যে প্রাণীগুলো হতে পারে পরবর্তী মহামারির কারণ

নাঈম লাবিব
| আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২১, ১১:১১ | প্রকাশিত : ১৩ এপ্রিল ২০২১, ১০:০৯

একদল বিজ্ঞানী ১০টি প্রাণীকে শনাক্ত করেছেন যা সম্ভাব্য পরবর্তী মহামারির কারণ হতে পারে। সেই ১০টি স্তন্যপায়ী প্রাণী নিয়েই আজকের প্রতিবেদন। লিখেছেন নাঈম লাবিব।

হেজহগ

হেজহগ মূলত স্তন্যপায়ী প্রজাতির একটি প্রাণী। এদের আকৃতি মূলত প্রস্থের দিক দিয়ে ৫ থেকে ১২ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে এবং উচ্চতার দিক দিয়ে ১ থেকে ২ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে। এদের ওজন ১৪ থেকে ৩৯ আউন্স পর্যন্ত হয়ে থাকে।

হেজহগের নামকরণ করা হয়েছিল মূলত এর অদ্ভুত শারীরিক গঠনের জন্য। এদের খাদ্য তালিকার মধ্যে মূলত কীটপতঙ্গ, কৃমি, সেন্টিপিডস, শামুক, ইঁদুর, ব্যাঙ, সাপ ইত্যাদি রয়েছে। কিছু মানুষ হেজহগকে পোষা প্রাণী হিসেবে পালন করে কারণ এরা প্রচুর পরিমাণে বাগানের ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ স্বীকার করে থাকে। চলাচলের ক্ষেত্রে এরা শ্রবণশক্তি ও ঘ্রাণশক্তির উপর নির্ভরশীল কারণ এদের দৃষ্টিশক্তি খুবই দুর্বল।

হেজহগের দেহে রয়েছে শক্ত এবং তীক্ষ্ণ আবরণ। এদেরকে মূলত আক্রমণ করা হলে এরা বিরক্ত হয় এবং শিকারিকে বাধা দেয়ার জন্য কাটা গুলো ফুটিয়ে দেয়। এরা সাধারণত দিনের বেলায় ঘুমায় এবং রাতের খাবারের সন্ধান এর জন্য বাইরে বের হয়।

হেজহগ গুলো শীতল আবহাওয়া শীতযাপন করে। আবার অনুরূপভাবে মরুভূমিতে এরা তাপ ও খরার মধ্যে দিয়ে বসবাস করে । এদের এই ক্ষমতাকে অ্যাস্টিভেশন বলে। তবে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে এরা বেশি সক্রিয় থাকে।

ডোমেস্টিক ক্যাট (পোষ্য বিড়াল)

এরা মূলত স্তন্যপায়ী প্রজাতির প্রাণী। এদের দেহ ২৮ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে এবং ওজন ৫ থেকে ২০ পাউন্ড পর্যন্ত হয়ে থাকে। বহু পুরনো কাল থেকেই মানুষের সাথে এসব বিড়ালের সম্পর্ক চলে আসছে । প্রায় চার হাজার বছর আগে প্রাচীন মিশরীয়রা বিড়াল পালন শুরু করে। কারণ তখন সেখানে প্রচুর পরিমাণে ইঁদুরের উপদ্রব ছিল । আর ইঁদুর মারার প্রতি এই বিড়ালগুলো যেই দক্ষতা, সেটি মানুষের মনোযোগ এবং স্নেহ অর্জন করতে সাহায্য করেছে এই বিড়াল গুলোকে।

এরা অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণীদের মতো এদের ধারালো দাঁত ও নখ দিয়ে অন্যান্য শিকারের সাথে গাছের ডালপালায় আঘাত করতে পারে। শিকারের জন্য এরা মূলত রাতের বেলা বেশি সচল থাকে যখন স্বীকারের চেয়ে তারা চোখে বেশি দেখতে পায়। বিড়ালের শ্রবণশক্তিও বেশ প্রখর। তবে এদের ব্যাপারে বেশ মজার একটি তথ্য হলো, এদের শরীরের ভারসাম্য রক্ষায় এদের লেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিড়ালরা মূলত তাদের যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন আসবাবপত্রের মধ্যে নখ দিয়ে আঁচড় দিয়ে থাকে। এই চিহ্নগুলো অন্যান্য বিড়ালকে তাদের বাসস্থান সম্পর্কে অবহিত করে। তবে বাড়িতে পোষা বিড়ালগুলো বিভিন্ন ভোকাল সাউন্ড এর মাধ্যমেও যোগাযোগ রক্ষা করে থাকে।

গৃহপালিত বিড়ালগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাংসাশী হয়ে থাকে এবং কাঁচা মাছ-মাংসের উপযোগী করেই এদের অন্ত্রের বিকাশ ঘটে থাকে। এদের রুক্ষ ও ধারালো জিহ্বা মাংসের হাড় থেকে প্রতিটি কণা আলাদা করতে ব্যাপক ভাবে সহায়তা করে থাকে। মানুষের দেয়া খাবারের সাথে বিড়ালের স্বাদের বেশ তারতম্য হতে পারে। এক্ষেত্রে তারা নিজেরাই স্বীকার করে নিজেদের খাবার সংগ্রহ করতে সক্ষম।

প্যাঙ্গোলিন (বন রুই)

প্যাঙ্গোলিন মূলত একটি স্তন্যপায়ী প্রাণী যাদের আকৃতি লম্বায় ৪৫ ইঞ্চি থেকে ৪ ফুট ৫ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে। এদের ওজন ৪ থেকে ৭২ পাউন্ড পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই নিরীহ, লাজুক প্রাণীটি ক্রমেই সকলের কাছে পরিচিত হয়ে উঠছে একটি কারণেই। তা হল এই প্রাণীটি বিশ্বের সর্বাধিক অবৈধভাবে পাচার হওয়া অমনুষ্য স্তন্যপায়ী প্রাণী। চীন এবং ভিয়েতনামের কিছু ধনী মানুষের কাছে এই প্রাণীটি অতি সুস্বাদু একটি খাবার। তাছাড়া প্রথাগত চীনা ওষুধের জন্য এই প্রাণীটির ব্যাপক কদর রয়েছে। এসব কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার প্যাঙ্গোলিন পাচার করে হত্যা করা হয়।

পুরো পৃথিবীর মিলিয়ে আট প্রজাতির প্যাঙ্গোলিন পাওয়া যায়। এরমধ্যে চাইনিজ-এশিয়ান, ফিলিপাইন, সুন্দা এবং ইন্ডিয়ান এই চার প্রজাতির প্যাঙ্গোলিন আইইউসিএন (IUCN) কর্তৃক বিপন্নপ্রায় প্রাণীর তালিকাভুক্ত হয়েছে। তবে চারটি আফ্রিকান প্রজাতি গ্রাউন্ড প্যাঙ্গোলিন, জায়ান্ট প্যাঙ্গোলিন, সাদা পেটযুক্ত প্যাঙ্গোলিন এবং কালো পেটযুক্ত প্যাঙ্গোলিন বিপন্নপ্রায় প্রাণীর তালিকায় একটু নিচের দিকে রয়েছে। তবে অবৈধ পাচারের জন্য সমস্ত প্রজাতিগুলোর জনসংখ্যাই ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। তবে ২০১৬ সালে একটি জরিপে ১৮ টি দেশ এই প্যাঙ্গোলিন পাচারের বিপক্ষে ভোট দেয়।

তবে এতকিছুর পরেও ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে সিঙ্গাপুরে প্যাঙ্গোলিনের ১৪ টন এবং ১৪.২ টনের দুটি চালান আটক করা হয় যা মূলত নাইজেরিয়া থেকে আগত ছিল।

প্যাঙ্গোলিন মূলত একাকী থাকতে পছন্দ করে এবং রাতের বেলা বেশিরভাগ সক্রিয় থাকে। এদের মধ্যে বেশিরভাগ মাটিতে বসবাস করলেও কিছু কিছু কালো পেটযুক্ত প্যাঙ্গোলিন গাছেও বসবাস করে। এদের আকৃতি মূলত গৃহপালিত বিড়ালের থেকে লম্বায় ৪ ফুট বড় হয়ে থাকে। এদের দেহ মূলত কেরাটিনযুক্ত আঁশ দিয়ে আবৃত থাকে যা মূলত মানুষের নখের উপাদান। কোন বিপদের সম্মুখীন হলে এরা গোল বলের মতো নিজেকে পেঁচিয়ে নেয় এবং লেজের গোঁড়া থেকে দুর্গন্ধযুক্ত তরল বের করতে পারে।

বেশ বড় ধরনের লম্বা জিহ্বা রয়েছে যা দিয়ে তারা খুব সহজেই পিঁপড়া এবং অন্যান্য পোকামাকড় ভক্ষণ করতে পারে। তবে মজার ব্যাপার হলো পিঁপড়া খাওয়ার সময় এরা এদের নাক এবং কান বন্ধ করতে পারে যাতে করে নাক, কান দিয়ে পিঁপড়া ঢুকতে না পারে। প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে কুকুর বিড়াল এবং ভাল্লুকের সাথে এদের অনেকটা মিল পাওয়া যায়।

এরাবিয়ান ক্যামেল (আরবিয় উট)

আমরা সকলেই কমবেশি উটের সাথে পরিচিত। এরা বিশালদেহী তৃণভোজী স্তন্যপায়ী প্রাণী। সাধারণত এদের উচ্চতা কম করে হলেও ৭ ফুট এর বেশি হয় এবং ওজন ১৬০০ পাউন্ডের বেশি হয়। বেশিরভাগ সময়ই এরা পালের মধ্যে ঘোরাঘুরি করে।

এই আরবি উটগুলো ড্রমেডারী হিসেবেও পরিচিত। এদের দেহে একটি মাত্র কুঁড়ি রয়েছে যা তারা খুবই কার্যকরভাবে ব্যবহার করে। একটি কুঁড়ি ৮০ পাউন্ড পর্যন্ত চর্বি সঞ্চয় করা যায় খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা না থাকলে উটের দেহে পানি ও খাদ্যের অভাব পূরণ করে থাকে। এই কুঁড়িগুলো পানি ছাড়াই উটকে ১০০ মাইল মরুভূমি পর্যন্ত ভ্রমণ করার শক্তির যোগান দেয়।

উটগুলোর দেহ থেকে খুব কমই ঘাম নিঃসরণ হয়। মরুভূমির তাপমাত্রা ১২০ ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছালে তখনই তারা তরল গ্রহণ করে এবং সেই তরল দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করতে পারে। এরা যখন পানি রিফিল করে তখন স্পঞ্জের মতো পানি ভিজিয়ে রাখে। এরা যখন খুব তৃষ্ণার্ত অবস্থায় থাকে তখন মাত্র ১৩ মিনিটের মধ্যে ৩০ গ্যালন পানি পান করতে পারে। এছাড়াও এদের আরও বিভিন্ন ধরনের অভিযোজন ক্ষমতা রয়েছে। বানু থেকে এদের নাক কে রক্ষা করার জন্য নাকের ভেতরে এক ধরনের পর্দা থাকে এবং চোখকে রক্ষা করার জন্য গুল্ম ধরনের ভ্রু থাকে।

বড় এবং শক্ত ঠোঁট এদেরকে কাঁটাযুক্ত উদ্ভিদ ভক্ষণে সহায়তা করে। এছাড়াও এদের পায়ের বড় পাদদেশ পাথরে অঞ্চল এবং মরুভূমির বালুর চর গুলোতে চলাচল করতে সহায়তা করে।

এই আরবিয় উটগুলো প্রায় ৩৫০০ বছর ধরে গৃহে পালন করা হচ্ছে। এরা দিনে ২৫ মাইল পর্যন্ত বড় ও ভারী বোঝা বহন করতে পারে। এছাড়াও আরবিয় সংস্কৃতি অনুযায়ী কোন ব্যক্তির সম্পত্তির পরিমাণ বিচার করতে গেলে তার উটের সংখ্যার উপর নির্ভর করে সে কতটা ধনী। তবে বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সমস্ত উট গৃহপালিত প্রাণী। বর্তমানে এদেরকে উত্তর আফ্রিকা, দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ায় খুঁজে পাওয়া যায়।

গ্রেটার হর্স হো ব্যাট

এরা মূলত স্তন্যপায়ী প্রাণী যাদের দৈর্ঘ্য ৫.৭ থেকে ৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। আর পাখনার দুই প্রান্তের দৈর্ঘ্য মিলিয়ে ৩৫ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এদের ওজন ১৭ থেকে ৩৪ গ্রাম পর্যন্ত হয়। এদের আয়ু গড়ে ৩০ বছরের বেশি হয়ে থাকে। এদেরকে সাধারণত এপ্রিল থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত দেখা যায়।

পূর্বে এদের বসবাস গুহার মধ্যে থাকলেও, বর্তমানে এরা পুরনো বাড়ি, গির্জা এবং শস্যাগার গুলোতে ঝাঁকে ঝাঁকে বসবাস করে। সমস্ত বাদুড় নিশাচর হয়ে থাকে এবং প্রতিধ্বনি ব্যবহার করে অন্ধকারেই এরা মাঝারি ও ছোট অন্যান্য উড়ন্ত পোকামাকড় গুলোকে খেয়ে থাকে। গ্রীষ্মের প্রথম দিকে এই বাদুরগুলো সন্ধ্যা এবং ভোর বেলা দেখা যায়। তবে শীতকালে বাদুরগুলো গুহা, অব্যবহৃত খনি, টানেল এবং ময়লার আস্তরণের মধ্যে শীতযাপন করে।

আমাদের পরিচিত বড় বাদুরগুলোর তুলনায় এই গ্রেটার হর্স হো ব্যাট বেশ ছোট যা মূলত একটি নাশপাতির আকৃতির সমান। এদের দেহে ঘোড়ার আকৃতির মতো মাংসল নাক রয়েছে। পিঠে লালচে-বাদামি পশম রয়েছে এবং নিচে ক্রিমের মতো আবরণ রয়েছে। এই প্রজাতির বাদুরকে সাধারণত দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ড এবং সাউথ ওয়েলসে পাওয়া যায়।

এশিয়ান পাম সিভেট

এশিয়ান পাম সিভেট মূলত দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি স্তন্যপায়ী প্রাণী। এরা সাধারণত ঘন জঙ্গল এবং রেইনফরেস্টে বসবাস করে থাকে। এরা দৈর্ঘ্যে ৪৩ থেকে ৭১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এদের ওজন ১.৪ কেজি থেকে ৪.৫ কেজি পর্যন্ত হয়। এদের গড় আয়ু সাধারণত ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে।

এশিয়ান পাম সিভেট সাধারণ সিভেট হিসেবেও পরিচিত এবং টডি প্রজাতির বিড়াল যেখানে পাওয়া যায় সে অঞ্চলে পাম সিভেটও স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায়। এশিয়ান পাম সিভেট সাধারণত কেবল রাতের বেলায় খাবার খায়। মনে করা হয়ে থাকে যে শিকারিদের ভয়ে এরা নিশাচর হিসেবে গড়ে উঠেছে।

এই এশিয়ান পাম সিভেটকে যে কফি বীজগুলো খাওয়ানো হয় তা হজম এর মাধ্যমে পায়ুপথ দিয়ে বের হওয়ার পর সংগ্রহ করা হয় এবং কফি প্রস্তুত করতে ব্যবহার করা হয়। তবে এই কফিটি মোটেও কোন সাধারণ কফি নয়। অনন্য স্বাদের এই কফির সারা বিশ্বজুড়ে বেশ কদর রয়েছে এবং এটি খুবই ব্যয়বহুল।

এশিয়ান পাম সিভেট জঙ্গলে বেশ অনেক জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে এবং এশিয়াজুড়ে খুব সহজেই দেখা যায়। এরা দেখতে অনেকটা বিড়ালের মতো হলেও, বাস্তবে ওয়েসেলস এবং মংগুজ সহ অন্যান্য ছোট মাংসপেশির প্রাণীর সাথে দেখতে মিল রয়েছে। অন্যান্য প্রজাতির সিভেটের মত এশিয়ান পাম সিভেটের লেজের মধ্যে রিং থাকেনা। তবে এদের মুখটি দেখতে রাকুন এর মত অনেকটা। তবে এরা এদের বড় চোখ এবং শরীরের মোটা, কালো পশমের জন্য সহজেই চিহ্নিত যোগ্য।

এশিয়ান পাম সিভেট একটি মাংসাশী প্রাণী এবং অন্যান্য প্রজাতির সিভেটের মত এটিও মাংস, অদ্ভুত উদ্ভিদ এবং ফলমূল ভিত্তিক ডায়েটে বেঁচে থাকে। ক্ষুদ্র প্রাণী যেমন টিকটিকি, সাপ, ব্যাঙ ইত্যাদি এদের পছন্দের খাবার। তবে এরা এদের বাসস্থানের আশেপাশের পামের ফল এবং ফুল, আম, কফি বীজ ইত্যাদিও খেয়ে থাকে। বর্তমানে বন উজাড়ের কারণে এদের বাসস্থান চরম হুমকির সম্মুখীন এবং এই কারণে এদের অস্তিত্ব বিপন্ন প্রায়।

ডোমেস্টিক পিগ (পোষা শূকর)

গৃহপালিত শুকরগুলো সাধারণত সহজেই প্রতিক্রিয়াশীল, অনুগত এবং অত্যন্ত বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে পরিচিত। এদের দেহের দৈর্ঘ্য সাধারণত ১৮০ থেকে ৯০০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এদের দেহের ওজন ৫০ থেকে ৩৫০ কেজি পর্যন্ত হয়। এরা সর্বোচ্চ ১৭ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিতে দৌড়াতে পারে। এদের গড় আয়ু সাধারণত ৯ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত হয়।

২০১৬ সাল পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী পুরো বিশ্বে এইসব গৃহপালিত শূকরের সংখ্যা ৭৮৪.৮৩ মিলিয়ন। পায়ে জোড়া খুরওয়ালা প্রাণীর মধ্যে এরা অন্যতম। এছাড়াও বুনো শুকর গুলোর থেকে এরা তুলনামূলক বৃহৎ আকৃতির এবং ধীর গতিসম্পন্ন। যদিও এদের জিন বুনো শুকর থেকেই এসেছে তবে এরা জিন পরিবর্তনের মাধ্যমে বৃহৎ আকৃতির লাভ করেছে। এই পদ্ধতিকে ক্রস ব্রিডিং ও বলে৷ এই ক্রস ব্রিডিং এর মাধ্যমে শূকরের অনেক প্রজাতির জন্ম হলেও তার মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ হল এই গৃহপালিত শুকর।

তবে আশ্চর্যজনকভাবে এরা বেশ পরিষ্কার এবং এদের বাড়ির পরিসীমার ভিতরে কোন ময়লা আবর্জনা জমতে দেয় না। ফার্মের বাইরে যখন এদের কে ছেড়ে দেয়া হয় তখন অধিকাংশ সময়ই এদেরকে খেলাধুলা করতে অথবা রোদ পোহাতে দেখা যায়। এই প্রাণীগুলোর ঘ্রাণশক্তি প্রখর যা তাদের আশেপাশের পরিবেশ সম্পর্কে সজাগ রাখতে সহায়তা করে।

গৃহপালিত এই শুকরগুলো এন্টার্কটিকা মহাদেশ ছাড়া সারা বিশ্বেই পাওয়া যায়। তবে সহনীয় তাপমাত্রার স্থানগুলো এদের বসবাসের জন্য আদর্শ। এরা সাধারণত সর্বভুক হয়ে থাকে। এরা প্রাণী এবং উদ্ভিদ জাতীয় উভয় ধরনের খাবার খেয়ে থাকে। তবে এদের পছন্দের খাবার গুলোর মধ্যে রয়েছে ভুট্টা, গম, সয়া, বার্লি ইত্যাদি। তবে অসচ্ছল খামারিরা এদেরকে ফলের খোসা, উদ্ভিজ্জ বিজ ইত্যাদি খাইয়ে থাকে। মজার ব্যাপার হলো এরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য উদ্ভট উদ্ভট শব্দের ব্যবহার করে থাকে।

আফ্রিকান গ্রিন মানকি (আফ্রিকান সবুজ বানর)

এই আফ্রিকান সবুজ বানর সাবাউস নামেও পরিচিত। এদের দেহ মূলত সোনালী ও সবুজ রঙের মিশ্রিত পশম দিয়ে ঢাকা এবং হাত-পা ফ্যাকাসে রঙের হয়ে থাকে। লেজের দিকটি আবার হলুদে-সোনালী রঙের হয়। এই প্রাণীগুলো কিছুটা দ্বিরুপী প্রজাতির। পুরুষরা সাধারণত মহিলাদের চেয়ে আকারে বড় হয়।

প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের ওজন ৩.৯ থেকে ৮ কেজি পর্যন্ত হয় এবং উচ্চতা ১.৩৮ থেকে ১.৯৭ ফুটের মধ্যে হয়। অন্যদিকে স্ত্রী দের ওজন সাধারণত ৩.৪ থেকে ৫.৩ কেজির মধ্যে হয় এবং উচ্চতা ১ থেকে ১.৫ ফুট পর্যন্ত হয়।

এদেরকে বেশিরভাগ কাঠের আবাসস্থল গুলোতে খুঁজে পাওয়া যায়। এছাড়াও কাঠের জমি থেকে শুরু করে রেইনফরেস্ট গুলোতেও এদের পাওয়া যায়। তবে উপকূলীয় অঞ্চল গুলোও এদের পছন্দের জায়গা যেখানে এদেরকে খুব সহজেই খুঁজে পাওয়া যায় যেখানে কাঁকড়ার আধিক্য রয়েছে৷ এছাড়াও এদের খাবারের তালিকায় বিভিন্ন ধরনের ফল সহ আরও অনেক কিছু রয়েছে।

এ প্রজাতির বানর গুলো বেশ সামাজিক এবং এদেরকে দলে দলে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। এদের এই দলগুলো সাধারণত ৭ থেকে ৮০ জনের হয়ে থাকে। তবে মজার ব্যাপার হলো এই বানর গুলি মৌখিক এবং অমৌখিক উভয়ভাবেই যোগাযোগ করাতে বেশ পারদর্শী। এদের একেকটি কাজের জন্য একেক রকম ভাষা রয়েছে। যেমন শিকারির হাত থেকে সতর্ক করার জন্য একরকম ভাষা রয়েছে। আবার শিকারির ধরনের উপর ভিত্তি করে ভাষারও ভিন্নতা রয়েছে। এরা এদের সংবেদনশীল অবস্থা প্রকাশের জন্য বিভিন্ন অঙ্গ-ভঙ্গি এবং মুখের ভাব ব্যবহার করে।

রেড ফক্স (লাল শিয়াল)

লাল শিয়াল মূলত একটি সর্বভুক স্তন্যপায়ী প্রাণী। এদের দৈহিক গড়ন সাধারণত ১৮ থেকে ৩৩ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে। আর শুধুমাত্র লেজের দৈর্ঘ্য ১২ থেকে ২১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। এদের ওজন সাধারণত ৬.৫ থেকে ২৪ পাউন্ড পর্যন্ত হয়ে থাকে। এদের গড় আয়ু ২ থেকে ৪ বছর হয়।

এই লাল শিয়াল মূলত সারা পৃথিবী জুড়েই বিভিন্ন স্থানে বসবাস করে যার মধ্যে বন-জঙ্গল, তৃণভূমি, মরুভূমি, পর্বতমালা ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে বর্তমানে কিন্তু তারা মানব সভ্যতার সাথে তাল মিলিয়ে শহর অঞ্চল এবং বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মধ্যেও ভালোভাবে খাপ খাইয়ে দিয়েছে। তবে যেই ব্যাপারটা এই শিয়ালকে এতো বিখ্যাত করে তুলেছে তা হল এর বুদ্ধিমত্তা এবং ধূর্ততা।

এই লাল শিয়াল হল নির্জন শিকারি অর্থাৎ এরা একা একাই শিকার করতে পছন্দ করে। এদের পছন্দের খাদ্য তালিকার মধ্যে রয়েছে ইঁদুর, খরগোশ, পাখি এবং অন্যান্য ছোট প্রাণী। তবে এদের খাদ্যাভ্যাস এবং আবাসস্থল পরিবর্তনের মতোই সহজ। অর্থাৎ প্রয়োজন পড়লে এরা ফলমূল, শাকসবজি, মাছ, ব্যাঙ এবং কীটপতঙ্গও খেয়ে থাকে৷ তবে মানুষের মধ্যে বসবাস করার সময়ে এরা ময়লা আবর্জনা এবং পোষা প্রাণী শিকার করে খায়।

ঠিক বিড়ালের মত শিয়ালের লেজও এদের দেহের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। তবে এদের লেজের অন্যান্য ব্যবহারও রয়েছে। যেমন শীতকালে শিয়াল তাদের এই মোটা লেজকে উষ্ণ আবরণ হিসেবে ব্যবহার করে। এছাড়াও অন্য শিয়ালের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এদের লেজ কে সংকেত হিসেবে ব্যবহার করে। মজার ব্যাপার হলো এরা পাথর এবং গাছের গোঁড়ায় প্রস্রাব করার পরে অন্য শিয়ালকে লেজের মাধ্যমে সংকেত দেয় যাতে করে অন্যরাও ওই স্থানেই প্রস্রাব করে।তবে অনেক জায়গাতেই এই শিয়াল গুলোকে সার্কাস বা খেলাধুলা প্রদর্শনের জন্য শিকার করা হয়। অনেক সময় এদেরকে বিপদজনক মনে করে মেরেও ফেলা হয়।

ওয়াটার বাফেলো (জলের মহিষ)

ওয়াটার বাফেলো মূলত একটি তৃণভোজী স্তন্যপায়ী প্রাণী। এদের দেহের দৈর্ঘ্য ৮ থেকে ৯ ফুট পর্যন্ত হয় এবং এদের লেজ ২ থেকে ৩.৫ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। এদের ওজন ১৫০০ থেকে ২৬৫০ পাউন্ড পর্যন্ত হয়ে থাকে। বন্য জীবনযাত্রা অনুযায়ী এদের গড় আয়ু ২৫ বছরের উপরে। এই এশিয়ান মহিষ বা জলের মহিষ মূলত বোভিনি উপজাতির বৃহত্তম সদস্য যার মধ্যে রয়েছে ইয়াক, বাইসন, আফ্রিকান মহিষ ও বিভিন্ন প্রজাতির বন্য ও গবাদি পশু। এরা দিনের বেশিরভাগ সময় এশিয়ার ক্রান্তীয় ও উপনিবেশীয় বনাঞ্চলের কাদাপানিতে সময় কাটায়। এদের লম্বা এবং প্রশস্ত পা গুলো এদেরকে গভীর কাদা পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা করে এবং সেইসাথে জলাভূমিতে চলতেও সহায়তা করে। এই জলাভূমিগুলো সমৃদ্ধি জলজ উদ্ভিদ সরবরাহ করলেও এই প্রাণীগুলো শুকনো তৃণভূমিতেই খেতে পছন্দ করে৷

প্রায় পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই মহিষগুলো গৃহপালিত হিসেবেও পরিচিত। তখন থেকে এদের মাংস, শিং, দুধ, চর্বি, পণ্য পরিবহন, জমি চাষ ইত্যাদি মানব সমাজে বিশেষ ভূমিকা রেখে আসছে। বন্য মহিষগুলোর অস্তিত্ব দিনদিন ঝুঁকিতে পড়ে যাচ্ছে যার কারণ হলো গৃহপালিত মহিষগুলোর সাথে এদের জীনের সম্পর্ক রয়েছে। এদেরকে এখন শুধুমাত্র ভারত, নেপাল ও ভুটানের কিছু সুরক্ষিত অঞ্চলে এবং থাইল্যান্ডের একটি বন্যপশু সংরক্ষণাগারে দেখা যায়।

ঢাকাটাইমস/১৩এপ্রিল/একে

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :