নিশ্চিত করুন কর্মজীবী নারীর মর্যাদা ও প্রাপ্তি

নীলুফার ইয়াসমিন
 | প্রকাশিত : ২৮ মে ২০২৪, ১০:৪৫

নারী- যার রয়েছে কতগুলো অর্থপূর্ণ প্রতিশব্দ। যেমন: অবলা, রমণী, কামিনী, ভামিনী, অন্তঃপুরিকা অথবা কোথাও নারীকে অন্দরমহল হিসেবেই বুঝানো হয়। নারী শব্দের এই সমার্থকগুলো নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, নারীর ভূমিকা ও উপযোগিতার ভিত্তিতে হয়েছে। আদিম সমাজে নারী-পুরুষের মধ্যে ভিন্নতা ছিল না। তাদের অধিকার ও মর্যাদা সমান ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশিই ছিল নারীর মর্যাদা। নারীর প্রজননশক্তি এবং সন্তান লালন-পালনকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হতো। শিকারের প্রয়োজনে, আত্মরক্ষার প্রয়োজনে এবং বেঁচে থাকার প্রয়োজনে তখন গড়ে উঠেছিল যূথবদ্ধ সমাজ। তাই সে যূথবদ্ধ সমাজে কোনো বৈষম্য ছিল না। সামন্ত সমাজে এসে নারীর মর্যাদা অবলুপ্ত হয়। সামন্ততান্ত্রিক সমাজে নারীকে মানুষ হিসেবেই গণ্য করা হতো না। নারী ছিল ভোগবিলাসের বস্তু এবং সন্তান উৎপাদন যন্ত্র। সমাজে বহুবিবাহ এবং বেশ্যাবৃত্তি প্রচলিত ছিল প্রকটভাবে।

বৃটিশ শাসিত ভারতবর্ষে উনিশ শতকে শিক্ষা, সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে নবজাগরণ ঘটে। সেসময় বেশ কয়েকজন সমাজহিতৈষী পুরুষ নারীশিক্ষার জন্য চিন্তা ভাবনা শুরু করেন। তাদের সাথে কয়েকজন রাজপুরুষও নারী শিক্ষা বিস্তারে এগিয়ে আসেন। নানা নিয়ম-শৃঙ্খলের জালে আবদ্ধ জীবের মতো যে জীবন সে জীবন নিজেকে মানুষ ভাবতে শুরু করে। সংসারধর্ম পালন এবং সন্তান উৎপাদন ও লালন-পালন ভিন্ন আর কোনো জগৎ তাদের ছিল না। আর বালবিধবাদের দুর্ভোগ ক্লিষ্ট অন্ধকারাচ্ছন্ন জগৎ জীবনের কাহিনি সে সময়কার ইতিহাসে, সাহিত্যে প্রচুর রয়েছে।

বাৎসায়ন গুণবতী নারীর যে চৌষট্টিটি লক্ষণের কথা বলেছেন সেসব গুণ দিয়েই নারীকে বিচার করা হতো। চৌষট্টিটি গুণের মধ্যে আত্মবিকাশ, আকাক্সক্ষা ও স্বপ্নবয়নের কোনো লক্ষণ ছিল না। যেসব গুণ ছিল সে সকলই পুরুষকে আকৃষ্ট করার, পুরুষের মনোরঞ্জন করার, পরিবারের সকলকে সুখী করার। সেই নিয়মের আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে নারী। কিন্তু সকলের জন্য তা সম্ভব হয়নি। সে সময় শিক্ষা মানে পূর্বে প্রচলিত সংস্কৃত আর রাজভাষা ইংরেজি। বনেদি ঘরের মেয়েরাই শিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ পেত তখন। গৃহেই তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা হতো। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর গ্রামে-গ্রামে মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে ব্রতী হয়েছিলেন। কিন্তু এজন্য প্রতিক্রিয়াশীলদের কোপানলে পড়েছিলেন তিনি। বিশ শতকে এসে মুসলমান সমাজও তাদের মেয়েদের শিক্ষার বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠে। নারী নতুনভাবে জাগতে শুরু করে। তার নিজের অধিকার, সমতা ও সম মর্যাদা বুঝে নিতে শিখতে চায়। শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে এসে নারী বাইরে বেরিয়ে আসে। একুশ শতকের নারী ঘরে বাইরে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে, পারদর্শী হয়ে ওঠে। নারী আজ অনেক ক্ষেত্রে পুরুষদের চেয়েও এগিয়ে। সর্বত্রই নারীর জয়জয়কার। মেয়েরা এটা পারবে না- এ ধরনের কোনো প্রসঙ্গ আজ নেই।

আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষাকে উচ্চশিক্ষা বলা হয়। সেই হিসেবে এখন ঘরে-ঘরে উচ্চশিক্ষিত মেয়ে। নারীর গুণের বৈশিষ্ট্যও পরিবর্তিত হয়েছে। ত্রিশ চল্লিশ বছর আগেও মেয়েদের চাকরি এত জনপ্রিয় ছিল না। ব্যাপারটা ছিল এরকম যে- মেয়ে পড়াশোনা করেছে ভালো কথা; তাই বলে চাকরি করতে হবে কেন?

একুশ শতকের যান্ত্রিক সভ্যতার উন্নতির সাথে সাথে আমাদের মনোলোকেরও উন্নতি ঘটেছে। কন্যার পিতারা যৌতুক দেবার চেয়ে মেয়েকে সম্পদ বানানোর প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে। মেয়েরাও একটা চাকরি করবে অথবা নিজের পায়ে দাঁড়াবে এই উদ্দেশ্যে পড়াশোনার মাঠে নামে। নব্বই এর দশকে ব্যাপকভাবে যৌতুকের প্রচলন এবং যৌতুককে কেন্দ্র করে নারীর প্রতি যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে তার বিরুদ্ধে মেয়েরাই হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। এবং তা সম্ভব হয় মেয়েদের আত্মনির্ভরশীলতার জন্য। তার জন্য শিক্ষা এবং একটা পেশা গ্রহণ ছিল খুব জরুরি। সেই সাথে তাদের পুরুষের সমমর্যাদা এবং স্বাধীনতা অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

বর্তমানে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ঘরে-ঘরে বউ-ঝিরা চাকরি করছে নয়তো বিভিন্ন পেশার সাথে যুক্ত হয়েছে এবং হচ্ছে। এতো গেল দৃশ্যমান চালচিত্র। এবার এই কর্মজীবী নারীদের অন্দর-বাহিরের কথা বলি। কর্মজীবী নারীর অন্দর-বাহির আলাদা নয়। তখন সে হয় দশভুজা। এজন্য সে অখুশি নয়। সে সবই দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিতে পারে। সকলে তাকে সমীহ করে। নিজেকে সে পরিবারের অপরিহার্য একজন মনে করে। নারী পুরুষ দুইজনেই বাইরে কাজ করে। দুইজনকেই বাইরে যেতে হয়। ঘরের কাজের ব্যাপারে পুরুষের দায়বদ্ধতা সীমাবদ্ধ। কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে সে সীমাবদ্ধতা নাই। নারীর দায়িত্ব অসীম। বাচ্চাদের দেখাশোনা, তাদের পড়াশোনার তদারকি, বয়োজ্যেষ্ঠদের দেখাশোনা সমস্তই নারীকে বুঝতে হয়। বহুকাল সংগ্রাম করে নারী সংসারে অংশীদারিত্ব অর্জন করেছে। সে অর্জন করেছে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা, চলাফেরার স্বাধীনতা, সমতা। পুরুষ এসকল সুবিধা নারীকে দিয়েছে। কেন দিয়েছে? সে তার নিজের সুবিধার্থেই দিয়েছে। আগে যেখানে সংসার পরিচালনার ভার একাই বহন করতে হতো, ঝড়ঝাপটা যাই আসুক একা সামাল দিতে হতো সেখানে সে পেয়েছে তার সহযোদ্ধা। আর নারী ঘরের বাইরের সমস্ত দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে; বিষয়টি এরকম- তোমার কলে তোমাকেই পেষার মতো অবস্থা।

বাইরের জগতে তার অবস্থান কি খুব সম্মানজনক? আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে। সেখানেও সে কিন্তু সুকৌশলে শোষিত হয়। তার পুরুষ সহকর্মীর সাথে অবশ্যই তার বৈষম্য আছে। কোথাও তা অস্পষ্ট কোথাও আবার সুস্পষ্ট। তার অধীনস্থ যারা থাকে তারাও তার সমমর্যাদার পুরুষ সহকর্মীকে যতটা সম্মান এবং ভয় করে সে নারী বলে ততখানি ভয় ও সম্মান তাকে করে না।

ওদিকে অন্দরমহলেও কিন্তু তার দোষ ত্রুটির অভাব নাই। প্রতিনিয়ত ঘর সংসার, সন্তান আর কাজ সামলাতে গিয়ে সে হিমশিম খায়। সর্বদা তাকে ম্যানেজ করে চলতে হয়। কোনো জায়গায়ই সে নিজেকে সম্পূর্ণ উপস্থাপন করতে পারে না। কর্মজীবনে তাই নারী সৃজনশীল, গঠনমূলক অবদান খুব কমই রাখতে পারে। যারা পারে তাদেরকে বলতে হয়, 'পৃথিবী আমারে চায়, বাঁধিয়া রেখো না আমায়; খুলে দাও ওগো বাহুডোর'।

ইদানীং বেশিরভাগ দাম্পত্য সম্পর্কে ধরছে ফাটল, চির। কর্মজীবী দম্পতিদের ক্ষেত্রে এটা বেশি ঘটছে। তাদের সংসারে বিরাজ করছে অপূর্ণতা, অতৃপ্তি, অসন্তোষ। এক্ষেত্রে নারী পুরুষ উভয়েই নতুন জুতার কামড়ের মতো সেই ফেটে যাওয়ার, চিরে যাওয়ার যন্ত্রণা সহ্য করে নিচ্ছে গোপনে। এখানেও কিন্তু সমাজ মনে করে সংসারে নারীর যথোপযুক্ত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতাই এর কারণ। তবে এক্ষেত্রে উভয়েরই দায়বদ্ধতা আছে। এই ব্যর্থতা উভয়েরই। আবার অর্থনৈতিক কারণও এখানে একটা প্রধান বিষয়। যৌথ আয়ের সংসারে কে বেশি দিল, কে কম দিল এটাও একটা ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। সমধিকারের ভিত্তিতে নারীও এখানে নিজস্ব মতামত প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু সবক্ষেত্রে সে সফল হয় না।

আবার দাম্পত্যের নিজস্ব যে সম্পর্ক, যে দাবি রয়েছে চাকরিজীবী নারী- সেক্ষেত্রে নিজেকে সম্পূর্ণ নিয়োজিত করতে পারে না। পুরুষও পারে না। কিন্তু তা বিশেষ দোষের নয়। একজন গৃহিণী সারাদিন কাজের পর সন্ধ্যায় চা বানিয়ে স্বামীর ঘরে ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকতে পারে, স্বামী সারাদিন পর বাইরে থেকে ফিরলে তাকে সাদর সংবর্ধনা জানাতে পারে কিন্তু একজন কর্মজীবী নারীর পক্ষে তা সম্ভব হয় না। সেদিন শেষে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে সংসারের বকেয়া কাজগুলো সারতে সারতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তখন তার মধ্যে আর রোমান্টিসিজম জমে না। দূরত্ব সৃষ্টি হতে থাকে সম্পর্কের ভেতর। প্রাণবন্ত সংসার নয়, চলে রোবোটিক সংসার। দূরত্বের এই ফাঁকফোকরের মধ্যে যেকোনো সময় কিছু উড়ো পাতা জড়ো হতে পারে। অতঃপর সম্পর্কগুলো বিনষ্ট হয়ে পরিবারে, সমাজে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।

আজকাল আবার গৃহিণী নারীদের সম্মান-সম্মাননা বেড়ে চলেছে। একজনের রোজগার দিয়ে সমস্ত সংসার চালানোর দক্ষতা, সংসারের সুখ শান্তি বজায় রাখতে আন্তরিকতা বেশ প্রশংসনীয়। গৃহিণীর সংসারে ভাঙনের প্রবণতা কম। স্বামীর শাসন-শোষণ সহ্য করেও সে পরিপাটি করে রাখে সংসার। এগুলো তার মহান গুণ। তবে গৃহিণী তার গৃহের কর্মেই ব্যস্ত থাকে। তার মাথায় রুটিনমাপা ঘরের চিন্তা ব্যতীত অন্য কোনো চিন্তা আনতে হয় না। অপর দিকে কর্মজীবী নারীকে ঘরের, বাইরের উভয় ক্ষেত্রের চিন্তা করতে হয়। প্রতিদিন তার মাথায় নতুন-নতুন তথ্য ইনপুট-আউটপুট হয়। তবে সে কেন প্রশংসা পাবার যোগ্য হবে না।

সৃষ্টিকর্তা নারীকে সৃষ্টি করেছেন শারীরিকভাবে পুরুষের চেয়ে দুর্বল করে। পুরুষের তুলনায় তার মগজের পরিমাণ কম, হার্ট ছোটো। এমনকি মর্যাদার দিকেও পুরুষ নারীর চেয়ে একটু উপরে। সেই সুবাদে নারীর সমস্ত প্রয়োজন পুরুষের থেকে আদায় করে নিতে হয়। পুরুষ নারীকে যা কিছু দিয়েছে তার সুবিধার্থে দিয়েছে, যা কিছু নিয়েছে সেও তার সুবিধার্থে। যুগে যুগে নারীকে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে বলা হয়েছে, কিন্তু পুরুষকে কোনো নৈতিকতার পাঠ দেয়া হয়নি। ইসলাম ধর্মে নারীকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের আলেম ওলামাগণ নারীদেরকে শুধু এ শিক্ষাই দেন কীভাবে সে স্বামীর হক আদায় করবে। সঠিক হক আদায় না হলে সোজা হাবিয়া দোজখে যাবে- এই ভয় দেখানো ছাড়া তারা আর কিছু বলতে পারেন না। কখনোই তারা নারীর প্রতি পুরুষের দায়িত্ববোধ সম্পর্কে পুরুষদের সচেতন করেন না। পুরুষ তার দায়িত্ব সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করলে সে ঘরের নারীকে বাইরে পাঠাতো না।

দেশের নাগরিক হিসেবে দেশের প্রতি নারী-পুরুষ উভয়ের কর্তব্য রয়েছে। নারীও তার মেধা-মননকে দেশের-দশের উন্নতিতে কাজে লাগাবে। তাই অবশ্যই সে কাজ করবে। বর্তমান কর্মজীবী নারী সমাজ ঘরে-বাইরে কাজ করতে গিয়ে যে মানসিক অস্থিরতায় ভোগে তার মন্দ প্রভাব পরিবারের ওপর, সমাজের ওপর আপতিত হয়। সর্বোপরি তার নিজের ওপর। স্বাধীনতা, সমাধিকারের নামে আসলে সে কী পায়? সম্মান, অর্থ, সন্তান মানুষ করা এসবের পেছনে ছুটে-ছুটে সে ক্লান্ত হয়। কিন্তু বিশ্রাম নেবার সময় নেই। যখন বিশ্রাম নেবার সময় হয় তখন আবার তা শরীরে সহ্য হয় না।

নারীদের প্রতি আহ্বান আপনারা মানসিক অস্থিরতা পরিহার করুন। আত্মশক্তিতে বলীয়ান হোন। শত ব্যস্ততার মাঝেও মানসিক স্থিরতা আনার চেষ্টা করুন। অন্যজন কতখানি গুরুত্ব দিল তার উপর ভরসা না করে নিজেকে নিজে গুরুত্ব দিন। সহমর্মিতা, সহানুভূতি- এই মানবিক গুণগুলো সম্পূর্ণতই চর্চার বিষয়। নারী-পুরুষ একে অপরের সম্পূরক এবং পরিপূরক হলেও দুইটি আলাদা সত্তা- একে অপরের প্রতি সহানুভূতি, সহমর্মিতা থাকতে হবে তাদের মধ্যে। শুধু নারীদের নয়- পুরুষদেরও নারীর প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে পরম সহানুভূতি নিয়ে জ্ঞান-অর্জন ও হৃদয়ানুভব করতে হবে এবং সেই জ্ঞানের চর্চাটা পরিবারে ও সমাজে সব সময় করে যেতে হবে।

নীলুফার ইয়াসমিন: লেখক, গবেষক ও সহকারী অধ্যাপক, বাংলা, সরকারি মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ, টাঙ্গাইল

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :