লোডশেডিংয়ে নাকাল দেশ, সংসদে দুঃখ প্রকাশ করে যা বললেন প্রতিমন্ত্রী

দেশজুড়ে চলমান তীব্র লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সংসদে দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। একই সঙ্গে বর্তমান সংকটের জন্য বিগত সরকারের দীর্ঘদিনের ভুল ও অপরিকল্পিত নীতিকে দায়ী করেছেন তিনি।
বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ সারা দেশে বিদ্যুতের চরম সংকট ও লোডশেডিং নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম।
জবাবে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সরকার কোনো লুকোচুরি করতে চায় না। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটে মানুষ কষ্টে আছে। এ পরিস্থিতির জন্য তিনি তাঁর মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আজকের এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। বিগত দেড় দশক ধরে ফ্যাসিস্ট সরকারের ভুল নীতির অনিবার্য পরিণতি আজ দেশের মানুষকে ভোগ করতে হচ্ছে।’
বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩৭০০ মেগাওয়াট
বিদ্যুৎ সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, গত ৯ আগস্ট দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। তাঁর দাবি, গত ৫৫ বছরের ইতিহাসে এটি সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ ঘাটতি।
তিনি বলেন, বিগত সরকার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা তৈরি করেছিল। দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট। এ পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু দেশীয় উৎপাদন ও এলএনজি আমদানি মিলিয়ে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, কারিগরি ত্রুটির কারণে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬১৬ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে। মাতারবাড়ীর আরেকটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া আদানি গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে দিনের বেলা প্রায় ৯০০ এবং রাতে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী জানান, গত ২১ জুলাই একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) নষ্ট হয়ে যাওয়ায় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেয়। পরে সেটি মেরামত করে ১৫ আগস্ট পুনরায় চালু করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে সরকার বর্তমানে ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদনের চেষ্টা করছে বলেও জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, বিগত সরকার এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের প্রায় ৪৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বকেয়া রেখে গিয়েছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংকট মোকাবিলায় দ্রুত ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এই অর্থ দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারবে।
প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, সেপ্টেম্বরের মধ্যেই বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য রাত ৮টার পর দোকানপাট ও বিপণিবিতান বন্ধ রাখার নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী। এ বিষয়ে সংসদ সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সহযোগিতা করার অনুরোধ করেন তিনি।
এছাড়া সংসদে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে নতুন উদ্যোগের কথাও জানান বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, গতকাল মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতির আদেশে এ–সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে।
এর ফলে এখন থেকে উদ্যোক্তা ও বাসাবাড়ির মালিকেরা নিজেদের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে নিজেদের চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রি করতে পারবেন। সরকার প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে ওই বিদ্যুৎ কিনবে বলে জানান তিনি।
সৌরবিদ্যুতের প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টারসহ আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক ও কর সুবিধার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব পণ্য আমদানিতে এখন মাত্র ১ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি দিতে হবে। পাশাপাশি ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) মওকুফ করা হয়েছে। আগামী ছয় মাস বাণিজ্যিক আমদানিকারকেরাও এ সুবিধা পাবেন।
প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এসব উদ্যোগের ফলে আগামী তিন বছরের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ আসবে। এতে আগামী গ্রীষ্মে দেশের মানুষকে বিদ্যুতের সংকটে ভুগতে হবে না বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































