সাক্ষাৎকারে ফরচুন চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান

এটা আমার নিজের তৈরি জীবন

সিরাজুম সালেকীন, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২১, ১৪:৫৬ | প্রকাশিত : ০৭ জুলাই ২০২১, ১৪:৩৬

মিজানুর রহমানের গল্পটা রূপকথার মতোই। সততা আর পরিশ্রম যে মানুষকে বিমুখ করে না, এর এক উজ্জ্বল প্রমাণ তিনি। ১৯৯৬ সালের দিকে ‘ডোর লক’ ও কিছু এক্সেসরিজ বিদেশ থেকে আমদানি করে এনে বিক্রি করতেন। তখনো তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সেই যে ব্যবসার শুরু, এরপর কেবলই এগিয়ে যাওয়ার পালা।

নিজের সততা ও প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠা করেছেন বেশ কটি জুতার কারখানা। সেগুলো হলো- প্রিমিয়ার ফুটওয়্যার, ইউনি ওয়ার্ল্ড ফুটওয়্যার টেকনোলজি, সিন ইন ফুটওয়্যার টেকনোলজি, এম জে ইন্ডাস্ট্রিজ এবং ফরচুন স্যুজ। যা শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন সেখানে তৈরি হচ্ছে সাড়ে ২২ হাজার জোড়া জুতা। যাচ্ছে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

আছে অন্যান্য খাতের আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। তার প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করছেন প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক।

শিল্প খাতে অবদানের স্বীকৃতি এবং শ্রেষ্ঠ উদ্যোক্তা হিসেবে অর্জন করেছেন ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প পুরস্কার ২০২০’। মাঝারি ক্যাটাগরিতে পেয়েছেন প্রথম পুরস্কার।

মিজানুর রহমান বরিশাল বিসিক মালিক সমিতির সভাপতি। ২০১৮ সালে পেয়েছেন ‘সেরা সফল ইয়ং উদ্যোক্তা’ এবং ‘স্যার সলিমুল্লাহ পদক’।

২০১৫ সালে তার প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের অন্তর্ভুক্ত হয়। দীর্ঘদিন ধরে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। গত বছর মার্কিন ‘ফোর্বস’ সাময়িকীতে ‘আন্ডার অ্য বিলিয়ন’ ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশের কোনো স্যু ফ্যাক্টরি হিসেবে প্রথম তালিকাভুক্ত হয়। এ ছাড়া তিনি বিপিএলে ‘ফরচুন বরিশাল’ ক্রিকেট টিম এবং ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্রিকেট টিমের চেয়ারম্যান।

মিজানুর রহমানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল তার সংগ্রাম আর সফলতার গল্প। ছোটবেলায় বেড়ে উঠেছেন বরিশালের বাবুগঞ্জে। বাবা ছোট একটি চাকরি করতেন। পাঁচ সন্তান নিয়ে টানাপোড়েনের সংসার ছিল তাদের। ভাইদের মধ্যে সবার বড় মিজানুর রহমান।

গ্রামের স্থানীয় স্কুলে যখন পড়াশোনা করতেন তখন ছিল না বিদ্যুৎ। কুপি বা হারিকেন জ্বালিয়ে তাকে পড়াশোনা করতে হয়েছে। কলেজে উঠে চলে আসেন চট্টগ্রামে এক নানার বাড়িতে। সেখান থেকেই এইচএসসি পাস করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা অবস্থায় শুরু করেন ব্যবসা। এরপর তাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

ঢাকা টাইমসের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে গল্পে গল্পে তার সুখ-দুঃখ আর স্বপ্ন-সাফল্যের কথা জানিয়েছেন ফরচুন স্যুজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান।

২০১২ সালে ৪৭২ জন শ্রমিক নিয়ে ফ্যাক্টরি শুরু করে আজ তার প্রতিষ্ঠানে পাঁচ হাজারের কাছাকাছি শ্রমিক কাজ করছেন। বর্তমানে বরিশালেই তিনটি জুতা কারখানা রয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে রয়েছে আরও ব্যবসা। ফরচুন স্যুজের পাশাপাশি এই শিল্প উদ্যোক্তার রয়েছে প্রিমিয়ার ফুটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি, কার্টন ফ্যাক্টরি, বক্স ফ্যাক্টরি ও কাটিং ডাইস ফ্যাক্টরি। তাছাড়া শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে- আজিজ ফুটওয়্যার এবং ফরচুন কেবলস।

অল্প বয়সে মিজানুর রহমান তার বাবাকে হারান। সেটা ১৯৯৬ সাল। মা বেঁচে আছেন। পাঁচ ভাইয়ের দুজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। বর্তমানে তারা চার ভাই ব্যবসাতে আছেন।

এই যে এত দূর আসা, এই জার্নিটা তো খুব কঠিন ছিল, নিশ্চয়?

‘আমি অনেক ছোটবেলা থেকে ইমপোর্ট ব্যবসা শুরু করি। সেটা ছিল ১৯৯৬ সাল। তখন তেমন অনলাইন ছিল না। চিটাগাং শহরে দুটো শপ ছিল। সেখানে গিয়ে অনলাইনে অর্ডার করতাম। তখন চাকরির পাশাপাশি ‘ডোর লক’ এবং কিছু ইক্সেসরিজ ইমপোর্ট করি। পাশাপাশি ছোট ব্যবসায় ঢুকে যাই। আমি সু (জুতা) ফ্যাক্টরিতে চাকরি করতাম। তখন তার্কিং ডাইস লাগত, যেটা দেশের সবাই চায়না, ইতালি থেকে আনত। তখন আমি কাটিং ডায়িং ফ্যাক্টরি শুরু করলাম। এভাবে চার বছর চলে।’

‘২০০৪ সালে শুরু করলাম এমব্রয়ডারি ফ্যাক্টরি। তখন এই ব্যবসা ভালো ছিল। দুই বছর পর ২০০৬ সালে চিটাগাংয়ে কার্টন এবং বক্স ফ্যাক্টরি শুরু করি। ২০০৮ সালে চাকরি ছেড়ে দিয়ে কোরিয়ান একটি ফ্যাক্টরির সঙ্গে যৌথভাবে জুতার কারখানা দিই। সেটি ছিল চিটাগাং ইপিজেডে। তবে সেটা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কিন্তু আমার হাতে প্রচুর অর্ডার ছিল। যেহেতু হাতে অনেক অর্ডার ছিল, সেগুলো অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে দিই। সে সময়ই আমি বরিশালে চলে আসি।

‘২০১০ সালে আমি বিসিকে জমি নিই এবং দুই বছর পরে ৪৭২ জন সহকর্মী (শ্রমিক) নিয়ে ফ্যাক্টরি শুরু করি। সবশেষ হিসাবে আমার ফ্যাক্টরিগুলোতে পাঁচ হাজারের কাছাকাছি লোক কাজ করছে।

বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ। সরকার আমাকে বিভিন্নভাবে সাপোর্ট দিচ্ছে। সেই সঙ্গে আরো ধন্যবাদ জানাচ্ছি ইউরোপীয় ইউনিয়নকে। তারা সাপোর্ট না দিলে আমরা কখনো চায়নাকে টেক্কা দিতে পারতাম না।

ছোটবেলার এমন কোনো গল্প আছে যা এখনো মনে পড়ে?

আমি যখন এইচএসসি পড়াশোনা করি, তখন আমার এক নানার বাসায় থেকে পড়াশোনা করতাম। নানার ছেলেমেয়েদের পড়াতাম। সেটা ছিল চট্টগ্রামের আনোয়ারাতে। আমার কলেজে ক্লাস ছিল নয়টা থেকে। আমাকে আনোয়ারা থেকে ফেরি পার হয়ে কলেজে আসত হতো। সকাল ছয়টায় বাসা থেকে বের হতাম। আমার আব্বা ছোট একটা চাকরি করতেন। এজন্য তার কাছে আমি বেশি টাকা চাইতে পারতাম না। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি দুটি টিউশনি করতাম। দেখা যেত আমাকে পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে গিয়ে পড়তে হতো, আবার প্রাইভেট পড়াতে হতো। অনেক সময় দুপুরে খাওয়ার মতো টাকা ছিল না।

সায়েন্সে পড়লে অবশ্যই প্রাইভেট পড়তে হয়। আমারও প্রাইভেট পড়তে হতো। কিন্তু আব্বাকে ডিস্টার্ব করতাম না। আমি আমার মতো করে চলতাম। যেহেতু কলেজে যেতে নদী পাড়ি দিতে হতো, রাতে বাসায় পৌঁছাতাম (তখন ফেরির প্রচলন ছিল) সাতটা সাড়ে সাতটায়। তখন অনেক কষ্টকর সময় ছিল। বিশেষ করে এইচএসসির সময়টা। পরে আনোয়ারা থেকে চিটাগাং শহরে চলে আসি। স্টিল মিল এলাকায় থাকতাম। এরপর আস্তে আস্তে প্রাইভেট পড়িয়ে আমি আমার লাইফ আমার মতো করে লিড করি। বলতে পারেন, এটা আমার নিজের তৈরি করা জীবন, যা খুব সহজ ছিল না।

বাবা মারা যাওয়ার পর তো পরিবারের হাল আপনাকে ধরতে হয়েছিল?

আমি যখন মাস্টার্সে পড়ি তখন বাবা মারা যান। আমার ছোট ভাইয়ের বয়স মাত্র চার বছর। আরেকজনের বয়স ছয় বছর, আরেকজনের এগারো বছর, আর মেজ ভাইটা তখন কলেজে পড়ে। আল্লাহর রহমতে সবাই শিক্ষিত হয়েছে। দুজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে এবং উচ্চ শিক্ষাগ্রহণ করেছে। এখনো আমরা একসঙ্গে থাকি। পরিবারের সবাই মিলে থাকা, এটার আনন্দটা আলাদা। আমার একটা ছেলে একটা মেয়ে। তাদের নিয়ে ঢাকাতে থাকি। এ জন্য আমাকে ঢাকা-বরিশাল করতে হয়। ঢাকাতে দুটো ফ্যাক্টরি আছে সাভার ও আশুলিয়ায়।

বরিশালের বাবুগঞ্জ থেকে এত দূর আসা সহজ ছিল না হয়তো?

আমি আগেই বলেছি, এটা আমার জন্য সহজ ছিল না। আমি যখন গ্রামে পড়ালেখা করতাম, তখন বাড়ি থেকে স্কুলে যেতে কোনো দিন জুতা পায়ে দিয়ে যেতে পারিনি। জুতাটা হাতেই নিয়ে যাওয়া লাগত। আমার সেই অভিজ্ঞতা আছে। আর আমি অত ভালো ছাত্রও ছিলাম না যে একবারে পাস করে যাব! কারণ প্রাইভেট পড়তে পারতাম না, আলাদা করে শিক্ষক রাখার মতো সামর্থ্য ছিল না।

আর গ্রামে তখন বিদ্যুৎ ছিল না। কুপি বা হারিকেন জ্বালিয়ে পড়াশোনা করতে হতো। এসএসসির চার মাস আগে স্কুলের ডরমেটরিতে চলে গিয়েছিলাম। সেখানে দশ-পনেরো জনের মতো ছাত্র ছিল। আমি তখন বাবুগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতাম।

বরিশাল থেকে কেন ব্যবসা শুরু করলেন?

আমি বরিশাল থেকে শুরু করিনি। প্রথম শুরু করেছিলাম চট্টগ্রাম থেকে। সেখানে পড়াশোনা এবং প্রায় দশ বছর চাকরি করেছি। সেখানে আমার স্থাপনা যেমন- ফ্যাক্টরি, বাসা, জমিজমা আছে। পরে বরিশালে শুরু করি।

এদিকে গত ১ জুলাই শিল্প মন্ত্রণালয় ‘বঙ্গবন্ধু শিল্প-বাণিজ্য পুরস্কার ২০২০’ ঘোষণা করে। ফরচুন গ্রুপের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি মাঝারি ক্যাটাগরিতে যৌথভাবে প্রথম স্থান অধিকার করে। ফরচুন গ্রুপ ইউরোপের প্রায় সবকটি দেশেই সাত-আট বছর ধরে জুতা রপ্তানি করে আসছে।

বর্তমানে ঢাকা এবং বরিশাল মিলিয়ে ফরচুনের পাঁচটি আধুনিক জুতা তৈরির কারখানা রয়েছে। যা শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান। জুতা তৈরি করতে সব ধরনের ব্যাকওয়ার্ড ফ্যাক্টরিও রয়েছে ফরচুন গ্রুপের। সেগুলো হলো- এমজে কার্টন ফ্যাক্টরি, এমজে ফোম প্লান্ট, এমজে লেমিনেশন, এমজে কাটিং ডায়িং এবং এমজে এমব্রয়ডারি।

ফরচুন মূলত বিভিন্ন ধরনের স্পোর্টস সু তৈরি করে থাকে। বিশ্বের অনেক বড় বড় ব্র্যান্ড তাদের জুতা সংগ্রহ করে। অতি অল্প সময়ে ফরচুন গ্রুপ বিশ্বের অনেক দেশের আস্থা অর্জন করেছে এবং এই অল্প সময়ের মধ্যেই তারা ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে।

এত বড় প্রতিষ্ঠান কীভাবে গড়ে তুললেন?

আগেই বলেছি আমার আব্বা ছোটখাটো চাকরি করতেন। তার কাছ থেকে তো কিছু পাইনি। পড়াশোনা অবস্থায় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ইমপোর্ট করতাম। তখন কিছু টাকা-পয়সা হয়েছিল। আর প্রথমেই আমি বড় ফ্যাক্টরি শুরু করিনি। ছোট ছোট ফ্যাক্টরি করেছি। এরপরেই কিন্তু জুতা তৈরিতে গিয়েছি। আর চায়নার সাপ্লাইয়াররা আমাকে সহযোগিতা করেছে। যখন বরিশালে শুরু করি তখন সমস্যায় পড়েছি। আমাকে কেউ কাজ শুরু করার জন্য টাকা দিচ্ছিল না। তখন আমার কাছে মেশিন ছিল। কিন্তু কাজ শুরু করতে শ্রমিকদের যে টাকা প্রয়োজন তা কোনো ব্যাংক আমাকে দেয়নি। সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি ব্যাংকে ঘুরেছি। সর্বশেষ ইসলামী ব্যাংকের একজন ভদ্রলোক আমাকে ছোট্ট একটি ‘ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল’ দিয়েছিলেন। এরপর আস্তে আস্তে অনেক ব্যাংক আমাদের সাপোর্ট দেয়। এরপরই ভালো করতে শুরু করি।

ব্যবসা করতে গিয়ে কখনো কোনো ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়েছে কি না?

২০১৪ সালে জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের কারণে আমার প্রায় ২৫টি কন্টেইনার পোর্টে আটকা পড়ে। সে সময় আমরা বাস দিয়ে ওয়ার্কারদের আনা-নেওয়া করতাম। আন্দোলনের সময় আমাদের চারটি বাস ও একটি প্রাইভেটকার পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এটা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে গিয়েছিল। এ সময় ফ্যাক্টরি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অনেক অর্ডার বাতিল হয়ে যায়। তখন আমার এখানে এক হাজার লোক কাজ করত। এতে প্রায় ২৫ কোটি টাকার সমস্যায় পড়ে গিয়েছিলাম। আস্তে আস্তে সেগুলো রিকভারি করেছি। ব্যবসায়ের সবচেয়ে বড় বিষয় সততা, সততা এবং সততা। এর বাইরে কিছু নেই। অঙ্গীকার দিলে তা রাখতে হবে। সততা থাকলে কেউ থামাতে পারবে না।

আর সব কাজে কর্মনিষ্ঠা থাকতে হবে। যেমন- চায়নাতে অফিসের কার্যক্রম শুরু করে সকাল নয়টায়। এ জন্য আমাকে সকাল সাতটায় কাজ শুরু করতে হয়। আবার রাত দুইটায় আমেরিকার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হচ্ছে। সকাল সাতটায় নাস্তা করতে করতে কাজ শুরু করি। ঘুমানোর আগ পর্যন্ত রাত দুইটা পর্যন্ত আমাকে কাজ করতে হয়। আমার অনেক বড় টিম থাকলেও ‘প্রাইজ কোটেশন’ এখনো আমি নিজে দেখি।

এমন কোনো স্মৃতি আছে, যা এখনো কষ্ট দেয়...?

এমন অনেক কষ্টের স্মৃতি আছে যা স্মরণ করলে সময় শেষ হবে না। তবুও বলি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় আমরা চট্টগ্রামে ব্যাচেলর বাসায় থাকতাম। আমার ছোট ভাইও একটু দুষ্টু। ও (বর্তমানে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার) তখন অষ্টম বা নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করে; আমার সঙ্গে থাকত। তখন ছোট ভাই পুকুরে গিয়ে গোসল করত। একদিন পুকুরের মালিক আমার ছোট ভাইকে চরম পিটিয়েছিল, যা দেখে আমি খুবই কষ্ট পেয়েছিলাম। তখন আমি কাউকে কিছু বলিনি। তবে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আমি কিছু করব বা এখানেই আমি কিছু করে দেখাব। পরে আমি ওই পুকুরের জায়গাতে জমি কিনেছি। ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ওই আচরণের ঘটনা আমার এখনো মনে আছে। হয়তো আমার ছোট ভাইয়ের মনে নেই।

জীবনে কারও কাছে ঋণী আছেন?

এটাও গল্প দিয়ে বলি। আমার ভাইদের নিয়েই তো আমার পরিবার, আমার জীবন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়তাম তখন আমার বন্ধু জাহিদ ইকবাল, আর আমি দুজন একসঙ্গে থাকতাম। ও (জাহিদ) এখন লন্ডনে থাকে। আমার ছোট ভাইয়ের এসএসসির ‘ফর্ম ফিলাপের (রেজিস্ট্রেশন) শেষ দিন, কিন্তু আমার কাছে টাকা নেই। এ জন্য আমার ছোট ভাই রাগ করে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। আমি বন্ধু জাহিদের কাছে গিয়ে বললাম, ‘বন্ধু, ছোট ভাইয়ের রেজিস্ট্রেশন, কিন্তু আমার কাছে তো টাকা নেই, কী করব? আর টিউশনির টাকা পেতেও সময় লাগবে। তত দিন তো রেজিস্ট্রেশনের সময় শেষ হয়ে যাবে।’ জাহিদ ওর আব্বার কাছে গেল এবং বলল, ‘আব্বা, কিছু টাকা লাগবে।’ ওর বাবা বলল, ‘কী জন্য?’ জাহিদ বলল- ‘আমার বন্ধুর (মিজানের) ছোট ভাইয়ের এসএসসির রেজিস্ট্রেশন।’ উনি কোনো কথা না বলে টাকাটা দিয়ে দিলেন। পরে আমি স্কুলে গিয়ে ছোট ভাইয়ের রেজিস্ট্রেশন করে চলে আসি। ওই আঙ্কেলকে আমি কখনো ভুলব না। উনি বেশ কিছু দিন আগে মারা গেছেন। আমি ইউরোপের কোনো দেশে গেলেই জাহিদের বাসায় গিয়ে দেখা করে তারপর আসি।

কোনো কিছু না পাওয়ার আক্ষেপ কি নেই?

...নাহ, নাহ, কোনো আক্ষেপ নেই। আল্লাহ যা দিয়েছেন, অনেক। তিনি যা করেছেন সব মঙ্গলের জন্য করেছেন। আমার যা পাওয়ার ছিল, তা-ই পেয়েছি বা পাচ্ছি।

বৈশ্বিক মহামারি করোনাকালে কী ধরনের অবদান রেখেছে আপনার প্রতিষ্ঠান?

গত বছর আমরা প্রায় দশ হাজার পরিবারকে খাদ্য, মাস্ক, সেনিটাইজার দিয়েছি। বরিশালের মেয়র সাহেবের ত্রাণ তহবিলে ৫০ লাখ টাকা দিয়েছি। অনেক নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ আছেন, যারা চাইতে পারেন না, আমরা বিভিন্নভাবে তাদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে রাত্রিবেলা খাবার সরবরাহ করেছি। তাছাড়া মসজিদ, মাদ্রাসা এমনকি মন্দিরে সহায়তা করেছি।

আপনার প্রতিষ্ঠানে প্রায় পাঁচ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী, তাদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন?

আল্লাহর রহমতে আমাদের সঙ্গে তাদের নিবিড় সম্পর্ক। আমি প্রায় দুই হাজার সহকর্মীর নাম ধরে চিনি। অফিসারদের সঙ্গে যতটা না কথা হয়, তার চেয়ে ওয়ার্কারদের সঙ্গে বেশি কথা বলি। আমি চেষ্টা করি তাদের সাপোর্ট করার জন্য। করোনার মধ্যে আমি তাদের কাপড় দিয়েছি; যেমনটা বাইরের লোকদের দিয়েছি। আমি বের করেছি আমাদের মধ্যে কারা দুর্বল আছে, তাদের একটা কাপড়, একটা শাড়ি দিলে কাজে লাগবে। আমাদের ফ্যাক্টরির লোকেরা বলে- ‘আমরা সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। কোনো দিন বেতন নিয়ে ঝামেলা হয়নি। ওভারটাইম নিয়ে ঝামেলা হয়নি। এখন পর্যন্ত কোনো দিন হয়নি।’

এই পর্যায়ে এসে এখন আপনার স্বপ্ন কী?

বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করা বিদেশের মাটিতে। কারণ, ব্যবসায়িক কাজে আমাকে প্রচুর বিদেশ যেতে হয়। দশ বছর আগে আমরা যখন বিদেশে যেতাম, কী পরিমাণ যে ইমিগ্রেশনে হয়রানি হতে হতো! তারা বাংলাদেশ চিনত না। বিভিন্নভাবে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে হতো। জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন ১১ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ। আর এখন আমরা কোথায়? প্রায় ৪৬ বিলিয়নে চলে গেছি। এখন আমাকে পরিচয় দিতে হয় না আমি বাংলাদেশি। পাসপোর্ট দেখলেই বোঝে আমি বাংলাদেশি। আমরা শিল্পায়নের মাধ্যমে দেশকে আরও এগিয়ে নিতে চাই এবং নিজেকে শিল্পায়নের একজন ভালো প্রতিনিধি হিসেবে দাঁড় করাতে চাই। যেটা আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবসা করছেন, কিন্তু দেশে কোনো শো-রুম চালু করেননি?

আমাদের পরিকল্পনা আছে। আল্লাহর রহমতে অচিরেই হয়তো বা শুরু করব। ব্র্যান্ডিংয়ে আমরা এরই মধ্যে নেমে গিয়েছি। বিপিএলে ‘ফরচুন বরিশাল’ নামে একটি ক্রিকেট টিম আছে। ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্রিকেট টিমের আমি চেয়ারম্যান। আমাদের প্রচার চালানোর একটা বড় জায়গা রয়ে গেছে। চিন্তা করছি ‘ফ্রাঞ্চাইজিং’ হিসেবে চলে আসব। সেটা খুব দ্রুতই।

দেশে অন্যান্য ব্র্যান্ডের জুতা ইতিমধ্যে প্রচলিত আছে। আপনারটায় কী ধরনের বিশেষত্ব থাকবে যা ক্রেতাকে আকর্ষণ করবে?

অনেকে ধনিক শ্রেণির ক্রেতাকে ধরার চেষ্টা করে ব্যবসা করছে। আমার প্রধান টার্গেট হবে সাধারণ মানুষ। তাদের কাভার করতে পারলেই আমি সাকসেসফুল হবো বলে আমার ধারণা।

আপনার স্বপ্ন ছিল মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার, সেটা তো হতে পারেননি, আক্ষেপ আছে কি?

এটা সত্য... আমি স্বপ্ন দেখতাম। তবে এত দিন বিষয়টি চেপে রেখেছিলাম। আপনি কেমন করে জানলেন জানি না। টাকা জোগাড় করতে পারিনি, এ জন্য হতে পারিনি। মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হতে যে পরিমাণ টাকা লাগত, সেটা আমার আব্বার কাছে ছিল না। তবে আমার দুই ভাই তো হয়েছে, এটাই আমার সার্থকতা।

অনেকে উদ্যোক্তা হতে চায়, তাদের বিষয়ে আপনার পরামর্শ কী?

আমি কয়েক দিন আগে একটি উদোক্তা প্রশিক্ষণের সনদ বিতরণীতে গিয়েছিলাম। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় যারা হয়েছে, তাদের ফাইল আমাকে দেখানো হলো। তাদের ফাইল দেখলাম- কেউ একজন ৪৭ শতাংশ, ৩১ শতাংশ, আরেকজন ২৭ শতাংশ লভাংশ দেখিয়েছে। আমি তাদের বললাম, এটা উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট প্রোফাইল। এটা কখনো সম্ভব নয়। অনেক সময় আমাদের কোম্পানি পাঁচ শতাংশ লভাংশ চিন্তা করে না। আমরা চিন্তা করি কীভাবে টিকে থাকতে হয়।

তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রতি আমার অনুরোধ, আপনারা সততা ও প্রতিশ্রুতি ঠিক রেখে কাজ করুন। আপনি টাকার পেছনে ঘুরবেন না, কাজের পেছনে ঘুরুন। এতে আপনি আপনার জায়গায় পৌঁছে যেতে পারবেন।

(ঢাকাটাইমস/৭জুলাই/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

অর্থনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :