ডাক্তারদের ধর্মঘটে অচল পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যসেবা

ঢাকাটাইমস ডেস্ক
 | প্রকাশিত : ১৪ জুন ২০১৯, ০৮:৪১

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সব সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা দুই সহকর্মী জুনিয়ার ডাক্তারদের রোগীর আত্মীয় পরিজনের হাতে মার খাওয়ার প্রতিবাদ জানাতে দুদিন ধরে ধর্মঘট চালাচ্ছেন। তারা দাবি করছেন যে, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, না হলে তারা কাজে ফিরবেন না। জরুরি বিভাগ বা বহির্বিভাগ- সবকিছুই বন্ধ।

জুনিয়ার ডাক্তার আর ইন্টার্নরাই রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলোতে পরিষেবার মূল ভিত্তি, তারা কোনোরকম কাজ করছেন না।

অন্যদিকে রোগীদের পরিবার পরিজন বলছেন, ‘ডাক্তারবাবুদের মারাটা অত্যন্ত খারাপ কাজ হয়েছে। কিন্তু আমাদের মতো যাদের আর্থিক সংস্থান নেই, বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পারব না, বিপদ হয়েছে আমাদের।’

এদের সমর্থনে সারা দেশেই কর্মবিরতির ডাক দিয়েছে বেশ কয়েকটি জাতীয় স্তরের চিকিৎসক সংগঠন।

সোমবার রাতে কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক রোগীর মৃত্যু এবং চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ তুলে দুই জুনিয়ার ডাক্তারকে মারধর করা হয়। দুটি ছোট ট্রাকে করে মৃত রোগীর পাড়া প্রতিবেশীরা লাঠি, ইট নিয়ে হাসপাতালে এসে তাণ্ডব চালায়।

তাদের ছোঁড়া ইটের ঘায়ে পরিবহ মুখার্জী নামের এক জুনিয়ার ডাক্তারের মাথার খুলিতে চোট লাগে। সেদিন রাত থেকেই ওই হাসপাতালে টানা কর্মবিরতি চলছে।

তবে চিকিৎসকদের বিক্ষোভ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে রাজ্যের অন্য সব সরকারি হাসপাতালেই।

বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ডাক্তারদের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘দুদিন হয়ে গেছে। আজকের মধ্যেই যদি কাজে যোগ না দেন, পুলিশ কড়া ব্যবস্থা নেবে। যারা এসব করছে, তাদের হোস্টেল আর হাসপাতাল থেকে বার করে দেওয়া হবে। জরুরি পরিষেবা আইনও ব্যবহার করব আমরা।’

মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারির পরে আন্দোলনরত ডাক্তাররা আরও অনড় অবস্থান নেন। তার ওই হুঁশিয়ারির খবর অন্যান্য হাসপাতালে পৌঁছনোর পরে জুনিয়ার ডাক্তার, ডাক্তারির ছাত্রছাত্রী আর সিনিয়র চিকিৎসকদের অবস্থান বিক্ষোভে মুহুর্মুহু সরকার-বিরোধী স্লোগান উঠতে থাকে। তারা সিদ্ধান্ত নেন যে ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়া হবে।

তবে এই প্রথম নয়, এর আগেও পশ্চিমবঙ্গের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসক নিগ্রহ, ভাঙচুরের অনেক ঘটনা হয়েছে। সব ক্ষেত্রেই রোগীর পরিবারগুলির অভিযোগ থাকে যে চিকিৎসায় অবহেলা হয়েছে বা গাফিলতির কারণেই রোগী মারা গেছেন।

নীলরতন সরকার মেডিকাল কলেজের এক চিকিৎসক সঞ্জয় মুখার্জি ব্যঙ্গ করে বলছিলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে যে ব্যাপারটা হয়েছে, তা হল, ডাক্তার ছাড়া বাকি সকলেই ডাক্তারিটা ভাল বোঝেন। আমরা পরীক্ষা দিয়ে ডাক্তারি পড়তে ঢুকেছি। পাঁচ বছর পড়েছি, একবছর ইন্টার্নশিপ করেছি, তারপরে আরও দু'বছর পড়ে এম ডি করেছি। তাতেও যদি মানুষের মনে হয় যে আমি কিছুই শিখি নি, তাহলে কেন আসছেন চিকিৎসা করাতে আমাদের কাছে?’

‘আমাদের কাছে না এলেই তো আর ভুল চিকিৎসা করব না, পেশেন্ট মারাও যাবে না। সেটাই তো সবার জন্য মঙ্গল হবে তাহলে," বলছিলেন ওই সিনিয়র ডাক্তার।

চিকিৎসকরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে ডাক্তারদের নিগ্রহ বা হাসপাতাল, নার্সিং হোম ভাঙচুর রোধে কড়া আইন আছে। ওই আইনে গ্রেপ্তার হলে জামিন যেমন পাওয়া কঠিন, তেমনই দোষী সাব্যস্ত হলে ক্ষতিপূরণও দিতে হয়। কিন্তু সেই আইন প্রয়োগই করা হয় না বেশীরভাগ ক্ষেত্রে।

আরেক চিকিৎসক দীপক গিরির কথায়, গাফিলতি বা অবহেলার অভিযোগ শুধু চিকিৎসকদের দিকেই তোলা হয়। কিন্তু সরকারি হাসপাতালগুলোর যে পরিকাঠামো নেই, সেটা কে দেখবে?

তার কথায়, "একজন ডাক্তার তো শুধু রোগীকে চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুলতে পারে না। তার জন্য প্রয়োজন পরিকাঠামো। সেটাই তো ভেঙ্গে পড়েছে এ রাজ্যে! আর এই অব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। যতদিন না পরিকাঠামো গড়ে তোলা যাবে, ততদিন চিকিৎসা পরিষেবার হাল ফিরবে কী করে? আর দোষ পড়বে আমাদের ওপরে, মার খাব আমরা।"

অন্যদিকে চিকিৎসা পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সব থেকে সংকটে পড়েছেন রোগীদের আত্মীয়স্বজন। নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজেই এক আসন্নপ্রসবাকে নিয়ে এলেন তার আত্মীয়রা।

তারা বলছিলেন, ‘পেশেন্টের যেকোনো সময়ে প্রসব হবে। দুটো হাসপাতালে ঘুরলাম। কোথাও ডাক্তার নেই। বলা হচ্ছে ভর্তি করলেও ওরা কোনও দায়িত্ব নেবে না, কোনও চিকিৎসা হবে না। গরীব মানুষ আমরা! কোন্ বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাব এখন?’

আরেকজন রোগীর আত্মীয় বলছিলেন ডাক্তারদের নিগ্রহ করাটা খুবই অন্যায়, কিন্তু তারা পড়েছেন বিপদে।

‘ডাক্তারদের মারাটা মোটেই ঠিক হয় নি। তাই ওরা যেটা করছেন তার বিরোধিতাও করা উচিত নয়। কিন্তু অসুবিধায় তো আমরা পড়লাম।’

আরেক রোগীর আত্মীয় দিলীপ যাদব বলছিলেন, ‘একজন রোগী মারা গেছে, তার পরিবারের রাগ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সেই রাগে তারা ডাক্তারবাবুদের যেভাবে মেরেছে, তাতে আমরা এই হাজার হাজার রোগী যে মরতে বসেছি।’

অন্যদিকে শুক্রবার সারা দেশে চিকিৎসকদের কর্মবিরতির ডাক দিয়েছে জাতীয় স্তরের কয়েকটি চিকিৎসক সংগঠন। -বিবিসি বাংলা

(ঢাকাটাইমস/১৪জুন/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :