গল্প

অকাল চিরকাল

বিধান সাহা
 | প্রকাশিত : ২৮ এপ্রিল ২০২০, ১৬:৩৯

আকাশে অথৈ নীল। সাদা সাদা মেঘ। সেই মেঘের ভেতর বিভিন্ন প্রাণীর অবয়ব ফুটে উঠে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। নদীর স্বচ্ছ জলে এসবের উজ্জ্বল ছায়া পড়ছে। নদীর এপাড় থেকে ওপারে তাকালে কালচে-সবুজ দেয়ালের মতো গাছ-গাছালির সারি। মালোপাড়ার পেছন দিকটা স্থির রেল গাড়ির মতো দাঁড়িয়ে আছে। তখন বিকেল। ভয়াবহ রোদের তীব্রতা একটু একটু করে কমতির দিকে। এই সময়টায় পাড়াগুলোও একটু ঝিমিয়ে পড়ে। দু-একজনকে দেখা যায় পরামানিকের মেহগনির বাগানে কলার পাতা বিছিয়ে তাতে শরীর এলিয়ে দিয়েছে। তখনই ডুব দিতে নদীতে আসে নয়নতারা। নয়নতারার আসল নাম নমিতা। তার জামাই আদর করে ডাকে নয়নতারা। নয়নতারার জামাইয়ের নাম ভানুমোহন। ভানুমোহন পানের ব্যাবসা করে। মঙ্গলবারের মোকাম থেকে পান কিনে হাটে হাটে বেচে। কোনো কোনো দিন গাওয়াল করে সকালের দিকে। আফসার খলিফার বউ ভানুমোহনের খাস কাস্টমার। আর কোনো বাড়িতে যাক আর না যাক, আফসার খলিফার বাড়িতে সপ্তাহে অন্তত দু-বার ভানুমোহনের না গেলে চলে না। আফসারের বউ নইলে খুব গোস্বা করে। তো, নয়নতারা নদীতে স্নানে নেমেছে। জলে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে দু বাহু জলের উপর প্রসারিত করে হাঁসের মতো খানিক ভেসে থাকে। দূর থেকে এইসব দৃশ্য দেখে ভানুমোহন। ভেসে থাকতে থাকতে ভুস করে ডুব দিয়ে ওঠে। তখন তার খিল খিল হাসির শব্দ শোনা যায়। নয়নতারার খিল খিল হাসির শব্দ ভানুমোহনের কলিজায় গিয়ে লাগে। সেই কবে নয়নতারাকে বিয়ে করে এনেছিলো পাশের হরিনাথপুর গ্রাম থেকে! তখনও তার পুতুল খেলার নেশা যায় নাই। মায়ের জন্য রাতের বেলা কান্নার অভ্যেস। শরীর কী জিনিস তখনও জানে না সে।

ভানুমোহন নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়ায়। রোজ দাঁড়ায়। নদীর ওই পাড়ে শ্মশানঘাট। ওই শ্মশানে তার মা আছে, ঠাকুমা আছে, দাদুও আছে। কার্তিক মাসের অমাবশ্যায় শ্মশানের মন্দিরে কালি পূজা হয়। তখন অনেকের সাথে সেও যায় সেখানে। নয়নতারা যায় না। তার ভয় করে। সেই একবার ছোটবেলায় পাশের বাড়ির টুবলির সাথে পূজা দেখতে বেরিয়েছিলো। কথা ছিলো, বাড়িতে কেউ জানার আগেই ডাবলু’সার বাড়ির প্রতিমাটা দেখেই ফিরে আসবে। এই হরিনাথপুর গ্রামে একমাত্র ডাবলু’সার বাড়ির পূজাতেই সব থেকে বেশি ধুম হয়। ওরা সিরাজগঞ্জ শহর থেকে লাইটিং নিয়ে আসে। সে কি লাইটের বাহার! লাইটিংয়ের মাঝে নাকি মা কালিকেও দেখা যায়! ওরা দুজন চুপচুপ করে রওনা হয়। দেখে রাস্তায় নরোত্তম কাকা তার বউ মেয়েদের নিয়ে ফটকা ফুটাচ্ছে। নয়নতারা আর টুবলিকে দেখে নরোত্তম কাকা এগিয়ে এসে বলেছিলো— কী রে, ফটকা ফুটাবি? আয়। টুবলি মাথা দুলিয়ে না করে সোজা ডাবলু সা’র বাড়ি চলে গিয়েছিলো। নয়নতারার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে নরোত্তম কাকা তার বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলো। তারপর নয়নতারার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কাকা হঠাৎ সাপ হয়ে গিয়েছিলো। আর নয়নতারা চিৎকার করতে করতে জিভ কামড়ে মা কালির মতো উদ্ধত ঢঙে নাচতে নাচতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলো। নরোত্তম কাকার বাড়িতে মা কালির আসন আছে যে!

তারপর থেকে যে কী হলো! সবসময় এমন ভঙ্গি করে যেন তার হাতে রামদা ধরা। আর সে এককোপে ধর থেকে মুণ্ডু আলাদা করে ফেলবে। লোকে বলে ওকে মা কালিতে ধরেছে। লোকে বলে, মায়ের কাছে মানত করে মাফ চাইতে হবে। রবি কবিরাজকে দেখানোর পরামর্শ দিয়েছে দক্ষিণ পাড়ার সত্যেনের মা-ও। কিছুতেই কিছু হয় না। ভানুমোহনের সাথে বিয়ের পর তাকেও বহুবার এরকম আক্রমণ করতে উদ্যত হয়েছে। একবার সত্যি সত্যি আনাজ কোটার বটি হাতে ছুটে এসেছিলো। ভানুমোহন কিছু বলে না। মা মরা মেয়েটার জন্য মায়া হয়। তাছাড়া সারাদিন সে বাড়িতেও থাকে না। গাওয়ালে যায়। সেখানে আফসার ফলিফার বউকে পান দিতে দিতে কোনো কোনো দিন দখিণা বাতাস এসে ভানুমোহনের চুলগেুলো উড়িয়ে নিয়ে যায়। তাতে তার সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। পান দেয়া শেষে ফেরার আগে আফসার খলিফার বাড়িতে একটা ফুলের গাছ পুতে বাড়ি রওনা হয় ভানুমোহন। খলিফার বউ ভানুমোহনের পুতে দেয়া ফুল গাছটায় রোজ পানি দেয়। যত্ন নেয়। আগলে আগলে রাখে।

সারাটাদিন ভানুমোহনের ভালো কাটলেও সমস্যা ওই রাতের বেলায়। কিছুতেই বশ মানে না। মায়ের জন্য কান্না করে।

আজ আকাশ আরো বেশি করে নীল হয়ে উঠেছে। নীল রঙের ভেতর প্রকৃতিকে আরো বেশি রহস্যময় দেখাচ্ছে। নদীর জল কমে যাওয়ায় নদীতলের লম্বা লম্বা ঘাসগুলো একটুখানি মাথা বের করে উঁকি মারছে। দুয়েকটি কচুরিপানা ভেসে বেড়াচ্ছে পাশেই। ভানুমোহনেরও এখন নিজেকে সেই ভেসে থাকা কচুরিপানার মতো লাগে। কচুরিপানাগুলোর আসলে কোনো গন্তব্য থাকে না। নদী তার আশ্রয় হলেও ভাসতে ভাসতে যেখানে গিয়ে ঠেকে সেটাই তার ঠিকানা। কতদিন নয়নতারাকে সে তার ভালোবাসা দিয়ে উষ্ণ করতে চেয়েছে! কত কত দিন হাট থেকে ফেরার সময় এটা-সেটা নিয়ে এসেছে যাতে ও খুশি হয়। কী যে হয়েছে মেয়েটার! খুশি সে হয় ঠিকই। কিন্তু ওই পর্যন্তই। কাজের সময় যেই লাউ সেই কদু! গায়ে হাতটা পর্যন্ত দিতে দেয় না। বয়স কি এখনও হয় নাই! রাগ হয় ভানুমোহনের। এবার বাবার বাড়ি থেকে ঘুরে আসার পর থেকে নয়নতারার মধ্যে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করে ভানুমোহন। পাগলামী করে না, একে ওকে মারতে যায় না। কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে। কেমন শান্ত হয়ে গেছে মেয়েটা! এমনকি ওইদিন রাতে ভানুমোহন ওর গায়ে হাত দিলেও আগের মতো চিৎকার-চেচামেচি না করে খানিক ঢং করে আলগোছে অন্য কাত ঘুরে শোয়। মেয়েদের এই আচরণটার সাথে ভানুমোহনের পরিচয় আছে। সে বোঝে মেয়েরা কোন আচরণ কেন করে। খুশিতে তার মনের ভেতর বানের জলের মতো স্রোত বয়ে যায়।

সেদিন ভানুমোহন ঘরের দরজায় বসে পান সাজাচ্ছিলো। দরজা সোজা রান্নাঘর। সেখানে নয়নতারা রান্না করছে। দুপুরের রোদের আলোয় নয়নতারার মুখটা আরো বেশি রক্তাভ হয়ে উঠেছে। কপাল চুঁইয়ে ঘাম চিবুকে এসে পড়ছে। এই দৃশ্য দেখে ভানুমোহনের বুকের ভেতরটা কেমন হুহু করে ওঠে। এখনই নয়নতারাকে বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরে রাখতে ইচ্ছে করে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে। কী মনে করে হঠাৎ নয়নতারা ঘরের দিকে তাকাতেই ভানুমোহনের চোখে চোখ পড়ে। এমনিতেই রোদের আভায় লাল হয়ে আছে তার উপর ভানুমোহনের চোখে চোখ পড়ায় লজ্জায় আরো লাল হয়ে জবা ফুলের মতো আলতো হেসে ওঠে। শব্দহীন সেই হাসি সকলকে ফাঁকি দিয়ে ভানুমোহনের বুকটাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়ে শূন্যে মিশে যায়! ওদের পৃথিবীটা এখন চিন্তাশূন্য। এলোমেলো। সহস্র মাইল গতিতে অন্ত্যমিলের শব্দ খুঁজে চলেছে যেন। নরোত্তম কাকা ধর্মপ্রাণ মানুষ। পূজা-আর্চা নিয়েই থাকে। বাড়িতে মা কালির আসনে রোজ তিনিই মায়ের পূজা দেন। সকালে উঠে একবার স্নান সেরে ধোয়া ধূতি পড়ে মাকে পূজা দিয়ে তারপর দোকানের গদিতে গিয়ে বসেন। রাতে ফিরেও একবার মায়ের সামনে যান। দিনের মধ্যে প্রায় সব সময় মায়ের নাম মুখে লেগেই থাকে। কোনো বিপদের সম্ভাবনা দেখলেই মনে মনে মাকে স্মরণ করেন। মা তাকে সকল বিপদ থেকে উদ্ধার করেন বলেই নরোত্তম কাকা দিনে দিনে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে উঠছেন। নাস্তিকের দল কি আর তা বোঝে? তারা কতরকম কথা বলে! বলে যে, ‘নরোত্তম ডিলার তো চাল চুরি করেই টাকা বানাইছে। কেউ কেউ আরো বাজে ভাষায় বলে মেয়েছেলে নিয়ে কারবার করে। শহরে বেইচে দেয়।’ আরো নানারকম কথা বললেও কাকা সেসবে কান দেন না।

সেদিন হরিনাথপুর থেকে ভোলা সা’র বাড়িতে জয়োগোপাল ঠাকুর আসছিলো নারায়ন পূজা করতে। সকাল বেলা সাইকেল নিয়ে এদিক দিয়ে যাওয়ার সময় নাকি বলে গেছে— সকলে বলাবলি করছিলো— নরোত্তম বাবু নাকি মা কালির বলি হইছেন। কী জানি, কোনো অশুচ কাপড়ে মায়ের মন্দিরে ঢুকছিলো কি না! জাগ্রত কালি কি আর এসব সহ্য করে? গলা টিপে মাইরা ফালাইছে। নরোত্তম বাবুর বাড়ির বৌ-ঝিয়েরাও নাকি তখন কেউ বাড়িতে আছিলো না।

এ বছর শ্মশানের কালি পূজা নিয়ে হিন্দু-মুসলিম সকলের মধ্যেই খুব উৎসব উৎসব ব্যাপার শুরু হয়েছে। এ গ্রামে এমনই হয়। তপু, কৃষ্ণ, রনি ওদের বন্ধু শামীম, কামাল, বক্কারসহ আরো অনেকেই রোজ চাঁদা তুলছে হাট-বাজার থেকে। মেয়র থেকে এমপি সকলেই অনুদান দিয়েছে। পাড়ার মধ্যেও বাড়ি অনুযায়ী একেকজনের একেক রকম চাঁদা ধরা হয়েছে। ভানুমোহনের এবার ৩০০ টাকা। একটু আগে তপু এসে টাকা নিয়ে যাওয়ার সময় এইসব বলছিলো। নয়নতারাকে উদ্দেশ্য করে বলছিলো— ‘ও বৌদি, পূজাত যায়ো’। ভানুমোহন মন খারাপ করে থাকে। কারণ সে জানে নয়নতারা শ্মশানের পূজায় যায় না। রাজু ওর বৌকে নিয়ে যায়। গণেশ ওর বউকে নিয়ে যায়। ফরিদ ভাইও বউ-বাচ্চা নিয়া যায়। শুধু ভানুমোহনই একা একা। এইসব তার আর ভালো লাগে না। মন খারাপ হয়।

ওদিকে আফসার খলিফা কোন হুজুরের কাছ থেকে কি শুনে এসেছে! উত্তর পাড়ার সোলেমানকে সে বলে দিয়েছে তার বাড়িতে এখন থেকে সে-ই যেন পান দেয়। কোনো লেংটির বাচ্চা ভানুমোহনের এই বাড়িতে ঢোকা বন্ধ। খলিফার বউ এ কথার প্রতিবাদ করেছিলো খুব। মানুষের আবার লেংটি-ন্যাড়া কী? শোনে নাই। উলটা যা-তা বলে মুখামুখি করছিলো।

কতদিন কেটে গেলো তারপর! ভানুমোহন আর গাওয়ালে বের হয় না। তার বোনা ফুলগাছটা খলিফার বউয়ের যত্ন-আত্তিতে একটু একটু করে বেড়ে উঠতে থাকে। ডাল-পালা বাড়তে থাকে। ভানুমোহন আর নয়নতারাও একটু একটু করে প্রজাপতি ধরা শিখলো এরই মধ্যে। একসাথে নদীতে ডুব দিয়ে শামুক তোলা শিখলো। আরো কত কী!

আজ কালি পূজা।

খলিফার বাড়িতে আজ খুব আনন্দ। একটু আগেই সোলেমান খলিফা আযান দিলো পুত্র সন্তানের পিতা হয়েছে বলে। উঠোনের শেষ প্রান্তে ভানুমোহনের লাগানো ফুল গাছটায় আজ একটা চমৎকার ফুল ফুটেছে। বাতাসে সেই ফুল সুবাস ছড়াচ্ছে। ঘরের ভেতর থেকে খলিফার বউ স্পষ্ট সেই সুবাস পাচ্ছে। তার খুব ঘুম পাচ্ছে এখন।

দূর থেকে ঢাকের শব্দ ভেসে আসছে। শ্মশানে পূজাকে কেন্দ্র করে বিশাল মেলা বসেছে। বিকেল থেকেই দলে দলে লোক রওনা হয়েছে। কেউ কেউ পরে যাবে বলে সঙ্গী গোছাচ্ছে। নয়নতারা ভানুমোহনের সাথে এবার শ্মশানের পূজায় যাবে বলে রাজি হয়েছে। মেলা থেকে কি কি কিনবে মুখে মুখে সে লিস্ট শোনায় ভানুমোহনকে। চোখে কাজল দেয়, ঠোঁট রাঙায়, পায়ে আলতা পড়ে, চুলগুলো ছেড়ে দেয়া... ভানুমোহনের আজ আর আনন্দ ধরে না। আহ্লাদ করে বলে, ‘খালি গায়ের রঙডো কালা হইলে সত্যি সত্যি মা কালিই মনে হইতো।’ ভানুমোহনের এই কথায় সে চোখ বড় করে হো হো করে ছুটে আসে। ভানুকে ভয় দেখায়। বলে, ‘আমিই মা কালি। নরোত্তম ডিলারকে আমিই খাইছি। আমি কাউরে ছাড়ি না! হা হা হা...’ ক্রূর এই হাসি ধীরে ধীরে থামিয়ে একটু স্বাভাবিক হয় নয়নতারা। চোখে তার তখনও আগুন। বলে, কী ভানু, ভয় পাইছো? ভানুমোহন সত্যিই খুব ভয় পায়। ভয়ে কথা বেরোয় না গলা দিয়ে। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। নয়নতারার মুখে রহস্যময় হাসি।

শ্মশান থেকে ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :