দুরন্তপনায় রাঙানো গল্প ‘মেঘ রৌদ্রের দিন’

রফিকুল ইসলাম
 | প্রকাশিত : ২০ অক্টোবর ২০২১, ১৭:৫৮

'মেঘ রৌদ্রের দিন' বইটি লিখেছেন ইয়াকুব আলী। যিনি ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র এবং বর্তমানে তথ্য অধিদপ্তরের সিনিয়র উপপ্রধান কর্মকর্তা। এর আগে বাংলাদেশ টেলিভিশনে বার্তা প্রযোজক, ব্রুনাই দারুসসালামে বাংলাদেশ হাইকমিশনে প্রথম সচিব হিসেবে কূটনীতিক দায়িত্ব পালন ও বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের পরিচালকসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পদস্থ পদে নিযুক্ত ছিলেন। বইটি এক অজপাড়া গাঁয়ে মমতাময়ী মায়ের আঁচলে বেড়ে উঠা এক দুরন্ত কিশোরের সূর্যালোকে গন্তব্যের অনবদ্য গল্প - মায়ের আঁচলে বিস্ময়কর পৃথিবী এক।

রোলাঁ বার্ত বলেছেন, 'পড়া আসলে একধরনের বিশিষ্ট কাজ।' আমি অবশ্য বইটির দুর্বল পাঠক। ইংরেজি কি বাংলা সাহিত্যের ছাত্র নয়। বই যদি পড়ার মতো করে পড়া যায় তাহলে ভাবতে হয় খুব। তেমন ভাবুকও যে নয়। ভরসা কেবল পণ্ডিতদের কেউ কেউ বলেছেন, 'পড়া আসলে একটি আনন্দদায়ক উপলব্ধি।' বই পড়ার কাজটা আরও আনন্দদায়ক হয়ে উঠে, যদি সেই বইটি অন্য কাউকে পড়ানো যায়। নিজের ভালোলাগা এমনকি মন্দলাগা কোনো বইয়ের বিবরণ আমরা উৎসাহের সাথে শেয়ার করি। আহ্বান জানাই নিজের অনুভূতির যথার্থতা যাচাই করতে। অবশ্য, প্রত্যেক পাঠক পরস্পরের চাইতে ভিন্ন ভিন্ন মননবোধের অধিকারী। পাঠক হিসেবে মনোজগতে যে আলোড়ন তুলেছে, এতে মনুষ্যত্ব থেকে আরও মানবিক হয়ে উঠতে শেখাবে। গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করবে সুখপ্রদ, আনন্দময় জীবন; জনপদ ও সমাজ। বইযের মূল বিষয়বস্তু উপলব্ধি, লেখকের রচনাশৈলী ও উদ্দেশ্য, আলোচ্য বইয়ের সাহিত্যিক উপাদান অনুধাবন প্রক্রিয়া ইত্যাদি পাঠক মনোভঙ্গি নিয়ে আলোকপাতের প্রয়াস।

'মেঘ রৌদ্রের দিন' - নামকরণেই সুরভিত স্মৃতিবিজড়িত জীবনের সুভাস মেলে। মনকে জীবনের কুঞ্জবনে প্রসারিত পাখা মেলে ফিরিয়ে নিয়ে যায় আজি নৃত্যে বিভোর করা শৈশবে। আর কৈশোরে পূর্ণদলে পল্লবিতের এমন বাঁধনহীন হর্ষ-উল্লাস, দুরন্তপনা, আর পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতাকে ভিন্নভাবে জয় করার এমন উদার মনের সব আবেগ নিংড়ানো আত্মজৈবনিক সুখপাঠ্য গদ্য কে কবে লিখেছে! স্মৃতিমান লেখক সুনিপুণভাবে আশির দশকে মফস্বলের স্কুলের সহপাঠীদের সঙ্গে কাটানো স্মৃতিময় দিনগুলো চিত্রায়ণ করতে গিয়ে অতুজ্জ্বলতায় শিক্ষাগুরুদের হৃদয় গহিনে অধিক সম্মানিত আসনে অধিষ্ঠানের পাশাপাশি একটি বিস্তৃত অঞ্চলের মানুষের চিন্তা-চেতনা, জীবনযাত্রা, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, অভাব-অনটন ও নৈরাশাকে বাস্তব রূপদান করেছেন। বারবার ধ্বনিত হয়েছে কৈশোরের বাঁধনছেড়া মুক্ত জীবনের জয়গান।

প্রান্তিক অজপাড়াগাঁয়ের দুরন্ত মেধাবী কিশোর এক। লেখকরূপী মেধাবী ওই কিশোর সমকালীন জীবনের স্ফুলিঙ্গে সঁচরণ করেছেন। সামগ্রিক পাঠে যা সামষ্টিক অনুপ্রেরণায় আঁতুড়ঘরে গভীরে গিয়ে রাঙিয়েছেন জীবনের পরন্তু নানা বাঁক। বাদ পরেনি সাগরসদৃশ নৈসর্গিক রূপের হাওরে অথৈ জলরাশিতে জলকেলি, নৌকাভ্রমণে উড়ি-ধবল বক, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ, কায়িক কৃষাণ-কৃষাণীর সূচিমুখ ও শুদ্ধ হাসি, জারি-পালাগান ও বিভিন্ন পার্বনে মেলায় গমন, রেলভ্রমণের প্রাণোচ্ছলতায় ফেটে পরা। যথার্থত লেখক একটি সময়কে আয়ত্তি করে তারই স্বাপ্নিক অভিযাত্রায় সিদ্ধি গল্পের সরোবরে আন্দোলিত এক অবিস্মরণীয় ইতিহাসের সাথে যুক্ত করেছেন নিজেকে।

লেখকের বাল্যকালের ইতিবৃত্তে ঐতিহ্যবাহী নানশ্রী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকাল হতে হালনাগাদপ্রায় অধ্যয়নকারী শত শত ছাত্রছাত্রীদের জীবনচরিত নিরবচ্ছিন্ন বর্ণনায় সমুজ্জ্বল। একটি সুসংহত, সুদৃশ্য, সুচেতা, মনোহর, সুখকর ও আনন্দময় পারিবারিক বাতাবরণে বেড়ে ওঠা একটি শিশু বা একজন কিশোরকে ব্যাপিয়া কত যে সময়ের দাবি, লেখক নিজেই এতে প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। কৈশোরে শখের বশে ধূমপান আসক্তির আলোকপাত অনেকের কাছে 'অন্ধকার দিক' বিস্মরণ মনে হলেও বেমালুম পরিত্যাজ্যের ঐচিত্য আগ্রহজ্ঞাপক প্রতিচ্ছবি প্রজন্মান্তরের জন্য অনুকরণীয় প্রেরণা যোগাবে ঠিক।

শিক্ষাই সর্বোত্তম বিনিয়োগ এবং শিক্ষার শেকড় তেতো হলেও এর ফল সুমিষ্ট। মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে থাকা উৎকর্ষের প্রকাশ বলেই জ্ঞান অন্বেষণে মায়ের আঁচল ও বাবার বুক ছিড়ে লেখকের পাড়ি জমাতে হয় দূর রাজধানীতে। বিশ্ববীক্ষণেও আঁতুড়ঘরের নাড়িছেঁড়া অনুভূতির গভীরতা অনুধাবনেরই অঙ্কিত প্রতিচ্ছবি লেখকের - 'ততদিনে তেজগাঁওের সরকারি বিজ্ঞান কলেজে ভর্তি হয়ে গেছি। নতুন জীবন শুরু করব ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করি। মাথায় হাত বুলিয়ে বিদায় দেন আব্বা। বাবারা সম্ভাব্য বিরহকাতরতা দেখাতে পারেন না। বিদায় জানাতে বাড়ির দেউড়ি পার হয়ে আসে মা-বোন। মঙ্গল আকাঙ্ক্ষায় উদ্ভাসিত তাঁদের সজল দৃষ্টি প্রসারিত হয়ে থাকে দৃষ্টিসীমার শেষ বিন্দু পর্যন্ত। ঝোলাটা মাথায় বা হাতে করে বয়ে চলে কনিষ্ঠ ভ্রাতা। যেভাবে হাজার বছর ধরে দূরদেশ যাত্রাকারী পুত্র বা ভাইকে বিদায় জানিযে আসছে এদেশের নারীরা। স্কুল জীবন শেষে এই যে বাড়ি ছাড়লাম এ জীবনে সেখানে আর থিতু হওয়া হলো না! জীবিকার তাগিদে হয়তো আরো তথাকথিত 'উজ্জ্বল ভবিষ্যতের' জন্যই ভিটা ছেড়ে আসা! পরিবার ও সমাজ ভালোবেসে 'আরো ভালো থাকার জন্য' স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দূরেই ঠেলে দেয়!'

লেখকের স্মৃতিচারণায় রেডিও ও টেলিভিশনের ব্যবহার, বিস্তৃতি ও উপযোগিতার দেখা মেলে। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের রোমন্থন করেছেন। বিশদ জ্ঞানালোচনায় 'মনিহার'সহ বেশকিছু প্রেক্ষাগৃহের খুঁজ মিলে। নানাবিধ সামাজিক কুসংস্কার ও ভ্রান্তধারণার বিরুদ্ধে এবং সহজ ও সুস্থ বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে নবপ্রজন্ম যুক্তিযুক্ত ধারণাশক্তি পাবেন পাঠক।

স্মৃতিশাস্ত্ররচয়িতা তৎকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক দৃশ্যপটও ফুটিয়ে তুলেছেন অনুচ্চরূপে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভাজনের মধ্য দিয়ে সমাজতন্ত্রের অবসানসহ ধনতান্ত্রিক তথা পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার উত্থান, তথাকথিত আধুনিকতা বা ফ্যাঁসিবাদের বিরুদ্ধে লেখকের জাগ্রত হৃদয় স্পন্দিত হয়েছে একটি শ্রেণিবৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা কায়েমি স্বার্থে।

বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বইটিতে দৃষ্টিপাত করা যায়। বিভিন্নরকম মানসিকতা বইয়ের লিখিত উপাদানকে ভিন্নরকমভাবে গ্রহণ করবে পাঠক, সেটাই স্বভাবিক। তবে ঝরঝরে গদ্য ও সহজ ও পরিচিত শব্দের চমৎকার প্রয়োগ, দুর্বোধ্যতা পরিহার, যথাশব্দের মজবুত গাঁথুনির কারণে বইটি সুখপাঠ্য। শব্দই নেবে টেনে পরবর্তী বাক্যে। এভাবেই চলবে শেষ না হওয়া অবধি।। ভাষা সাবলীল ও প্রাঞ্জল। বর্ণনাভঙ্গিও প্রাণোচ্ছল। লেখকের জীবন ভাবনা পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করবে। বইটি পড়ে পাঠক লেখক হওয়ার অনুপ্রেরণা লাভ করবেন- এমনটি বলে দেওয়া যায় অকপটে। 'মেঘ রৌদ্রের দিন' সত্যসত্যিই অনন্য সৃষ্টি এক।

ধ্রুপদী বিষয়বস্তুর উত্তমতা, প্রাঞ্জল সুখবোধ্য ভাষা প্রমিত শব্দচয়নে বলিষ্ঠতা, ছোট ছোট বাক্যে গতিশীলতা 'মেঘ রৌদ্রের দিন'কে অনুপমেয় উচ্চতা দান করেছে। কালান্তর প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ১৬০ পৃষ্ঠার মলাটবদ্ধ এই অনন্য সৃজনের প্রচ্ছদ এঁকেছেন নন্দিত প্রচ্ছদশিল্পী মোমিন উদ্দীন খালেদ। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সমাজব্যবস্থা, নানা অনুশাসন শিক্ষাব্যবস্থা ও ইতিহাস নিয়ে যাঁরা কাজ করবেন তথা আগামী দিনের গবেষকদের জন্য সহায়কগ্রন্থ হতে পারে 'মেঘ রৌদ্রের দিন' বইটি, যা ইতোমধ্যে বইমেলাসহ বাজারে এসে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :