সাংবাদিক হত্যায় প্রতিবাদের ঝড় নেই কেন?

বই মেলার দুই দিন আগে বইমেলার প্রস্তুতি নিয়ে নিউজ করতে গিয়ে ছিলাম বাংলা একাডেমিতে। একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদের ইন্টারভিউ নিলাম, তিনি বই মেলার ইতিবাচক দিকগুলোই তুলে ধরলেন, নেতিবাচাক কিছুই বলেননি। কারণ, ইতিবাচক দিক বললেই কেবল মানুষ উৎসাহিত হবে বই মেলায় আসতে।
সেদিন পরিচালকের কক্ষেই একজন যুবককে দেখলাম, মুখে দাড়ি ও পাঞ্জাবি পড়া, হাতে কালো ব্যাগ। ২৬\২৭ বছর বয়সী হবে। তাকে দেখে পরিচালক কিছুটা ঘাবড়ে গেছেন মনে হলো। তাই উনার সঙ্গে আমাকেও কক্ষে ঢুকতে বললেন। আর দরজাটা না লাগিয়ে খোলা রাখতে বললেন। যুবকটা চেয়ারে বসে পরিচালকের সঙ্গে কথা বলছিলেন তার একটি লেখা ছাপানোর বিষয়ে। কিন্তু পরিচালক হয়তো ভেবেছেন জঙ্গিবাদের কোন বিষয় হতে পারে। তিনি এতটাই ঘাবড়েছেন যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওই যুবককে বিদায় দিতে চাচ্ছেন। তবে আমি যখন রুমে তখন তিনি একটু সাহসও পেলেন বৈকি। আর আমার হাতে ছিল রেডিও টুডের বুম। কিছুক্ষণ কথা চালিয়ে যাবার পর তাকে বিদায় দিয়ে আমার সঙ্গে কথা বললেন।
কিন্তু ওই যুবক আমাকে অনুসরণ করলেন। আমার জন্য সিড়িতে দাঁড়িয়ে রইলেন। আমি সাক্ষাৎকার শেষে বেরিয়ে সিঁড়িতে আসতেই, উনি আমাকে ম্যাম বলে সম্বোধন করলেন, কথা বললেন...
না, ঘাবড়ানোর কিছু নেই..
ওনি স্রেফ উনার বই প্রচারের জন্যই আমার সঙ্গে কথা বললেন। এবার মেলায় উনি একটি ছোট্ট বই প্রকাশ করতে যাচ্ছেন সেটাই জানালেন আমাকে এবং তাকে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানান। আবার ওনার সঙ্গে বনানীতে দেখা হলে তিনি তার লেখা 'পাগলার গান' নামে ছোট্ট একটি বই হাতে ধরিয়ে দিয়ে তা প্রচার করার অনুরোধ জানান।
এবার বলি আগের কিছু কথা.. গত বছর, একজন মানবাধিকার কর্মী সহযোগিতা চেয়েছেন, দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে তার বাড়ির ১২ হাজার টাকার ট্যাক্স এক লাখ টাকা লিখে ভুয়া ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে তার বাড়ির আসবাবপত্র উঠানোর পাঁয়তারা করছিল একদল দালাল। নিউজ করা সম্ভব হয়নি, তবে সেই চেষ্টা বন্ধ করতে পেরেছি।
দুবছর আগে, স্বামীর অত্যাচারে টিকতে না পেরে আত্মহত্যা করতে যাওয়া নারীকে স্বামীর ঘরে ফিরিয়ে দিয়েছি লেখনি দিয়ে। ফিরিয়ে দিয়েছি সন্তানের অধিকার।
কোন পুরুষ প্রতারণার স্বীকার হলে আর সহযোগিতা চাইলে যতদূর সম্ভব সহযোগিতা করেছি লেখনির মাধ্যমে।
রাস্তায় চলতে, গাড়িতে উঠতে নারীদের অবমাননা আর অপমানের জবাব দিয়েছি লেখনি ও ব্যক্তিগত ভাবে। যার ফলে এখন বাসে মহিলা, শিশু, প্রতিবন্ধী সিট হয়েছে। হয়েছে আইন।
ভাঙা রাস্তায় বৃদ্ধ বাবার পড়ে যাওয়া রুখেছি লেখনিতে।
সন্তানের ভবিষ্যত সুন্দর শিক্ষা, খেলাধুলার পরিবেশ সৃষ্টিতে এঁকেছি অনেক চিত্র। এখনো তাদের নিরাপদ আবাস গড়ায় আমার লড়াই অব্যাহত।
বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে অনেক মানুষ এসেছেন তার বিপদের কথা বলতে। বলার সুযোগ দিয়েছি। উপকারও করেছি অনেকের। তারা এখনো ফোন দিয়ে খোঁজ-খবর নেন।ভাবছেন কে আমি? এতকিছু কেন করি?
এতকিছু নি:স্বার্থভাবে করতে পারেন একজন সাংবাদিকই।
আর আমি সেই সাংবাদিক।আমি বলতে শুধু আমি একা নই। সকল সাংবাদিক মানেই আমি, আমি মানেই সকল সাংবাদিক।
আমরা সাংবাদিক। আমার, আমাদের বিবেক আছে আছে মগজও। আছে প্রাণ।
আমরা সাংবাদিক, মাঠের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছুটে বেড়াই ভালো কিংবা খারাপ নিউজ সংগ্রহে। বিনিময়ে মাস শেষে পেটের ভাত জুটার অংকটা পাই। কারো পক্ষে লিখলেও আমার কিছু যায় আসে না, বিপক্ষে লিখলেও কিছু যায় আসে না। বরং পত্রিকা, অনলাইন, রেডিও, টিভি চ্যানেলে এসব সংবাদ দেখে আপনি জনগণই উপকৃত হন। জনগণই হাসে। আর তা দেখে তৃপ্তি মেলে আমার কিংবা আমাদের। আপনার হাসিতে আমি হাসি, আপনার কান্নাতে আমি কাঁদি।
আমরা, যদি দেশের এতগুলা চ্যানেল একযোগে বই মেলা কিংবা, এ জাতীয় যে কোন ইতিবাচক সংবাদ প্রচার না করতাম, কর্তৃপক্ষ কি ভেবে দেখবেন যে, তা প্রচার করতে সবগুলো মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন দিতে আপনার কত খরচ হতো?
ও পরিচালক, আপনি জঙ্গির ভয়ে আশ্রয় নিতে সাংবাদিক খুঁজেন।
ও যুবক, আপনি নিজের বই প্রচারে সাংবাদিক খোঁজেন। ও মানবাধিকার কর্মী নিজের বাড়ি বাঁচাতে সাংবাদিক খোঁজেন।
ও দলীয় নেতা, আপনি আন্দোলন করতে সাংবাদিক খুঁজেন, মাঠে মার খান সাংবাদিক খুঁজেন, মামলা থেকে বাঁচতে সাংবাদিক খুঁজেন। ডাকাত, ছিনতাই, মাদক থেকে মুক্তি পেতে সাংবাদিক খুঁজেন। ধনী, আপনি প্রসাদ গড়েন, সাংবাদিক খুঁজেন। দরিদ্র আপনি ভিটা বাঁচাতে সাংবাদিক খুঁজেন, সন্তান বাঁচাতে সাংবাদিক খুঁজেন।
দেশের উন্নয়নে সাংবাদিক চাই, দাবি আদায়ে সাংবাদিক চাই। পুরস্কার দিতে সাংবাদিক চাই। আইন শৃঙ্খলা বিস্তারে সাংবাদিক চাই, বিচার চাইতেও সাংবাদিক চাই।সর্বক্ষেত্রে সাংবাদিকই যেন অাপনার ভরসা!
অথচ, আপনারই সেই চাওয়ার মূল্য দিতে গিয়ে যখন রাস্তায় নিরপরাধ সাংবাদিক মার খায়, তখন আপনার মুখে কোন শব্দ নেই? কোন প্রতিবাদ নেই?
যখন গুলি খেয়ে মারা যায়, তখনও কোন আন্দোলন নেই! নেই কোন সমবেদনাও?
সাংবাদিকের মাথার খুলি দেশে রেখে ডাক্তার তাকে পাঠায় বিদেশে, অথচ মুখ বন্ধ আপনার!
সর্বশেষ সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে মেয়রের গুলিতে আহত হন সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুল। সমকালের এই সাংবাদিক আজ শুক্রবার মারা গেছেন। তার জন্যও কোন প্রতিবাদ নেই আপনার!
এ ঘটনা যখন আপনার ক্ষেত্রে ঘটে, সাংবাদিক কি সেটা তুলে এনে লেখনির মাধ্যমে প্রতিবাদ করতেন না?
বিপদে পড়লে আপানারা পাবলিক, দলীয় নেতা, আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাংবাদিককে বন্ধু ডাকেন। অথচ সাংবাদিকের বিপদে মজা লন? বলেন এরা হলুদ? হলুদরা তো চাটুকারিতায় পারদর্শী। হাত কচলান। ওরা যে মাঠে যায়না, মার খায় না, বসে থাকেন আমাদের ঘাড়ের উপর, টু শব্দটি করেন না, প্রতিবাদ তো দূরে থাক। এটা কি আপনার বোধগম্য নয়?
বলেন এরা সাংঘাতিক? হ্যা সাংঘাতিক, তবে যে অন্যায় অপরাধ করে তার জন্য সাংঘাতিক। আপনার সাথে কেউ অন্যায় করলে সাংবাদিকরা সারা দেশের মানুষ একত্র করে প্রতিবাদ করে মাঠে নামেন। নিজের জীবন বিপন্ন জেনেও তা করেন।
কিন্তু আপনি? আপনি কি করেছেন? কাজ করতে গিয়ে একজন আহত সাংবাদিকের জন্য মাঠে নেমেছেন? দেখতে গিয়েছেন? বের হয়েছে কোন প্রতিবাদের সুর?
শুধু নিজের স্বার্থেই সাংবাদিক ইউজ করছেন আপনি?
এতটাই স্বার্থপর আপনি?ঘুম থেকে উঠেই পত্রিকা খুলেন, টিভি অন করেন কিংবা রেডিও শুনেন, দেশের খবরাখবর নেন। কিন্তু সেই খবরাখবর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আপনার কানে পৌঁছে দেন, অাপনার চোখে দেখিয়ে দেন, সাংবাদিকের চোখেই দেখেন গোটা বিশ্বকে। আর আপনার কথা সরকারের কাছে পৌঁছে দেয়। অথচ সেটা মনে রাখেন না।
ভাবেন তো একবার, যদি সকল সাংবাদিক একমাস কাজ বন্ধ রাখেন, ঘরে কোন পত্রিকা নেই, টিভি ও রেডিওতে কোন খবর নেই। কোথায় কারফিউ, কোথায় মারামারি, কে মারা গেল, কে এক্সিডেন্ট করলো, কোথায় নিয়োগ, পরীক্ষা, ফলাফল কিছু জানতে পারবেন? রাস্তায় যদি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে থাকেন, পৌঁছবে কি সরকারের কানে?
আপনি গনমাধ্যম মালিকও যদি এই ক্যাটগরিতে থাকেন, ভাবেন তো একবার, সাংবাদিক ছাড়া কতদিন চলবে আপনার পত্রিকা কিংবা রেডিও, টিভি চ্যানেল?
হ্যাঁ, আমি আপনাকেই বলছি। আপনি পাবলিক, আপনি মালিক, আপনি হাত চুলকানো নেতা, আপনি পক্ষ-বিপক্ষ দল, আপনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আপনি ডাক্তার, আপনি ইঞ্জিনিয়ার, আপনি উকিল, আপনি ছাত্র, আপনি প্রবাসী, আপনি মাঝি, আপনি জেলে, আপনি কৃষক, আপনি লেখক, আপনি কবি।
আমি আপনাকেই বলছি।
আপনি স্বার্থপর। আপনি অকৃতজ্ঞ।আপনি যদি এতটাই স্বার্থপর হন, তাহলে আমাকেও তো স্বার্থপর হতে হয়..
লেখক: সাংবাদিক
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































