নিবন্ধন আইনের ফেরে বিএনপি

বোরহান উদ্দিন, ঢাকাটাইমস
  প্রকাশিত : ১২ মার্চ ২০১৭, ০৮:২৫| আপডেট : ১২ মার্চ ২০১৭, ১২:৫৯
অ- অ+

নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি পূরণ না হওয়ায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করা বিএনপির দাবি পূরণ হয়নি এখনও। তাহলে কি আরেকটি নির্বাচন বর্জন দেখছে বাংলাদেশ? তবে এই সিদ্ধান্ত নেয়া বিএনপির জন্য জটিল অন্য একটি কারণে।

রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইনের একটি ধারায় বলা আছে, পর পর দুইবার নির্বাচন বর্জন করা দল নিবন্ধন হারাবে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আরও দেড় বছরের বেশি বাকি থাকলেও বিএনপির সম্ভাব্য করণীয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে মূলত এই বিষয়টি নিয়েই।

যে দাবিতে দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছে বিএনপি সেই ত্ত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে এখন কথা বলছেন না দলের নেতারাই। আগের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসে এখন তারা বলছেন, নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের কথা। এই সরকার ব্যবস্থা কী হবে সে নিয়ে বিএনপি এখনও কিছু বলেনি। আর এই সহায়ক সরকারের আগে দলটির পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশন গঠনে ১৩ দফা প্রস্তাব কার্যত অগ্রাহ্যই হয়ে গেছে। তাই এই সহায়ক সরকারের প্রস্তাব আদৌ গ্রহণ করা হবে কি না-এ নিয়ে সংশয়ে নেতারাই।

সরকারি দলের নেতারা নির্বাচিত সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্তে অটল। তারা এও বলছেন, শেখ হাসিনার অধীনেই আগামী নির্বাচন হবে এবং এতে যোগ দিতে হলে এটা মেনে নিতেই হবে বিএনপিকে।

আপাত দৃষ্টিতে কঠোর অবস্থান থেকে সরা বিএনপি কি বিষয়টি মেনে নেবে? না নিলে? আরেকবার নির্বাচন বর্জন হলে? রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকাঠামোর বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো কতদিন টিকে থাকতে পারে? জন্মলগ্ন থেকেই সাংগঠনিক দুর্বলতায় ভোগা বিএনপিই বা কত দিন পারবে?- এসব প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনার খোরাক যোগাচ্ছে।

নির্বাচন বর্জন করলে নেতা-কর্মী ধরে রাখা যাবে কি না- বিএনপির জন্য এরচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তার কারণ নিবন্ধন হারানোর দুচিন্তা।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাও বলছেন, নিবন্ধন রক্ষার জন্য নিজেদের তাগিদেই নির্বাচনে আসবে। তাই আলোচনার দরকার নেই। কেউ আবার বলছেন,দশম সংসদ নির্বাচনে না এলেও এবার নির্বাচন বর্জন করে নিবন্ধন হারানোর ঝুঁকি নিবে না বিএনপি। দলটি এমন বোকামি করবে না বলাও বলা হচ্ছে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে।

যদিও বিএনপি এ নিয়ে মোটেও চিন্তিত নয় বলে দাবি করছেন দলটির শীর্ষ নেতারা। তবে তাদের অভিযোগ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনকে ঘিরে অনেক আইন সংশোধন হলেও সরকার বিএনপিকে চাপে রাখতে গণপ্রতিনিধিত্ব আইনের নিবন্ধন বাতিলের ধারাটি রেখে দিয়েছে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ আইনে যা আছে

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ আইনের (আরপিও)৯০ (এইচ) (১) দফায় রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিলের এ নির্দেশনা রয়েছে। ওই দফার (ই) উপ-দফায় বলা হয়েছে, নিবন্ধিত কোন রাজনৈতিক দল পর পর দুইবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে নিবন্ধন বাতিল হবে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপিসহ ২৮টি রাজনৈতিক দল। এর মধ্যে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়ে গেছে এরই মধ্যে। সেই হিসাবে আরপিওর ওই বিশেষ বিধানের কারণে আগামী নির্বাচন বর্জন করলে ঝুঁকিতে থাকবে আসলে ২৭টি দল।

অবশ্য নির্বাচন বর্জন করলেই নিবন্ধন হারাবে দলগুলো-বিষয়টি এমন নয়। আইনের ৯০ এইচ (২) দফায় বলা হয়েছে, ‘শর্ত থাকে যে দফা (১) এর (সি), (ডি) ও (ই) এর অধীন নিবন্ধন বাতিলের পূর্বে নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলকে শুনানির সুযোগ প্রদান করবে।’ অর্থাৎ শুনানিতে সন্তোষজনক জবাব দেয়ার সুযোগ পাবে পরপর দুইবার নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলো।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের বিধান চালু হয় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সেনা শাসনের সময়। এরপর ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আবারও চালু হয় একই বিধান।

সুনির্দিষ্ট কিছু শর্ত মেনে সে সময় নিবন্ধনে আগ্রহী নেতারা নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেন এবং এই আবেদনের পর শর্তসাপেক্ষে নিবন্ধন দেয়া হয় দলগুলোকে। এর মধ্যে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। ২০১৫ সালের ২ জুন আইনমন্ত্রী সংসদকে জানান, দেশে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ৪০টি।

আরপিওর সব ধারা মেনে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন মনে করছেন, নিবন্ধন আইনের ওই ধারা গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। তিনি বলেন,‘আইন করা হয়েছে, দুই বার জাতীয় সংসদ নির্বাচন না করলে নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে। আইন থাকবে, আইন মানুষের কল্যাণের জন্য। যে আইন মানুষের কল্যাণে আসবে না, সে আইন, আইন নয়।’

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ঢাকাটাইমসের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সাপ্তাহিকএই সময়কে বলেন,‘বিএনপির নিবন্ধন থাকবে কি থাকবে না তা নিয়ে আপনাদের এত দুশ্চিন্তা কেন? দেশটা কি শেখ হাসিনার পৈত্রিক সম্পত্তি যে তিনি যা বলবেন, যেভাবে চাইবেন সেভাবে সবকিছু চলবে? এটা হতে পারে না। তাই এটা নিয়ে আমরা এত চিন্তা করছি না। যে দেশে আইন-কানুন বলে কিছু নেই সেখানে বিএনপির নিবন্ধন থাকা না থাকায় কোনো কিছু যায় আসে না।’

গয়েশ্বর বলেন,‘বেশ কিছুদিন ধরে স্থানীয় সব নির্বাচনে ধানের শীষ-নৌকা প্রতীকে নির্বাচন হচ্ছে। আর যে প্রতীক সংসদ নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সেটা চাইলেই চলে যাবে এটা সম্ভব না। কারণ আমরা তো স্থানীয় সব নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। একটা জিনিস বুঝতে হবে, নিবন্ধন বাতিলের কথা বলা সহজ, করা কঠিন। আর যদি সরকার বিরোধীদল শূন্য দেশ করতে চায়, তাহলে সেটা ভিন্ন কথা।’

নিবন্ধন বাতিলের প্রক্রিয়া কী?

সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নির্বাচন কমিশনের একজন কমিশনার ছিলেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা এম সাখাওয়াত হোসেন। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিলের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকাটাইমসের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সাপ্তাহিক এই সময়কে তিনি বলেন,‘কোনো দল যদি নিজেই নিজেকে বিলুপ্ত করে বা সরকার কোনো দলকে নিষিদ্ধ করলে সরাসরি কমিশন ওই দলের নিবন্ধন বাতিল করবে। কিন্তু নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার কারণে বাতিলের প্রয়োজন হলে কমিশনকে অবশ্যই দলটির কথা ও নির্বাচনে না যাওয়ার যুক্তি শুনতে হবে।’

বিএনপি নেতাদের দাবি, দশম সংসদ নির্বাচনে তাদের অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত ছিলো যুক্তিসঙ্গত। তাই সরকারের এমন বক্তব্য ধোপে টিকবে না।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করলেও জেলা পরিষদ ছাড়া বর্তমান সরকারের আমলে সব কটি স্থানীয় নির্বানে অংশ নিয়েছে বিএনপি। নেতারা বলছেন, তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের চাঙা এবং দলকে সক্রিয় রাখতে এসব নির্বাচনে গেছেন তারা।

নিবন্ধন বাতিল হলে কী হবে?

সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নির্বাচন কমিশন থেকে নিবন্ধন নেয়া দলগুলোর মধ্যে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে এরই মধ্যে।

জামায়াতের গঠনতন্ত্র বাংলাদেশের সংবিধানবিরোধী-এই অভিযোগ তুলে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল তরীকত ফেডারেশনের আবেদনের পর হাইকোর্ট ২০১৩ সালের ১ আগস্ট জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে। এই রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াতের আপিলও নাকচ হয়েছে উচ্চ আদালতে।

এই রায়ের প্রভাবে বর্তমান সরকারের আমলে পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ আর সাম্প্রতিক উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি জামায়াতে ইসলামী। আগামী সংসদ নির্বাচনেও তারা অংশ নিতে পারবে না দলীয় প্রতীকে।

অবশ্য অন্য কোনো দলের সঙ্গে জোট করে জামায়াত সেই দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। ২০০১ ও ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নেয়া দলগুলোর বেশ কয়েকটির প্রার্থীরা জোটের প্রধান দলের প্রতীক নিয়ে অংশ নেয়। ২০০১ এবং ২০০৮ সালে সালে বিএনপির শরিক ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি ধানের শীষ এবং ২০০৮ এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শরিক জাসদ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। আগামী নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট অংশ নিলে জামায়াত ধানের শীষ প্রতীক নেবে কি না-সেটা অবশ্য নিশ্চিত করেনি দলটি।

বিএনপির নির্বাচন ভাবনা

দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা বলছেন, মুখে যাই বলা হোক না, কেন আগামী নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি চলছে তলে তলে। সম্প্রতি দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার তাগিদ দিয়েছেন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

নির্বাচনের আগে দলের ভেতরের রাগ-ক্ষোভ নিরসনেও উদ্যোগী হয়েছেন বিএনপি নেত্রী। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দলের ভেতর সংস্কারের দাবি তুলে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা দুই নেতাকে ডেকে নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন বিএনপি নেত্রী। এই দুই নেতা হলেন নরসিংদীর সর্দার সাখাওয়াত হোসেন বকুল এবং বরিশালের জহিরউদ্দিন স্বপন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত অন্য নেতাদের সঙ্গেও তারা যোগাযোগ করছেন এবং খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকের প্রক্রিয়া চলছে।

আরও নানা ঘটনাপ্রবাহে আগামী নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের ইচ্ছার প্রকাশ ঘটছে বলেই মনে করছেন সরকারি দলের নেতারা।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ঢাকাটাইমসের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সাপ্তাহিক এই সময়কে বলেন, ‘আমরা জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে গত নির্বাচনে অংশ নেইনি। কারণ জনগণ মনে করেছিলো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। শেষ পর‌্যন্ত আমাদের সিদ্ধান্ত যে যুক্তিসঙ্গত ছিলো প্রমাণ হয়েছে। কারণ জনগণ ভোট দেয়নি। বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেয়নি। আগামী নির্বাচনের ব্যাপারেও বিএনপির ভাবনা জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে ঘিরে। সুতরাং নিবন্ধন থাকবে কি থাকবে না এই রিস্ক নিয়েই আমরা সিদ্ধান্ত নিব।’

নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের আইনে দুইবার নির্বাচনে অংশ না নিলে নিবন্ধন বাতিলের কথা বলা আছে। কিন্তু গত নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত যৌক্তিক না ইচ্ছাকৃত সেটাও বিবেচ্য বিষয়। আমরা মনে করে দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন ছিলো যুক্তিসঙ্গত। তাই এটাকে ধরা যাবে না ।’

নিবন্ধন নিয়ে বিএনপি চিন্তিত নয় এমন দাবি করে দলটির এই শীর্ষ নেতা বলেন, ‘একসময় তো কোনো দলের নিবন্ধন ছিলো না। জিয়াউর রহমানের সময় নিবন্ধিত হলো। সেক্ষেত্রে নিবন্ধনের বিষয়টিকে এত বড় করে দেখার প্রয়োজন নেই। কারণ একটি দলের অস্তিত্ব ও স্থিতি জনগণের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে।’

ঢাকাটাইমস/১২মার্চ/বিইউ/ডব্লিউবি

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
কক্সবাজারে বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে উদ্ধার তৎপরতায় আনসার-ভিডিপি
৩০০ কোটি টাকা পরিশোধের পরও পাঁচ বছরে মেলেনি পুলিশের দুই হেলিকপ্টার, কারণ কী?
চট্টগ্রামে বন্যাদুর্গত মানুষের মধ্যে নৌবাহিনীর খাবার বিতরণ
‘এভেনজোর ইন্টারন্যাশনাল স্কুল’-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা