বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা একজন উপাচার্যের জন্য ঠিক কতটা কঠিন?

বাংলাদেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়া বাইরে থেকে যতটা সম্মানজনক ও ক্ষমতাবান মনে হয়, বাস্তবে দায়িত্বটি ততটাই জটিল, ক্লান্তিকর এবং বহুস্তরীয় চাপের। সমাজে অনেকেই মনে করেন, উপাচার্য মানেই বিশাল অফিস, প্রশাসনিক ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদা। কিন্তু বাস্তবতা হলো—একজন উপাচার্যকে প্রতিদিন এমন সব সংকট, সংঘাত ও প্রত্যাশার ভেতর দিয়ে যেতে হয়, যা অনেক সময় একজন অভিজ্ঞ প্রশাসককেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা কখনোই শুধু অফিস পরিচালনা নয়; বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, জ্ঞানচর্চা এবং রাষ্ট্রের মানবসম্পদ গঠনের দায়িত্ব বহন করার নামান্তর। তাই উপাচার্যের পদকে শুধু ক্ষমতার চেয়ার হিসেবে না দেখে, একটি জটিল ও চাপপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে দেখা প্রয়োজন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি সত্যিকার অর্থে গবেষণাভিত্তিক, উদ্ভাবনী ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে চায়, তবে উপাচার্যদেরও রাজনৈতিক চাপমুক্ত, পেশাদার ও নীতিনির্ভর কাজের পরিবেশের প্রয়োজন হবে । কারণ শেষ পর্যন্ত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান অনেকাংশেই নির্ভর করে তার নেতৃত্ব কতটা দূরদর্শী, সাহসী এবং ভারসাম্যপূর্ণ তার ওপর। আর সেই নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতেই থাকেন উপাচার্য—যাঁর দায়িত্বের ভার অনেক সময় তাঁর পদমর্যাদার চেয়েও অনেক বেশি।
দুই. বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি এক ধরনের ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। এখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক সংগঠন, প্রশাসনিক কাঠামো, বাজেট, গবেষণা, আন্তর্জাতিক র্যাংকিং, মিডিয়া, আদালত—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে। ফলে একজন উপাচার্যকে একই সঙ্গে শিক্ষাবিদ, প্রশাসক, কূটনীতিক, সংকট ব্যবস্থাপক এবং কখনো কখনো রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষাকারীর ভূমিকাও পালন করতে হয়। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্যের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বহুমুখী চাপ সামলানো। একজন উপাচার্যকে একই সময়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, অভিভাবক, সরকার, গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর প্রত্যাশা পূরণ করতে হয়। এই প্রত্যাশাগুলো অনেক সময় একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়। যে সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয়, সেটি হয়তো প্রশাসনিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ; আবার যে সিদ্ধান্ত প্রশাসনিকভাবে প্রয়োজনীয়, সেটি শিক্ষক বা রাজনৈতিক সংগঠনের বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে।
তিন. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উপাচার্যের দায়িত্ব আরও কঠিন হয়ে ওঠে; কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক মেরুকরণ অত্যন্ত প্রবল। ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষক রাজনীতি এবং বিভিন্ন গ্রুপিং প্রায়শই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। একটি নিয়োগ, একটি হল বরাদ্দ, এমনকি একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়েও বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হতে পারে। অনেক সময় উপাচার্যকে একাডেমিক নীতির চেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণকে বেশি গুরুত্ব দিতে হয়। ফলে তাঁরা একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের চাপ সামলান, অন্যদিকে শিক্ষক সংগঠন ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক বলয়ের বিরোধিতাও মোকাবিলা করেন।
চার. বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া প্রতিটি ঘটনা মুহূর্তে ছড়িয়ে দেয়। ফলে উপাচার্যের প্রতিটি পদক্ষেপ তাৎক্ষণিক পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। মিথ্যা বা অসম্পূর্ণ তথ্যও দ্রুত ভাইরাল হতে পারে, মিডিয়ায় সঠিক প্রেক্ষাপট না আসার আগেই জনমত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলে। উপাচার্যের বক্তব্য বিকৃত হলে ব্যক্তিগত মানহানি, নিন্দা ও পরিবারকে পর্যন্ত অনুশোচনায় ফেলার ঝুঁকি থাকে। প্রশাসক হিসেবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধুমাত্র নীতিগত যুক্তি আর প্রশাসনিক বিধি-নিষেধই নয়, সম্ভাব্য সামাজিক প্রতিক্রিয়াও পর্যবেক্ষণ করতে হয়। এই পরিস্থিতি কঠোরতা ও দক্ষ জনসংযোগ কৌশল না থাকলে সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে এবং নীরবতাকে অনিশ্চয়তায় পরিণত করে।
পাঁচ. বাংলাদেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অবকাঠামো, সরকারি বাজেট ও নিজস্ব তহবিলের ঘাটতি স্পষ্ট। আবাসন সংকট, ল্যাব-সুবিধার অভাব, পর্যাপ্ত গবেষণা তহবিলের অনুপস্থিতি ও শিক্ষক ঘাটতি—এসব মিলিয়ে একাডেমিক মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তবু ছাত্র-অভিভাবকদের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী: সময়মতো ফল, সেশন মুক্তি, নিরাপদ আবাসন—এসব ব্যর্থ হলে দায় সবসময় উপাচার্যের কাঁধে পড়ে। সীমিত সম্পদের মধ্যে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা, তহবিল বণ্টনকে দক্ষভাবে পরিচালনা করা এবং পুনর্গঠনমূলক উদ্যোগ নেয়াই উপাচার্যের আরেকটি বড় পরীক্ষা। এসব সমস্যা যে শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং বহু বছর ধরে সঞ্চিত নীতিগত দুর্বলতার ফল, সেটিও উপাচার্যকে বিবেচনা করতে হয়।
ছয়. বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উপাচার্যের সামনে অন্য ধরনের চাপ থাকে: মালিকপক্ষ ও বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সঙ্গে সমন্বয়, ইউজিসি নির্দেশনা মেনে চলা, বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা ও শিক্ষার্থীর বাজারভিত্তিক প্রত্যাশা বজায় রাখা। এখানে টেকসই আর্থিক অবস্থা নিশ্চিত করতে গিয়ে অনেক সময় একাডেমিক স্বাধীনতা কমে যায়। শিক্ষার গুণমান ও লাভবান প্রতিষ্ঠানের চাহিদার মধ্যে সুষমতা রাখা উপাচার্যকে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। মালিকানার স্বার্থ ও নৈতিক একাডেমিক আদর্শের মধ্যে সমন্বয় স্থাপনের কাজটি সূক্ষ্ম কূটকৌশল দাবি করে।
সাত. একজন উপাচার্যের ব্যক্তিগত জীবনও এই দায়িত্বের কারণে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো সংকট তৈরি হলে দিন-রাত তাঁকে পরিস্থিতি সামলাতে হয়। আন্দোলন, সংঘর্ষ বা জরুরি বৈঠকের কারণে অনেক সময় ব্যক্তিগত সময় বলে কিছু থাকে না। মানসিক চাপ, রাজনৈতিক সমালোচনা এবং জনসম্মুখে প্রতিনিয়ত মূল্যায়নের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, কাঠামোগত সংকট ও বহুমুখী চাপের মধ্যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থিতিশীল রাখা একটি কঠিন কাজ। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় একজন উপাচার্যকে অনেক সময় এমন সমস্যার দায়ও নিতে হয়, যার মূল কারণ বহু বছরের নীতিগত দুর্বলতা।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বাংলাদেশে আমরা উপাচার্যের পদকে প্রায়ই অতিরিক্ত রাজনৈতিক দৃষ্টিতে দেখি। ফলে একজন শিক্ষাবিদ উপাচার্য হওয়ার পর তাঁকে আর শুধু শিক্ষক হিসেবে মূল্যায়ন করা হয় না; তাঁকে সরকারি দলের ক্ষমতার অংশ হিসেবেও দেখা হয়। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ব্যক্তিগত আক্রমণে রূপ নেয়। একজন উপাচার্যের ভালো কাজগুলো অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়, কিন্তু একটি ভুল সিদ্ধান্ত তাঁর পুরো মেয়াদকেই বিতর্কিত করে দিতে পারে। এজন্য স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও পেশাদার প্রশাসনিক কাঠামো থাকা অত্যন্ত জরুরি—যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া বিশ্বাসযোগ্য হয় এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে নেতৃত্ব রক্ষা পায়।
উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়ন করতে চাইলে উপাচার্যদের জন্য রাজনৈতিক চাপমুক্ত, পেশাদার ও জবাবদিহিতামূলক পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি। স্বচ্ছ নিয়োগ ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, পর্যাপ্ত তহবিল, অবকাঠামো উন্নয়ন ও মানসম্মত গবেষণা সহায়তা প্রদান করলে নেতৃত্বের কার্যকারিতা বাড়বে। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ, সংকট ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্বগত দক্ষতা বৃদ্ধি করাও প্রয়োজন। এছাড়া আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও গবেষণা ক্ষেত্রে সুযোগ বৃদ্ধি পেলে প্রতিষ্ঠানগুলোর মান বাড়বে এবং উপাচার্যের ওপর চাপও সামান্য কমবে। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা কেবল ফাইল সই করা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠন, জ্ঞানচর্চার পরিবেশ রক্ষা এবং একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনা নির্ধারণের দায়িত্ব। তাই একজন উপাচার্যের সফলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে তাঁর দূরদর্শিতা, নৈতিকতা, সংকট ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতার ওপর। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে যদি সত্যিকার অর্থে উন্নত করতে হয়, তাহলে উপাচার্যদের জন্য রাজনৈতিক চাপমুক্ত, পেশাদার এবং জবাবদিহিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান শুধু তার ভবনের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে তার নেতৃত্ব কতটা যোগ্য, সাহসী এবং বিচক্ষণ তার ওপর। আর সেই নেতৃত্বের সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব বহন করেন উপাচার্য—যাঁর কাজ অনেক সময় বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তার চেয়ে বহু গুণ বেশি কঠিন।
লেখক: শিক্ষক ও চেয়ারম্যান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, এবং জনস্বাস্থ্য ও সমাজনীতি বিষয়ক গবেষক, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































