শিশুশ্রমমুক্ত ঠাকুরগাঁওয়ে বাস্তবে ভিন্নতা

এম এ জুনাইদ কবির, ঠাকুরগাঁও
| আপডেট : ১১ মে ২০২৪, ১২:০৫ | প্রকাশিত : ১১ মে ২০২৪, ১২:০১

১৩ বছর বয়সি সুদেব মোটরবাইক সার্ভিসিংয়ের কাজ করছে এক বছর ধরে। পড়াশোনার ইচ্ছে থাকলেও পরিবারের আর্থিক অনটনে সম্ভব হয়নি। ঠাকুরগাঁও সদরের গড়েয়া ইউনিয়নের ভাই ভাই বাইক সার্ভিসে কথা হয় সুদেবের সঙ্গে। পরিবারে অভাব, তাই ঝুঁকি নিয়েই এ কাজ করতে হচ্ছে তাকে।

সুদেব বলে, মোটরসাইকেলের টায়ার খোলা, হাওয়া দেওয়াসহ বিভিন্ন কাজ করতে হয়। ভয় লাগে, কখন দুর্ঘটনা ঘটে। পেটের দায়ে এ কাজ করি। বাবা-মা গরিব; খাবার দিতে পারে না, পড়াশোনা করব কীভাবে। কতবার যে সার্ভিসের মালামাল দিয়ে ব্যথা পেয়েছি, তার হিসাব নাই।

শুধু সুদেব নয়, পড়াশোনার ইচ্ছে থাকলেও তার মতো অনেক শিশুই আর্থিক কারণে জড়াচ্ছে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। ঠাকুরগাঁও ঘুরে এমন অনেক শিশুকেই দেখা গিয়েছে, যারা শিশুশ্রমের সঙ্গে যুক্ত; যা তাদের স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গত ৩১ মার্চ বেসরকারি সংস্থা ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) ঠাকুরগাঁওকে ‘শিশুশ্রম মুক্ত’ ঘোষণা করে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু সামরিক জাদুঘরে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠান থেকে ঠাকুরগাঁও জেলাকে দেশের প্রথম শিশুশ্রম মুক্ত জেলা ঘোষণা করা হয়। এদিন জেলাকে শিশুশ্রম মুক্ত ঘোষণা করে সরকারের দায়িত্বশীলদের কাছে নথিপত্র হস্তান্তর করেন জেলার পাঁচ উপজেলার চেয়ারম্যান।

সম্মেলনে জানানো হয়, ঠাকুরগাঁওকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম মুক্ত করতে জেলার পাঁচটি উপজেলার তিনটি পৌরসভা ও ৫৪টি ইউনিয়নে একটি প্রকল্প পরিচালনা করে ইএসডিও। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সহযোগিতায় ও যুক্তরাজ্যের এফসিডিওর অর্থায়নে ঠাকুরগাঁওয়ে ১ হাজার ১৯২ শিশুশ্রমিককে চিহ্নিত করে সংস্থাটি। তাদের কাজ থেকে মুক্ত করে স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঠাকুরগাঁও-১ আসনের এমপি রমেশ চন্দ্র সেন, সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি দ্রুপদি দেবী আগরওয়াল, ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের এমপি হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ, জেলার ৫ উপজেলার চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান।

ঠাকুরগাঁওকে ‘শিশুশ্রম মুক্ত’ ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় অনেকে। তারা লিখেছেন, শহরের সব জায়গায় শিশুরা কাজ করছে, তাহলে ইএসডিও কীভাবে শিশুশ্রম মুক্ত ঘোষণা করল। তারা পুরোপুরি যাচাই না করেই এমনটা করেছে। প্রতিষ্ঠানটিকে আরও ভালোভাবে মাঠপর্যায়ে কাজ করার পরামর্শও দেন অনেকে।

সরেজমিনে ঠাকুরগাঁও সদরসহ কয়েকটি উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, নানা ধরনের শ্রমের সঙ্গে যুক্ত আছে কোমলমতি শিশুরা। কেউ মোটরসাইকেল সার্ভিসিং, কেউ মুদিখানা, কেউ কেউ ওয়ার্কশপে ঝালাইয়ের কাজসহ মাহিন্দ্রাতে বালু ও মাটি ভরাটে যুক্ত।

রাণীশংকৈলের একটি ওয়ার্কশপে কাজ করে ১২ বছর বয়সি আল আমিন। সে জানায়, প্রায় দুই বছর ধরে এখানে কাজ করছে। কেউ কখনও আসেনি তাকে নিষেধ বা বাধা দিতে। এমনকি কেউ কখনও কোনো খবর নেয়নি।

আল আমিন আরও জানায়, ঝালাই করলে রাতে চোখের জ্বালায় ঘুমাতে পারে না সে। তবু পেটের দায়ে এ কাজই করতে হয় তাকে। পড়াশোনার ইচ্ছে থাকলেও কেউ সহযোগিতা করেনি।

ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম মুক্ত করার কাজে আছে গাফিলতি। ওয়ার্কশপ মালিক আবুল হাসান বলেন, অনেক দিন আগে একবার কিছু মানুষজন এসে বলেছিল, শিশুদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো যাবে না। আমিও করাই না। কিন্তু এই ছেলেটি কাজ শেখার জন্য করে।

সদর আকচা ইউনিয়নের মুদি দোকানে কাজ করে ১১ বছর বয়সি রতন। রতন জানায়, এক বছর ধরে এ কাজের সঙ্গে সে যুক্ত। রতন বলে, ‘এখানে লবণ, চাল, ডালের বস্তাসহ অনেক ভারী মালামাল তুলতে হয়। তাও বেতন অনেক কম। এই কাজে কোনো ভবিষ্যৎ নাই। আমার বাবা নাই, তাই এ কাজ আমাকে করতে হচ্ছে।’

শিশুশ্রম মুক্ত না করে এমন একটি ঘোষণা দেওয়া প্রসঙ্গে সমালোচনা করে ঠাকুরগাঁওয়ের শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা জবেদ আলী বলেন, আমরা শিশুদের নিয়ে কাজ করি। ঠাকুরগাঁওয়ে অনেক শিশুশ্রমিক আছে। তবে আগের থেকে এই সংখ্যা কমেছে। পুরোপুরিভাবে শিশুশ্রম মুক্ত করা যায়নি। ইএসডিওর উচিত ভালোভাবে মাঠপর্যায়ে কাজ করে ঘোষণা দেওয়া। আমরা তাদের সঙ্গে আছি। ভবিষ্যতে সব ধরনের কাজে সহযোগিতা করব।

এ বিষয়ে ইএসডিওর প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোস্তফা কামাল বলেন, আমরা জেলার উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের সঙ্গে কাজ করেছি। যখন দোকানগুলোয় গিয়েছিলাম, ওই সময় সেখানে কোনো শিশুশ্রমিক ছিল না। ইউপি চেয়ারম্যানরা আমাদের জানিয়েছেন, তাদের ইউনিয়নে কোনো শিশুশ্রমিক নেই। তাই আমরা এই জেলাকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম মুক্ত ঘোষণা করেছি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইএসডিওর নির্বাহী পরিচালক ডা. শহীদ উজ জামান বলেন, পাঁচ উপজেলার চেয়ারম্যান আমাদের নিশ্চিত করেছেন জেলায় কোনো ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নেই। অনেক ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান বলেছেন, তাদের ইউনিয়নেও শিশুশ্রমিক নেই। ফলে আমরা এই ঘোষণা দিয়েছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান অরুণাংশ দত্ত টিটো জানান, অভিযানে গেলে দোকানে শিশুশ্রমিকদের লুকিয়ে রাখা হয়, তাই সে সময় বিষয়গুলো নজরে আসে না। তিনি বলেন, ২১ ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা আমাদের জানিয়েছেন, তাদের ইউনিয়নে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নেই। আমরাও কয়েকটি জায়গায় গিয়ে শিশুশ্রমিক পাইনি। অভিযানে গেলে কিছু ব্যবসায়ী শিশুদের লুকিয়ে রাখে। আমরা চলে এলে তারা আবার শিশুদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করায়। তার মতে, ঠাকুরগাঁও জেলাকে পুরোপুরি শিশুশ্রম মুক্ত না করা পর্যন্ত কাজ করতে হবে।

পুরোপুরিভাবে শিশুশ্রম মুক্ত হয়নি স্বীকার করে রাণীশংকৈল উপজেলা চেয়ারম্যান শাহরিয়ার আজম মুন্না বলেন, আমরা যখন বিভিন্ন দোকানে গিয়েছি সেখানে তখন কোনো শিশুশ্রমিক ছিল না। এ কথা সত্য, পুরোপুরিভাবে আমাদের উপজেলা শিশুশ্রম মুক্ত হয়নি। তবে অনেক কমেছে। আমরা এটা নিয়ে কাজ করব।

হরিপুর উপজেলা চেয়ারম্যান জিয়ারুল হাসান মুকুল বলেন, আমরা মাঠপর্যায়ে যা পেয়েছি সেটাই জানিয়েছি। ইউপি সদস্যরা আমাদের বলেছেন, তাদের ইউনিয়নে শিশুশ্রম হয় না। ফলে আমাদের উপজেলাকে আমরা শিশুশ্রম মুক্ত ঘোষণা করেছি।

ঠাকুরগাঁও-১ আসনের এমপি রমেশ চন্দ্র সেন বলেন, ইএসডিও শিশুশ্রম নিয়ে কাজ করে। উপজেলা চেয়ারম্যানরা বলেছেন, ঠাকুরগাঁওয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নেই। আমরা মাঠপর্যায়ে এর বাস্তব চিত্র যাচাই করে দেখিনি। তাদের অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলাম।

একই কথা বলেন অনুষ্ঠানে অতিথি হওয়া ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের এমপি হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ। তিনি বলেন, উপজেলা চেয়ারম্যানরা লিখিতভাবে কাগজ দিয়েছেন আমাদের ঠাকুরগাঁও জেলায় ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নেই বললেই চলে। আমি তাদের কথার ভিত্তিতে অনুষ্ঠানে অতিথি হয়েছিলাম।

(ঢাকা টাইমস/১১মে/এসএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :