শিক্ষাঙ্গনে ছাত্ররাজনীতির নামে যা চলছে তা ক্ষতিকর

অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী
| আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০১৯, ১৮:২৮ | প্রকাশিত : ১৩ অক্টোবর ২০১৯, ১২:১৯
অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী

ছাত্ররাজনীতির প্রথম ভূমিকা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ যাতে ভালো থাকে সেদিকে খেয়াল রাখা। যেমন ক্যান্টিন, হল, লাইব্রেরি এসবে কোনো সমস্যা থাকলে তার প্রতিবাদ করা। উপাচার্য থেকে শুরু করে যারা আছেন ছাত্রকল্যাণ পরিচালক, প্রভোস্ট তারা এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যাগুলো দূর করা। এছাড়া সহশিক্ষা কার্যক্রম যেমন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, হলভিত্তিক, বিভাগভিত্তিক অর্থাৎ পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনডোর গেমস, আউটডোর গেমস পরিচালনা করা।

যেসব ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্যে এসেছে। সর্বশেষ যে ঘটনা ঘটেছে, আবরার ফাহাদ নামে এক ছেলেকে এক রুম থেকে মারধর করে আরেক রুমে নেয়া হয়েছিল। এগুলো এখন অবিশ্বাস্য মনে হয়। আমাদের সময়ে প্রায় ৯০ ভাগ ছাত্র হোস্টেলে থাকত। আমি বাসা থেকে গিয়ে ক্লাস করতাম। আবরার হত্যার পর ছাত্র সমাবেশে অনেক প্রাক্তন ছাত্র-শিক্ষক এসেছে সবাই বলেছে এখনকার প্রভোস্টরা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেন না। অর্থাৎ হলের খোঁজখবর ঠিকমতো রাখেন না। রাজনীতি করা ছাত্ররা নাকি টর্চার সেল বানিয়েছে হলে। এখানে সাধারণ ছাত্রদের ডেকে নিয়ে টর্চার করা হতো। এটা শুরু হলো র‌্যাগিং দিয়ে।

আমি শিক্ষক ছিলাম ২০০১ সাল পর্যন্ত। তারপর আমি চলে গেলাম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। আগে র‌্যাগিং যেটা ছিল সেটা হলো বিদায়ী ছাত্ররা টাকা-পয়সা তুলে একটা আনন্দফুর্তির আয়োজন করত। ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রদের ধরে নিয়ে নির্যাতন করা এটা গত কয়েক বছর ধরে শুরু হয়েছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েও আমি ৯ বছর ছিলাম। ওখানে কিছু কিছু এ ধরনের ঘটনা ঘটে। র‌্যাগিংয়ের নামে এত বেশি ফিজিক্যাল, মেন্টাল টর্চার করা হয় যে, অনেক ছেলে বুয়েট ছেড়ে চলে গেছে। এটা প্রথম থেকে বন্ধ না করলে দিন দিন বাড়তে থাকে। তবে ছাত্রদের ধরে নিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা, নির্যাতন করা এটা চিন্তা করা যায় না। আমার মনে হয় আস্তে আস্তে এটা বেড়েছে। অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রভোস্ট, প্রভোস্ট তাদের দায়িত্ব অবহেলার কারণে এগুলো বাড়ে।

জাতীয় পর্যায়ে যারা রাজনীতির উচ্চাসনে আছেন তারা মনে করেন ছাত্ররা সরাসরি তাদের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবে। এটা হলে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনাটা অনেক সহজ হবে। গণসভা, মহাসমাবেশ ইত্যাদিতে তাদের অংশগ্রহণ অনেক বাড়বে। মূলত ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের ওপরই এই দায়িত্ব দেয়া হতো অধিক জনসমাগম করার। হলে ভয়ভীতি দেখানো হয় মিছিল-মিটিংয়ে না গেলে ক্ষতি হবে। সুতরাং ইচ্ছা-অনিচ্ছায় প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী যেতে বাধ্য হয়। মূল রাজনৈতিক দলের হস্তক্ষেপের জন্যই মূলত এই অধঃপতন।

প্রথমে একটা প্রসিকিউশন স্টাবলিস্ট করতে হবে। বিভিন্ন মত থাকতে পারে, ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে একজন যদি ভিন্ন মতের হয় তাকে যুক্তি দিয়ে আনতে পারে, জোর করে আনা যাবে না। তাদের সংগঠন বক্তৃতা করবে। তবে কারো উপর ফিজিক্যাল প্রেশার দিয়ে দলে আনার চেষ্টা করবে না। ভবিষ্যতে তো এরাই নেতৃত্ব দিবে। এই বয়স থেকে তাদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন হতে হবে। ভিন্ন মত থাকবে, ভিন্ন মত শুনতে হবে। বুয়েটে যারা আসে তারা বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী। একটি গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক সচেতনতা থাকবে। আমরা আন্দোলন করে গণতান্ত্রিক অধিকার পেয়েছি। এ দেশ এককেন্দ্রিক সরকার ব্যবস্থা নয়। ভিন্নমত থাকবে, তাই বলে জোর করে ফিজিক্যাল প্রেশার দিয়ে এক পার্টিতে আনার প্রচেষ্টাটা অন্যায়। বিরোধী দল বলে কিছু থাকবে না এটা হতে পারে না। এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতির ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিভাবে উন্নয়ন করা যায় সেই চেষ্টাই করতে হবে।

আমরা একেবারে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে বলছি না। একেবারে বন্ধ করে দেয়ার পর্যায়ে যাওয়া ঠিক হবে না। একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ রেখে বিভিন্ন রূপরেখা তৈরি করে কীভাবে ছাত্ররাজনীতি ক্যাম্পাসে পরিচালিত হতে দেয়া যায় সে ব্যবস্থা নিতে হবে। একাডেমিক্যালি যারা মেরিটরিয়াস তাদেরকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বুয়েটে যদি ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয় তবে বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হবে না। বুয়েটে চার বছর বা পাঁচ বছর শিক্ষাজীবনে যদি মূল ধারার রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় অংশগ্রহণ না থাকে তবে তারা রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে না এ ধারণা অমূলক। এটায় দীর্ঘমেয়াদি কোনো ক্ষতি হবে না। এখনকার শিক্ষার্থীরা রাজনীতির পিছনে প্রচুর সময় দেয়। তখন এত সময় না দিয়ে পড়াশোনার পিছনে সময় ব্যয় করবে।

এক্ষেত্রে বড় রাজনৈতিক দলগুলো একটা যৌথসভা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে শিক্ষাঙ্গনে বর্তমানে ছাত্ররাজনীতির নামে যে কার্যক্রম এটা দেশের জন্য, ভবিষ্যতের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এটা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ছাত্ররা সক্রিয়ভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রমে যেতে পারবে না।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যগণ রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তারা মেধার ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হন না। যেহেতু তাদের তুলে এনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধান করা হয় সেজন্য তারা পদ-পদবি ধরে রাখতে ওই দলের হুকুমের গোলাম হয়ে কাজ করেন এবং তাদের কথামতো পরিচালনা করতে থাকেন।

অনুলিখন: শেখ সাইফ।

(ঢাকাটাইমস/১৩অক্টোবর/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :