দুবারের সাবেক এমপি একমুঠো খাবারের নিশ্চয়তা চান!

আজহারুল হক, ময়মনসিংহ ও ফরিদুল আলম সজীব, গফরগাঁও
| আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০২০, ১১:০৩ | প্রকাশিত : ২৩ নভেম্বর ২০২০, ০৮:৫১

বয়স ৮০ ছুঁই ছুঁই। গফরগাঁও থেকে দুবার নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য (জাতীয় পার্টি)। দীর্ঘদিন ধরে সর্বস্বান্ত। গফরগাঁও পৌর শহরে দুই কক্ষের ছোট্ট একটি ভাড়া বাসায় আট বছরের শিশুসন্তানকে নিয়ে খেয়ে-না খেয়ে পড়ে আছেন একসময়ের প্রতাপশালী এনামুল হক জজ। সাবেক এই সাংসদের করুণ মানবেতর জীবন দেখে স্তম্ভিত গফরগাঁওয়ের মানুষ।

তার স্ত্রী-সন্তান থেকেও নেই। সহায়-সম্পদ যা ছিল সবই প্রথম দুই স্ত্রী ও সন্তানদের লিখে দিয়ে এখন সর্বস্বান্ত তিনি। তাকে দেখার কেউ নেই। শেষ সম্বল ১২ শতক জমি দিয়েছেন মসজিদের নামে।

এই অশীতিপর রাজনীতিক বোঝা হয়ে উঠেছেন পরিবারের কাছে। তার দল বর্তমান সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও কোনো দায়িত্ব পালন করছে না সাবেক সাংসদের প্রতি। দল থেকে পাচ্ছেন না কোনো সহায়তা।

নিজেকে একজন মুক্তিযোদ্ধা দাবি করা এনামুল হক জজ ১৯৮৩ ও ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির টিকিটে দুবার সাংসদ নির্বাচিত হন। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পালিত মেয়ে, রওশন এরশাদের বোন সাবেক মন্ত্রী মমতা ওয়াহাবের মেয়ের জামাই এনামুল হক জজ জাতীয় পার্টির শাসনকালে ময়মনসিংহ-১০ গফরগাঁও আসনের প্রতাপশালী এমপি ছিলেন।

প্রথম স্ত্রী নাছিমা হক এক মেয়েকে নিয়ে আমেরিকায় থাকেন। দ্বিতীয় স্ত্রী ঢাকার পুরানা পল্টন ও মিরপুর কাজী পাড়ায় দুই সন্তান নিয়ে ঢাকার দুটি বাড়িতে থাকেন। সহায় সম্পদ যা ছিল সবই এই দুই স্ত্রী ও সন্তানদের নামে লিখে দিয়েছিলেন জজ। এখন তিনি তৃতীয় স্ত্রী দরিদ্র রোমার সঙ্গে পৌর শহরের ২ নম্বর ওয়ার্ডে ভাড়া বাসায় ৮ বছরের শিশুসন্তান নুরে এলাহীকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

সাবেক এমপি ও সেনা কর্মকর্তা এনামুল হক জজের সঙ্গে তার ভাড়া বাসায় কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এ সময় তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জানান তার বর্ণাঢ্য অতীত আর জীর্ণ বর্তমান কালের কথা।

এনামুল হক জজ বলেন, ‘আমি ক্ষমতায় ছিলাম, কিন্তু আমার শক্তি প্রয়োগ করিনি। আজ আমি ক্লান্ত। এই শেষ জীবনে আমার একটা ঘর দরকার। দেশের একজন প্রবীণ নাগরিক হিসেবে আমি দুমুঠো খাবারের নিশ্চয়তা চাই।’

এনামুল হক জজ তার স্ত্রীর কল্যাণে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন পেয়ে গফরগাঁও থেকে এমপি নির্বাচিত হন। তার পরিবারের কেউ চায়নি তিনি নির্বাচন করুন। তাদের তিন ভাইয়ের মধ্যে এখন জজই কেবল বেঁচে আছেন।

তিনি বলেন, ‘আমি এমপি হলাম। কত অচেনা মানুষ আপন হলো, কত চেনা মানুষ পর হলো। আমার চারদিকে এত লোক ছিল যেন আমি কোনো রাজ্য জয় করেছি। চাওয়ার আগেই সব হচ্ছিল।’

মুক্তিযুদ্ধের আগে পশ্চিম পাকিস্তানে ক্যাডেট হিসেবে অধ্যয়নরত ছিলেন এনামুল হক জজ। পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে আপ্যায়নকালে তার পরিচয় হয়। তিনি বলেন, ‘পরবর্তী অনেক সময় পেরিয়ে যায়। আমি চলে আসি আমার প্রিয় মাতৃভূমি পূর্ববাংলায়। এদিকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাঙালি যুদ্ধসাজে সজ্জিত। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাকে সেদিন আমি আরও অনেক যুবকের মতো যুদ্ধমাঠে শামিল হই।’

সেই যাত্রার বর্ণনা দিতে গিয়ে স্মৃতিতে ডুব দেন জজ, ‘মন্ত্রমুগ্ধের মতো আটজনের একটি দল নিয়ে চলে যাই ভারতের মেঘালয়ে। সেখান থেকে এক মাস পরে ফিরে আসি কিশোরগঞ্জের ফুলতলায়। নির্দেশ আসে হোসেনপুর হয়ে নদী পেরিয়ে গফরগাঁও অপারেশন। একটি বাজারের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে কখনো রাস্তায় কখনো বাড়িঘরের ভেতর দিয়ে যাই। গন্তব্য কালীবাড়ির (বর্তমান গফরগাঁও ইমামবাড়ি) কাছে একটি পাটক্ষেত। সেখানে এসএলআর বিনিময় হবে বিকেল ৪টায়। সময়মতো চলে আসি হোসেনপুর হয়ে নদী পেরিয়ে। হেঁটে চলে আসি গন্তব্যে।

‘হঠাৎ দেখি ১০-১২ বছরের একটি ছেলে আমাকে ইশারায় ডাকছে। কাছে গেলাম। একটি চিরকুট হাতে দিয়ে ছেলেটি উধাও। লেখা ছিল ‘তাড়াতাড়ি কেটে পড়ো। সমস্যা আছে।’ নতুন জায়গার কথা লেখা ছিল চিরকুটে। সেখানে পরদিন সন্ধ্যায় যেতে হবে। হঠাৎ পাক বাহিনীর উপস্থিতি টের পাই। পালাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ধরা পড়লাম।

যখন জ্ঞান ফিরল, দেখি আমি গফরগাঁও ডাকবাংলোর আমগাছে ঝুলে আছি। হঠাৎ কানে ভেসে এল ‘এটা মৌলানা সাহেবের লোক।’ আমাকে ছেড়ে দেওয়া হলো। যিনি আমাকে ছাড়িয়েছেন তার কাছে জীবন বাঁচানোর জন্য আমার পরিবার কৃতজ্ঞতা জানাল। তিনি পাঁচবাগ ইউনিয়নের মৌলানা। যিনি কোনো পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তার নাম আমি বলব না, মায়ের নিষেধ ছিল।’

সাংসদ থাকাকালে তার ভূমিকা সম্পর্কে এনামুল হক জজ বলেন, ‘একজন মন্ত্রীর যোগ্যতার চেয়ে বেশি শক্তি প্রয়োগ করেছি কিছু অমানুষের ওপর। আমার কাছে সহজে ভালো মানুষ আসতে পারেনি কিছু অমানুষের কারণে। যারা আমার কাছে পৌঁছাতে পেরেছেন, তাদের সহযোগিতা করেছি দুহাত ভরে। আমি বুঝতাম আমার পাশে থাকা নেতাদের অনেকেই তখন আঙুল ফুলে কলাগাছ। অনেক বড় মন্ত্রীও আমাকে দেখলে সমীহ করত। কেন করত সেটা আমি জানি। আমি গফরগাঁও উপজেলায় দুই দিনের চেষ্টায় রাষ্ট্রপতির আসার ব্যবস্থা করেছিলাম। এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের ব্যবস্থা করেছি। ক্লাব, মসজিদ, মাদ্রাসা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আমি দিয়েছি দুহাত ভরে। আমাকে ব্যবহার করে অনেকে পারিবারিক সুবিধাসহ টাকার পাহাড় করেছে। দিনশেষে আমার হিসাবের খাতা শূন্য।’

এনামুল হক জজের দাদা কাজী হালিম উদ্দিন ছিলেন একাধারে শিক্ষাবিদ, বহুভাষাবিদ, সমাজ সংস্কারক, মুসলিম রেনেসাঁর একজন অগ্রদূত আলেম, সরকারি চাকরিজীবী, সমাজকর্মী। বাবা আব্দুস ছালাম গফরগাঁও ইসলামিয়া সরকারি হাই স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমিদাতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ।

স্যুট-টাই পছন্দ করতেন এনামুল হক জজ। ময়লা কাপড় কখনো ব্যবহার করেননি তিনি। সে কথা মনে করে তিনি বলেন, ‘এখন হতশ্রী অবস্থা। গত ১ নভেম্বর পাঞ্জাবিটি পরেছি। আজ ১৬ নভেম্বর। ধোলাই করতে পারছি না সাবান কেনার অভাবে। আমি কখনো কারও টাকা মেরে খাইনি। এখনো অনেকের কাছে অর্ধকোটি টাকা পাই। আমাকে দেখে পালিয়ে যায় কিছু বড়লোক। আমি হাজারো কষ্টের মাঝেও হাসি। তারা আমাকে টাকা দেয় না, আজ তারা শক্তিশালী। বিশ্বাস করুন, আমার খুব কষ্টার্জিত পয়সা এরা নিয়েছে। আজ যখন ২৭০০ টাকা ভাড়ায় ছোট্ট একটি রুমে ঘুমাতে যাই, তখন মনে হয় আগের দিনগুলোর কথা।’

নিঃসঙ্গ এই সাবেক সাংসদের পাশে কেউ না থাকলেও সন্তানদের জন্য ঠিকই মন পোড়ে তার। বলেন, ‘আমাকে ছেড়ে চলে গেছে আপনজন। আমার যা ছিল সব দিয়েছি। এতে আমার দুঃখ নেই। আজ ৩৩ বছর কাটছে বড় মেয়ে জয়ার মুখ দেখি না। সাথে আছে পারিসা, রামিমা দুজন। খুব ইচ্ছে করে সন্তানের প্রিয় মুখগুলো দেখতে। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আমি। ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত দেহ নিয়ে ঘুমতে যায় প্রতিদিন। সন্তানদের মুখগুলো বহুকাল দেখতে না পেয়ে প্রতি রাতে বুক ফেটে কান্না আসে।’

মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম না ওঠায় মনের কষ্টের কথা জানিয়ে এনামুল হক জজ অভিমানী হন। বলেন, ‘আমি দুবার এমপি ছিলাম দাবি করব না কোনো দিন। আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি দাবি করব না কোনো দিন। আমার মুক্তিযুদ্ধের দরখাস্ত যারা ছুড়ে ফেলেছেন, তাদের বলছি তোমরা আমাকে দিলে না, কিন্তু এখনো কিছু অবশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা বেঁচে আছেন, অন্তত তাদের মরণের আগে কিছু করে দিও।’

বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ আপনজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ গফরগাঁও উপজেলার কৃতী সন্তান আবুল হাসেম এমপি (সাবেক), সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা আলাল আহম্মেদ, সিরাজুল ইসলাম তার মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ সাক্ষী বলে জানান সাবেক সেনা কর্মকর্তা জজ।

(ঢাকাটাইমস/২৩নভেম্বর/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :