সাইবার পুলিশ ইউনিট: প্রয়োজনীয়তা ও অস্বস্তিকর কিছু প্রশ্ন

হা মীম কেফায়েত
  প্রকাশিত : ২২ মে ২০২৬, ১৬:৪০
অ- অ+

একটি পরিসংখ্যানই বর্তমান বাস্তবতার ভয়াবহতা বুঝিয়ে দেয়, প্রতি পাঁচজন কিশোরী বা তরুণীর মধ্যে তিনজন সাইবার বুলিংয়ের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। কিন্তু ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রায় ৮৯ শতাংশ সামাজিক লজ্জার ভয়ে অভিযোগই করেন না। তার মানে, সাইবার হয়রানির শিকার বেশিরভাগ মানুষ চুপ করে থাকেন। একা বহন করেন কষ্টটা। এই বাস্তবতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ যখন গত ১১ মে পৃথক সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের ঘোষণা দিলেন, তখন অনেকের মনে স্বস্তির একটা অনুভূতি এলেও অস্বস্তিকর কিছু প্রশ্নও জমে উঠেছে।

বাংলাদেশে সাইবার অপরাধের চিত্র এখন কতটা গুরুতর সেটা সংখ্যায় একটু দেখা দরকার। সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে নতুন ধরনের সাইবার অপরাধ বেড়েছে ২৮১ শতাংশেরও বেশি। শিশু ভুক্তভোগীর হার বেড়েছে ১৪০ শতাংশ। আর ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৫৯ শতাংশেরও বেশি নারী। ডেইলি স্টারের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে সাইবার অপরাধের তালিকায় সবচেয়ে উপরে আছে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, যা মোট ঘটনার প্রায় ২২ শতাংশ। তার পাশাপাশি আছে অনলাইন প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল, পরিচয় চুরি এবং ক্রমশ বাড়তে থাকা আর্থিক জালিয়াতি। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রায় ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার সাইবার হামলার মাধ্যমে চুরি হয়েছিল। সেই ঘটনাটি বিশ্বের অন্যতম বড় সাইবার ডাকাতি হিসেবে ইতিহাসে লেখা আছে।

এই পরিস্থিতিতে বিশেষায়িত সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের কথা উঠেছে স্বাভাবিক কারণেই। এখন পর্যন্ত পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ অর্থাৎ সিআইডিই মূলত সাইবার মামলা দেখে। কিন্তু সমস্যা হলো সাইবার অপরাধের ধরন প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। একজন হ্যাকার হয়তো ঢাকায় বসে সার্ভার ভাঙছেন যেটা আছে সিঙ্গাপুরে, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষটি থাকেন চট্টগ্রামে। প্রমাণ লুকানো থাকে এনক্রিপ্টেড ফাইলে। এই ধরনের অপরাধ তদন্তে সাধারণ প্রশিক্ষণ নেওয়া পুলিশ দিয়ে কাজ হয় না। দরকার ডিজিটাল ফরেনসিক, নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ আর আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় পারদর্শী একটি বিশেষ দল।

কিন্তু এখানেই থামতে হবে একটু।

বাংলাদেশে ডিজিটাল আইন আর পুলিশি ক্ষমতার সম্পর্ক সুখকর নয়। ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন হয়েছিল। সেই আইনে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ৭ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে বলে তৎকালীন আইনমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছিলেন। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ ১ হাজার ৪৩৬টি মামলা বিশ্লেষণ করে দেখেছে অভিযুক্তদের মধ্যে ৩২ শতাংশ রাজনীতিবিদ এবং ২৯ শতাংশ সাংবাদিক। আর মামলাকারীদের প্রায় ৭৮ শতাংশই ছিলেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত। এই আইনের আওতায় সাংবাদিকদের রাতের বেলা তুলে নেওয়া হয়েছে, ওয়ারেন্ট ছাড়া ডিভাইস জব্দ করা হয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ফেসবুকে পোস্ট করার অপরাধে মানুষ গ্রেফতার হয়েছেন। ব্যঙ্গচিত্র পোস্ট করার কারণে সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই আইনকে বলেছিল "দমন-পীড়নের পুনর্মোড়কজাতকরণ"। ক্লুনি ফাউন্ডেশন ফর জাস্টিসের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বেশিরভাগ মামলা বিচার পর্যন্ত পৌঁছায়নি। যেগুলো পৌঁছেছে সেগুলোতে মাত্র একজন সাংবাদিক দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। কিন্তু বিচার না হলেও গ্রেফতার, আটক, ডিভাইস জব্দ এবং সামাজিক অপমানের ক্ষতি তো হয়ে গেছেই। ২০২৩ সালে এই আইনের জায়গায় এলো সাইবার নিরাপত্তা আইন। সেটিও সমালোচিত হলো একই কারণে। পরে ২০২৫ সালে এলো সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, যেখানে বেশ কিছু বিতর্কিত ধারা সরানো হয়েছে।

এই ইতিহাসটা মাথায় রেখেই সাইবার পুলিশ ইউনিটের কথা ভাবতে হবে।

সাইবার অপরাধ দমনের নামে যে ক্ষমতা তৈরি হয়, সেটা খুব সহজেই রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, নতুন ইউনিটটি সাইবার অপরাধের পাশাপাশি "অনলাইনে ছড়ানো গুজব ও মিথ্যা তথ্য" মোকাবিলা করবে। এই বাক্যটি পড়ে একটু থামা দরকার। কারণ "গুজব" এবং "মিথ্যা তথ্য" এই শব্দ দুটি বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে বিরোধী মতকে চুপ করানোর কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। রাজনৈতিক সমালোচনা একটু বেশি তীব্র হলে সেটাকে গুজব বলে চিহ্নিত করার নজির আমাদের কম নেই।

প্রযুক্তির জগতে একটি কথা আছে: যে হাতিয়ার তৈরি হয় শত্রু মারতে, সেটা নিজের মানুষ মারতেও ব্যবহার করা যায়। তাই সাইবার পুলিশের ক্ষমতা যতটা শক্তিশালী হবে, জবাবদিহির কাঠামোটাও ততটাই মজবুত হতে হবে।

এখানে কয়েকটি প্রশ্ন সরাসরি করা দরকার। এই ইউনিটের কার্যক্রম কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে? কোনো নিরীক্ষণ বোর্ড বা স্বাধীন তদারকি সংস্থা থাকবে কি? কোনো নাগরিক যদি এই ইউনিটের কর্মকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাঁর জন্য প্রতিকারের কার্যকর পথ কী? ওয়ারেন্ট ছাড়া তল্লাশি বা গ্রেফতারের বিষয়ে কী নিয়ন্ত্রণ থাকবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ঘোষণার সঙ্গে না থাকলে সেটা একটি অসম্পূর্ণ উদ্যোগ।

তবে শুধু ক্ষমতার অপব্যবহারের ভয় দেখিয়ে সাইবার পুলিশ ইউনিটের পুরো ধারণাটাকে নাকচ করে দেওয়া ঠিক হবে না। প্রকৃত ভুক্তভোগীদের কথাও মনে রাখতে হবে। যে মেয়েটির ব্যক্তিগত ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে, সে থানায় গেলে কি সুবিচার পাচ্ছে? যে তরুণী সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিদিন হয়রানির শিকার হচ্ছেন কিন্তু ৮৯ শতাংশের মতো চুপ করে আছেন, তাঁর জন্য কি এখন কোনো কার্যকর জায়গা আছে? বেশিরভাগ সময় উত্তর হলো নেই।

এখানেই সাইবার পুলিশ ইউনিটের সম্ভাবনা। যদি এই ইউনিট সত্যিকার অর্থে ভুক্তভোগীবান্ধব হয়, যদি অভিযোগ করা সহজ হয়, তদন্ত দ্রুত হয় এবং ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা রক্ষা পায়, তাহলে এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হতেই পারে। পৃথিবীর অনেক দেশে এ ধরনের বিশেষায়িত ইউনিট কার্যকরভাবে কাজ করছে।

কিন্তু কেবল পুলিশিং দিয়ে সাইবার সমস্যার সমাধান হবে না। গবেষণাই বলছে, অসচেতনতা এই অপরাধের বড় কারণ। একটি কিশোর যদি না জানে যে অন্যের ছবি তার অনুমতি ছাড়া শেয়ার করা অপরাধ, একটি মেয়ে যদি না জানে কীভাবে অনলাইনে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে হয়, একজন বাবা-মা যদি না বোঝেন সন্তানের স্মার্টফোনে কী হচ্ছে, তাহলে শুধু পুলিশ বাড়িয়ে সংখ্যা কমবে না। শিক্ষা পাঠ্যক্রমে ডিজিটাল নৈতিকতা, পরিবারে সচেতনতা এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর নিজস্ব দায়িত্ব এই তিনটি না থাকলে সাইবার পুলিশ শেষমেশ দমন-পীড়নের যন্ত্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিই বেশি থাকে।

বাংলাদেশ এখন একটা সংক্রমণকালে আছে। পুরোনো কালো আইন সরানো হয়েছে, নতুন কাঠামো তৈরির চেষ্টা চলছে। এই মুহূর্তে সাইবার পুলিশ ইউনিট হবে একটি পরীক্ষা। পরীক্ষাটা হলো, রাষ্ট্র কি নাগরিককে সত্যিই সুরক্ষা দিতে চায়, নাকি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়?

উত্তরটা নির্ভর করবে কার্যকর জবাবদিহি, স্বচ্ছ কার্যপদ্ধতি এবং মতপ্রকাশের অধিকারের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধার ওপর। শুধু ঘোষণায় নয়, বাস্তবে।

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
প্রধানমন্ত্রীর খালাতো ভাইয়ের প্রতিষ্ঠানের টাকা ছিনতাইয়ের নেপথ্যে পেশাদার অপরাধী চক্র, মাস্টারমাইন্ডের খোঁজে ডিবি
কালকিনিতে মহিলা মাদ্রাসায় হাতবোমা বিস্ফোরণে আহত ৪ শিক্ষার্থী
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের আংশিক কমিটিতে যারা পেলেন দায়িত্ব
বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ, সব সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা