কুমিল্লা-১১: এমপির স্বেচ্ছাচারিতায় আ.লীগে বিভক্তির অভিযোগ

শাহরিয়ার ইমন জয়, কুমিল্লা
| আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২৩, ১৭:৪১ | প্রকাশিত : ১৫ নভেম্বর ২০২৩, ১৭:২৬
সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক।

রাজনৈতিক অবস্থান এবং ত্যাগকে পুঁজি করে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেয়ে প্রথমবারের মতো কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মুজিবুল হক। পরবর্তীতে ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে পুনরায় এমপি নির্বাচিত হয়ে মোট ৪বার সংসদ সদস্য হন তিনি। হুইপ, ধর্ম বিষয়ক ও রেলপথের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। তবে সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্য, অনিয়ম, দলীয় নেতাকর্মীদের মামলা-হামলা, স্বজনপ্রীতি এবং একনায়কতন্ত্রের অভিযোগ উঠেছে এই এমপির বিরুদ্ধে। এছাড়া টাকার বিনিময়ে জামায়াত-বিএনপি ও ভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক দলের লোকদের আওয়ামী লীগে স্থান দিয়ে বিভিন্ন পদ-পদবি দিয়েছেন তিনি। এমপির হয়রানির হাত থেকে রেহাই পাননি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতারাও। তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা আওয়ামী লীগে সৃষ্টি হয়েছে বিভক্তি।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা জানান, এই বিভক্তির ফলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ডুবতে পারে নৌকা। সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে নির্বাচনে সক্রিয় হয়ে উঠবে জামায়াত-বিএনপি। দলের নীতিনির্ধারকদের প্রতি আসনটিতে আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রাখতে বিকল্প প্রার্থী নির্বাচনের প্রত্যাশা তাদের।

এমপি মুজিবুল হকের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, স্বেচ্ছাচারিতা, মনোনয়ন বাণিজ্য ও দলীয় নেতাকর্মীদের মামলা-হামলাসহ বেশকিছু অভিযোগ এনে প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন করেন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্যাগী ও এমপির হাতে নির্যাতিত নেতাকর্মীরা। স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মীদের অবমূল্যায়ন করে মনোনয়ন বাণিজ্য করেন মুজিবুল হক। উপজেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মসূচি পালন করতে গেলে হামলা করে এমপি মুজিবুল হকের সন্ত্রাসী বাহিনী। প্রতিবাদ করলেই দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার ও মিথ্যা মামলা দেন তিনি। চৌদ্দগ্রাম উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের মূল পদপদবীতে থাকা অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেন এই এমপি।

তবে মুজিবুল হক এমপি জানান, প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের বিষয়ে অবগত নন তিনি। দলের পক্ষ থেকে তাকে কিছুই জানানো হয়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লা-১১ আসন থেকে নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন চাইবেন চৌদ্দগ্রাম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আবদুস সোবহান ভূঁইয়া হাসান, চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান, বেলজিয়াম আওয়ামী লীগের সভাপতি বজলুর রশিদ বুলু, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শ্রম ও জনশক্তি বিষয়ক উপকমিটির সদস্য এম তমিজউদ্দিন ভূঁইয়া সেলিম।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ, জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের টার্গেট করেন এমপি মুজিবুল হক। মনোনয়ন প্রত্যাশীরা নির্বাচনি এলাকায় প্রচার-প্রচারণা কিংবা দলীয় কর্মসূচি চালালেই হামলা ও মিথ্যা মামলা দেন তিনি। যার ফলে উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা এমপির নেতিবাচক কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা করছেন। এর আগে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী বেশ কয়েকজন নেতার নির্বাচনি প্রচারণায় হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরও করেন এমপির-সমর্থকরা।

এদিকে এমপির নির্দেশে উপজেলার এক ইউপি চেয়ারম্যানের ওপর হামলা এবং ইউনিয়ন পরিষদে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী চেয়ারম্যান শাহজালাল মজুমদার।

তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এমপি মুজিবুল হকের আত্মীয় এক সদস্য প্রার্থীকে সমর্থন না দেওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদে এসে এমপি মুজিবুল হকের নির্দেশে যুবদল ক্যাডার জুয়েল, এমপির ভাতিজা তোফায়েল ও নাতি রুবেলের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা আমার ওপর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা করে মারধর ও গাড়ি ভাঙচুর করে। পরে ইউনিয়ন পরিষদে আমার কক্ষ ভাঙচুর করে তালা লাগিয়ে দেয়। গত ২ বছর যাবত আমি পরিষদে গিয়ে কার্যক্রম চালাতে পারছি না। আমার বিরুদ্ধে ২টি মিথ্যা মামলা দিয়েছে। চৌদ্দগ্রাম উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ত্যাগী ও এমপি মুজিবুল হকের অত্যাচারের শিকার নেতাকর্মীরা এখন ঐক্যবদ্ধ। আমরা এখন পরিবর্তন চাই।

পরিবর্তনের লক্ষ্যে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা জুড়ে প্রচার-প্রচারণা ও মতবিনিময় করেছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী বেলজিয়াম আওয়ামী লীগের সভাপতি বজলুর রশিদ বুলু। অভিযোগ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চৌদ্দগ্রামবাসীর কাছে তুলে ধরার জন্য আমি সমাবেশের আয়োজন করি। সেখানে মুজিবুল হকের সন্ত্রাসী বাহিনী অতর্কিত হামলা চালায়। আমার গাড়ি ভাঙচুর করে। আমার নেতাকর্মীদের পিটিয়ে আহত করে। দলীয় যেকোনো প্রোগ্রামের আয়োজন করলে উনি ভাঙচুর চালান। আমার লোকজনকে গুম করে দেওয়ার হুমকি দেন। চৌদ্দগ্রাম আওয়ামী লীগের ত্যাগী ও এমপির নির্যাতনের শিকার নেতাকর্মীরা আমরা ঐক্যবদ্ধ। আমরা পরিবর্তন চাই।

অভিযোগ আছে, গ্রুপিংয়ের জেরে গত ৬ জুন উপজেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার হুমকির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিলে হামলা করেন মুজিবুল হক এমপির সমর্থকরা। এক পর্যায়ে চৌদ্দগ্রাম বাজারে অবস্থিত আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার সাবেক মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মিজানুর রহমানের পারিবারিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে অস্ত্র নিয়ে হামলা করে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়।

মিজানুর রহমানের দাবি, তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী হওয়ায় এমপির লোকজন তার সমর্থকদের ওপর হামলা চালায়।

বিষয়টি নিয়ে সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান বলেন, আমি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে চৌদ্দগ্রাম পৌরসভা থেকে ৩বার মেয়র নির্বাচিত হয়েছি। আমার বাবা চৌদ্দগ্রাম পৌরসভা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান বীরমুক্তিযোদ্ধা আবদুর রশীদ। আমি চৌদ্দগ্রামে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি তৈরি করেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার হুমকির প্রতিবাদে চৌদ্দগ্রামে বিক্ষোভ সমাবেশ চলাকালে এমপি মুজিবুল হকের সমর্থকরা আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।

সমাবেশে উপস্থিত বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা বাহার উদ্দিন রেজাকে পিটিয়ে মারাত্মক জখম করে তারা। এ সময় সমাবেশে উপস্থিত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ৩০ জন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হন। শান্তির চৌদ্দগ্রামে মুজিবুল হক এমপি অরাজকতা সৃষ্টি করেছেন।

তিনি আরও বলেন, চৌদ্দগ্রাম আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটিগুলোতে ত্যাগী নেতাকর্মীরা বঞ্চিত হয়েছেন। অনেক নেতাকর্মীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হয়নি। ফলে ত্যাগী কর্মীরা আলাদাভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী যদি নেতাকর্মীদের কাঙ্ক্ষিত প্রার্থীকে মনোনয়ন দেন, তাহলে সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে নৌকাকে বিজয়ী করে আনতে পারব।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মুজিবুল হক এমপি ঢাকা টাইমসকে বলেন, আমি কোনো নেতাকর্মীকে হয়রানি করিনি। তারা নিজেদের দোষে নিজেরা হয়রানি হয়। মনে করেন, আমি একজনকে নব্বই দিন সুবিধা দিলাম। একানব্বই দিন দিতে পারলাম না। ফলে তারা আমার বিরুদ্ধে চলে যায়। বিরুদ্ধে চলে গেলে কী করার আছে!

তিনি আরও বলেন, চৌদ্দগ্রাম আওয়ামী লীগের একটি নেতাও বঞ্চিত নয়। যারা আমার নামে মিথ্যাচার করে শুধু তারাই বলে বঞ্চিত। আর কেউ বলে না। নির্বাচন এলে তারা জয়গায়-জায়গায় দরখাস্ত আর অভিযোগে ব্যস্ত থাকে।

নির্বাচনকে সামনে রেখে এমপি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দয়া করে আমাকে হুইপ-রেলমন্ত্রী বানিয়েছিলেন। আমি আশা করছি, এবারও তিনি আমাকে মনোনয়ন দেবেন।

(ঢাকাটাইমস/১৫নভেম্বর/এআর)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :