ভালোবাসা হোক প্রতিদিনের, অকৃত্রিম ও নিঃস্বার্থ

ফিচার ডেস্ক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:০২ | প্রকাশিত : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:২৫

শীতের কুয়াশার চাদরে মোড়ানো সকাল পেরিয়ে বাতাসে লেগেছে বসন্তের ছোঁয়া। বসন্ত আগমনের আগেই অবশ্য চলে আসে ভ্যালেন্টাইনস ডে। বিশ্বজুড়ে এই সময়ে ভালোবাসা উদযাপনে মেতে ওঠেন বহু মানুষ।

মূলত ভালোবাসা শব্দটি পবিত্র। ভালোবাসা এমন এক অনুভূতি, যা মানুষের মনের গহিনে প্রবাহমান থাকে। পরস্পরের মধ্যে প্রীতি স্থাপনের জন্য সৃষ্টিকর্তা প্রতিটি প্রাণীর মধ্যেই ভালোবাসা তৈরি করে দিয়েছেন। ভালোবাসা একটি মানবিক অনুভূতি এবং আবেগকেন্দ্রিক একটি অভিজ্ঞতা। বিশেষ কোন মানুষের জন্য স্নেহের শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে ভালোবাসা। ভালোবাসাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাগ করা যায়। যেমন একজন মায়ের ভালোবাসা একজন সঙ্গীর ভালোবাসা থেকে আলাদা, যা আবার খাবারের প্রতি ভালোবাসা থেকে ভিন্ন। সাধারণত, ভালোবাসা বলতে একটি তীব্র আকর্ষণ এবং মানসিক সংযুক্তির অনুভূতিকে বোঝায়।

বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান ভালোবাসাকে টিকে থাকার হাতিয়ার হিসেবে দেখায়। মানুষসহ অন্যান্য স্তন্যপায়ী তাদের জীবনকালের দীর্ঘ সময় পিতামাতার সাহায্যের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। এই সময়ে ভালোবাসা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভালোবাসার কারণেই শ্রদ্ধাময়ী মা গর্ভে সন্তান ধারণ করেন। পিতা কঠোর পরিশ্রম করে সন্তানকে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। ভালোবাসার কারণেই বনজঙ্গলের হিংস্র প্রাণীগুলোও স্বজাতিদের নিয়ে একসঙ্গে বসবাস করে। ভালোবাসা সৃষ্টিকর্তার মহান দান। সৃষ্টি জগতের প্রতি ভালোবাসার টান হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে ভালোবাসার জন্য কোনো ক্ষণ, দিবস-রজনীর প্রয়োজন নেই। নির্দিষ্ট নেই বা প্রয়োজনও হয় না।

প্রাচীন গ্রীক দার্শনিকরা ভালোবাসার ছয়টি রূপ শনাক্ত করেছিলেন: যেগুলো মূলত, পারিবারিক ভালোবাসা (গ্রিক: স্টার্জে), বন্ধুত্বপূর্ণ ভালোবাসা বা প্লেটোনিক ভালোবাসা (ফিলিয়া), রোমান্টিক ভালোবাসা (ইরোস), নিজেকে-ভালোবাসা (ফিলাউটিয়া), অতিথিকে ভালোবাসা (জেনিয়া) এবং ঐশ্বরিক বা নিঃশর্ত ভালোবাসা (আগাপে)। আধুনিক লেখকগণ ভালোবাসার আরও কিছু বৈচিত্র্য শনাক্ত করেছেন; যেমন: প্রতিদানহীন ভালোবাসা, শূন্য ভালোবাসা, মুগ্ধ ভালোবাসা, পরিপূর্ণ ভালোবাসা, দরদী ভালোবাসা, আত্মভালোবাসা এবং সৌজন্যমূলক ভালোবাসা। এছাড়াও বিভিন্ন সংস্কৃতিতে রেন, ইউয়ানফেন, মামিহলাপিনাতাপাই, কাফুনে, কামা, ভক্তি, মৈত্রী, ইশক, চেসেড, আমোর, চ্যারিটি, সওদাদের মতো সাংস্কৃতিকভাবে অনন্য শব্দসমূহ ভালোবাসার সংজ্ঞা হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

গত দুই দশকে আবেগের উপর বৈজ্ঞানিক গবেষণা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভালোবাসার রঙ চাকা তত্ত্ব থেকে তিনটি প্রাথমিক, তিনটি মাধ্যমিক এবং নয়টি তৃতীয় স্তরের ভালোবাসার পরিচয় পাওয়া যায়, যেগুলোকে একটি রঙের চাকায় বর্ণনা করা হয়। ভালোবাসার ত্রিভুজ তত্ত্ব পরামর্শ দেয় "ঘনিষ্ঠতা, আবেগ এবং প্রতিশ্রুতি" ভালোবাসার মূল উপাদান। ভালোবাসার অতিরিক্ত ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক অর্থ রয়েছে। ব্যবহার এবং অর্থের এই বৈচিত্র্য এর সাথে জড়িত অনুভূতিগুলোর জটিলতার সাথে মিলিত হয়ে অন্যান্য মানসিক অবস্থার তুলনায় ভালোবাসাকে সংজ্ঞায়িত করা অস্বাভাবিকভাবে কঠিন করে তোলে।

অন্যদিকে ভালোবাসার জৈবিক ভিত্তি হলো কামনা, আকর্ষণ এবং সংযুক্তির উপর। কামনা হল যৌন বাসনা পূরণ করার জন্য এক ধরনের অনুভূতি। রোমান্টিক আকর্ষণ মূলত নির্ধারণ করে কোন ব্যক্তির সঙ্গী কতটা আকর্ষণীয় তার উপর। তাছাড়া আরও কিছু বিষয় আছে, যেমন, একই সাথে একটি বাড়িতে অবস্থান করা, পিতামাতার প্রতি কর্তব্য, পারস্পরিক প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনুভূতিগুলিও জড়িত থাকে। এই তিনটি রোমান্টিক শৈলীগুলির সাথে নিউরাল সার্কিটগুলি, নিউরোট্রান্সমিটার এবং তিনটি আচরণগত নিদর্শন সংযুক্ত সব সময় কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

কামনা হল যৌন বাসনার প্রাথমিক ধাপ যা টেস্টোস্টেরন এবং এস্ট্রোজেনের মতো রাসায়নিক পদার্থ বর্ধিত ত্যাগ করে। এর প্রভাব কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়। আকর্ষণ আরও স্বতন্ত্র এবং রোমান্টিক হয় একটি নির্দিষ্ট সঙ্গীর জন্য, যার মাধ্যমে একটি স্বতন্ত্র লালসা বিকশিত হয়।

স্নায়ুবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, মানুষ মূলত প্রেমে পড়ে যখন তার মস্তিষ্ক নিয়মিত একটি নির্দিষ্ট সেটের রাসায়নিক পদার্থ ত্যাগ করে। উদাহরণস্বরূপ, নিউরোট্রান্সমিটার হরমোন, ডোপামিন, নোরপাইনফ্রাইন, এবং সেরোটোনিন এর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। অ্যামফিটামিন এক ধরনের পদার্থ ত্যাগ করে যার ফলে মস্তিষ্কের কেন্দ্রীয় অংশ সক্রিয় হয়ে ওঠে, হৃৎস্পন্দনের হার বৃদ্ধি পায়, ক্ষুধা এবং ঘুম হ্রাস পায়, এবং উত্তেজনা বেড়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই পর্যায় সাধারণত দেড় থেকে তিন বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

কামনা এবং আকর্ষণ এর পর্যায়গুলিকে অস্থায়ী বলে মনে করা হয়, তাই দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের জন্য একটি তৃতীয় পর্যায় প্রয়োজন। সংযুক্তি হল এক ধরনের বন্ধন যার কারণে সম্পর্ক অনেক বছর এমনকি কয়েক দশক পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সংযুক্তি সাধারণভাবে বিবাহ বা শিশু জন্মদান করার মত অঙ্গীকারগুলির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। তাছাড়া পারস্পরিক বন্ধুত্ব বা পছন্দের বিষয়গুলি ভাগ করে নেয়ার কারণেও সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে যে স্বল্পমেয়াদী সম্পর্কের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ক্ষেত্র বেশি পরিমাণে রাসায়নিক অক্সিটোসিন এবং ভ্যাসোপ্রেসিন নির্গত হয়। দেখা যায়, প্রোস্টেট অণুটি স্নায়ু বৃদ্ধিকারক ফ্যাক্টর (এনজিএফ) নামে পরিচিত, যখন লোকেরা প্রথম প্রেমে পড়ে তখন তার মাত্রা অনেক বেশি থাকে, কিন্তু এক বছর পর তারা আবার পূর্ববর্তী স্তরে ফিরে আসে।

কিন্তু ১৪ ফেব্রুয়ারিই কেন ভালোবাসা দিবস? ভালোবাসার সঙ্গে ভ্যালেন্টাইনের সম্পর্কই বা কী? ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যাবে রক্তাক্ত এক ইতিহাস বহন করছে ভ্যালেন্টাইনস ডে দিনটি। ভ্যালেন্টাইনস ডের সূচনা হয় প্রায় ১৭শ বছর আগে পৌত্তলিক রোমকদের মাঝে প্রচলিত ‘আধ্যাত্মিক ভালোবাসা’র মধ্য দিয়ে। ২৬৯ সালে ইতালির রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামে একজন খ্রিস্টান পাদ্রী ও চিকিৎসক বসবাস করতেন। আর সেই সময় রোমে নিষিদ্ধ ছিল খ্রিস্ট ধর্মের প্রচার। রাজার আদেশ অমান্য করেই খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারের কাজে নামেন সেন্ট ভ্যালেন্টাইন।

কিন্তু রোমের সিংহাসনে বসা সম্রাট ক্লডিয়াস তা মেনে নিতে পারেননি। ক্লডিয়াস বিশ্বাস করতেন যে, প্রেম, বিয়ে ইত্যাদি করলে পুরুষের শক্তি এবং বুদ্ধি কমে যায়। তার কর্মচারি কিংবা সৈন্য সকলেরই নিষেধ ছিল বিয়ে কিংবা সম্পর্কে জড়ানো। সেই সময়ের রোমে খ্রিস্টধর্মের প্রচারও নিষিদ্ধ করেন সম্রাট। কিন্তু নিয়মের রাজত্বে কেউ কেউ থাকেন নিয়ম ভাঙার জন্যই। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন রাজার এই আদেশের বিরোধিতা করলেন সোচ্চারে। স্বভাবতই রাজদ্রোহের দায়ে কারাবন্দি হলেন ক্লডিয়াস। কিন্তু বন্দি জীবনেও মানুষের সেবা তাকে ফের জনপ্রিয় করে তুলল। কারাগারে থাকাকালীন এক মহিলাকে চিকিৎসা করে তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন পেশায় ডাক্তার ভ্যালেন্টাইন। ফের রাজার রোষানলে পড়েন তিনি। ফলে ১৪ ফেব্রুয়ারি তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেন নির্দয় সম্রাট ক্লডিয়াস। সেই সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের স্মরণেই আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হয় 'ভ্যালেন্টাইনস ডে'।

তবে ভ্যালেন্টাইনস ডে উদযাপনের শুরু ইউরোপ থেকেই। লুপারকেলিয়া নামে এক আঞ্চলিক উৎসবের প্রচলন ছিল রোমে। এটি ফেব্রুয়ারি মাসের ১৪-১৫ তারিখ নাগাদ অনুষ্ঠিত হত৷ লুপারকেলিয়া উৎসবটিকে বসন্তের আগমন হিসেবেই ধরা হত ৷ এই অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে একটি বক্স থেকে কোনও ছেলে বা মেয়েকে একটি নাম লেখা কাগজ তুলতে হত ৷ এই ভাবেই একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতেন ছেলে-মেয়ের দল। এমনকি তারা বিয়েও করতেন ৷ কালক্রমে এই উৎসব আর সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের আত্মত্যাগ মিলেমিশে আজকের ভ্যালেন্টাইনস ডে’র রূপ পেয়েছে। তবে ভালোবাসা হোক প্রতিদিনের, অকৃত্রিম ও নি:স্বার্থ। বেঁচে থাকুক যুগ যুগ ধরে নি:স্বার্থ ভালোবাসার অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে।

(ঢাকাটাইমস/১৪ ফেব্রুয়ারি/আরজেড)

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ফিচার এর সর্বশেষ

এই বিভাগের সব খবর

শিরোনাম :