পৌর নির্বাচনের প্রচারণায় সহিংস-উত্তাপ বাড়ছে

আল-আমিন রাজু, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২১, ২০:২২ | প্রকাশিত : ১৫ জানুয়ারি ২০২১, ২০:২০
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আড়ানী পৌরসভায় আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী শহিদুজ্জামান সাঈদের প্রধানের নির্বাচনী অফিসে বোমা হামলা।

দেশে চলমান পৌরসভা নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা ও দলীয় দ্বন্দ্বের কারণে সহিংসতা বাড়ছে। প্রথম ধাপের নির্বাচন কিছুটা নিরুত্তাপ থাকলেও দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনী প্রচারণা থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার মাত্রা বেড়েছে অনেক। এর মধ্যে কাউন্সিলর প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা সবচেয়ে বেশি। আজ শুক্রবার পর্যন্ত সহিংসতায় ঝিনাইদহের শৈলকূপায় দুজন ও কুষ্টিয়ায় একজন নিহত হয়েছেন। আর বাঘা উপজেলার আড়ানী পৌর নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর দুই সমর্থককে কুপিয়ে জখম করেছে বিদ্রোহী প্রার্থীর লোকজন। গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া বেশ কয়েক জায়গায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

এরই উত্তাপ যেন গিয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত হয়েছে একজন।

দেশে চলমান পৌর নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে শনিবার ৬০টি পৌরসভার ভোট গ্রহণ করা হবে। ভোট গ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্নের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

দ্বিতীয় ধাপে শনিবার ৬১টি পৌরসভার তফসিল ঘোষণা করলেও নীলফামারীর সৈয়দপুরের মেয়র পদের স্বতন্ত্র প্রার্থী (নারিকেল গাছ প্রতীক) মো. আমজাদ হোসেন সরকারের মৃত্যুতে এ পৌরসভার ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়।

দেশের ৩২৯টি পৌরসভার মধ্যে প্রথম ধাপে ২৪টি পৌরসভায় ইভিএমে ভোট হয় ২৮ ডিসেম্বর। তৃতীয় ধাপে ৬৪টি পৌরসভায় ৩০ জানুয়ারি এবং চতুর্থ ধাপে ৫৬টি পৌরসভায় ১৪ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের প্রচারকে ঘিরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নির্বাচনী সভায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে একাধিক। তবে বড় ধরনের সহিংসতা হয়েছে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে। উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে অনেক পৌরসভায় ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ঘোষণা করছে সংশ্লিষ্ট রিটার্নি কর্মকর্তারা। খাগড়াছড়ি পৌরসভার সব কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়।

নোয়াখালীর বসুরহাটে সুষ্ঠু ভোটের দাবিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ভাই মির্জা কাদেরর বক্তব্য ইতিমধ্যে দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় একজন সংসদ সদস্য এবং প্রশাসনের প্রতি অভিযোগ করেছেন নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের।

এদিকে বিভিন্ন জায়গায় প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা যখন সংঘর্ষে জড়াচ্ছেন তখন সুষ্ঠু ভোটের দাবিতে গাইবান্ধায় বিক্ষোভ করেছে সাধারণ ভোটাররা। অন্যদিকে পৌরসভা নির্বাচনকে নিয়ে যখন এমন অবস্থা তখন আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরেও একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনকে ঘিরে মঙ্গলবার চট্টগ্রাম নগরীর পাঠানটুলিতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় একজন গুলিবিদ্ধসহ আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।

শৈলকুপা প্রতিনিধি জানান, পৌরসভা নির্বাচনকে ঘিরে শৈলকুপায় নির্বাচনী সহিংসতায় লিয়াকত ইসলাম ওরফে বল্টু নামে আওয়ামী লীগের এক নেতা নিহত হন। তিনি মারা যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী শওকত আলীর লাশ উদ্ধার করা হয়।

জানা গেছে, দলের পক্ষ থেকে মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়ায় অনেক জায়গায় ক্ষমতাসীন দলের অনেকে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। মেয়র-কাউন্সিলর উভয় পদেই এমন ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ আছে, সংসদ সদস্য বা স্থানীয় শীর্ষ নেতাদের গ্রুপিংয়ের কারণেও অনেক জায়গায় বিরোধের ঘটনা ঘটছে।

শিল্পমন্ত্রীর ছেলের সঙ্গে নরসিংদীর মনোহরদী পৌরসভার মেয়রের বিরোধের জেরে মনোহরদীতে সংঘর্ষ-হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসময় কাউন্সিলর প্রার্থীসহ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এখানকার আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আমিনুর রশিদ সুজনের বিরুদ্ধে। বুধবার রাতে মনোহরদী হিন্দু পাড়াসহ পৌরসভার বিভিন্ন স্থানে এসব হামলার ঘটনা ঘটে।

ক্ষতিগ্রস্তরা ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জানান, পৌরসভা নির্বাচনে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের কাছে বর্তমান মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রশিদ সুজন, পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি কফিল উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক আবদুস সামাদ মোল্লা জাদুর নাম প্রস্তাব করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী তালিকার সবাই মনোনয়নপত্র কেনার কথা থাকলেও রহস্যজনক কারণে মেয়র সুজন ছাড়া কেউ মনোনয়নপত্র কেনেননি। এরপর মেয়র সুজন দলীয় মনোনয়ন পান।

তারা বলেন, পৌরসভার নয় ওয়ার্ডে বর্তমানে ছয়টিতে বিএনপির কাউন্সিলর রয়েছেন। যাদের প্রত্যেকের সঙ্গে মেয়র সুজনের সখ্য রয়েছে। তবে চার ওয়ার্ডে যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাদের প্রার্থী করতে চান শিল্পমন্ত্রীর ছেলে মঞ্জুরুল মজিদ মাহমুদ সাদী। যা নিয়ে মেয়র সুজনের সঙ্গে মন্ত্রীপুত্র সাদীর মতবিরোধ দেখা দেয়। যদিও মন্ত্রীপুত্র তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন।

এদিকে টাঙ্গাইলে বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক সানুর নির্বাচনী সভায় আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী এসএম সিরাজুল হকের সমর্থকরা অতর্কিত হামলা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে ১৪ ফেব্রুয়ারি চতুর্থ ধাপে অনুষ্ঠেয় শেরপুর পৌর সভার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত আনিসুর রহমানের বিক্ষুব্ধ সমর্থকরা বিক্ষোভ মিছিল ও ভাঙচুর চালিয়েছে। বুধবার রাতে শহরের বিভিন্ন দোকানপাট ও যান বাহনে ভাঙচুর চালায় তারা।

বুধবার রাতে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আড়ানী পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গুলি ও বোমা হামলার চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মুক্তার আলীর সমর্থকদের দিকে। সেদিন রাত সাড়ে ৯টায় আড়ানী পৌর সদরের তালতলা বাজারে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী শহিদুজ্জামান শহিদের পথসভায় গুলি ও বোমা হামলার ঘটনা ঘটে।

আর গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে বাঘা উপজেলার আড়ানী পৌর নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর দুই সমর্থককে কুপিয়ে জখম করেছে বিদ্রোহী প্রার্থীর লোকজন। পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নুরনগর গ্রামের এ ঘটনা ঘটে।

আহতরা হলেন, আড়ানী পৌর এলাকার ৪ নম্বর নুরনগর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রহমান (৪৫) ও তার ভাগনে আরিফ হোসেন (৩০)। তাদের রাতেই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

আহতদের অভিযোগ, বিদ্রোহী প্রার্থী বর্তমান মেয়র মুক্তার আলীর সমর্থকেরা তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হামলাকারীরা আড়ানী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করছেন। হামলার শিকার বজলুর রহমান অন্য এক কাউন্সিলর প্রার্থীকে সমর্থন করেন।

বরগুনা পৌরসভায় বর্তমান মেয়র ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী শাহাদাত হোসেনের নির্বাচনী প্রচারণার মাইক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থীর লোকজন এই হামলা করেছে বলে অভিযোগ করেছেন শাহাদাতের লোকজন। যদিও এই ঘটনায় মেয়রের লোকজনের বিরুদ্ধে উল্টো মামলা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বরগুনাতেই নির্বাচনের আগের দিন শুক্রবার প্রচারণার সময় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এক কর্মীকে বাসায় ডেকে কুপিয়ে জখম করার অভিযোগ উঠেছে এক নারী কাউন্সিলর প্রার্থী নাসরীন নাহার সুমির বিরুদ্ধে। বরগুনা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সংলগ্ন তার বাসায় বেলা ১১টায় এ ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত ওই নারী কাউন্সিলর প্রার্থী ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডে অটোরিকশা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

আহত কর্মীর মো. দেলোয়ার হোসেন (৪৫) বরগুনা পৌরসভা নির্বাচনে ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর প্রার্থী নিপা আক্তারের পক্ষে কাজ করছিলেন। এ সময় তাকে ডেকে নিয়ে আহত করেন নাসরিন সুমি। আহতাবস্থায় উদ্ধার করে তাকে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

(ঢাকাটাইমস/১৫জানুয়ারি/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :