হংকংয়ের স্যাটেলাইটে চলছিল হেলেনার ‘জয়যাত্রা টিভি’

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ০৩ আগস্ট ২০২১, ১৪:৫২

আওয়ামী লীগের উপকমিটির পদ থেকে বহিস্কৃত হেলেনা জাহাঙ্গীর তার জয়যাত্রা টেলিভিশনটি হংকংয়ের একটি ফ্রিকুয়েন্সি ব্যবহার করে সম্প্রচার করছিল। যা সম্পূর্ণ অবৈধ ছিল। প্রতিমাসে হংকংয়ের স্যাটেলাইটটি ব্যবহারের জন্য ছয়লাখ টাকা পরিশোধ করত।

হেলেনার দুই সহযোগী হাজেরা খাতুন ও সানাউল্লাহ নুরীকে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য পেয়েছে এলিট ফোর্স র‌্যাব।

মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ানবাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের মুখপাত্র জানান, র‌্যাব সদরদপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-৪ এর অভিযানে আজ ভোরে রাজধানীর গাবতলী এলাকায় অভিযান চালিয়ে হেলেনা জাহাঙ্গীরের অন্যতম সহযোগী হাজেরা খাতুন এবং সানাউল্লাহ নুরীকে গ্রেপ্তার করে।

অভিযানে দুটি ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হেলেনা জাহাঙ্গীরের সঙ্গে প্রতারণায় জড়িত বেশ কয়েকজনের তথ্য পাওয়া গেছে।

কে এই হাজেরা

২০০৯ সালে কুমিল্লার একটি কলেজ হতে মাস্টার্স শেষ করেন হাজেরা খাতুন। এরপর তিনি হেলেনার মালিকানাধীন মিরপুরে একটি গার্মেন্টসে অ্যাডমিন (এইচআর) পদে চাকরি শুরু করেন। হেলেনার নিকট আত্মীয় হওয়ায় কর্মদক্ষতার কারণে অত্যন্ত আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন হাজেরা। ২০১৬ সালে হাজেরা জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনের ডিজিএম হিসেবে নিয়োগ পান। ‘জয়যাত্রা টিভি’ প্রতিষ্ঠার পর থেকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে জিএম (অ্যাডমিন) পদেও তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়। গ্রেপ্তার হাজেরা হেলেনা জাহাঙ্গীরের আর্থিক বিষয়াগুলো দেখভাল করতেন।

র‌্যাব মুখপাত্র বলেন, গ্রেপ্তার হাজেরাকে জয়যাত্রা টিভি সম্পর্কে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন ২০১৮ সাল থেকে জয়যাত্রা টিভি হংকংয়ের একটি ডাউন লিংক চ্যানেল হিসেবে সম্প্রচারিত হয়ে আসছে। যার ফ্রিকুয়েন্সি হংকং থেকে বরাদ্দ করা হয়। এই ফ্রিকুয়েন্সির জন্য প্রতি মাসে প্রায় ছয় লাখ টাকা পরিশোধ করতে হতো। কিন্তু হংকং থেকে বরাদ্দ ফ্রিকুয়েন্সি থেকে দেশে সম্প্রচারের কোনো বৈধ অনুমোদন ছিল না বলে জানিয়েছেন হাজেরা।

এছাড়া সম্প্রচারের জন্য ক্যাবল ব্যবসায়ীদের কাছে ‘রিসিভার’, জয়যাত্রা টিভি বা প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরবরাহ করত। কিন্তু ক্যাবল ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সম্প্রচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় অনেক জেলা প্রতিনিধি চাকুরিচ্যুত হয়েছেন।

র‌্যাব জানায়, জয়যাত্রা টেলিভিশন দেশের প্রায় ৫০টি জেলায় সম্প্রচারিত হতো। টিভি চ্যানেলটি রাজধানী ও জেলা পর্যায়ের পাশাপাশি মফস্বল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে জনপ্রিয় করার জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়েছিলেন হেলেনা। যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অধিকসংখ্যক প্রতিনিধি নিয়োগের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা যায়। আবার কখনও গুরুত্ব বিবেচনায় জেলা প্রতিনিধি নিয়োগে ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো। এছাড়া উপজেলা প্রতিনিধি হতে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছিল। এসব টাকা এককালীন দিতে হতো।

এছাড়া প্রতিনিধিদের কাছ থেকে প্রতি মাসে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছিলো। জয়যাত্রা টেলিভিশনটি বিশ্বের প্রায় ৩৪টি দেশে সম্প্রচারিত হতো। দেশ বিবেচনা করে প্রতিনিধি নিয়োগে একলাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়া হতো।

গ্রেপ্তার হেলেনা জাহাঙ্গীরের টেলিভিশনের মুলধারার বিজ্ঞাপন কেউ দিত না। তাই টাকার বিনিময়ে তাবিজ-কবজ, টুটকা-ফাটকা, ভাগ্য বলে দিতে পারে, জিনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, গোপন সমস্যার সমাধান এসব বিজ্ঞাপন চালানো হতো।

র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হাজেরা খাতুন জানান, হেলেনা জাহাঙ্গীর জয়যাত্রা টিভিকে নিজ প্রচার ও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেই ব্যবহার করতেন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে জয়যাত্রা টিভি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা চালাতেন হেলেনা। তার প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুতদের একইভাবে হেনস্থা করতেন। এছাড়া জয়যাত্রা টিভির বিশাল নেটওয়ার্ক দিয়ে তিনি একটি সংগঠন তৈরীর পরিকল্পনা করেন। যেখানে পাঁচ হাজার সংবাদকর্মীর একটি বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা ছিল।

জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন সম্পর্কে হাজেরা খাতুন জানিয়েছেন, ফাউন্ডেশনে ডোনার, জেনারেল মেম্বার, লাইফ টাইম মেম্বার এসব ক্যাটাগরিতে অর্থ সংগ্রহ করত। এই সংগঠনের প্রায় ২০০ জন সদস্য রয়েছেন। যাদের কাছ থেকে সদস্য পদ বাবদ ২০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত সংগ্রহ করা হয়।

কে এই সানাউল্লাহ

র‌্যাব জানায়, সানাউল্লাহ নুরী জয়যাত্রা টিভির প্রতিনিধিদের সমন্বয়ক ছিলেন। তিনি হেলেনা জাহাঙ্গীরের নির্দেশনায় প্রতিনিধিদের সমন্বয় করতেন।

প্রতিনিধিদের কেউ মাসিক টাকা দিতে ব্যর্থ হলে বা গড়িমসি করলে তাদেরকে ভয়ভীতি দেখানো হতো। এছাড়া গাজীপুর এলাকায় তার নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। তিনি গার্মেন্টস সেক্টরে ব্যাপক চাঁদাবাজি করে একটি অংশ জয়যাত্রা টিভিতে দিতেন।

গত বৃহস্পতিবার রাতে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন আওয়ামী লীগের উপকমিটির পদ হারানো হেলেনা জাহাঙ্গীর। পরে তার মিরপুরের জয়যাত্রা টেলিভিশনে অভিযান চালিয়ে অবৈধ সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা হয়েছে।

(ঢাকাটাইমস/৩আগস্ট/এসএস/কেআর)

সংবাদটি শেয়ার করুন

অপরাধ ও দুর্নীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :