পারফিউম

মনদীপ ঘরাই
 | প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৩:৫৪

“আমার আগামী জন্মদিনে কি দেবে?” একরাশ কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে নিশি।

“ এই তো সেদিন জন্মদিন গেল। আবার তো সামনের বছর। ফেব্রুয়ারি আসুক আগে। একটা আকাশ আর একবুক সাগর দেব, চলবে?” বলেই হাসতে থাকে নিশান।

নিশি এবার মিছে রাগ করে বলে, “ঢং! গত জন্মদিন ভুলে গেছিলে, মনে আছে?”

“বাবা রে বাবা! কতবার সরি বলেছিলাম, তা মনে আছে? ১০৩ বার”

“ যাও। কিচ্ছু দিতে হবে না। এখন বাজারে যাও তো। আমার জন্য না হোক। আমার মধ্যে একটা নতুন প্রাণ আছে না? ওর কথা চিন্তা করে তো আলসেমি ছাড়ো! ও: আর শোনো, জন্মদিনে আমাকে একটা ভালো পারফিউম দিও। ইদানিং সব গন্ধ খুব নাকে লাগে।”

এই এক ব্যপারে মারাত্মক আবেগী নিশান। ওদের অনাগত সন্তান। আর কদিন পরেই বাবা হতে যাচ্ছে নিশান। এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কি হতে পারে? লাফ দিয়ে উঠে বাজারের ব্যাগ খুঁজতে থাকে রান্না ঘরে।

নিশি রিমোটটা নিয়ে বসেছে। টিভি দেখবে বোধ হয়। বেডরুমে বসেই নিশানের দরজা আটকানোর শব্দ টের পায়।

বাজারে গিয়ে সব মনে করে করে কিনতে লাগলো নিশান। পেটে সন্তান আসার পর নিশি আর ফর্দ লিখে দেয় না। তাতে লাভ একটা হয়েছে। কিছু ভুলে গেলে ওই দোহাই তো দিতে পারে!

ঘেমে নেয়ে বাজার নিয়ে ফিরে এসে নিশান দেখে টিভিতে খবর দেখে কাঁদছে নিশি। ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে নিশান বলে, “ কি হয়েছে সোনা তোমার? কোনো বিপদ হলো নাকি?”

নিশি চোখ মুছতে মুছতে বললো, “ কিছু না। নিমতলী ট্রাজেডির আজ আট বছর হলো। কতগুলো প্রান গেছে সেদিন। আহা রে! কত কষ্ট পেয়ে মানুষগুলো পুড়ে মরেছে…..”

“ও। এই ব্যাপার! ধুর পাগলী, এতে কান্নার কি আছে? সবাই দেখো না ভুলতেই বসেছে”

“হ্যাঁ । সবাই ভুলতে পারে । তুমি আমি কি পারবো?”

“ না না। ওভাবে তো বলি নি।ওই দিনই তো প্রথম দেখেছিলাম তোমায়। কি লাজ নিয়ে দেখেছিলে আমাকে”

“ ও: মনে আছে তাহলে? তুমি একদম স্মার্ট ছিলে না তখন। বাচ্চা ছেলে!”

হাসতে হাসতেই দুজন টিভির দিকে চোখ ফেরায়। নিমতলী নিয়ে আরেকটা রিপোর্ট দেখাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিমতলীর তিন কন্যাকে নিয়ে রিপোর্ট। এখন ভালই আছে তারা। রুনা,রত্না ও আসমার নিয়মিত খোঁজও রাখেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।

রিপোর্টটা দেখতে দেখতে হঠাৎ রিমোট চেপে টিভিটা মিউট করে দেয় নিশি। বলে ওঠে, “নিশান, আমাদের তো ছেলে হবে। চলো না নিমতলীর রত্নার সাথে মিলিয়ে আমাদের ছেলের নাম রত্ন রাখি”

ব্যাপারটা যে খুব মন থেকে নিশান মেনে নিয়েছে, তা নয়। তার ইচ্ছে ছিল ছেলের নাম “ন” দিয়ে রাখে। কিন্তু নিশির মন ভাঙ্গতে ইচ্ছে করলো না। বললো, “রাজি। ১০০ তে ১০০ রাজি”

নিশির মুখে হাসি ফুটলো। আনমনে কেন জানি বলে উঠলো, “আমার না আগুনে অনেক ভয়, নিশান। নিমতলীর মতো আগুন লাগলে তুমি কি আমাকে ফেলে দৌঁড় দেবে? আমি তো এ অবস্থায় নড়তেও পারবো না।“

নিশান আঙ্গুল দিয়ে নিশির মুখ চেপে ধরে বললো, “চুপ। একদম আজেবাজে বলবে না। কোনদিন ছেড়ে যাবো না তোমাদের।দরকার হলে নিজে আগে মরবো।“

“তোমাদের? আমি ছাড়া আবার কে আছে তোমার?”

“বা রে! রত্নের কথা ভুলে গেলে!”

দুজন মিলে খুব হাসলো। মন খুলে হাসলো। দুজন মিলে একটা কাগজে গোটা গোটা অক্ষরে লিখে রাখলো, “রত্ন”। নিশানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিশি বললো,

“বাঁচবো একসাথে। পাশে থেকো”

রত্নের আগমনী ভাবনায় দুজনের দিন কাটতে থাকে। কাল ২১ ফেব্রুয়ারি। মহান ভাষা দিবস। শোকের দিন। এদিনই জন্মেছে নিশি। শোকের দিনে উদযাপন করবে না বলে প্রতিবছর একদিন আগেই জন্মদিন পালন করে ও। নিশান এই সিদ্ধান্তের সাথে মন থেকে একমত। একদিন আগে জন্মদিন, তাই উপহারও কিনতে হবে একদিন আগেই।

সকাল সকাল উঠেই অফিসে দৌঁড় দেয় নিশান। আজ নিশির জন্মদিন পালনের দিন। ফেরার পথে নিতে হবে উপহার, মানে পারফিউম।  সারাদিন ব্যস্ততার মধ্যে মনেই ছিল না। অফিস শেষে মনে পড়লো ।ফেরার পথে কোনো একটা দোকানেও পছন্দ হলো না পারফিউম। ব্যর্থ মনোরথে বাসার পথে পা বাড়ায় নিশান। আজ খালি হাতেই ফিরতে হবে। গতবারের মতো সরি বলা ছাড়া আর উপায় নেই। অন্য যে কোন কিছু বলতো! পারফিউম! গন্ধ পছন্দ না হলে কেনা যায়? নিশিটাও না! মনে মনে বলে নিশান।

সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠেই চোখটা চকচক করে ওঠে তার । ওদের বাসার দোতলাতেই তো পারফিউমের গোডাউন। আর ও কি না এদিক-ওদিক খুঁজে মরছিল! গোডাউনের চার্জে থাকা সালেকের সাথে সখ্যতা তার বহুদিনের। গোডাউনে ঢুকেই কথাবার্তা ছাড়া সালেককে বললো,

“সালেক ভাই,বাঁচান। নিশির জন্মদিন। পারফিউম লাগবে।“

সালেক সাহেব বললো, “আরে আগে জিরাবা তো এট্টু। দিতাছি পারফিউম। মাগার ১২ টার প্যাকেট। এর কমে নিবার পারবা না কইলাম।“

নিশান অস্থির হয়ে বললো, “দরকার হলে পুরো গোডাউন কিনবো। নিশির জন্মদিন বলে কথা! “

১২ টা পারফিউমের ক্রেট নিয়ে উপরে উঠে বাসার দরজায় কড়া নাড়ে নিশান।

বাসার ছোট্ট কাজের মেয়েটা দরজা খুলে দেয়।

“তোর আপু কই রে?”

“আপু রান্নাঘরে। হাত পুড়সে”

জুতো পড়েই এক দৌঁড়ে রান্নাঘরে যায় নিশান। সামান্য পুড়েছে নিশির হাত। তাতেই নিশির চোখ মুখে আতঙ্ক।

“দেখি দেখি। কিচ্ছু হয় নি। ঠিক হয়ে যাবে। এটুকু পোড়াতে ভয় পেতে নেই নিশু”

“আমি কি আর ইচ্ছে করে ভয় পাই? আমার আগুনে খুব ভয়। তুমি তো জানই”

“জানি তো। এবার আসো। তোমার জন্য উপহার এনেছি”

দুজনেই ড্রইং রুমে আসে। নিশির হাতে এক ডজন পারফিউমের বোতল তুলে দেয় নিশান।

“আরে! করেছ কি পাগল? পারফিউম কি আর গোলাপ নাকি যে ডজন ধরে আনলে?”

“তোমার জন্য সব পারি”

“নিশান, কেন যেন খুব ভয় হয়। আমাকে কখনও ছেড়ে যাবে না তো?”

উত্তর দেবার আগেই বিকট শব্দে বিষ্ফোরন হয়। জানালা থেকে আগুনের লেলিহান শিখা স্পষ্ট দেখতে পায় নিশান। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখে জানালার পর্দাটা পুড়ছে।

কাঁপছে নিশি। বাসার কাজের মেয়েটা বাথরুম থেকে বালতি এনে পর্দার আগুন নেভাচ্ছে।

কি হচ্ছে এসব। চিৎকার, বিষ্ফোরন আর সিঁড়িতে সবাই একসাথে নামার শব্দ।

“চলো নিশি, চলো, বাঁচতে হবে আমাদের। রত্নকে বাঁচাতে হবে।“

নিশির শরীরটা গত কদিন ধরেই নানান কারণে খারাপ ছিল। ঘটনার আকস্মিকতায় যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। বললো,”আমি পারছি না নিশান।পারবো না সিঁড়ি বেয়ে নামতে। তুমি যাও”

দৌঁড়ে দরজার কাছে চলে যায় নিশান। দরজাটা খুলে কাজের মেয়েটাকে বলে,

“তুই যা”

মেয়েটা চোখের সামনে দৌঁড়ে নামে

সময় নেই। সময়ের বড় অভাব।

নিশান দরজাটা আটকে দেয়। নিশি কাঁদছে।

ড্রইং রুমের মেঝেতে বসে শিশুর মতো কাঁদছে নিশি।

নিশির পাশে গিয়ে মেঝেতে বসে তাকে জড়িয়ে ধরে নিশান।

চোখ বেয়ে জল পড়ছে দুজনেরই।

নিশান নিশির পেটে হাত রেখে বলে, “  রত্ন, তোকে আমরা আলো দেখাতে পারলাম না রে বাবা। ক্ষমা করে দিস”

নিশি শেষবারের মতো বলে, “তুমি যাও”

নিশান নিশির গালে হাত রেখে বলে, “তুমি হলে যেতে?”

এই কথাটাই শেষ কথা দুজনের। আগুন হানা দিয়েছে ঘরের মধ্যে। আগুন ভয় পাওয়া নিশি এত সাহস পেয়েছে কোথায়? হয়ত নিশানের কাছে।

মুহূর্তে পুড়ে ছাড়খার হয় নিশি, নিশান, রত্ন আর পারফিউমের বোতলগুলো।

আগুন গিলছে সবকিছু। শুধু হাওয়ায় ভেসে উড়ে যায় একটুকরো কাগজ।

 আর তাতে নিশি আর নিশানের লেখা্ একটা শব্দ “রত্ন”।

পারফিউমের গুদামের পুরোটাই ফেটেছে বিকট শব্দে। বাতাসে পোড়া গন্ধ। নিশির গন্ধ,নিশানের গন্ধ, রত্নের গন্ধ, ভালোবাসা আর কষ্টের গন্ধ।

সেই সাথে ছড়িয়ে পড়েছে পারফিউমের গন্ধ।হয়তো নিশির জন্য।  নিশি ইদানিং গন্ধ সইতে পারে না। একদম না...

[বি.দ্র.- সব চরিত্র কাল্পনিক। তবে, উৎসর্গ করছি রিফাত, রিয়া আর তাদের অনাগত সন্তানকে।]

মনদীপ ঘরাই: সিনিয়র সহকারী সচিব এবং লেখক

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :