‘ছাত্রসংগঠনগুলোতে শুদ্ধি অভিযান প্রয়োজন’

দিতি আহমেদ
 | প্রকাশিত : ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ২২:৩৬

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ছাত্রলীগের হামলায় শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ নিহত হওয়ার পর ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনীতির প্রাসঙ্গিকতাও নিয়েও প্রশ্নে উঠেছে। বলা হচ্ছে ছাত্রসংগঠনগুলো ছাত্রদের দাবি-দাওয়া নিয়ে কাজ না করে নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন এবং ক্ষমতার অপপ্রয়োগ, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। এসব নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানিজ শিক্ষা অনুষদের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দিতি আহমেদ।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রসংগঠনের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র এবং ছাত্রসংগঠনগুলোর ভূমিকা হবে কেবলমাত্র শিক্ষাবান্ধব, জ্ঞানচর্চার এবং প্রসারিত করার প্রধান জায়গা। যৌথ উদ্যোগ শেখার এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্র। আলোকিত মানুষ হওয়ার স্থান।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রসংগঠনগুলো কি সেই আদর্শ নিয়ে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে?

সাম্প্রতিক সময়ের ছাত্রসংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড দেখলে এটা প্রতীয়মান যে, তাদের আচার-আচরণ, চিন্তা-চেতনা, মনোভাবের অবমূল্যায়ন ঘটেছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক, লজ্জাজনক এবং আতঙ্কের বিষয়। আতঙ্কের বলছি এই জন্য যে, এই ছাত্রসংগঠনগুলোর ভূমিকা যদি এমন হয় তাহলে অদূর ভবিষ্যতে দেশ এবং জাতি এদের দ্বারা উপকৃত হবে, এটা দুঃস্বপ্ন ছাড়া কিছুই না।

যে উদ্দেশ্য নিয়ে ছাত্ররাজনীতি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল সেসব উদ্দেশ্য, লক্ষ্য  কি পূরণ হয়েছে?

আসলে কী উদ্দেশে ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্ররাজনীতিকে সক্রিয় করা হয়েছিল তার কারণ আমার জানা নেই। যে বা যারা এটিকে সক্রিয় করেছেন, পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেছেন, এর সঠিক উত্তর কেবলমাত্র তাদের পক্ষেই দেওয়া সম্ভব।

ছাত্ররাজনীতির এই অধঃপতনের কারণ কী?

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নানাবিধ কর্মকাণ্ডে ছাত্রসংগঠনগুলোকে ব্যবহার করা হয়। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া, ক্ষমতা প্রদান করা, এক কথায় বলতে গেলে বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের প্রয়োজনমতো ছাত্রসংগঠনগুলোকে ব্যবহার করার জন্যই আজকের এই ছাত্ররাজনীতির অধঃপতনের কারণ।

সাধারণ মানুষ দাবি করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হোক।  আপনি এটাকে কীভাবে দেখছেন?

আমি ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের পক্ষে নই। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার জন্য ছাত্ররাজনীতিকে নিষিদ্ধ করার কোনো প্রশ্নই উঠে না। ছাত্ররাজনীতি অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। বর্তমানে ঘটে যাওয়া অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার জন্য এই দাবি যুক্তিযুক্ত মনে হলেও বাস্তবিক অর্থে তা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ না করে বরং অপরাজনীতি যেন বন্ধ হয় তার জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং শুদ্ধ রাজনীতির চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।

২০০২ সালে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতির সহিংসতায় প্রাণ হারান সেখানকার ছাত্রী সাবেকুন নাহার সনি। তখন অধ্যাদেশ জারি করে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। পরে আবার ছাত্ররাজনীতি সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ সম্পর্কে আপনার মতামত কি?

বুয়েট কর্তৃপক্ষ তাদের বিধি মোতাবেক ছাত্ররাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও পরবর্তীকালে কেন এবং কী কারণে বুয়েটে আবার ছাত্ররাজনীতি সক্রিয় হয়েছে তার উত্তর আসলে বুয়েট কর্তৃপক্ষ ভালো দিতে পারবেন বলে আমি মনে করি।

গত একযুগ ধরে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে। অতীতে বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে এমন অনেক অভিযোগ ছিল। এই অপসংস্কৃতির  শেষ কোথায় বলে আপনি মনে করেন?

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অপসংস্কৃতির রাজনীতি বন্ধের একমাত্র উপায় হচ্ছে অপরাজনীতি বন্ধ করা। এর চর্চাও নিষিদ্ধ করা। অপরাজনীতির মদতদাতাদের খুঁজে বের করা এবং এর শিকড় উপড়ে ফেলা।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ  অনেক সময় ছাত্রনেতাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। তারা দেখেশুনেও সব না দেখার ভান করেন। এটা কতটা যুক্তিযুক্ত?

অবশ্যই এই অবস্থা যুক্তিযুক্ত নয়। এটি অত্যন্ত অনাকাক্সিক্ষত এবং দুঃখজনক ঘটনা।  বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যারা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালন করেন তারা কাক্সিক্ষত পদ লাভের উদ্দেশে এক সময় ছাত্রনেতাদের ব্যবহার করে থাকেন। বলা যায় ছাত্রনেতাদের ব্যবহার করেই বর্তমানে কর্তৃপক্ষ ক্ষমতায় আসে এবং টিকে থাকে। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য কর্তৃপক্ষ নিজেদের চোখ-কান-মুখ সব বন্ধ রাখেন অর্থাৎ ছাত্রনেতাদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকেন। যাদের ব্যবহার করে ক্ষমতায় এসেছেন তাদের বিরুদ্ধে গেলে ক্ষমতায় টিকে থাকা অসম্ভব।

ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ  কোন দিকে যাচ্ছে?

বর্তমানে ছাত্ররাজনীতি যে অবস্থায় আছে সে অবস্থা থেকে যদি উত্তরণ না ঘটে, বলা ভালো উত্তরণ না ঘটায় তবে অদূর ভবিষ্যতে দেশ এবং জাতিকে অকল্পনীয় অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

এই পরিস্থিতিতে আপনার পরামর্শ কী?

বর্তমান সরকার যে শুদ্ধি অভিযানে নেমেছে সেই শুদ্ধি অভিযান তাদের ছাত্রসংগঠনগুলোতেও প্রয়োগ করতে হবে। ছাত্রসংগঠনগুলোকে যে বা যারা নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করছে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করছে সেসব মাথা খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে এবং শিকড় থেকে এর মূল উৎপাটন করতে হবে। ভবিষ্যতে ছাত্ররাজনীতির কেউ যেন অপব্যবহার করতে না পারে এর জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :