বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল: উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে রূপান্তর, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (BAC) উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিত করতে গুণগত মানের মানদণ্ড বাস্তবায়ন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক (BNQF) কার্যকর করা এবং একাডেমিক প্রোগ্রামগুলোকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে উপনীত করতে অ্যাক্রেডিটেশন প্রদানের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মূল উন্নয়নগুলোর মধ্যে রয়েছে ফলাফল-ভিত্তিক শিক্ষা (OBE), শাসনব্যবস্থার উন্নয়ন, এবং দক্ষতার ঘাটতি পূরণে স্নাতকদের কর্মসংস্থানের যোগ্যতা বৃদ্ধি করা। BAC-এর অডিটর হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সক্রিয়ভাবে প্রেরণ করা আবশ্যক, যাতে তারা মান নিশ্চিতকরণ প্রক্রিয়া সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেন।
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দ্রুত প্রসারের কারণে এই ব্যবস্থা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। গত কয়েক দশকে দেশে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে অধিক সংখ্যক তরুণ-তরুণী উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু মান নিশ্চিতকরণ ছাড়া এই বিস্তৃতি কাক্সিক্ষত ফল বয়ে আনবে না—এই বাস্তবতাই BAC-এর গুরুত্ব বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের শিক্ষা খাত জোরদার করতে একাধিক পদক্ষেপ ঘোষণা করেছেন। তিনি নির্বাচনি ইশতেহারে বর্ণিত জিডিপির ৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় ধাপে ধাপে বৃদ্ধির সরকারি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।সরকার উচ্চশিক্ষাকে শুধু শিক্ষাদানকেন্দ্র থেকে গবেষণামূলক “জ্ঞান-প্রতিষ্ঠানে” রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে University Grants Commission (UGC)-কে শক্তিশালীকরণের উপর জোর দিচ্ছে। এর মূল উদ্যোগগুলো হলো:
- UGC-এর কৌশলগত নেতৃত্ব জোরদারকরণ — UGC-কে আরও স্বায়ত্তশাসিত ও শক্তিশালী করা হচ্ছে। বর্তমানে UGC-কে Bangladesh Higher Education Commission (BHEC)-এ রূপান্তরের খসড়া অর্ডিন্যান্স প্রস্তুত করা হয়েছে, যাতে এটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুণগত মান, অ্যাক্রেডিটেশন ও গবেষণা নিয়ন্ত্রণে আরও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।
- HEAT প্রকল্প (Higher Education Acceleration and Transformation) — UGC-এর অধীনে World Bank-সমর্থিত এই ৫ বছরের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পের মূল উপাদান:
- Academic Transformation Fund (ATF) — প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা অনুদান।
- ডিজিটাল অবকাঠামো, অনলাইন লার্নিং, ফ্যাকাল্টি ডেভেলপমেন্ট (প্রশিক্ষণ)।
- গ্র্যাজুয়েট এমপ্লয়েবিলিটি, মহিলাদের উচ্চশিক্ষার গুণগত মান ও গভর্ন্যান্স উন্নয়ন।
- প্রকল্পটি ২০২৭ সাল পর্যন্ত চলবে এবং ইতোমধ্যে প্রথম অনুদানের আহ্বান করা হয়েছে।
- শিক্ষায় ব্যয় বৃদ্ধি — লক্ষ্য ৫% of GDP-এ উন্নীত করা। বর্তমানে (২০২৩-২০২৬ তথ্য অনুসারে) শিক্ষায় মোট সরকারি ব্যয় GDP-এর প্রায় ১.৫–২.০%-এর মধ্যে রয়েছে, যা UNESCO-এর ৪–৬% সুপারিশের তুলনায় অনেক কম। FY2026-এ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ প্রায় ৯৫,৬৪৪ কোটি টাকা (মোট বাজেটের ~১২%)।
- ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া পার্টনারশিপ — বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের মধ্যে যৌথ গবেষণা, ইন্টার্নশিপ ও দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ।
- প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা অনুদান — উদ্ভাবন ও গবেষণাকে উৎসাহিত করতে।
এই উদ্যোগগুলোর সম্ভাব্য প্রভাব ও চ্যালেঞ্জ
ইতিবাচক দিক:
- বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে গবেষণা ও উদ্ভাবনকেন্দ্রে পরিণত করতে সাহায্য করবে।
- HEAT প্রকল্পের মাধ্যমে ডিজিটাল সংযোগ, ফ্যাকাল্টি প্রশিক্ষণ ও গুণগত মান নিশ্চিতকরণ সম্ভব।
- শিল্প-অ্যাকাডেমিয়া লিঙ্কেজ বাড়লে গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থানযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে।
চ্যালেঞ্জসমূহ:
- বাজেট বাস্তবায়ন — বর্তমান ব্যয় GDP-এর ২%-এর নিচে; ৫%-এ উন্নীত করা রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে বড় চ্যালেঞ্জ।
- UGC-এর রূপান্তর — নতুন কমিশন গঠনের খসড়া প্রস্তুত হলেও বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত রাখা জরুরি।
- গবেষণা সংস্কৃতির অভাব — অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাদানই প্রধান; গবেষণা অনুদান ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রয়োজন।
- বাস্তবায়নের গতি — HEAT প্রকল্পের অগ্রগতি World Bank-এর মতে “moderately satisfactory”।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
সরকারের এই উদ্যোগগুলো (বিশেষ করে UGC-এর শক্তিশালীকরণ ও HEAT প্রকল্প) উচ্চশিক্ষাকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির সাথে সংযুক্ত করার সঠিক দিকনির্দেশনা। তবে সফলতা নির্ভর করবে:
- প্রকৃত বাজেট বৃদ্ধি ও তার কার্যকর ব্যবহার,
- রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত স্বায়ত্তশাসন,
- গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য প্রতিযোগিতামূলক ফান্ডিং-এর ধারাবাহিকতা।
যদি এগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতে একটি বাস্তবিক রূপান্তর সম্ভব। অন্যথায়, শুধু নীতি ও প্রকল্প থেকে যাবে।
আপনি যদি এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা, HEAT প্রকল্পের নির্দিষ্ট কম্পোনেন্ট, বাজেট তুলনা বা সুপারিশ চান, তাহলে জানান।
BAC-এর মূল উন্নয়ন ক্ষেত্র
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় BAC-এর মূল উন্নয়ন ক্ষেত্রগুলো নিম্নরূপ:
১। বাধ্যতামূলক অ্যাক্রিডিটেশন: BAC স্বেচ্ছামূলক থেকে বাধ্যতামূলক অ্যাক্রিডিটেশনে স্থানান্তরিত হচ্ছে। সকল তৃতীয় স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিশ্ববিদ্যালয়) মান মেনে চলে কিনা তা নিশ্চিত করতে এখন পাঁচ বছরের অ্যাক্রিডিটেশন সার্টিফিকেট প্রদান করা হবে।
২। BNQF বাস্তবায়ন (স্তর ৭-১০): BAC বাংলাদেশ ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক (BNQF) বাস্তবায়ন করছে, যা ফলাফল-ভিত্তিক শিক্ষা এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষার ওপর জোর দেয়।
৩। স্ব-মূল্যায়ন ও বহিঃস্থ পর্যালোচনা: প্রতিষ্ঠানগুলিকে এখন অ্যাক্রিডিটেশন ম্যানুয়াল ২য় সংস্করণ-২০২৪ অনুযায়ী স্ব-মূল্যায়ন পরিচালনা করতে হবে, তারপর একটি বহিঃস্থ গুণমান মূল্যায়ন (EQA) টিম পরিদর্শন করবে।
৪। দক্ষতার অভাব পূরণ: একটি প্রধান লক্ষ্য হলো একাডেমিক পাঠ্যক্রমকে বাজারের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের যোগ্যতা বৃদ্ধি করা।
৫। সক্ষমতা বৃদ্ধি: BAC বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল (IQAC) প্রতিষ্ঠা এবং অ্যাক্রিডিটেশন মানদণ্ড পূরণে প্রশিক্ষণ প্রদানকে উৎসাহিত করছে।
৬। মান নির্ধারণ: BAC অ্যাক্রিডিটেশনের জন্য ৯টি স্বতন্ত্র মান তৈরি করেছে, যা শাসন, পাঠ্যক্রম, শিক্ষাদান-শেখানো, শিক্ষার্থী সহায়তা এবং গবেষণাকে অন্তর্ভুক্ত করে।
অডিটরদের শুধু নামেই অডিটর রাখা হবে না, বরং তাদেরকে দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সক্রিয়ভাবে পাঠাতে হবে। "সক্রিয়ভাবে" বলতে বোঝায়:
- একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী তাদের নিয়োগ দেওয়া
- বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঘুরে ঘুরে মূল্যায়ন করার সুযোগ তৈরি করা
- শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবক্ষেত্রে তাদের কাজ করানো
মান নিশ্চিতকরণ প্রক্রিয়া বলতে BAC-এর নির্ধারিত ১০টি মানদণ্ড (যেমন—শাসন, পাঠ্যক্রম, শিক্ষাদান, গবেষণা, অবকাঠামো ইত্যাদি) অনুযায়ী একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কতটুকু মান বজায় রেখেছে, তা যাচাই করা বোঝায়।অডিটররা যদি সরাসরি প্রতিষ্ঠানে যান, তবে—
- স্ব-মূল্যায়ন প্রতিবেদনের সত্যতা যাচাই সম্ভব হয়
- শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাদের সাথে সরাসরি মতবিনিময় হয়
- শ্রেণিকক্ষ, ল্যাব, লাইব্রেরির বাস্তব চিত্র দেখা যায়
- ফলস্বরূপ, অ্যাক্রিডিটেশন প্রক্রিয়া positive হয়ে পড়ে
|
কারণ |
ব্যাখ্যা |
|
বাস্তব অভিজ্ঞতা |
অডিটররা সরাসরি প্রতিষ্ঠানে গেলে প্রকৃত চিত্র বুঝতে পারেন |
|
স্বচ্ছতা বৃদ্ধি |
সরাসরি মূল্যায়নে জালিয়াতি বা তথ্য গোপন করার সুযোগ কমে |
|
মানের উন্নয়ন |
অডিটরদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সংশোধন করতে পারে |
|
আন্তর্জাতিক মান অর্জন |
নিয়মিত ও সক্রিয় মূল্যায়ন বাংলাদেশের শিক্ষাকে বিশ্বমানের করতে সহায়তা করে |
বিএনকিউএফ (BNQF)-এর ভূমিকা ও উদ্দেশ্য
বাংলাদেশ ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক (BNQF) একটি একক, ১০-স্তরের জাতীয় কাঠামো যা বাংলাদেশের সকল শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ খাতের মাধ্যমে যোগ্যতাগুলি শ্রেণীবদ্ধ এবং মানসম্মত করে। এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয় দ্বারা উন্নয়ন করা হয়েছে এবং ২০২১ সালে অনুমোদিত হয়েছে।
BNQF-এর প্রধান উদ্দেশ্যগুলো নিম্নরূপ:
|
উদ্দেশ্য |
বিবরণ |
|
মান সংহতকরণ |
বিভিন্ন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগ্যতার মানকে একক মানে সংহত করা |
|
সামঞ্জস্য |
টেকনিক্যাল, ভোকেশনাল ও উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে সঙ্গতি প্রতিষ্ঠা করা |
|
যোগাযোগ |
শিক্ষার্থীদের জন্য যোগ্যতার স্বীকৃতি এবং অন্যান্য দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সংযোগ স্বাভাবিক করা |
|
ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা |
শিক্ষার ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়া এবং কর্মক্ষমতা ও দক্ষতা অনুযায়ী মূল্যায়ন করা |
|
কর্মসংস্থানের সুযোগ |
কর্মবাজারের চাহিদার সাথে দক্ষতার মিল তৈরির মাধ্যমে পেশাদার সুযোগ বৃদ্ধি করা |
|
সমন্বয় সাধন |
শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে সমন্বয় সাধন, যাতে শিক্ষার্থীরা আধুনিক প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হতে পারে |
BAC-এর মানদণ্ড ও মূল্যায়ন পদ্ধতি
BAC দশটি বিস্তৃত মানদণ্ডের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলিকে মূল্যায়ন করে:
|
মানদণ্ড |
পয়েন্ট |
বিষয়বস্তু |
|
শাসন ও প্রশাসন |
৪০ |
নেতৃত্ব কাঠামো, পরিকল্পনা প্রক্রিয়া |
|
নেতৃত্ব ও দায়িত্ব |
১৫ |
নৈতিক মান, সামাজিক দায়বদ্ধতা |
|
সততা ও স্বচ্ছতা |
৪০ |
ভর্তি, নিয়োগ, তথ্য ভাগাভাগি |
|
পাঠ্যক্রম নকশা |
৬০ |
প্রোগ্রামের পরিকল্পনা, সময়োপযোগিতা |
|
শিক্ষাদান ও মূল্যায়ন |
৬৫ |
শ্রেণীকক্ষ অনুশীলন, পরীক্ষা ব্যবস্থা |
|
শিক্ষার্থী সহায়তা |
৫৫ |
ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, সহশিক্ষা কার্যক্রম |
|
অনুষদের মান |
৬৫ |
শিক্ষকের যোগ্যতা, পেশাদার উন্নয়ন |
|
সুযোগ-সুবিধা ও সম্পদ |
৪০ |
অবকাঠামো, ল্যাব, গ্রন্থাগার |
|
গবেষণা কার্যক্রম |
৩০ |
গবেষণা নীতি, তহবিল, প্রকাশনা |
|
ক্রমাগত উন্নতি |
৩০ |
ফিডব্যাক সংগ্রহ, মান নিশ্চিতকরণ |
BAC সহকর্মী বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি বহিঃস্থ পর্যালোচনা দল গঠন করে। এই পর্যালোচকরা স্ব-অধ্যয়ন প্রতিবেদন পরীক্ষা করেন, ক্যাম্পাস পরিদর্শন করেন এবং অংশীদারদের সাক্ষাৎকার নেন।
গুণগত মানোন্নয়নে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা
একাডেমিক অডিটরদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
BAC-এর অডিটর হলেন সেইসব দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞ, যারা বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (BAC) কর্তৃক স্বীকৃত। তারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান মূল্যায়নের দায়িত্ব পালন করেন।
প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ
বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলকে শক্তিশালী করার জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো জরুরি:
|
ক্রম |
পদক্ষেপ |
বিবরণ |
|
১ |
বাধ্যতামূলক অ্যাক্রিডিটেশন |
সকল উচ্চশিক্ষা প্রোগ্রামের জন্য BAC অ্যাক্রিডিটেশন বাধ্যতামূলক করা |
|
২ |
বৈশ্বিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্য |
QS এবং টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাঙ্কিংয়ের মতো বৈশ্বিক মানদণ্ডের সাথে সমান্তরালভাবে কাজ করা |
|
৩ |
পিএইচডি ডিগ্রি বাধ্যতামূলক |
সকল অনুষদ সদস্যের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পিএইচডি ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করা |
|
৪ |
স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ফলাফলের অগ্রাধিকার |
শিক্ষক নিয়োগে এইচএসসি নয়, ৪ স্কেলে ৩.৭৫ এর উপরে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ফলাফল বাধ্যতামূলক করা |
|
৫ |
অধ্যাপকের বয়সসীমা বৃদ্ধি |
শিক্ষকতার বয়সসীমা ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৭২ বছর করা |
|
৬ |
গবেষণা জার্নাল র্যাঙ্কিং সিস্টেম |
UGC বা BAC-এর অধীনে একটি ডেডিকেটেড শাখা দ্বারা পরিচালিত আনুষ্ঠানিক জার্নাল র্যাঙ্কিং সিস্টেম তৈরি |
|
৭ |
স্বচ্ছতা বৃদ্ধি |
অ্যাক্রিডিটেশন প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা আনা |
|
৮ |
অর্থায়ন বৃদ্ধি |
BAC-কে আরও অর্থায়ন এবং হিট প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করা |
|
৯ |
গবেষণা কার্যক্রম জোরদার |
BAC-কে গবেষণা কাজ পরিচালনা করতে হবে |
|
১০ |
প্রেস সচিব নিয়োগ |
BAC-এর সংবাদ প্রকাশের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একজন প্রেস সচিব নিয়োগ |
যারা অডিটর হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন এবং BAC কর্তৃক প্রত্যয়িত (certified) হয়েছেন, তারাই এখানে "দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি" বলে বিবেচিত হবেন। তাদের ওপর অ্যাক্রেডিটেশন মূল্যায়নের আইনি ও পেশাগত দায়িত্ব বর্তায়।
উচ্চশিক্ষা কমিশন ও BAC-এর সম্পর্ক
উচ্চশিক্ষা কমিশন প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠা BAC-এর কাজের জন্য সুযোগ এবং বিবেচনা উভয়ই উপস্থাপন করে। আদর্শ সম্পর্কের ক্ষেত্রে HEC বিস্তৃত নীতি ও সমন্বয় পরিচালনা করবে, যখন BAC তার মূল্যায়ন সিদ্ধান্তে স্বাধীনতা সহ মান মূল্যায়নের বিশেষায়িত কাজ চালিয়ে যাবে।
BAC-এর শক্তি তার প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং পিয়ার-রিভিউ পদ্ধতির মধ্যে নিহিত। সাংগঠনিক পরিবর্তন নির্বিশেষে এই বৈশিষ্ট্যগুলি সংরক্ষণ এবং শক্তিশালী করা উচিত।
ভবিষ্যতের জন্য সুপারিশ
ভবিষ্যতে BAC-এর কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেতে পারে:
১। উন্নত নির্দেশিকা: প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য কেবল মূল্যায়ন না করে, মানের মান বুঝতে এবং বাস্তবায়নে সহায়তা করার জন্য আরও সংস্থান সরবরাহ করা।
২। প্রযুক্তি একীকরণ: নথি জমা, প্রতিবেদন এবং যোগাযোগের জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।
৩। বৃহত্তর অংশীদারদের সম্পৃক্ততা: নিয়োগকর্তা, স্নাতক এবং সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের মতামত মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা।
৪। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড: আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিতকরণ অনুশীলনের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখা।
৫। শিক্ষাগত উদ্ভাবন: বিকল্প শিক্ষাদান পদ্ধতি বা নতুন ধরণের শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম স্বীকৃতি দেওয়া।
OBE ও Blooms ট্যাক্সোনমি বাস্তবায়ন
অবজেক্টিভ-বেসড এডুকেশন (OBE) একটি শিক্ষা পদ্ধতি যা শেষ ফলাফল, উদ্দেশ্য, অর্জন, এবং ফলাফলকে অগ্রাধিকার দেয়। অধ্যাপক ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ স্যার এবং তার নেতৃত্বে অধ্যাপক ড. এস.এম. কবীর, অধ্যাপক ড. সঞ্জয় কুমার অধিকারী-এর মতো নিবেদিতপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের দল OBE ও ব্লুমের ট্যাক্সোনমি বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন।
প্রয়োজনীয় সংস্কারের দিকসমূহ:
- শিক্ষাক্রম হালনাগাদ: চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষাক্রম সময়োপযোগী করা
- গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি: শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত গবেষণার সুযোগ ও তহবিল নিশ্চিত করা
- শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষাদান: মুখস্থনির্ভরতা কমানো
- শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ: আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি সম্পর্কে নিয়মিত প্রশিক্ষণ
- আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: বিশ্বের নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম ও যৌথ গবেষণা বাড়ানো
বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (BAC) উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিএনকিউএফ বাস্তবায়ন, OBE প্রবর্তন এবং কঠোর মূল্যায়ন মানদণ্ডের মাধ্যমে BAC শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য সরকারি সমর্থন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।
সকল উচ্চশিক্ষা যেমন কৃষি, প্রকৌশল এবং চিকিৎসা ক্ষেত্র BAC-এর আওতায় আনতে সরকারের নির্দেশনা প্রয়োজন। পোস্ট-ডক্টরাল এবং ডি.লিট.-এর মতো উচ্চতর গবেষণা ও অর্জনগুলিকে অ্যাক্রিডিটেশনের আওতায় নিয়ে আসা শিক্ষার মান ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে।
BAC-এর সাফল্যই আগামী দিনের বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মান নির্ধারণ করবে।BAC-এর অডিটররা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সক্রিয়ভাবে পরিদর্শন করলে অ্যাক্রিডিটেশন প্রক্রিয়া গতিশীল, স্বচ্ছ ও ফলপ্রসূ হয়। মান নিশ্চিতকরণ প্রক্রিয়ার সঠিক বাস্তবায়নে অডিটরদের নিয়মিত মাঠপর্যায়ে প্রেরণ একটি কার্যকর ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, QA বিশেষজ্ঞ, IT বিশেষজ্ঞ এবং উদ্যোক্তা বিশেষজ্ঞ
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































