গান গেয়ে জীবন বাঁচান যে শিল্পী

বিনোদন ডেস্ক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২৪ নভেম্বর ২০১৭, ১৪:৪৩

বয়স তার মাত্র ২৫ । কিন্তু হাজার বছর বেঁচেছেন এর মধ্যে। কিংবা বলা যায়, হাজারবার জন্ম নিয়েছেন হাজার খানিক জীবন বাঁচিয়ে।

নাম তার পলক মুচ্ছল। জন্মেছেন ভারতের মধ্য প্রদেশ এর ইন্দোর শহরে একটি মাড়োয়ারি পরিবারে। চাকুরীজীবী বাবা আর গৃহিণী মা বাবার মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯৯২ সালের ৩০ মার্চ প্রথম সন্তান হিসেবে জন্ম গ্রহণ করেন পলক মুচ্ছল। একটি ছোট ভাইও রয়েছেতার। পরিচয় তার বলিউডের প্লেব্যাক সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে। যদিও তার পরিবারের কারোর সাথেই সঙ্গীতের কোন যোগাযোগই নেই। মেয়েটির বয়স যখন আড়াই বছর- একদিন পারিবারিক একটি অনুষ্ঠানে সবাই যখন কিছু না কিছু পরিবেশন করছে, তখন মেয়েটাও বায়না ধরলো তার মায়ের কাছে। মিনতি করলো অনেক, সেও কিছু পরিবেশন করবে বলে। মা ভাবল মেয়েটা হয়তো কোন ছড়া বা কবিতা বলবে। কিন্তু মঞ্চে উঠে সবাইকে অবাক করে দিয়ে পলক নামের সেই মেয়েটা হঠাৎ গান ধরলো। মা সেদিনই সিদ্ধান্ত নিলেন মেয়েটাকে তার গান শেখাবেন। বয়স যখন চার বছর তখন সে আনন্দ-কল্যাণজি লিটল স্টার নামের সংগঠনের সদস্য হলো।

১৯৯৯ সাল পলকের বয়স তখন সাত বছর। তখন ভারতে শুরু হল কারগিল যুদ্ধ। পলকের মা তাকে পত্রিকা থেকে যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং সৈনিকদের দুর্দশার কথা পড়ে শোনাতেন। পলক ভাবল শুধু ঘরে বসে না থেকে দেশের জন্য তারও কিছু করার রয়েছে। একটি দানের বক্স নিয়ে দোকানে দোকনে গিয়ে বলল, "আমি আপনাদের একটি গান শোনাবো। বিনিময়ে আপনার যা খুশি তা এই বক্সে দান করবেন।" এভাবে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে সেই সময়ে ২৫ হাজার ভারতীয় মুদ্রা সংগ্রহ করলেন পলক। ভারতীয় সেনা কতৃপক্ষের কাছে সেটা জমাও দিলেন। এই খবরটি স্থানীয় মিডিয়ায় ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়। পলক পেয়ে যান মানুষের জন্য কিছু একটা করার দারুন অনুপ্রেরণা। একই বছর ভারতের অঙ্গরাজ্য ওড়িশ্যায় সাইক্লোনে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যের জন্যও গান গেয়ে অর্থ সংগ্রহ করেন পলক।

প্রায়ই সে দেখতো তার বয়সী ছেলে মেয়েরা নিজের পরনের পোশাক দিয়ে ট্রেনের বগি, গাড়ি ধোয়া-মোছা করে। তখন তার মনে ভাবনা আসে যে, সে এদেরও কোনো না কোনো ভাবে সাহায্য করবে। সে তার বাবা-মাকে তার এই ইচ্ছার কথা জানালে তারাও না করলেন না।কাকতালীয় ভাবে সেই সময়কালে ইন্দোরের একটি স্কুলের একজন শিক্ষক তার স্কুলের লোকেশ নামে হৃদরোগে আক্রান্ত এক শিশুর চিকিৎসার জন্য পলক এবং তার পরিবারের কাছে সাহায্য চায়। তখন পলক লোকেশের জন্য একটি ভ্রাম্যমাণ মঞ্চ তৈরি করে সেখানে গান গেয়ে অর্থ সংগ্রহ শুরু করে। ২০০০ সালের মার্চ মাসে অনেকগুলো মঞ্চ পরিবেশনার পর ভারতীয় মুদ্রায় ৫১ হাজার রুপি সংগ্রহ করতে সক্ষম হয় পলক। পলকের এই অপার্থিব মমতা দেখে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় খবর ছাপা হলো। আর এসব খবর দেখে ভারতের বিখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট দেব প্রসাদ শেটি সেই লোকেশ নামের ছেলেটির হৃদপিন্ডের অপারেশন বিনা পারিশ্রমিকেই করে দিলেন।

কিন্তু লোকেশের জন্য টাকাতো ওঠানো হয়ে গেছে। এখন পলক এবং তার পরিবার চিন্তায় পড়ে গেল এই টাকা দিয়ে তারা কি করবে ? শেষে পত্রিকায় পলকের বাবা বিজ্ঞাপন দিলেন, যদি কোন শিশু হৃদরোগে আক্রান্ত থাকে তাহলে যেন অতিসত্তর যোগাযোগ করা হয়। তারা শিশুটির অপারেশনের খরচ বহন করবেন। পরের দিন ৩৩টি শিশুর পরিবার যোগাযোগ করে- যাদের প্রত্যেকের হৃদরোগের অপারেশন করা লাগবে। পলক এবং তার পরিবার খুবই চিন্তায় পড়ে যান। এতো শিশু হৃদরোগে আক্রান্ত!

পলক তাদের সবাইকে সাহায্য করতে চাইলেন। এই সমস্ত শিশুদের অপারেশন করার জন্য ঐ বছরই একাধিক মঞ্চেগানকরে প্রায় ২ লক্ষ ২৫ হাজার ভারতীয় মুদ্রা সংগ্রহ করতে সক্ষম হলেনপলক। এই টাকায়অবশ্য ৩৩ জনের অপারেশন করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু ৫ জন শিশুর অপারেশন করাতে পেরেছিলেন পলক। শুরু হয় পলক মুচ্ছলের শিশুদের বাঁচানোর এক অনন্য অভিযানের কথা। সেই অভিযান আজও চলছে।

এখন পর্যন্ত তিনি গান গেয়ে অর্থ সংগ্রহ করে বাঁচিয়েছেন ১৩৩৩ জন শিশুকে। যাদের সকলেই হার্টের কোনো না কোনো অসুখে ভুগছিল। এদের সবাইকে অপারেশনের মাধ্যমে সুস্থ্য করা গেছে।

একবার চিন্তা করুন, যখন আপনার আমার বয়স মাত্র ১১ বছর। তখন আমরা কি করতাম ? নাওয়া খাওয়া ভুলে গিয়ে খেলতাম আর খেলতাম। আর সেই বয়সেই ১০০ এর বেশি হৃদরোগে আক্রান্ত বাচ্চার অপারেশনের খরচ যোগানোর মাধ্যমে সুস্থ্য করে তুলছেন পলক। শুধু টাকার যোগান দেয়াই নয়, অপারেশনের সময় পলক অপারেশন থিয়েটারের আশেপাশেই থাকতেন।ডাক্তাররা তাকে অপারেশন থিয়েটারে শুধু প্রবেশ করার অনুমতিই দিতেন না- পাশাপাশি ছোট্ট পলকের জন্য পরিষ্কার অ্যাপ্রোনও রেখে দিতেন।

একবার ভাবুন, তো ঐ অসহায় বাচ্চাদের পরিবারগুলোর কাছে এই ছোট্ট মেয়েটি কে ? দেবী ছাড়া আর কি! সৃষ্টিকর্তা তাকে পাঠিয়েছেন বুঝি তাদের প্রিয় সন্তানটির জীবন বাঁচানোর জন্যই। তাইতো শিল্প-সংগীত এর ছোঁয়াও নেই এমন পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেও নিজের কণ্ঠ দিয়ে বাঁচাচ্ছেন হাজারো দরিদ্র হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুদের।

পলক গান গেয়ে যতো টাকা উপার্জন করে তার সবটুকুই সে তার ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দরিদ্র শিশুদের চিকিৎসার কাজে ব্যয় করেন। আগে যেখানে একটি শিশুর অপারেশনের জন্য একাধিক মঞ্চ পরিবেশনা করতে হতো। বর্তমানে এখন ১টি মঞ্চ পরিবেশনা থেকে ৭-৮টি শিশুর অপারেশন করা সম্ভব হয়। ব্যস্ততার কারণে এখন সবগুলো অপারেশনের সময় শিশুটির পাশে না থাকতে পারলেও- প্রতিটি অপারেশনের সময় সে প্রার্থনায় বসে প্রার্থনা করে।

ভাবতে অবাক লাগে, যে বয়সে একটি মেয়ের পুতুল খেলে সময় পার করার কথা- তখন পলক শিশুদের জীবন বাঁচানোর জন্য রিতিমত লড়াই করে গেছেন। অবশ্য মজার একটা ব্যাপার আছে তার। তার সাহায্য নিয়ে কোনো শিশু সুস্থ্য হলে তিনি সেই পরিবারের কাছ থেকে একটা পুতুল নেন। এর কি কারন জানতে চাইলে পলক বলেন “ যখন আমার পুতুল খেলার কথা তখন আমি আমার শৈশবের প্রায় পুরোটাই ব্যায় করেছি শিশুদের জন্য অর্থ সাহায্য তুলতে।কিন্তু আমার কাছে বন্ধুদের সাথে পুতুলখেলার চেয়ে একটি জীবন বাঁচান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই কথাটা নিজে কেমনে করিয়ে দেয়ার জন্যই আমি সুস্থ্য হয়ে যাওয়া শিশুদের পরিবারের কাছ থেকে একটা পুতুল উপহার হিসেবে নিই।”

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত