`বাংলাদেশের মানুষ কোয়ালিটি বোঝে'

মাহমুদ উল্লাহ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৬ মার্চ ২০১৭, ১২:০৪ | প্রকাশিত : ১৩ মার্চ ২০১৭, ১৭:৫৯

অল্প সময়ে দেশের ফ্যাশনপ্রেমী মানুষের মন জয় করে নিয়েছে গ্রামীণ ইউনিক্লো। এর পেছনে যে মানুষটি রয়েছেন তিনি নাজমুল হক। জাপানে ছিলেন ১৫ বছর। সেখানে একটি প্রতিষ্ঠানে বিজনেস কনসালটেন্ট হিসেবে ১০ বছর কাজ করেন। ফ্যাশন হাউস গ্রামীণ ইউনিক্লোকে এগিয়ে নিতে দেশে ফিরে এর সঙ্গে যুক্ত হন। নাজমুল হকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহমুদ উল্লাহ

গ্রামীণ ইউনিক্লো নামটি কেন? এর সম্পর্কে কিছু বলুন।

জাপানের সবচেয়ে বড় অ্যাপারেল রিটেলার প্রতিষ্ঠানের নাম ফাস্ট রিটেলিং কোম্পানি লিমিটেড। সারা পৃথিবীতে এদের সাতটি গ্লোবাল ব্র্যান্ড রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ডের নাম হচ্ছে ইউনিক্লো। পৃথিবীর মধ্যে গার্মেন্ট বিজনেসে এর অবস্থান তিনে। তাদের টার্গেট হচ্ছে পৃথিবীর এক নম্বর ব্র্যান্ড হওয়া। আর ইউনিক্লোর বাংলাদেশে অবস্থিত লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডের নামই হচ্ছে গ্রামীণ ইউনিক্লো।

বাংলাদেশকেই ইউনিক্লো কেন বেছে নিয়েছে?

বিশ্বের বিভিন্ন মহাদেশে ইউনিক্লোর ব্র্যান্ড রয়েছে। আমরা নতুন নতুন দেশে ঢুকছি ও আমাদের ব্যবসা প্রসারিত করছি। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশে এসেছি। তবে এখানে পুরোপুরি ব্যবসা করতে আসিনি। ব্যবসার পাশাপাশি মানুষের জন্য ভালো কিছু কাজ করাও আমাদের দায়িত্ব। এরই অংশ হিসেবে কর্পোরেট গ্লোবাল রেসপনসিবিলিটির অংশ হিসেবে ২০১০ সালে ইউনিক্লো সোশ্যাল বিজনেসের জন্য বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে। এটি অ্যাপারেল রেডিমেট গার্মেন্ট বিজনেস।

এদেশে শুরুটা হয় কিভাবে?

গ্রামীণ হেলথ কেয়ার ট্রাস্ট গ্রামীণ ব্যাংকের একটি শাখা প্রতিষ্ঠান। এরা বাংলাদেশের বিভিন্ন সমস্যা দূর করার জন্য কাজ করছে। তাদের কনসেপ্টটি আমরা নেই। আমাদের গ্রুপের চেয়ারম্যান তাদাশি ইয়ানাই, তিনি গ্রামীণ হেলথ কেয়ারের কনসেপ্টটি পছন্দ করে তাদের সঙ্গে যুক্ত হন। তাদের সমাজ উন্নয়ন কনসেপ্ট নিয়ে গ্রামীণ ইউনিক্লো বাংলাদেশে কাজ শুরু করে। প্রথমে ২০১০ সালে এসে বিভিন্ন রিসার্চ শুরু করি। কিভাবে বাংলাদেশের দারিদ্র্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য উন্নয়নে কাজ করা যায়, এরপর বিভিন্নভাবে কাজ করতে থাকি।

আচ্ছা, প্রথম দিকের গল্পগুলো বলেন।

২০১১ সালে ব্র্যান্ড কোম্পানি তৈরি করে গ্রামে গ্রামে নারীদের এসাইন করে ১ ডলারে টিশার্ট, নরমাল শার্ট, মেয়েদের টপস টাইপের কিছু প্রোডাক্ট তৈরি করে সেল করি। এভাবেই আমাদের পথচলা শুরু।

এরপর?

আমরা দেখি যে, এভাবে সোশ্যাল ওয়ার্ক হচ্ছে। কিন্তু সোশ্যাল ওয়ার্কটি বিজনেস আকারে দাঁড়াচ্ছে না। তাহলে এটা সাসটেইন করবে না। তাছাড়া এভাবে  প্রোডাক্টের মানও বাড়ছে না। তখন ২/৪ ডলারে প্রোডাক্ট তৈরি করে গ্রামে গ্রামে দিই। মিরপুরসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে হায়েস গাড়ি দিয়ে প্রোডাক্ট পৌঁছে দিয়ে আসি। রাস্তায়ও কিছু প্রোডাক্ট ভ্রাম্যমাণ হিসেবে বিক্রি করি।

বাংলাদেশে প্রথম শোরুম চালু হয় কবে?

আমরা পরে বুঝতে পারি আরও ভালো প্রোডাক্টের প্রয়োজন রয়েছে আমাদের। বিজনেসটির সঙ্গে আরও বেশি মানুষের সংযোগ স্থাপনও প্রয়োজন হয়ে পড়ছিল। কিভাবে আরও বেশি মানুষের কাছে ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে পৌঁছে দেওয়া যায় সেই চিন্তা থেকেই আমরা ঢাকায় প্রথম শোরুম চালু করি। ২০১৩ সালের জুলাইতে নিউ এলিফ্যান্ট রোডে এটি দেওয়া হয়। এখন এর ১২টি শোরুম রয়েছে। কোয়ালিটি ম্যাটারিয়াল ও অ্যাফোর্ডেবল প্রাইজে রাখার চেষ্টা করি সবসময়।

এত অল্প সময়ে আপনাদের চাহিদা বৃদ্ধি পেলো কিভাবে?

প্রথম থেকেই ব্যবসা নয়, আমরা সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমরা যেহেতু একটি গ্লোবাল ব্র্যান্ড, তাই আমাদের কোম্পানির যে জাপানিজ  প্রযুক্তি রয়েছে তা ব্যবহার করে আরো উন্নত প্রোডাক্ট তৈরি করি। এটা আমাদের মানুষের আস্থা তৈরিতে সাহায্য করেছে। বেশি মানুষের কাছে নিয়ে আসার জন্য আমরা এখনো কাজ করে যাচ্ছি। কম্পেলেইন অ্যান্ড ক্লায়েন্ট ইস্যুগুলোতে আমরা নজর দিই। আরও ভালো ও আরামদায়ক পণ্য সবার হাতের নাগালে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মানুষ কি ধরনের প্রোডাক্ট চাচ্ছে সেগুলো বিবেচনা করি। আমাদের অ্যাক্সসেপ্টেন্স এসব কারণে বাড়ছে। আমাদের যাত্রা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

আপনাদের প্রোডাক্ট সম্পর্কে কিছু বলুন?

আমাদের সফ্ট অ্যান্ড স্ট্রেচের কিছু  প্রোডাক্ট রয়েছে। ট্রানট্রপ, বক্সার, পালাজো, লেগিংস, ইজি কেয়ার শার্ট যেগুলো আয়রন করা লাগে না। এ রকম কিছু প্রোডাকশন করছি আমরা। এছাড়া ড্রাই পোলো শার্ট রয়েছে আমাদের। বিভিন্ন নতুন নতুন মানসম্পন্ন প্রোডাক্ট বাংলাদেশের মানুষকে  প্রতিনিয়ত পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমাদের যে ডেনিম রয়েছে তা স্ট্রেচ। মূলত কাস্টমারদের আরামদায়ক পোশাক দেওয়া যায় কি না সেদিকে ফোকাস বেশি করার চেষ্টা করি আমরা। সব মিলিয়ে এগুলোই আমাদের এতদূর আসতে সাহায্য করেছে। 

আপনাদের এই ব্যবসার এজেন্ডাগুলো কীকী?

আমাদের মিশনগুলো হলো (১) বাংলাদেশের মানুষকে খুশি করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি, নলেজ এবং আইডিয়া ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক পণ্য দেশে তৈরি করে বিক্রি করে সুখী ও সন্তুষ্ট করা।

(ক) উচ্চ মানসম্পন্ন আরামদায়ক হাতের নাগালের মূল্যে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া।

(২) সামাজিক সমস্যাকে ব্যবসার মাধ্যমে সমাধান করা।

(ক) গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডের বিজনেস লিডার  ও বিজনেস পারসন তৈরি করা দেশ-বিদেশে গ্লোবাল ট্রেনিং দিয়ে।

(খ) এ রকম একটি কাজের পরিবেশ তৈরি করা যেখানে এডুকেশন ব্যাকগ্রাউন্ড বা বয়স বা জেন্ডারের কোনো ব্যবধান থাকবে না। সবাইকে সমানভাবে দেখা ও সুযোগ দেওয়া হবে।

(গ) আমরা যাদের সঙ্গে পার্টনারশিপ হিসেবে কাজ করছি, সেসব পার্টনার মানসম্পন্ন কি না তা ইনশিওর করি।

তারা তাদের কর্মীদের সঠিক বেতন-ভাতা দিচ্ছে কি না তাও ইনশিওর করি। সবখানে ওভারটাইম, কাজের পরিবেশ, সুন্দর জীবন  প্রদান হলে সেই ব্যবসায়ীদেরই পার্টনার হিসেবে নিই। আর সে রকম না হলে তাদের এসব কাজে উদ্বুদ্ধ করি।

(৩) আমাদের যে মুনাফা আসবে তা আবার সোশ্যাল বিজনেসই পুনঃবিনিয়োগ করা। বিজনেস বাড়িয়ে বাংলাদেশের মানুষের যে সমস্যা রয়েছে তার সমাধান করা।  

পোশাককর্মীদের জীবনমানের উন্নয়নে আপনারা কিছু করছেন?

আমাদের যেসব পার্টনার ফ্যাক্টরিগুলো রয়েছে তারা তাদের কর্মীদের আন্তর্জাতিক সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে কি না তা মনিটরিং করে তাদের আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বলি।

আপনাদের পণ্যের দাম তো কম নয়। এ বিষয়ে কি বলবেন?

আমাদের কোয়ালিটির কারণে খরচ তিন গুণ বেশি। তারপরও অন্যান্য  প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করলে দেখবেন আমাদের মূল্য কম রয়েছে।

নতুন যারা এই খাতে আসতে চান, তাদের উদ্দেশে কিছু বলুন। 

বাংলাদেশের মানুষ কোয়ালিটি বোঝে। কাস্টমারদের হাতের নাগালে নিতে পারলে সুযোগ আছে। তবে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও উপকারে নজর দেওয়া উচিত। একটি কোম্পানি যেন সমাজের উপকারে আসে, সেদিকে নজর দেওয়া উচিত। বাংলাদেশের বিভিন্ন সমাজের জন্য কাজ করার এখনো অনেক কিছু রয়েছে। সেটা ব্যবসার মাধ্যমেই করতে হবে।

আপনি গ্লোবাল মার্কেটিংয়ে যুক্ত। মার্কেটিংয়ে কাজ করতে আগ্রহীদের জন্য পরামর্শ কী?

মিডিয়া ও কাস্টমার বিহেভিয়ার দুটোই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হচ্ছে। সবার আগে কাস্টমারের বিহেভিয়ার বুঝতে হবে। আগে মানুষ টিভি দেখত, পেপার পড়ত, ডিজিটালাইজড ছিল না। এখন সবাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ঢুকছে।  প্রতিটি কোম্পানি বিহেভিয়ারের মাধ্যমে পরিববর্তন করা গুরুত্বপূর্ণ। কাস্টমারের সঙ্গে সামঞ্জস্যতা রেখে নিজের ব্র্যান্ডকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করতে হবে। তার নিজস্বতা কি সেটা বিবেচনা করেই ব্র্যান্ডিংয়ে আগাতে হবে বলে আমি মনে করি। এছাড়া সমাজের মানুষের কি সমস্যা ও চাহিদা তা খেয়াল করে বিজনেসে নামলে ভালো। পোশাক ছাড়াও আইটি ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও এখানে বিজনেস করা সম্ভব। 

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

আপনাকেও ধন্যবাদ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত