দিনাজপুরে শঙ্খধ্বনিতে মুখর ঢেপা নদী, নৌযাত্রায় কান্তজিউ বিগ্রহ

একদিকে ভোরের কোমল আলো, অন্যদিকে শঙ্খ ও ঘণ্টার ধ্বনি সব মিলিয়ে কাহারোলের কান্তনগর মন্দিরে তখন এক পবিত্র আবহ। কীর্তনের সুরে মুখর মন্দির প্রাঙ্গণ। পূজা-অর্চনা শেষে ভক্তদের সঙ্গে নিয়ে ঢেপা নদীর কান্তনগর ঘাটের পথে এগিয়ে চলেছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আরেক রূপ ‘কান্তজিউ বিগ্রহ’। কারও হাতে ফুল, কারও হাতে প্রদীপ; সবার চোখে-মুখে ভক্তি আর প্রার্থনা। নদীর তীরে পৌঁছানোর পর সেই আধ্যাত্মিক দৃশ্য যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে।
প্রথা অনুযায়ী, এই নৌযাত্রা চলে আসছে প্রায় ২৭৪ বছর ধরে। জন্মাষ্টমীর দুইদিন আগে কান্তজিউ বিগ্রহ কাহারোল থেকে নদীপথে যাত্রা শুরু করে পৌঁছান দিনাজপুর শহরের রাজবাটি মন্দিরে। রাজবাড়িতে তিন মাস অবস্থান শেষে রাস পূর্ণিমায় আবার ফিরিয়ে নেওয়া হয় কান্তনগরে।
আজও ছিল সেই একই পথ, সেই একই নদী, সেই একই ভালোবাসা। ঢেপা নদীর দুই তীরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের চোখে ছিল গভীর শ্রদ্ধা আর আনন্দের ঝিলিক। নদীপথে নৌকার বহর যেন ভাসমান উৎসব। প্রতিটি ঘাটে থামার সময় ভক্ত-পুণ্যার্থীদের ভিড়ে নদীর জলও যেন গাঢ় হয়ে ওঠে ভক্তি রঙে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীপথ পেরিয়ে সন্ধ্যায় নৌযাত্রা এসে থামবে পুনর্ভবা নদীর সাধুর ঘাটে।
কাহারোল থেকে আসা ভক্ত সেজোতি রায় ঢাকা মেইলকে বলেন, “ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের সঙ্গে কান্তজিউ মন্দিরে আসতাম। আজ স্বামীর সঙ্গে এসেছি। দুজন মিলে একসঙ্গে পূজা-অর্চনা করেছি। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছি, যেন আমাদের পরিবার সুখে-শান্তিতে থাকে এবং সবার মঙ্গল হয়।”
দিনাজপুর শহরের বাসিন্দা রাজেশ কুমার রায় বলেন, এই যাত্রা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটা আমাদের সংস্কৃতি ও শিকড়ের সঙ্গে মিশে থাকা আবেগ।
ঠাকুরগাঁও থেকে আগত তাপস পাল বলেন, কান্তজিউ বিগ্রহের দর্শনে এসে আজ আমরা শ্রীকৃষ্ণের শ্রীচরণে প্রার্থনা করেছি। আমাদের কামনা, সারা পৃথিবী যেন সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভরে ওঠে। প্রতিটি মানুষের জীবনে বয়ে আসুক আনন্দ ও উল্লাসের ধারা। হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে শান্তি, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সবাই যেন মিলেমিশে সুন্দরভাবে বসবাস করতে পারে শ্রীকৃষ্ণের কাছে আজ এটাই ছিল আমাদের পবিত্র প্রার্থনা।
দিনাজপুর রাজ দেবোত্তর এস্টেটের এজেন্ট রনজিৎ সিংহ বলেন, দিনাজপুরের মহারাজা রাজা প্রাণনাথ ১৭০৪ সালে কান্তনগর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তার পোষ্যপুত্র রাজা রামনাথ ১৭৫২ সালে এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন। সেই সময় থেকেই জন্মাষ্টমীর দুইদিন আগে কান্তজিউ বিগ্রহ রাজবাড়ীতে নিয়ে গিয়ে পূজা অনুষ্ঠিত হওয়ার ঐতিহ্য শুরু হয়। রাসপূর্ণিমার আগে পুনরায় বিগ্রহ মন্দিরে ফিরে আসে এবং এসময় মন্দির প্রাঙ্গণে মাসব্যাপী মেলা বসে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কাহারোল সার্কেল) মনিরুজ্জামান বলেন, দিনাজপুর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে কান্তজীর মন্দির থেকে রাজবাড়ীর মন্দির পর্যন্ত এবং নদীর দুই পাড়জুড়ে সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করে এ অনুষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন করা হবে।
(ঢাকা টাইমস/২সেপ্টেম্বর/এসএ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































