আওয়ামী লীগে শুদ্ধি অভিযান

অপকর্মে জড়িত নেতাদের মনে ভীতির সঞ্চার

সৈয়দ ঋয়াদ
| আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:৫৫ | প্রকাশিত : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৭:৫৯
ফাইল ছবি

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কাছে চাঁদাদাবির অভিযোগ মাথায় নিয়ে নজিরবিহীনভাবে ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতাকে পদ ছাড়তে হয়েছে। এরপরই আওয়ামী লীগ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোতে শুদ্ধি অভিযান চালানোর কড়া হুঁশিয়ারি দল প্রধান শেখ হাসিনার। এরইমধ্যে দুর্নীতিতে জড়িত, বিভেদ সৃষ্টিকারী, বিদ্রোহী, অনুপ্রবেশকারী আর কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না- এমন নেতাদের আমলনামা সংগ্রহ করছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। এমন নেতাকর্মীর বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থা, বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে সংগৃহীত রিপোর্ট জমা পড়ছে তার টেবিলে।

এবার শুদ্ধি অভিযানের পালা। এই অভিযান চলবে আগামী ডিসেম্বরে দলের ২১তম জাতীয় কাউন্সিলের আগ পর্যন্ত। অভিযানে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অস্ত্রবাজি, ইয়াবাখোর ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলে দলের যেইই হোক না কেন রেহাই মিলবে না। আর সর্বোচ্চ এই সিদ্ধান্তে এরইমধ্যে বুকে কাঁপন তুলেছে নানা অপকর্মে জড়িত নেতাকর্মীদের মনে।

এরই মধ্যে দলে খবর ছড়িয়েছে তালিকাভুক্ত কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। অভিযোগ প্রমাণ হলেই শাস্তির আওতায় আনা হবে। দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোভাব অত্যন্ত কঠোর। তিনি আগামী তিন মাসের মধ্যে এ শুদ্ধি অভিযান সম্পন্ন করতে চান।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, দলের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রত্যেক কর্মীর কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করছেন দলীয় সভাপতি। রাজনীতির নামে কোনো চাঁদাবাজি, পেশিশক্তি প্রয়োগ এর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছেন শেখ হাসিনা। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই কঠোর বার্তা তিনি দিয়েছেন সহযোগী সংগঠনগুলোর প্রতি।

দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা টাইমসকে বলেন, টানা তৃতীয় মেয়াদের সরকারপ্রধান হওয়ার পর শেখ হাসিনা দলের গুটিকয়েক কর্মীর জন্য নিজের ও সরকারের অর্জনকে ব্যর্থ হতে দেবেন না। তার সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- বিতর্কিত ও অগ্রহণযোগ্য নেতাকর্মীদের কারণে ম্লান হয়ে যাবে- এ ব্যাপারে তিনি তিল পরিমাণ ছাড় দিতেও রাজি নন। আর সে কারণেই দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।

আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এ নেতার ভাষ্যমতে, ছাত্রলীগ দিয়ে শুরু হলেও দলের অন্য অঙ্গ-সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়েও কাজ করছেন শেখ হাসিনা। গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট ও তৃণমূল থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নেতাকর্মীদের অভিযোগ যাচাই করছে দলের হাইকমান্ড। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শিগগিরই ব্যবস্থা নেবেন দলের সভাপতি।

সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য ফারজানা ইসলামের অভিযোগের ভিত্তিতে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে পদচ্যুত করা হয়েছে। এ ছাড়া দল মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হওয়া তৃণমূলের বিভিন্ন ইউনিটের পদধারী ১৭৭ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। এসবই শুদ্ধি অভিযানের অংশ বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগ নেতারা।

দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছাত্রলীগ যুবলীগসহ দলের প্রতিটি ইউনিটের নেতাকর্মীদের ভালোমন্দের তথ্য আছে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর নজরদারিতে আছেন মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য, দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা ও কয়েক ডজন সাংসদও।

গণ ভবনের একটি সূত্র জানায়, বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত অভিযোগ রয়েছে এমন নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের শরণাপন্ন হচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ খাতায় নিজের নাম আছে কিনা এমন খবরের সত্যতা পরীক্ষায় গণভবনের নিয়মিত যাতায়াত করছেন তারা বলে আতঙ্কে থাকা অনেক নেতাকর্মীই ভিড় করছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের বাসভবনে। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে যারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে গ্রহণযোগ্য, তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছেন তারা।

আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘পেশিশক্তি প্রদর্শন করা নেতাকর্মীদের নেত্রী পছন্দ করেন না। তিনি সব সময় চান নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। যারা মানুষের মন ভালোবাসা আর উদারতা দিয়ে জয় করবে। তাই সম্মেলনের আগে প্রায় সব নেতাকর্মীদের জন্য এটা এক ধরনের পরীক্ষাও বলা যায়।’

উল্লেখ্য, টানা ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার পর একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ’ করার কথা ঘোষণা দেয়। ১২টি ভাগে আলাদা শিরোনামে প্রকাশ করা সেই নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ ‘দুর্নীতি একটি বহুমাত্রিক ব্যাধি’ হিসেবে চিহ্নিত করে বলে, ‘পেশিশক্তির ব্যবহার ও অপরাধের শিকড় হচ্ছে দুর্নীতি।’

‘যার ফলে রাষ্ট্র ও সমাজজীবনে অবক্ষয় বা পচন শুরু হয় এবং অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন প্রভৃতি কোনো ক্ষেত্রেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয় না। দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও আইনের প্রয়োগ মুখ্য হলেও তা শুধু সরকারের দায় নয়, জনগণেরও দায় রয়েছে। আমরা মনে করি, দুর্নীতি দমনে প্রয়োজন সরকার ও জনগণের সমন্বিত পদক্ষেপ।’

লক্ষ্য ও পরিকল্পনায় দলটি ঘুষ, অনুপার্জিত আয়, কালো টাকা, চাঁদাবাজি, ঋণখেলাপি, টেন্ডারবাজি ও পেশিশক্তি প্রতিরোধ এবং দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও উল্লেখ করেছিল।

ঢাকা টাইমস/১৮সেপ্টেম্বর/ডিএম

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :