সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক ফরিদুল

কারাগারে শ্বাসরোধে হত্যার পরিকল্পনা ছিল ওসি প্রদীপের

সিরাজুম সালেকীন, কক্সবাজার থেকে
| আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২০, ১৬:৪৭ | প্রকাশিত : ৩০ আগস্ট ২০২০, ১৫:৩২

টেকনাফের বরখাস্ত ওসি প্রদীপকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় স্থানীয় সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা খানকে বিদেশি মদ, ইয়াবা ও অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার দেখিয়ে ছয়টি মামলা করেছিল পুলিশ। দীর্ঘ ১১ মাস ৫ দিন কারাভোগের পর গত বৃহস্পতিবার জামিনে মুক্ত হন ফরিদুল। বর্তমানে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। ওসি প্রদীপের নির্যাতনে চোখ হারাতে বসেছেন এই সাংবাদিক। কক্সবাজারের স্থানীয় পত্রিকা দৈনিক ‘কক্সবাজার বাণী’র সম্পাদক ফরিদুল মোস্তফা ঢাকাটাইমসের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে সেদিনের লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দেন।

ফরিদুল মোস্তফা জানান, কারাগারে থাকার সময় ওসি প্রদীপ তাকে (ফরিদুল) শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যার চেষ্টা করেছিল। এছাড়া ভুল চিকিৎসা ও খাবারে বিষপ্রয়োগে হত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু কারাগারে কর্মকর্তাদের তৎপরতায় প্রদীপ সফল হয়নি। তাছাড়া ফরিদুলকে আটকের পর ওসি প্রদীপ ক্রসফায়ারের হত্যার চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন নজরদারিতে তা পারেনি।

গত বছরের ২৪ জুন ‘টেকনাফে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, এবং পরের দিন ‘টাকা না দিলে ক্রসফায়ার দেন টেকনাফের ওসি', শিরোনামে দুটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। যেখানে মাদক নির্মূলের নামে ওসি প্রদীপের মাদক ও ক্রসফায়ার বাণিজ্যের করেছেন বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। এছাড়া প্রতিবেদনে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেনের নামও তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে নিরীহ মানুষকে কিভাবে ধরে এনে হত্যা করা হতো সেই বিষয়েও তথ্য দেন। এ কারণে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়। এরপর ঢাকা থেকে বিনা ওয়ারেন্টে ফরিদুলকে ধরে আনা হয়। চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। নিজের (ওসি প্রদীপের) পালিত তিনজন মাদক ব্যবসায়ী ও একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাদী করে অস্ত্র ও মাদক আইনে ছয়টি মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়। এরপর তিনি ১১ মাস কারাগারে ছিলেন।

গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর এলাকায় এপিবিএনের চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) সিনহা রাশেদ খান। এরপর বিষয়টি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ঘটনার পর নিহতের বড় বোন বাদী হয়ে আদালতে একটি মামলা করেন। সেই মামলা টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার সাহা, বাহারছড়া ফাঁড়ির ইনচার্জ লিয়াকত আলীসহ নয়জনকে আসামি করা হয়। এরপর সাত অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পরে তাদেরকে বরখাস্ত করা হয়। এছাড়া পৃথক অভিযানে র‌্যাব-পুলিশের সাক্ষী তিনজন ও এপিবিএনের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে র‌্যাব।

মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের পরই ওসি প্রদীপসহ কক্সবাজার পুলিশের অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ গণমাধ্যমে উঠে আসে। তাদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এমন অনেকে লোমহর্ষক বর্ণনা দেন। অনেকের মতো ওসি প্রদীপের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা।

আটকের পর পরিবার কী জেলা পুলিশের কাছে গিয়েছিল এবং স্থানীয় সাংবাদিক নেতারা কী ভূমিকা রেখেছিল জানতে চাইলে সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘দেশের সকল প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী এমনকি প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের আইজিপি বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন। পুলিশের অনেকেই আমাদের পাশে গোপনে দাঁড়িয়েছে। আমরা তাদের কাছে ঋণী। তারা না হলে প্রদীপ এবং এসপি মাসুদ আমাকে সেদিন রাতে গুলি করে হত্যা করে ফেলতো। অথবা পৈচাশিক নির্যাতন চালিয়ে থানা হাজতেই মেরে ফেলতো।'

আটকের পর আপনার পরিবার এসপির কাছে সহায়তা পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে এই সাংবাদিক বলেন, ‘আমার পরিবার বা আমাদের কাউকে এসপির কাছে যাওয়ার মতো পরিবেশ এসপি তো আগে দেয়নি। আমি রিপোর্ট করার পরে নিজেই এসপিকে ফোন করে বলেছিলাম- দেখেন আমি থাকি কক্সবাজার; টেকনাফের পুলিশ কেনো আমার বাসায় আসে? রেড দিচ্ছে?'

‘এসপি তখন আমাকে শাসিয়ে বলেছিলেন, ‘কক্সবাজারের অমুক সাংবাদিক (একজন সাংবাদিকের নাম উল্লেখ করে) আমাদের বিরুদ্ধে লেখে না। আপনি কি এমন সাংবাদিক হয়েছেন যে, মাদক আর ঘুষের বিরুদ্ধে এতো বেশি লেখালেখি করবেন।’

কারাগারে যাওয়ার পরেও কী নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হয়েছেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা বলেন, ‘অবাক হলেও অবিশ্বাস্য সত্য জেলে যাওয়ার পর দেখেছি তাদের কিছু লালিত-পালিত মাদক ব্যবসায়ী কারাগারে আছে। মনে করেন, একজন বড় মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১০ লাখ টাকার মাদক উদ্ধার হয়েছে। তার কাছে থেকে টাকা নিয়ে দুই হাজার বা পাঁচশ পিস দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে। এগুলোই তাদের লালিত-পালিত মাদক ব্যবসায়ী।'

‘আবার অনেক মাদক ব্যবসায়ী আছে যারা আমাকে কারাগারে শ্বাসরোধ করে হত্যা করতে পারলে তাদের মাদক মামলার চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হবে বলে প্রলোভন দেখানো হয়েছে। বা ভবিষ্যতে কারাগার থেকে বের হলে ক্রসফায়ার দেওয়া হবে না। এভাবে পরিকল্পনা করে কারাগারের ভেতরে হত্যা করতে চেয়েছিল।'

কারা হাসপাতালের একটা চক্র এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল জানিয়ে এই সাংবাদিক বলেন, তারা আমাকে ভুল চিকিৎসাও দিতে চেয়েছিল। খাবারে বিষ মিশিয়ে দিতেও চেয়েছিল। কিন্তু কারা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের আন্তরিকতায় এবং বস্তুনিষ্ঠ পেশাগত দায়িত্ব পালনে ও অন্যায়ের কাছে আপোষহীন কক্সবাজারের জেল সুপার মোকাম্মেল হোসেনের কারণে তা সম্ভব হয়নি।

কারাগার থেকে বেরিয়ে আসলেও এখনো নিজেকে নিরাপদ ভাবছেন না এই সাংবাদিক। বলেন, কারাগার থেকে বের হওয়ার পরে আমি এবং আমার পরিবার নিরাপত্তহীনতায় আছি। কারণ অসৎ পুলিশের অনেক কর্মকর্তা এখনো কক্সবাজারে চাকরি করছে। যারা গ্রামেগঞ্জের বিভিন্ন জায়গা থেকে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ধরে আনে বা টার্গেট করে। কক্সবাজারে আগত ধনাঢ্য কোনও পর্যটককে ধরে এনে নির্মম নির্যাতন করে।

মিথ্যা মামলায় নির্যাতনের শিকার হয়ে এখন আইনি পদক্ষেপ নিতে চান সাংবাদিক ফরিদুল। বলেন, ‘আমি অসুস্থ। আমার সাংবাদিক নেতা এবং আমার আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে আলাপ করছি। তারপর দেখি কী করবো। তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে ন্যায়বিচার চাই। কারণ জুলুমের বিচার হোক। আর কারও সহযোগিতা পেলে অবশ্যই আইনের আশ্রয় নেবো।’

পুলিশের প্রশংসা করে ফরিদুল বলেন, ‘করোনার মধ্যে পুলিশ যে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে তা কিছু অসৎ কর্মকর্তার কারণে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। কারণ দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এবং অনেক ভালো কাজে পুলিশের অনেক ভূমিকা রয়েছে।’

ঢাকাটাইমস/৩০আগস্ট/এসএস/এমআর

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :