আশরাফেই আস্থা

তানিম আহমেদ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০১৬, ১৪:৪৩ | প্রকাশিত : ০৮ অক্টোবর ২০১৬, ০৮:৪২

দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছে এখন। চলতি মাসের ২২ ও ২৩ তারিখে দুই দিনের এই আয়োজনের মাধ্যমে নতুন কমিটি পাবে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দলটি। সাড়ে তিন দশক ধরে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের অবিসংবাদিত নেতা। এজন্য সভাপতি পদে কোনো পরিবর্তন আসছে না এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। দলের দ্বিতীয় প্রধান হিসেবে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বিকল্প সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। তাই কিছু গুঞ্জন থাকলেও সাধারণ সম্পাদক পদেও রদবদলের সম্ভাবনা কম, এটাই নিশ্চিত করেছে দলের একাধিক সূত্র।

গত মার্চে দলের ২০তম সম্মেলনে বিষয়টি সামনে আসার পর থেকেই পদ-পদবি নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা কাক্সিক্ষত পদ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামেন। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, দলটির প্রায় সব জাতীয় সম্মেলনেই সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়ে প্রতিযোগিতা ছিল। সম্মেলনের আগে এই পদ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা থাকত। এবার সভাপতি পদের মতো সাধারণ সম্পাদক পদেও কোনো বদল আসছে না, এটা অনেকটাই নিশ্চিত।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর সঠিক নেতৃত্বের অভাবে আওয়ামী লীগ অনেকটা টালমাটাল অবস্থায় ছিল। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দলের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বেই দলটির নবজাগরণ হয়। টানা ৩৫ বছর দলের কা-ারি হয়ে আছেন তিনি। ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচিত হওয়ার কথা থাকলেও সভাপতি পদে শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ন্যূনতম কোনো আভাষ নেই। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সৈয়দ আশরাফকেও অপ্রতিদ্বন্দ্বী মনে করছেন দলের বেশিরভাগ নেতা।

তবে এই পদের জন্য এখনো চেষ্টা-তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন বর্তমান কমিটির সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ, ওবায়দুল কাদেরসহ আরো কয়েকজন। সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ি, মাঝেমধ্যে লজ্জাও পাই। সেটা হচ্ছে সম্মেলনকে সামনে রেখে নানা আলাপ-আলোচনা আসে। পত্রিকায় ছবি বের হয় অমুকের প্রতিদ্বন্দ্বী। আমি আপনাদের স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমি আওয়ামী লীগের কোনো পদে প্রার্থী নই।’ তার বক্তব্যকে অবশ্য একটি কৌশল বলে মনে করে দলের একটি অংশ।

আশরাফের কারিশমা

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, সাধারণ সম্পাদক পদে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকেই পছন্দ দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার। এ বিষয়ে দলটির একাধিক নেতা বলছেন, এক-এগারোর সরকারের সময় আওয়ামী লীগের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা যখন কারাবন্দি শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন, দলের সেই দুঃসময়ে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে একনিষ্ঠভাবে নেত্রীর পাশে ছিলেন সৈয়দ আশরাফ। তার এবং তখনকার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই ব্যর্থ হন সংস্কারপন্থি নেতারা। শুধু তাই নয়, বিগত ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের তা-বের দিন সন্ধ্যায় সৈয়দ আশরাফের বক্তব্যকে এখনো বিভিন্ন সময় উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন আওয়ামী লীগের নেতারা।

অনেক নেতা বলছেন, সৈয়দ আশরাফ নিজের রাজনৈতিক কারিশমা আবারও দেখান ২০১৩ সালে। দশম সংসদ নির্বাচনের আগে জাতিসংঘের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতিনিধিদের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করেন। ‘নির্বাচনের ফর্মুলা’ নিয়ে আয়োজিত ওই বৈঠকগুলোয় সৈয়দ আশরাফের কূটনৈতিক দক্ষতার প্রশংসাও করেন অনেকে। সেদিন আশরাফের কূটনৈতিক যুক্তির কারণে বিএনপির প্রতিনিধিরা তাদের দাবি-দাওয়া ঠিকমতো তুলে ধরতে পারেননি।

তৃতীয়বারের মতো সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করার কারণ ব্যাখ্যা করে দলের একাধিক নেতা বলেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দেশের জন্য নিরাপদ, দলের জন্য নিরাপদ ও সর্বোপরি জননেত্রী শেখ হাসিনার জন্যও নিরাপদ। এই তিনটি গুণ বিকল্প কোনো নেতার না থাকায় সৈয়দ আশরাফের সাধারণ সম্পাদক পদে থাকা উচিত। তারা আরও বলেন, এক-এগারোর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে এখন পর্যন্ত সব রাজনৈতিক দুর্যোগ সফলভাবে মোকাবেলা করেছেন সৈয়দ আশরাফ। অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিয়ে আওয়ামী লীগের জন্য সাফল্য ছিনিয়ে এনেছেন।

আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, সৈয়দ আশরাফ সবসময়ই শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তার দর্শন হচ্ছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্ব শক্তিশালী হলে আওয়ামী লীগ শক্তিশালী হবে, বাংলাদেশ শক্তিশালী হবে। আর বিষয়টি মাথায় রেখে সৈয়দ আশরাফ সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব সুদৃঢ় করেছেন। নেতারা বলছেন, আগামী নির্বাচন পর্যন্ত আওয়ামী লীগকে দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মতো নেতার প্রয়োজন। কারণ তিনি ইতিমধ্যেই শেখ হাসিনার আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছেন।

আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, টানা দুইবার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের সময় সৈয়দ আশরাফের বিরুদ্ধে কেউ কোনো দুর্নীতি, অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলতে পারেনি। কেউ কেউ মনে করেন, স্বল্পভাষী এই নেতা নিজের ব্যক্তিত্বের গুণে রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনায় তার বক্তব্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে উত্তেজিত না করে বরং আশ্বস্ত করেছে। সর্বশেষ নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে সৈয়দ আশরাফের বক্তব্যকে বিরোধী বিএনপিও স্বাগত জানিয়েছে। এ বিষয়টিকে তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা বলে মনে করেন আশরাফের শুভাকাক্সক্ষীরা।

দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্বে থাকলেও সৈয়দ আশরাফের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ নেই। কোনো ফিসফাঁসও নেই। তদবিরবাজদের থেকে নিজেকে দূরে রাখেন তিনি। সৈয়দ আশরাফের যে কোনো সমালোচনা নেই তা অবশ্য নয়। তার বিরুদ্ধে প্রধান সমালোচনা দুটি। প্রথমত, তিনি মন্ত্রণালয়ে বরাবরই গরহাজির থাকেন। দ্বিতীয়ত, সংগঠন গোছাতে তার তৎপরতার কমতি রয়েছে বলেও কেউ কেউ বলে থাকেন। কর্মীরা সহজে তার নাগাল পান না।

এ সব বিষয়ে সৈয়দ আশরাফ তার ঘনিষ্ঠদের বলেছেন, দলে রাজনীতি উন্মুক্ত রাখতেই তিনি একা সব কিছু দেখভাল করেন না। ৭ সাংগঠনিক, ৩ যুগ্ম সম্পাদকসহ দলের সভাপতিম-লীর সদস্যদের রাজনীতিতে স্পেস দিতেই তিনি সব ক্ষেত্রে সক্রিয় থাকেন না। আর তার মন্ত্রণালয়েই সবচেয়ে বেশি কাজ হয়। তদবিরবাজদের কাছ থেকে নিজেকে দূরে রাখতেই তিনি মন্ত্রণালয় ও দলীয় কার্যালয়ে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সময় দেন না। দু-একটি সমালোচনা উতরে সৈয়দ আশরাফ বাংলাদেশের রাজনীতির এক বিরল চরিত্র। তার ক্লিন ইমেজে কখনো কালিমা পড়েনি।

গত বছর জুলাইয়ে অবশ্য সৈয়দ আশরাফকে নিয়ে সরকার এবং আওয়ামী লীগে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। তাকে সরিয়ে দেওয়া হয় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর পদ থেকে। সহসাই তিনি জনপ্রশাসনমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। শেষ হয়ে যায় তাকে ঘিরে সব গুঞ্জন। মন্ত্রণালয় বদলের ওই ফাঁকা সময়ে নানা গুজবের মধ্যেও এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি লাভের জন্য রাজনীতি করি না। আমার পিতা সততার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন, নেতার জন্য মৃত্যুবরণ করেছেন। এটাই আমার রক্ত।’ সৈয়দ আশরাফ সাধারণত মিডিয়াবিমুখ। কথা বলেন কম। তবে যখন যা বলেন তা গুরুত্ব পায়। প্রায়ই দলীয় নেতা-কর্মীদের সতর্ক করেন তিনি। ‘খাই খাই’ স্বভাব থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান বারবার। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের ঘটনার যেন কোনো পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার জন্য কর্মীদের সজাগ থাকতে বলেন তিনি।

নতুন কমিটিতে সৈয়দ আশরাফ যে সাধারণ সম্পাদক পদে থাকছেন, এমন ইঙ্গিত দিয়ে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক দলের একজন সভাপতিম-লীর সদস্য ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘সম্মেলনেই আওয়ামী লীগের নেতা নির্বাচিত করা হয়। আওয়ামী লীগকে গতিশীল করতে কাকে নেতা বানানো যায় তা কাউন্সিলররা ঠিক করেন। তবে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ইতিমধ্যে যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি গত দুই মেয়াদে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করতে চেষ্টা করেছেন। আমার জানা মতে, শেখ হাসিনার আস্থাও অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি।’

ঢাকাটাইমস/০৭অক্টোবর/টিএ/এমএইচ

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত