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হোন। প্রয়োজনে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। তার খাবার দাবারে বিশেষ সচেতন হতে হবে ও তাকে পর্যাপ্ত বিশ্রামে রাখতে হবে। এছাড়া নিয়মিত মশারি টানান, মশার প্রজনন স্থলগুলো ধ্বংস করা ইত্যাদির মাধ্যমে এ রোগটির বিস্তার রোধ করা সম্ভব।

(ঢাকাটাইমস/৩০ আগস্ট/আরজেড)

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :