আলুর ঘাপলা হিমাগারে!

বোরহান উদ্দিন, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২০, ১৩:১২ | প্রকাশিত : ০২ নভেম্বর ২০২০, ০৮:০৯
ফাইল ছবি

আলুর দাম নিয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত মানা হচ্ছে না। ক্রেতা পর্যায়ে বিক্রিতে সরকার আলুর দাম নির্ধারণ করে দিলেও দেশের আড়তগুলো থেকেও উধাও হয়ে যাচ্ছে এই নিত্যপণ্যটি। আলু নিয়ে নজিরবিহীন এই পরিস্থিতির জন্য পাইকার ও আড়তদাররা দুষছেন হিমাগার মালিকদের। আবার হিমাগার মালিকরা কৃষকের থেকে বাড়তি দামে আলু কেনার অজুহাত দেখাচ্ছেন।

আড়তদারদের দাবি, হিমাগার থেকে বেশি দামে আলু কেনায় বড় বড় বাজারে ঢুকছে না আলুর ট্রাক। এর সঙ্গে মোবাইল কোর্টের সাজার ভয়েও আছেন তারা। যে কারণে চাইলেও আড়তদাররা আলু নিচ্ছেন না। তাদের ভাষ্য, আলুর দাম স্থিতিশীল করতে হিমাগারে সরকারের নজরদারি বাড়ানোর বিকল্প নেই। হিমাগারের মালিকরা বলছেন, কৃষকের কাছ থেকে বাড়তি দামে আলু কেনার কারণে নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে পারছেন না।

পাইকারি বিক্রিতা, আড়তদার ও হিমাগার মালিকদের পারষ্পারিক দোষারোপের মধ্যে বাজারে এখনো ৫০ টাকা দামেই খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে আলু। শ্যামবাজারের বড় আলুর আড়ত ‘মেসার্স এন্টারপ্রাইজের’ হিসাব রক্ষক চঞ্চল ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘কোল্ড স্টোরেজ থেকে ৩২ থেকে ৩৪ টাকা কেজি আলু কিনছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু আমাদের এখান থেকে বিক্রি করতে হবে ৩০টাকায়। এ কারণে আলু নিয়ে এদিকে কেউ আসে না। ছোট ছোট বাজারগুলোতে ট্রাক ঢুকছে।’

প্রতিদিন ছয় থেকে সাতশ বস্তা আলু বিক্রি করলেও এখন সামান্য কয়েক বস্তা আলু আড়তে আছে জানিয়ে তিনি বলেন,‘সরকারের উচিত সব হিমাগারে মনিটরিং করা। হিমাগার থেকে ঠিক দামে আলু আসলে বাজার স্বাভাবিক হতে বাধ্য।’

আলুর বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রথমে ৩০টাকা পরে খুচরা বাজারে ৩৫ টাকা নির্ধারণ করে সরকার। এছাড়া কোল্ড স্টোরেজ পর্যায়ে প্রতি কেজি আলু ২৭ টাকা এবং পাইকারিতে ৩০ টাকা কেজি বেঁধে দিয়ে মঙ্গলবার দাম পুনঃনির্ধারণ করে দেয় কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। এছাড়া প্রথমবারের মতো টিসিবির মাধ্যমে ২৫ টাকা কেজিতে ট্রাকে আলু বিক্রির সিদ্ধান্ত হয়। নতুন দাম বেঁধে দিয়ে সেই দামে যাতে সব পর্যায়ে আলু বিক্রি হয় তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসকদের ব্যবস্থা নেয়ারও নির্দেশনা ছিল। কিন্তু কোনো কিছুতেই কিছু হয়নি। আলু তার নিজস্ব গতিতে চলছে।

সম্প্রতি অভিযানে জরিমানার ভয়ে দেশের অন্যতম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারে আলু সরিয়ে রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া রাজধানীর পাইকারি বাজার শ্যামবাজার ও কারওয়ানবাজারেও এমন চিত্র দেখা গেছে। যদিও আলু সরিয়ে রাখার অভিযোগ নাকোচ করে দিয়ে আড়তদাররা বলছেন, হিমাগার থেকে বেশি দামে আলু কেনার কারণে ছোট ছোট বাজারে আলু নিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

এদিকে আলু নিয়ে যখন এমন তোলপাড় তখন দেশের হিমাগারগুলোতে কি পরিমাণ আলু মজুত আছে তার বিস্তারিত তথ্য জানতে জেলা প্রশাসকদের চিঠি দেয় প্রতিযোগিতা কমিশন। এখন পর্যন্ত মাত্র ১২টি জেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারপারসন (জ্যেষ্ঠ সচিব) মো. মফিজুল ইসলাম ঢাকা টাইমসে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ১২টি জেলার তথ্য পাওয়া গেছে। সবগুলো আসার পর আমরা সঠিক পরিমাণ জানতে পারবো। আমরা দেখবো যে, মজুতের উদ্দেশ্য কী। সেই মজুত আইনবিরোধী কি না, সেটা আমরা দেখবো। কার্টেল হয়েছে কি না, সেটা আমরা দেখবো।’

যদিও হিমাগারের মালিকরা তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মানতে নারাজ। উল্টো তারা দুষছেন সরকারের হঠাৎ করে দাম বেধে দেয়াকে। বগুড়া জেলা কোল্ড স্টোরেজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের টিএমএসএসের নির্বাহী পরিচালক হোসনে আরা ঢাকা টাইমসকে বলেন, এবছর আলু উৎপাদন কম হয়েছে। দেশের বেশিরভাগ হিমাগারে আলু কম। ৮০ ভাগও ভরেনি। এখন বীজের জন্য রেখে যে আলু হিমাগার থেকে খালাস হচ্ছে তা নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।

আড়তে মিলছে না আলু

গতকাল সরেজমিনে শ্যামবাজারের বড় বড় আলুর আড়তে ঘুরে দেখা গেছে অচেনা চিত্র। পেঁয়াজসহ অন্যান্য আড়তে কেনাকাটা থাকলেও আলুর আড়তে অলস ঘুমাতে দেখা গেছে শ্রমিকদের। কেউ কেউ আবার বসে বসে গল্প করছেন বিষন্ন মনে।

মেসার্স এন্টারপ্রাইজে প্রায় ২০ বছর ধরে শ্রমিকের কাজ করেন মো. আলম। ঢাকা টাইমসকে তিনি বলেন, ‘জীবনেও এমন অবস্থা দেহি নাই। ভোর ৫টায় শুরু করতাম আর রাতে কাজ শেষ করতাম। আর অহন তো আলুই নাই। কাম নাই তাই আয়ও নাই।’

সেখান থেকে কিছু সামনে শাহানুর ট্রেডার্স, বিসমিল্লাহ বাণিজ্যালয়, টঙ্গীবাড়ি ট্রেডার্সেও দেখা গেছে একই চিত্র। বিসমিল্লাহ বাণিজ্যালয়ের একজন কর্মচারী ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘তিন থেকে চারশ বস্তা আলু বিক্রি হত আমাদের কিন্তু ৫০বস্তাও আসে না। দাম বেশি তাই যাত্রাবাড়ি, মিরপুর এসব জায়গায় ছোট বাজারে ট্রাক যাচ্ছে।’ টঙ্গীবাড়ি ট্রেডার্সের হিসাব রক্ষক ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘প্রতিদিন চারশ বস্তার মতো আলু ঢুকত আড়তে এখন একশ বস্তার মতো পাচ্ছি।’

যদিও নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আড়তে ৩০ টাকা লেখা থাকলেও বিক্রি করতে হচ্ছে বেশি দামে। কারণ বেশি দামের কথা জানতে পারলে জরিমানা দিতে অনেক টাকা। তাই সকাল সকাল আলু অনেকে বিক্রি করায় অনেক কম দেখা যাচ্ছে।’

(ঢাকাটাইমস/০২নভেম্বর/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :