যা ন্যায্য তাই বলি: ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ

সিরাজুম সালেকীন, ঢাকা টাইমস
| আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২৩, ১৩:০৬ | প্রকাশিত : ১৩ অক্টোবর ২০২৩, ১২:২২

জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেছেন, আমি বারবারই বর্তমান সরকারের পক্ষের লোক। তবে যা ন্যায্য ও সত্য তাই বলি।

সমসাময়িক বিষয় নিয়ে ঢাকা টাইমসের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।

রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য কলিমউল্লাহর কাছে প্রশ্ন ছিল তৃতীয় কোনো পক্ষ আসার সম্ভাবনা দেখছেন কি না? এসময় তিনি বলেন, ‘দুই বছর তিন উদ্দিন কাঁধে ভর করে বসে থাকল। বহু কষ্ট হয়েছে নামাতে। কী দাঁড়ায় ভবিষ্যতে কে জানে।’

সাবেক এই উপাচার্য কখনও ভোটাধিকার প্রয়োগ করেননি- ঢাকা টাইমসের সঙ্গে আলাপকালে এমনটিই জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি কখনো ভোট দিইনি। জাতীয় নির্বাচনেও কখনো ভোটাধিকার প্রয়োগ করিনি। কারণ, আমরা নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করি। নির্বাচন দিবসে, জনগণের স্বার্থে এই ত্যাগ স্বীকার করি।’

অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ দেশের একজন শিক্ষাবিদ। তিনি রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ উপাচার্য ছিলেন। এর বাইরেও তিনি জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি দেশের বর্তমান পেক্ষাপট নিয়ে বেশকিছু মন্তব্য করেন তিনি, যাতে সরকারের অনেকে মনে করেন, তিনি সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

বুধবার রাতে ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর সঙ্গে কথা বলে ঢাকা টাইমস। এসময় তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, বড় দুই দল তো তাদের অবস্থানে অনড়। এতে কি সামনে দেশের পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে যাবে? তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিরোধী রাজনীতিতে জড়িতদের গ্রেপ্তার শুরু করেছে।

এসময় অধ্যাপক কলিমউল্লাহ বলেন, ‘বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ এখন যে অবস্থানে আছে এবং রাষ্ট্রের চরিত্রের কারণে এখন কোনো সংঘাতকে কেউ সমর্থন দেয় না। মানে সংঘাত afford করার জন্য যে apatite দরকার সেটা নেই। যতই আমরা বলি তালগাছ আমার; শেষ পর্যন্ত সব পক্ষ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সম্মান রেখে একটা আপস বা সমঝোতায় উপনীত হবেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের গ্রেড-১ অধ্যাপক ড. কলিমউল্লাহ। তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০০৭ সালে অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণপদক এবং ২০১১ সালে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের লেজিসলেটিভ ফেলোশিপ অর্জন করেন। আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মিশর, মোজাম্বিক, জাম্বিয়া, নাইজেরিয়া, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, পাকিস্তান ও হংকংসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালন করেন।

ভিসানীতি দেশের রাজনীতি বা ভোটের মাঠে কোনো প্রভাব ফেলবে কি না জানতে চাইলে ড. কলিমউল্লাহ বলেন, ‘মার্কিন ভিসানীতি একটা ইউনিক ইনোভেশন (অনন্য উদ্ভাবন)। তারা বিশ্ব পরাশক্তি। উন্মুক্ত বিশ্বের ভবিষ্যৎ। যথেষ্ট হোমওয়ার্ক করেই তারা এই নীতিতে আস্থা রেখেছেন। বাংলাদেশে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। রাইতে শালুক ফোটে বলে না? এটা খুব স্লোলি বাট শিওরলি ফুটবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর এটার যে ইমপ্যাক্ট বা প্রভাব সেটা অনুভূত হতে থাকবে।’

তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বৈশ্বিক দুর্নীতি দমনবিষয়ক সমন্বয়ক রিচার্ড নেফিউ বাংলাদেশে এসে সোজা চলে গেছেন দুদকে। সেখানে খাতা মিলিয়ে দেখেছেন। এরপর চলে গেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে। সেখানে কথা বলে দুজন একসঙ্গে গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, স্যাংশন (মার্কিন নিষেধাজ্ঞা) হতে পারে দুর্নীতি দমনে একটা ভালো হাতিয়ার। রিচার্ড নেফিউ দেশে ফিরে গেলেন, এরপর আমরা জানলাম এফবিআই বাংলাদেশের দশ ধনকুবেরের (বাংলাদেশি আমেরিকান) আয়ের উৎস কোথায় জানতে চাইছে। এই যে আমেরিকায় আপনি বিশাল ধনসম্পদ করলেন বাংলাদেশ থেকে এনে। সেটা কী নিয়ম মেনে এনেছেন? নাকি আইন ভঙ্গ করেছেন? এসব করে মার্কিন সরকার মিস্টার মিত্রকে (সাবেক খাদ্যসচিব বরুণ দেব মিত্র) আলোর নিচে এনেছে। তিনি আঠারো মাসের আগাম বেতন নিয়ে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে চলে গেছেন আমেরিকায়। মিত্র বলছেন, এগুলো তার স্ত্রীর সম্পত্তি। মার্কিন নীতির উদাহরণ হিসেবে একজনকে দিয়ে কেসস্ট্যাডি পাওয়া গেল। এমন আরও অনেক লোকের ভীত কম্পন শুরু হয়ে গেছে। এটার একটা ইমপ্যাক্ট পড়বে।’

ড. কলিমউল্লাহ বলেন, ‘সম্প্রতি একটা শো-তে একজন গেস্ট বলছিলেন, ‘১৭ কোটি লোকের মধ্যে একশ-দুইশ, এক হাজার-দুই হাজার লোকের ওপর স্যাংশন হবে তারা ভোটের হিসেবে কয়জন? আসলে মার্কিনিরা তো যারা এমপ্লয়ারস তাদের টার্গেট করেছে। একজন এন্টারপ্রেইনার যার অধীনে এক লাখ লোক কাজ করে। এ ধরনের লোকের কারণে যখন লাখ লাখ মানুষ বেকার হয়ে যাবে তখন তো বেকায়দা দেখা যাবে।’

অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর বিভিন্ন বিষয়ে দেড় ডজনের বেশি গ্রন্থ এবং দেশি-বিদেশি জার্নালে অসংখ্য গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

এই শিক্ষাবিদের কাছে প্রশ্ন ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন মহলের ব্যক্তিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে, এমন চিন্তা অনেকের মধ্যে। এর প্রভাবটা কেমন হবে?

ড. কলিমউল্লাহ বলেন, ‘ভয়ে দুই ধরনের কাজ হয়। একটা হলো- কেউ পেটের মধ্যে ঢুকে যেতে চায়। আরেকটা হলো- পরোয়া করি না, যা আসে আসুক।’ আমাদের পুলিশপ্রধান তিনি স্যাংশনপ্রাপ্ত সেটা সবাই জানেন। দেশরত্ন শেখ হাসিনা বিষয়টি কি পরোয়া করেছেন? যখন বিষয়টি অবহিত হয়েছেন, তখন র‌্যাব ডিজির দায়িত্বে থাকা চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে আইজিপি করেছেন। তারপর চুক্তিভিত্তিক বা চাকরির মেয়াদ বাড়িয়েছেন। আবার প্রমোশন দিয়ে সিনিয়র সচিব পদমর্যাদা দিয়ে দিয়েছেন। ফলে সরকারপ্রধান উদাহরণ দিতে চেয়েছেন, স্যাংশন হয়েছে তাতে কি? আপনার জন্য তো আরও উপকার হলো। আপনাকে আরও শক্তিশালী করে দিলাম।’

তার মানে কী যাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আসবে তাদেরকে শক্তিশালী করে দিলে লাভ হবে আমাদের? এমন প্রশ্নে নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, ‘এটা তো ভাবছে না। সাময়িকভাবে করছে।’

তৃতীয় কোনো পক্ষ আসার সম্ভাবনা দেখছেন কি না- জানতে চাইলে ড. কলিমউল্লাহ বলেন, ‘তৃতীয় পক্ষ বলে তো কিছু নাই। বিষয়টি হলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। মনে আছে, দুই-দুইটা বছর ফখরুদ্দিন, মঈনুদ্দিন, ইয়াজউদ্দিন কাঁধে ভর করে বসে থাকল। বহু কষ্ট হয়েছে নামাতে। কী দাঁড়ায় ভবিষ্যতে কে জানে।’

দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি। মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। কিন্তু সরকার তেমন কিছুই করতে পারছে না- এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কলিমউল্লাহ বলেন, ‘সরকারকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। বিদ্যুৎ ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছিল, অফিসের সময় ছোট্ট করে আনা হয়েছিল, কেন? কৃচ্ছসাধন করতে। ইউক্রেন যুদ্ধ বাধ্য করেছে সব জিনিসের দাম বাড়াতে। যত উন্নয়ন প্রকল্প নেয়া হয়েছে তাতে তো সরকারের ভান্ডারে ঘাটতি আছে। উন্নয়ন হয়েছে কিন্তু সুনিপুণ করতে ক্রাইসিস, তারপর ভান্ডার শেষ হয়েছে।’

বলা হচ্ছে আপনি সব সময় সরকারের পক্ষে থেকেছেন। কিন্তু হঠাৎ বিরুদ্ধাচরণ করা শুরু করেছেন। এটার কীভাবে ব্যাখা করবেন?

এই প্রশ্নে নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বক্তব্য, আমি বারবারই সরকারের পক্ষে। আমি কখনও ভোট দিইনি। জাতীয় নির্বাচনে কখনও ভোটাধিকার প্রয়োগ করিনি। কারণ আমরা নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করি। নির্বাচন দিবসে, জনগণের স্বার্থে এই ত্যাগ স্বীকার করি। আমি যা সত্য তাই বলি।’

সর্বশেষ প্রশ্ন ছিল, সরকার কী করলে শান্তিপূর্ণভাবে একটা সমাধান আসবে বলে মনে করেন?

জবাবে অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন তো নিশ্চিত করেছে রাতের ভোট দিনেই হবে। রাতে হবে না। সকাল বেলা তারা ব্যালটপেপার কেন্দ্রে হাজির করে দেবেন। ভিন্ন কিছু হওয়ার সুযোগ নেই। দিন শেষে আমরা তো এই দেশের নাগরিক। সব সংকট শেষ মুহূর্তে হলেও উতরে গেছে। দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে যত মেঘ জমেছে আকাশে তা দূরীভূত হয়ে যাবে।’

(ঢাকাটাইমস/১৩অক্টোবর/এসএস/এফএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সাক্ষাৎকার এর সর্বশেষ

ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে কিছু জঙ্গি সংগঠন মাথাচাড়া দিতে চায়

আধুনিক মানের যাত্রীসেবা নিশ্চিতে কাজ করছে বেবিচক

গণতন্ত্রের স্বার্থে সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা প্রয়োজন: ড. রাশেদা রওনক খান

বিগত সংসদের সঙ্গে এই সংসদের তুলনা হবে না: আরেফিন সিদ্দিক

ঢাকায় ক্র্যাকডাউনের খবর শুনে আমরা বিদ্রোহ করি

ভোগের নয়, ত্যাগের রাজনীতি করতে চাই: আদনান রনি

আমি মনে করি নদী খেকো ও বালু খেকোদের বিজয় হয়েছে: ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী

বাংলাদেশ নিয়ে পশ্চিমাদের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে দ্বিমুখী ও পরস্পরবিরোধী

একটি ব্যাংককে পথে বসাতে খেলাপি ঋণই যথেষ্ট: মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ

‘পরিবহন সেবায় জনগণের অন্তরে স্থান পেয়েছে বিআরটিসি’

এই বিভাগের সব খবর

শিরোনাম :