ঐতিহ্যের হাজারী গুড় এখন ভুয়া ‘ট্রেডমার্কে’ বন্দি

সায়েম খান, (হরিরামপুর) মানিকগঞ্জ
 | প্রকাশিত : ২৯ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:৫১

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা শিকদারপাড়া (গাছিপাড়া) এলাকায় ‘হাজারী গুড়ে’র উৎপত্তি। যা দেশে ও দেশের বাইরে বেশ পরিচিত। তবে, এই গুড়ের সুনাম ও ব্যাপক চাহিদার কারণে প্রায় চারবছর ধরে ভুয়া ট্রেডমার্ক নম্বর ব্যবহার করে গাছিদের একপ্রকার জিম্মি এবং প্রতারণা করে আসছেন হাজারী পরিবারের উত্তরসূরি শফিকুল ইসলাম হাজারী শামীম।

এর আগে হাজারী গুড় তৈরি ও বাজারজাত উন্মুক্ত থাকলেও ট্রেডমার্কের দোহাই দিয়ে তিনি গাছিদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। তার অনুমতির বাইরে কেউ এই গুড় বিক্রি করতে পারবেন না বলেও গাছিদের জানান তিনি। যারা গুড় তৈরি করতেন তাদের সবাইকে একটি করে সিল দেন তিনি, সেখানেও ব্যবসা রয়েছে তার। বর্তমানে তার অধীনে ২৭ জন গাছি রয়েছেন।

ট্রেডমার্ক নম্বর ২২৮৮৪৮ ব্যবহার করে তৈরি করেন গুড় তৈরির প্যাকেট। এই প্যাকেটের বাইরে গুড় বিক্রি করা যাবে না বলে সবাইকে জানান তিনি। এছাড়া, রেজিস্ট্রার্ড ট্রেডমার্কের এই প্যাকেটের বাইরে গুড় ভেজাল ও ভুয়া বলে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করেন তিনি।

প্যাকেটের গায়ে হাজারী প্রোডাক্টস ছাড়াও এভারগ্রিন বিডি সেফ ফুডস লিমিটেড এর নাম রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের মালিক মেহেদী জামান ফুয়াদ। তিনি বলেন, গুড়ের প্যাকেট, কার্টুন আর টিস্যু পেপার আমরা সরবরাহ করি। শামীম হাজারী ট্রেডমার্ক নিবন্ধন পাননি বিষয়টি আমার জানা ছিলো না। এ বিষয়ে আমি এখনি তার সঙ্গে কথা বলবো।

গুড় তৈরিকারক গাছি ও গুড় ব্যবসায়ীরা জানান, এক কেজি গুড়ে চারটি পাটালি হয়। প্রতিটি পাটালির জন্য রয়েছে আলাদা করে একটি প্যাকেট বক্স। এছাড়া, পাঁচ কেজি পর্যন্ত গুড়ের জন্য রয়েছে আলাদা বক্স। হাজারী গুড় তৈরির মৌসুমে প্রতিদিন কমপক্ষে ৭০-৮০ কেজি গুড় বিক্রি হয়। প্রতিকেজি গুড়ে শুধু প্যাকেটের পেছনেই ক্রেতাদের অন্তত ১০০ টাকা বেশি খরচ হয়।

গাছিরা জানান, আগে হাজারী গুড় গাছিরা নিজেরা তৈরি ও বিক্রি করতে পারতেন। হাজারী পরিবারের থেকে সিল নিয়েও অনেকে তৈরি করতেন। তখন হাজারী পরিবারের কেউ কোনো বাধা বা জোর করতো না। কিন্তু ট্রেডমার্ক করার পরে শামীম হাজারী ট্রেডমার্কের কথা বলে তার বাইরে গুড় তৈরি ও বিক্রি করতে বাধা দেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন গাছি বলেন, এখন প্রত্যেক গাছিকে প্রায় চারভাগের তিনভাগ গুড় শামীম হাজারী ও তার ভাইদেরকে দিতে হয়। বাকি এক ভাগ গুড় বাইরে বিক্রি করতে পারি। তবে, সেটাও তাকে অনুরোধ করে। বাইরে আমরা ১৮০০ টাকা কেজি বিক্রি করতে পারলেও তিনি আমাদের ১১০০-১২০০ টাকা দেন। কিছু বেশি টাকা চাইলে ট্রেডমার্কের কথা বলে গুড় তৈরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়াসহ প্রশাসনের ভয় দেখান তারা। কষ্ট করি আমরা, আর লাভের গুড় পিঁপড়া খায়। প্যাকেট ও গুড় মিলে বিনা চালানে প্রতিবছর শামীম হাজারীর ১০-১২ লাখ টাকা আয় হয়। পাশাপাশি, গুড় উৎপাদন ও বিক্রি প্রশাসনের নেতৃত্বে উন্মুক্ত করে দেওয়ার দাবিও জানান তারা। বলেন, উন্মুক্ত করে দেওয়া হলে গুড়ের দাম কমবে।

গতবছরের ২৪ জানুয়ারি হাজারী গুড়ের প্যাকেটে উৎপাদন ও মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ এবং মূল্য উল্লেখ না থাকায় হাজারী পরিবারের দুই গুড় ব্যবসায়ীকে ছয় হাজার টাকা জরিমানা করেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আসাদুজ্জামান রুমেল। এখনও প্যাকেটে উৎপাদন ও মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ বা মূল্য উল্লেখ করা হয় না।

ট্রেডমার্কসহ প্যাকেটের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ দিলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ১৩ নভেম্বর হাজারী প্রোডাক্টসের প্রোপ্রাইটর হিসেবে মো. শফিকুল ইসলাম হাজারী শামীম ‘হাজারী প্রোডাক্টস’ নামে ট্রেডমার্কের ৩০ নম্বর শ্রেণিতে নিবন্ধনের আবেদন করেন। এ শ্রেণিতে অন্যান্য পণ্যের মধ্যে গুড়ও রয়েছে। তার আবেদন নম্বর-২২৮৮৪৮। অন্য আরেকটি আবেদনের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ থাকায় অধিদপ্তর ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর শামীম হাজারীকে সে বিষয়ে বক্তব্য ও তথ্যপ্রমাণ দাখিলের জন্য নোটিশ দেয়। নোটিশের ৬নং ক্রমিকে উল্লেখ ছিল, আগামী দুমাসের মধ্যে তথ্যপ্রমাণ ও বক্তব্য দাখিল করা না হলে কিংবা শুনানি না চাইলে আবেদনটি পরিত্যক্ত/বাতিল মর্মে গণ্য হবে। নির্দিষ্ট সময়ে কোনো বক্তব্য বা তথ্য-প্রমাণ দাখিল না করায় তার আবেদনটি বাতিল করা হয়। সম্প্রতি বিষয়টি জানিয়ে তাকে নোটিশও দেওয়া হয়েছে। ট্রেডমার্ক বিভাগের দুজন উপপরিচালক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

সার্বিক বিষয়ে শামীম হাজারী বলেন, সিল বানাতে ১২০০ টাকা খরচ হয়, গাছিদের কাছে থেকে দুই হাজার টাকা নেওয়া হয়। আমি মাত্র একজনের থেকে গুড় নেই। আমার ট্রেডমার্ক আবেদন বাতিল হয়েছে মর্মে আমি কোনো নোটিশ পাইনি। বাতিল হলে আবার আবেদন করবো। আমাকে বলা হয়েছিল আবেদন নম্বর ব্যবহার করেই আমি প্যাকেট-বাজারজাত করতে পারবো। গুড়টি আমাদের পরিবারের, আমাদের একটা অধিকার থাকবে না। এটা উন্মুক্ত করে দিলে এর মান নষ্ট হয়ে যাবে।

হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার রহমান বলেন, এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে।

মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক রেহেনা আকতার বলেন, আমরা হাজারী গুড় তৈরির গাছিদেরকে নিয়ে হাজারী পল্লী তৈরি করবো। ইতোমধ্যে আমরা বিভিন্ন বিষয়ে কাজ শুরু করেছি। ট্রেডমার্কের বিষয়টি আমরা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবো। আমরা নিজস্ব একটা অনুমোদন নিবো। সরকারিভাবে ট্রেডমার্ক হবে। বাইরের সবগুলো তখন বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

এ বিষয়ে পেটেন্ট, শিল্পনকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মুনিম হাসান বলেন, তিনি নিবন্ধন পাননি। তার আবেদন বাতিল হয়ে গেছে।

(ঢাকাটাইমস/২৯জানুয়ারি/প্রতিনিধি/জেডএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :