ভারসাম্যের কূটনীতি: শেখ হাসিনার ভারত ও চীন সফর

ড. অরুণ কুমার গোস্বামী
| আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৪, ১২:০৬ | প্রকাশিত : ০৭ জুলাই ২০২৪, ১১:৫৪

এই মূহুর্তে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে ‘ভারসাম্যের কূটনীতি’। নিজ দেশের প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষণ নেতৃত্বে ‘ভারসাম্যের কূটনীতি’ একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভারত সরকারের আমন্ত্রণে জুন (২০২৪) মাসে প্রধানমন্ত্রীর দুইবার ভারত সফর এবং জুলাই মাসে চীন সফরকে ঘিরে এই আলোচনার দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে। ইতঃপূর্বে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু ঢাকা সফরে এসে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে বর্তমান সরকারের সম্পর্ক উন্নয়ন ও স্থায়ী করার বার্তা দেওয়ার সময়েও ‘ভারসাম্যের কূটনীতি’র বিষয়টি আলোচনার পাদপ্রদীপে এসেছিল। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তথা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘ভারসাম্য’ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডে ‘ভারসাম্য’ শব্দটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘ক্ষমতার ভারসাম্য’ শব্দটির ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা প্রদর্শন করে। ‘ক্ষমতার ভারসাম্য’ শব্দটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক তত্ত্বের একটি ধারণা হিসেবে বোঝায়- যা দ্বারা একটি সিস্টেমে বিভিন্ন জাতি তথা কর্মক বা অ্যাক্টরদের মধ্যে ক্ষমতার বিস্তরণ বোঝায়। আন্তর্জাতিক রাজনীতির মার্কিন পণ্ডিত জর্জ এফ. কেনন (১৯৫০)-এর মতে, ‘ক্ষমতার ভারসাম্যের’ ধারণার মূল লক্ষ্য হচ্ছে একটি ‘স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’ সংরক্ষণ করা। কূটনৈতিক ক্ষেত্রে ‘ভারসাম্য’পূর্ণ নীতির ফলে যুদ্ধের আশঙ্কা দূরীভূত হয়ে স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ সুগম করে। গবেষক অ্যাডাম এম কোলি (২০২৪) তার একটি নিবন্ধে বলছেন, ক্ষমতার মূল ভারসাম্যের দ্বারা এমনভাবে জাতিগুলির মধ্যে ক্ষমতার বণ্টনের ব্যবস্থা করা হয় যা কোনো একটি সত্তাকে অপ্রতিরোধ্যভাবে প্রভাবশালী হতে বাধা দেয়। একবিংশ শতাব্দীর যুগে উদীয়মান শক্তির ভারসাম্য রক্ষার জন্য কৌশলগত জোট এবং অংশীদারিত্বের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত এবং অস্ট্রেলিয়া নিয়ে ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত জোট কোয়াড্রালেটারাল সিকিউিরিটি ডায়ালগ (কোয়াড) এবং এর বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে চীন কর্তৃক ঘোষিত বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) একটি অংশীদারিত্বমূলক উদ্যোগ ।

স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা চালিয়েছে। ১৯৭২ সালে জাতিরপিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের সংবিধান দ্রুত প্রণয়ন করা হয়। এই সংবিধানের ২৭-৪৪ অনুচ্ছেদে ১৮টি মৌলিক মানবিক ও নাগরিক অধিকারের স্বীকৃতি ও সংরক্ষণের সুস্পষ্ট সুরক্ষা তুলে ধরা হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রবর্তিত 'সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়' ভিত্তিক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে জাতীয় সার্বভৌমত্ব, শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তি এবং বিশ্বব্যাপী নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর প্রতি সমর্থনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। জাতিরপিতার প্রদর্শিত পথেই তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা বিশ্ব দরবারে পরস্পর বিরোধী শক্তিগুলোর সাথে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের স্বার্থে সুসম্পর্ক বজায় রেখে ‘ভারসাম্যপূর্ণ’ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির মতো বাংলাদেশও তার অবকাঠামো সম্প্রসারণে আগ্রহী। তবে বাংলাদেশ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত অর্থায়ন পায় না। প্রসঙ্গক্রমে পদ্মা সেতু থেকে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন প্রত্যাহারের বিষয়টি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যুক্তিযুক্ত। এর ফলে দেশটি বিআরআইয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বাংলাদেশ ২০১৬ সালে বিআরআইয়ের সদস্য হয় এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইজিংয়ের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের পর থেকে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক অনেক দূর এগিয়েছে। তবে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম বছরগুলিতে চীনের সাথে দেশটির সম্পর্কের ‘টানাপোড়েন’ ছিল। স্নায়ুযুদ্ধ ও এ অঞ্চলের ভূ-রাজনীতির ফলে চীন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানকে শুধু সমর্থনই দেয়নি, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানকারী সর্বশেষ দেশগুলোর মধ্যে চীন ছিল অন্যতম। চীন তখন এমনকি জাতিসংঘের সদস্য হওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রচেষ্টায় ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করেছিল। এরপর ১৯৭৬ সাল থেকে ঢাকার সাথে বেইজিংয়ের সম্পর্ক নতুনভাবে যাত্রা শুরু করেছিল। তবে এখানে অপরিহার্যভাবেই উল্লেখ করা যেতে পারে যে, চীনের বিআরআই প্রকল্পের সাথে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা পাকিস্তানের মতো গভীর নয়, সুধা রামচন্দ্রনের মতে, ‘ঢাকার জন্য এক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা বলে কিছু নেই’। দ্য ডিপ্লোম্যাটে লেখা এক নিবন্ধে সুধা রামচন্দ্রন উল্লেখ করছেন, ‘চীনারা বাংলাদেশে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তার কোনোটিরই কৌশলগত প্রভাব নেই।’ বিআরআই নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান নিজ দেশের অর্থনীতির স্বার্থে এবং তা ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের সাথে দেশটির সম্পর্কের সাথে ভারসাম্য বজায় রেখে করা হচ্ছে। বিআরআই-এর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল অর্থনৈতিক শর্তাবলির উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ এমন প্রকল্প প্রত্যাখ্যান করেছে যা অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়। উদাহরণস্বরূপ, মাতারবাড়িতে জাপানের প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের নিকটবর্তী অবস্থানের কারণে চীনের প্রস্তাবিত বন্দরটি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে বুঝতে পেরে বাংলাদেশ সোনাদিয়ায় চীনা প্রকল্পটি বাতিল করে দেয়। শুধুমাত্র ‘অর্থনৈতিক-কেন্দ্রিক’ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ঢাকার পক্ষে চীনা উদ্যোগের মূল ক্ষতিগুলো এড়িয়ে যাওয়া অনেকাংশে সম্ভব হয়েছে। “হাউ বাংলাদেশ লার্নড টু লাভ দ্য বেল্ট এন্ড রোড; ঢাকা হ্যাজ লার্জলি এভয়ডেড দ্য মেজর পিটফলস অব চায়না’স ইনিশিয়েটিভ হোয়াইল এমব্রেছিং দ্যা গেইন্স” নিবন্ধে সুধা রামচন্দ্রন বলছেন, চীনা বিনিয়োগকে বাংলাদেশের কাছে যা আকর্ষণীয় করে তুলেছে তা হলো বেইজিং ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে অর্থায়ন করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। পশ্চিমা তহবিলদাতারা অতীতে এ জাতীয় বেশ কয়েকটি প্রকল্পে অর্থায়ন করতে অস্বীকার করেছিল।

উদাহরণস্বরূপ, প্যারিসভিত্তিক বহুজাতিক সর্বজনীন ব্যাংক এবং আর্থিক পরিষেবা হোল্ডিং কোম্পানি বিএনপি পরিবাস এবং নরওয়েজিয়ান সরকারের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল পরিবেশগত কারণে খুলনায় রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়ন করতে অস্বীকার করেছিল।

উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতির ভুয়া অভিযোগ এনে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পে ১২০ কোটি ডলার ঋণ বাতিল করেছিল বিশ্বব্যাংক। বিপরীতে চীন এসব প্রকল্পে সহায়তা দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশ বিআরআইকে তার অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে দেখছে। প্রকৃতপক্ষে, ঋণের ফাঁদে পড়া অন্য বিআরআই সদস্য দেশগুলোর বিপরীতে বাংলাদেশ একটি সতর্ক ঋণগ্রহীতা।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম, সেহেতু বাংলাদেশও এ সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায়। অন্যদিকে ভারত, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গেও চলমান উষ্ণ সম্পর্ক ধরে রাখতে চায় সরকার। তার অংশ হিসেবে এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিবেশী দেশ ভারত সফর করেছেন এবং জুলাই মাসে চীন সফরে যাচ্ছেন। ফলে পশ্চিমা এবং এশিয়ার শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যমূলক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ (নেইবারহুড ফার্স্ট) নীতির বাহ্যিক প্রকাশ হিসেবে হাতে গোনা কয়েকটি রাষ্ট্রের প্রধান বা সরকারপ্রধানকে নরেন্দ্র মোদির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ১০ই জুন ২০২৪ তারিখে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্রীয় সফরে ২১শে জুন বিকালে দিল্লিতে পৌঁছান। ২২শে জুন সফরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বিকালেই ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। সবদিক থেকে এটি একটি কমপ্যাক্ট সফর হিসেবে আখ্যায়িত করেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। রাষ্ট্রীয় সফরের সবগুলো উপাদান এখানেও ছিল কিন্তু সময় খুব কম, ২৪ ঘণ্টা বা তার বেশি এবং সে কারণে এটি ছিল একটি কমপ্যাক্ট সফর।

ভারত সফর শেষ করার দুই সপ্তাহ পর আগামীকাল ৮ই জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীনে যাচ্ছেন। প্রায় এক দশক পর দ্বিপক্ষীয় এই রাষ্ট্রীয় সফরে অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি রাজনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বেইজিং। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরের আগে গত শনিবার ঢাকায় এসেছেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লি জিয়ানছাও। এ উদ্দেশ্যে চীন সফর করেছেন আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের এক প্রতিনিধিদল।

ভারত সফর নিয়ে ২৫শে জুন মঙ্গলবার গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতকে দুঃসময়ের বন্ধু হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি, চীন থেকে শেখার আছে বলে উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কেউ মনে করল এদিকে ঝুঁকলাম না কি ওদিকে ঝুঁকলাম। আমি সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখে দেশের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি।’

ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্যের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের উন্নয়নে কার সঙ্গে কতটুকু বন্ধুত্ব দরকার, সেটা করে যাচ্ছে সরকার। সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়- বাংলাদেশের এমন পররাষ্ট্রনীতির বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেন। বলেন, ‘ভারত আমাদের চরম দুঃসময়ের বন্ধু। আবার চীন যেভাবে নিজেদের উন্নত করেছে, সেখান থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। সেগুলো সামনে রেখে সম্পর্ক বজায় রেখে যাচ্ছি। আমি সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখে দেশের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। এটা নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘চীন আমাকে দাওয়াত দিয়েছে, আমি চীনে যাব। আমি যাব না কেন? বাংলাদেশ সার্বভৌম দেশ। সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব নিয়েই চলব। কার কী ঝগড়া, সেটা তাদের সঙ্গে থাক। আমার না। দেশের মানুষের কতটুকু উন্নতি করতে পারি, সেটাই আমার।’

তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য চীন ও ভারত উভয় দেশ প্রস্তাব দিয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অবশ্যই আমি বিবেচনা করব কোন প্রস্তাবটা দেশের মানুষের কল্যাণে আসবে, আমি সেটাই করব। কোন প্রস্তাব নিলে আমি ঋণ কতটুকু নিলাম, শোধ করলাম, দিতে কতটুকু পারব। সবকিছু বিবেচনা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে ভারত যখন বলছে তারা করতে চায় এবং টেকনিক্যাল গ্রুপ পাঠাবে, অবশ্যই তারা আসবে। আমরা যৌথভাবে সেটা দেখব। চীনও একটা সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে। ভারতও একটা করবে। যেটা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য, লাভজনক-সেটাই করব।’ একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারত যদি প্রকল্পটা করে দেয়, তাহলে সব সমস্যার সমাধানই হয়ে যায়। ভারতের সঙ্গে যদি তিস্তা প্রকল্পটা করা হয়, তাহলে পানি নিয়ে আর সমস্যা থাকে না।

তবে, সম্প্রতি দক্ষিণ চীন সাগর এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের প্রভাব লক্ষণীয়ভাবে বেড়ে চলেছে, যা পশ্চিমা বিশ্ব ও এশিয়া-প্যাসিফিক দেশগুলোর জন্য চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত চীনের এই দ্রুতগতির প্রভাববিস্তারকে ঠেকাতেই যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও জাপানের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কোয়াডের আবির্ভাব। কোয়াডের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব রোধ করা, যা স্বাভাবিকভাবেই কৌশলগত বৈসাদৃশ্যের সূচনা ঘটাবে এবং পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে চীনও তার আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। কোয়াডের ব্যাপারে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে যায় সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার মাধ্যমে। ‘কোয়াডে যোগ দিলে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে’ সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদমাধ্যমে ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের এমন প্রকাশ্য মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ এ ধরনের মন্তব্যকে ‘আগ বাড়িয়ে দেওয়া’ হিসেবে আখায়িত করেছে। এরপরেই আবার ঢাকার চীনা দূতাবাসের পক্ষ থেকে মন্তব্যটিকে ‘ভাষাগত সমস্যা’ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যদিও চীন কোয়াডের বিরুদ্ধে তাদের কঠোর মনোভাব সেদিনও ব্যক্ত করেছে।

উপরের ঘটনা ছাড়াও ‘ইন্দো-প্যাসিফিক রূপরেখা’ ঘোষণা এ সম্পর্কে বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বার্থে ‘ভারসাম্যের কূটনীতি’ বজায় রাখতে সহায়ক প্রচেষ্টা। বাংলাদেশ ২০২৩ সালের ২৪শে এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে তার 'ইন্দো-প্যাসিফিক রূপরেখা' ঘোষণা করেছে। রূপরেখায় বলা হয়েছে, বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে একটি আধুনিক, জ্ঞানভিত্তিক উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য রাখে। এক্ষেত্রে, দেশের ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়নে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এবং সমৃদ্ধিকে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক’ হিসেবে বিবেচনা করে।

ভারত সফরের পর চীন সফরে যাওয়া, এর আগে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক রূপরেখা’ ঘোষণা, সতর্কতার সাথে চীনের বিআরআই এর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক বজায় রাখা এসবই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক অনুসৃত ভারসাম্যের কূটনীতি হিসেবে কূটনৈতিক মহলে প্রশংসিত হচ্ছে। ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, যোগাযোগ ও কৌশলগত দিক দিয়ে বাংলাদেশ আজ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেছে। এ কারণেই বাংলাদেশকে সব রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হয়। যেকোনো আত্মমর্যাদাশীল দেশের মতো বাংলাদেশ নিজেদের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্র বিষয়ে কর্মপন্থা নির্ধারণে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। এ পথে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত 'সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়' নীতিটি মৌলিক ভিত্তি হিসেবে নিরন্তন প্রেরণার উৎস।

ড. অরুণ কুমার গোস্বামী: কলামিস্ট, প্রফেসর, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যলয় ও পরিচালক, সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ, ঢাকা

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :