ছাই, কয়লা আর আর্তনাদের চলন্তিকার বস্তি

কাজী রফিক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০১৯, ২০:০৮ | প্রকাশিত : ১৭ আগস্ট ২০১৯, ১৫:৩৪

সাড়ে তিন ঘণ্টার আগুনে ছাই হয়ে গেছে বছর ধরে সাজানো সংসার। কারও আবার হারিয়ে গেছে কয়েক বছরের সাধনা, সম্বল আর সম্পদ। সব কিছু হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে হতাশার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছেন চলন্তিকা বস্তির বাসিন্দারা। কে কী করবেন একদিনে যেমন সেই ভাবনা অন্যদিকে, সব কিছু হারানোর হাহাকার আর আর্তনাদ। 

শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটা কিছু পরে রূপনগরের চলন্তিকা মোড়ের বস্তিতে আগুন লাগে। বিশাল আয়তনের জায়গা জুড়ে ঝিলের উপর গড়ে ওঠা বস্তিটি চার ভাগে বিভক্ত। এখানে রয়েছে আবাসিক কবিরের বস্তি, চলন্তিকা বস্তি, ৭ নম্বর বস্তি এবং হাজী রজ্জবের (স্থানীয় কাউন্সিলর) বস্তি। রজ্জবের বস্তি রক্ষা পেলেও আগুনে পুরোপুরি ছাই হয়ে গেছে বাকিগুলো। রয়েছে শুধু ছাই আর কয়লা। 

শনিবার সকালে বস্তি ঘুরে ঘরের টিন, ছাই আর কয়লা ছাড়া কিছুই চোখে পড়েনি। দেখা গেছে এক সন্ধ্যায় সব কিছু হারানো মানুষের আহাজারি।
পারভীন আক্তার তার পোড়া ঘরের দিকে তাকিয়ে অঝোরে কেঁদে চলছিলেন। কান্নাভেজা কন্ঠে ঢাকা টাইমসকে বলেন, আগুন লাগার সময় তারা ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলেন। ঘরে ছিল বড় মেয়ে। আগুন দেখে মেয়ে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। মেয়ের কোন ক্ষতি না হলেও ঘরের কোন কিছুই আগুনে হাত থেকে রক্ষা পায়নি। 

ঘটনার সময় নিজের ঘরেই শুয়ে ছিলেন রুনু বেগম। আগুনের কথা শুনে ঘর থেকে বের হয়ে আসেন। তারপরে আর আগুন থাকে ঘরে ঢুকতে দেয়নি। বের করা সম্ভব হয়নি ঘরের ভেতরে থাকা দামি জিনিসপত্র বা কাপড় চোপড়।

কাঁদতে কাঁদতে রুনু বেগম বলেন, ‘এক কাপুড়ে বাইরাইয়া আইছি। আমার আর কিছুই নাই... আমার সব শ্যাষ।’

ঘর আর সম্পদ হারানোর পাশাপাশি নিজের জীবিকাও হারিয়েছেন কেউ কেউ। ঢোল বাজিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা মুরাদ ঢুলি জানান, শুক্রবার সন্ধ্যার আগুনে পুড়ে গেছে তার জীবিকার একমাত্র অবলম্বন, তার ঢোল। আগুন কেড়ে নিয়েছে তার সহায় সম্বল সব কিছুই। 

বলেন, ‘এখন আল্লাহ আল্লাহ ছাড়া কিছু করার নাই। সব শেষ আমার কিচ্ছু নাই।’

বস্তিতে কী পরিমাণ ঘর রয়েছে এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। সিটি করপোরেশনের বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো পরিসংখ্যান নেই।

স্থানীয়রা জানান, বস্তিতে প্রায় দুই হাজারের বেশি ঘর ছিল। আর এসব ঘর ভাড়া দেয়া হত। ঘর প্রতি দেড় থেকে দুই হাজার টাকা ভাড়া হিসেবে এখানে বসবাস করত কয়েক হাজার পরিবার। সিটি করপোরেশনের মতে, এ বস্তিতে বসবাসকারীর সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার।

বস্তিটিতে ছিল গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ। এরমধ্যে ওয়াসার পানির সংযোগের বৈধতা থাকলেও স্থানীয় নেতাদের ছত্রছায়ায় অবৈধভাবে বস্তিতে ছিল তিতাসের গ্যাস এবং ডিপিডিপির বিদ্যুৎ সংযোগ। 

আগুনে বসতবাড়ি পুড়ে ছাই হওয়ার পাশাপাশি পুড়ে গেছে বেসরকারি সংস্থার চারটি স্কুল, একটি মসজিদ ও একটি এতিমখানা।

অটোচালক মামুন বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলেন না। গাড়ি (অটোরিকশা) চালাইতে গেছিলাম। মোবাইলে একজন কইল আগুন লাগছে। আইসা দেখি আমার ঘরে আগুন। আমি আইতে আইতে সব পুইড়া গেছে।’

অন্যের বাসা বাড়িতে কাজ করে কিছু টাকা জুগিয়ে ৪০টি ঘরে তুলেছিলেন ওসুমান বেগম। দুই ছেলে, এক মেয়ে, মেয়ের জামাই, নাতিসহ সবাইকে নিয়ে এখানে বসবাস ছিল তার। নিজেদের বসবাসের পর  যে কয়টি ঘর খালি ছিল তা ভাড়া দিয়েছিলেন। চলতেন সেই টাকা দিয়েই। 

সব হারিয়ে প্রায়ই মূর্ছা যাচ্ছিলেন এই নারী। এক ফাঁকে তিনি বলেন ওঠেন, ‘শ্যাষ হইয়া গেছি...আমি এহন কী করুম...’

স্থানীয়দের মতে, বস্তির বাসিন্দা ফরিদের ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত। ফায়ার সার্ভিসও তাদের প্রাথমিক ধারণায় জানিয়েছেন, বৈদ্যুতিক শর্টশার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। মূল কারণ জানতে এরই মধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।  

ফায়ার সার্ভিস জানায়, সন্ধ্যা ৭টা ২২মিনিটে তাদের খবর দেয়া হলে ছয় মিনিট পর তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। প্রথম সাতটি ইউনিট কাজ শুরু করলেও একেএকে বাড়ানো হয় ইউনিট সংখ্যা। ২৪টি ইইউনিটের ১২৫ জন দমকলকর্মী প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা চেষ্টা করে রাত সাড়ে ১০টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। 
এসময় ফায়ার সার্ভিসের সাথে যোগ দেয়, ওয়াসার চারটি পানিবাহী গাড়ি ও ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবী। এছাড়া আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে স্থানীয় জনতা। 
আগুনে ঘটনায় কেউ নিহত না হলেও আহত হয়েছেন চারজন। তবে তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক নয়।

ঢাকাটাইমস/১৭আগস্ট/কারই/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজধানী বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :