পরিবহন ধর্মঘট

কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টে দুই মন্ত্রী

মাসুদ কামাল
  প্রকাশিত : ০৫ মার্চ ২০১৭, ১১:৪০| আপডেট : ০৫ মার্চ ২০১৭, ১১:৪৫
অ- অ+

কাউকে হত্যা করলে আপনার শাস্তি হবে। এটাই আইন, এটাই নিয়ম। হত্যা যেহেতু সবচেয়ে বড় অপরাধ, তাই তার শাস্তিও বড় হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু হত্যাকারী কি সবসময়ই চূড়ান্ত শাস্তি পায়? না, পায় না। বড় উকিল ধরলে অনেক সময় নানা কথার মারপ্যাঁচে আইনের ফাঁক দিয়ে সে তার মক্কেলকে ঠিকই বের করে নিয়ে আসে। আবার সাক্ষ্য প্রমাণ ঠিকঠাক মতো উপস্থাপন করতে না পারলেও কখনো কখনো সাজা যথাযথ হয় না। আবার সাক্ষী, প্রমাণ সবকিছু পেলেই কি হত্যার জন্য দায়ী ব্যক্তির সর্বোচ্চ সাজা মেলে? সকল হত্যাই কি এক রকম? সকল হত্যাকাণ্ডের জন্য কি একই শাস্তি নির্ধারিত? তা যে নয়, সেটা দেশের সাধারণ মানুষ সম্প্রতি একেবারে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। জামির হোসেনের কারণেই যে মিশুক মুনীর ও তারেক মাসুদের মতো প্রতিভাবান দুজন মানুষকে জাতি হারিয়েছে, আদালতে সেটা প্রমাণে কোনো দ্বিধা ছিল না। তারপরও এই বাসচালককে চরমদণ্ড দেওয়া যায়নি। দিতে হয়েছে যাবজ্জীবন। আর সেটা নিয়েও আপত্তি। আপত্তির নমুনা দেখাতে অচল করে দেওয়া হয়েছে পুরো দেশ। জনগণ জিম্মি হয়ে পড়েছে পরিবহন শ্রমিকদের কাছে।

মানুষ যেভাবেই মারা যাক না কেন, তার পরিণতি কিন্তু একই, বিদায় নিতে হয় পৃথিবী থেকে। সকল মৃত্যু এক হলেও সকল হত্যা কিন্তু এক নয়। অন্তত সাজার দিকে তাকালে সে রকমই মনে হয়। পেনাল কোড বা বাংলাদেশ দ-বিধিতে খুনের সাজা নির্ধারণ করতে বেশ কয়েকটি ধারা রয়েছে। ২৯৯ থেকে ৩১১- এই ধারাগুলোতে বিভিন্ন ধরনের খুন এবং তার শাস্তি নিয়ে বলা হয়েছে। আমাদের আজকের আলোচনায় বারবারই ঘুরেফিরে ৩০৪, ৩০৪(ক) এবং ৩০৪(খ) এই ধারাগুলো আসবে। ৩০৪ ধারায় বলা হয়েছে, খুন নয় এমন শাস্তিযোগ্য নরহত্যার সাজার কথা। একসময় এই ধারাতেই সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ নিহত হলে সেই মৃত্যুর জন্য দায়ী গাড়িচালকের বিচার হতো। এই ধারাতে সর্বোচ্চ সাজা হিসাবে যাবজ্জীবন কারাদ-ের বিধান রাখা হয়েছে। পরে এতে (ক) উপধারা যুক্ত হলো। ৩০৪(ক) তে মৃত্যুর জন্য দায়ী গাড়িচালকের সর্বোচ্চ সাজার বিধান রাখা হলো ৫ বছর কারাদ-ের। আর ৩০৪(খ) তে সেই সাজা নেমে এলো ৩ বছর কারাদণ্ডে। পেশাদার চালকদের দাবি, পথে তাদের কারণে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তারপর যদি মামলা হয়, তাহলে সেই মামলা এবং তার বিচার হতে হবে ৩০৪(খ) ধারায়। সাংবাদিক মিশুক মুনীর আর চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের হত্যাকারী বাসচালক জামির হোসেনের বিচার ৩০৪(খ) ধারায় হয়নি, হয়েছে ৩০৪ ধারায়। সে কারণে তার যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছে নিম্ন আদালত। কেন এই সাজা দেওয়া হলো, এ নিয়েই তাদের আপত্তি। আর তাই দেশজুড়ে শুরু হলো পরিবহন ধর্মঘট।

একেবারে শুরু থেকেই কিন্তু সারা দেশে ধর্মঘট শুরু হয়নি। আগে শুরু হয়েছে বিভিন্ন অঞ্চলে। দিন কয়েক সেখানে চলার পর হঠাৎ করেই মঙ্গল ও বুধবার (২৮ ফেব্রুয়ারি ও ১ মার্চ, ২০১৭) দেখা গেলে দেশের কোথাও কোন গণপরিবহন চলছে না। স্থবির হয়ে পড়লো জনজীবন, চূড়ান্ত ভোগান্তিতে পড়লো পুরো জাতি। একাধিক সংবাদ মাধ্যমে বলা হলো, এই ধর্মঘটের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি এসেছে মন্ত্রীর বাড়ি থেকে। এই মন্ত্রী যে সরকারের নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, এটা গোপন কিছু নয়, সবাই জানে। ধর্মঘট যখন চলছে, মানুষ যখন এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, তখনও দেখা গেলো এই মন্ত্রীকেই পরিবহন শ্রমিকদের পক্ষ নিয়ে সাফাই গাইতে। বললেন তিনি, ধর্মঘট তো নয়, পরিবহন শ্রমিকরা কর্মবিরতি করছে। তাদের একজন সহকর্মীর সাজা হওয়ায় এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা কর্মবিরতি পালন করছে। দ্বিতীয় দিন ধর্মঘট যখন প্রত্যাহার করা হলো, তখনও নায়কের ভূমিকায় দেখা গেল এই মন্ত্রী মহোদয়কেই। তিনি পরিবহন শ্রমিকদের অনুরোধ করলেন, আর অমনি সবাই কর্মবিরতি বাদ দিয়ে কাজে যোগ দিলেন।

আচ্ছা, এই অনুরোধটা তিনি ধর্মঘটের শুরুতে করতে পারলেন না কেন? তার অনুরোধে পরিবহন শ্রমিকরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করবে, এ আত্মবিশ্বাসটাই বা তার এলো কেন? অনুরোধ তো করার কথা সড়ক পরিবহনমন্ত্রীর। তা না করে নৌ-পরিবহনমন্ত্রী কেন করলেন? তাহলে কি নৌ-পথের পাশাপাশি সড়ক পথেরও দায়িত্ব তারই উপর? সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আবার দলের সাধারণ স¤পাদকও। এত পাওয়ারফুল একজন মন্ত্রী হয়েও তার কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই কেন সড়কে দাপিয়ে বেড়ানো পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের ওপর? যে প্রশ্নটা প্রথমে জেগেছিল, ধর্মঘটের শুরুতে কেন প্রত্যাহারের অনুরোধ করলেন না খান সাহেব? এর উত্তর হয়ত সহজ, যদি শুরুতেই প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়, তাহলে আর ধর্মঘট ডাকার কি অর্থ থাকতে পারে? তাহলে ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিনেই বা কেন প্রত্যাহার? ওটা কি ধমক খেয়ে? সেটা হতে পারে। তাহলে এই ধমকটাই বা প্রথম দিনে এলো না কেন? তাহলে তো ৩৩ ঘণ্টা ধরে দেশের কোটি কোটি মানুষকে এত অসহনীয় ভোগান্তি পোহাতে হতো না। এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনোদিনই মিলবে না। উল্টো এরকম বেয়াড়া প্রশ্নের জন্য খোদ প্রশ্নকর্তাকেও বিপাকে পড়তে হতে পারে। ধর্মঘট প্রত্যাহারের আগে সরকারের সঙ্গে মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে বৈঠক হয়। বৈঠকে নৌ-পরিবহনমন্ত্রী ছাড়াও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গাও উপস্থিত ছিলেন। যে প্রশ্নটির জবাব পাওয়া খুবই জরুরি তা হচ্ছেÑ এই দুই মন্ত্রী সেখানে উপস্থিত ছিলেন কোন পক্ষের প্রতিনিধি হয়ে? মন্ত্রীর বাইরে এই দুই জনের আরও একটা পরিচয় আছে। মন্ত্রী শাজাহান খান শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি, আর মশিউর রহমান রাঙ্গা মালিকদের সংগঠনের সভাপতি। অর্থাৎ এই দুই ব্যক্তি একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের নেতা, আবার সরকারেরও প্রতিনিধি। এর আগেও দেখা গেছে, পরিবহন বিষয়ে যখনই কোনো বিরোধ নি®পত্তির প্রশ্ন ওঠেছে, বৈঠকে অবধারিতভাবে এই দুই ব্যক্তি থেকেছেন। প্রশ্নটি হচ্ছেÑ বৈঠকে তারা কোন পক্ষ অবলম্বন করেন? আন্দোলনরত মালিক-শ্রমিকদের, নাকি আন্দোলন দমনে সচেষ্ট সরকারের? বিরোধ নিরসনে যখন কোনো আলোচনা হয়, তখন একই ব্যক্তির পক্ষে কি দুই দিকেই থাকা সম্ভব? একই ব্যক্তি দুই পদে থাকতে পারবেন না এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু আপত্তিটা উঠবে তখনই যখন কোনো বিরোধ নিষ্পত্তিতে একই ব্যক্তি দুই পক্ষেরই প্রতিনিধিত্ব করবেন। ইংরেজিতে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট বলে একটা কথা আছে। এই বৈঠকে এই দুই মন্ত্রী কোন পক্ষের ইন্টারেস্ট দেখেছেন?

বিষয়টা কিন্তু কেবলমাত্র দুই মন্ত্রীর মধ্যেই আর সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বিস্তৃত হয়ে গেছে পুরো সরকারের মধ্যেই। সরকারের দায়িত্ব মানুষের দুর্ভোগ নিরসন, সেটাই তাদের নৈতিক দায়িত্ব, সেই শপথ নিয়েই তারা দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এখন সরকারেরই দুই মন্ত্রী যদি দুর্ভোগের কারণ হিসেবে আবির্ভূত হন, সেটা পুরো সরকারের জন্য, সরকারপ্রধানের জন্য কিছুটা হলেও বিব্রতকর নিঃসন্দেহে। ধমকের কারণেই হোক বা অন্য কোনো কারণেই হোক, ধর্মঘট তো উঠে গেল। এর পরদিনই দেখা গেল ধর্মঘটের কারণে গাবতলীতে যে ভাঙচুর হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে মামলা হয়েছে। মামলার এজাহারে সহস্রাধিক লোকের নাম দেওয়া হয়েছে। ৬৫ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে, বাকিদের নাম বলা হয়নি। ফলে গাবতলী টার্মিনালে বিরাজ করছে এক গ্রেফতার আতংক। শ্রমিকদের অনেকে জানেনও না, কেন কি কারণে ছিল এই ধর্মঘট। শ্রমিকদের অধিকাংশই বেতন পেয়ে থাকেন দিনভিত্তিক, কাজ করলে টাকা পান, না করলে নেই। ধর্মঘটের কারণে ওই দুই দিন কোনো বেতন পাননি। আর এখন গ্রেফতার আতংকের কারণেও কাজে যোগ দিতে পারছেন না। আর একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, মামলায় কিন্তু কেন্দ্রীয় কোনো নেতাকেই আসামি করা হয়নি। ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত যাদের কাছ থেকে এসেছে, তাদের কিছু হয়নি। বহাল তবিয়তে পতাকাবাহী গাড়িতে ঘুরছেন। আর বিপদে আছেন সেই প্রান্তিক শ্রমিকরা, পালিয়ে বেড়াচ্ছেন গ্রেফতার এড়াতে।

আসলে এখন সময় এসেছে প্রশ্ন করার। প্রশ্ন করা দরকারÑ একদিনও পরিবহন শ্রমিক হিসেবে কাজ না করেও কিভাবে একজন মন্ত্রী শ্রমিকদের নেতার পদটি দখল করে রাখতে পারে? নিজের পদ টিকিয়ে রাখতে কিভাবে বলতে পারেন ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে হলে লেখাপড়া জানা দরকার নেই, কেবল গরু ছাগল চিনতে পারলেই হবে? প্রশ্ন করা দরকার, জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টির মূল হোতা দুই ব্যক্তিকে কিভাবে সরকারপ্রধান রাখেন তার মন্ত্রিসভায়? এমন প্রশ্নও উত্থাপন করা দরকার, যে আইন হত্যার সাজাকে কমিয়ে দেয়, তেমন আইন আদৌ থাকা দরকার কি না? জানি, এতসব প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে না। তবে যে প্রশ্নটির জবাব পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়, সেটি হলোÑ আদালতের কোনো রায়ের বিরুদ্ধে ধর্মঘট করার কোনো এখতিয়ার কারও আছে কি না? এই আশাটি করছি এ কারণে খোদ উচ্চ আদালতেই উত্থাপন করেছেন এই প্রশ্নটি। অপেক্ষায় থাকবো, দেখি আদালতের এই প্রশ্নের কি জবাব আসে সরকারের কাছ থেকে। সেই সঙ্গে এটাও দেখার জন্য অপেক্ষা করবো, জনগণের সরকার কি ব্যবস্থা নেন জনদুর্ভোগের জন্য দায়ী তার গুণধর দুই সদস্যের ব্যাপারে।

মাসুদ কামাল : লেখক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
সমুদ্রে অসাধারণ সাহসিকতার স্বীকৃতি, আইএমওর বীরত্ব পুরস্কার পাচ্ছেন চট্টগ্রাম বন্দরের ক্যাপ্টেন আসিফ
আকস্মিক বন্যা মোকাবিলায় চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী মোতায়েন
শেখ হাসিনার জন্য ফাঁসির দড়ি অপেক্ষা করছে: নাহিদ ইসলাম
দিনভর বন্যা পরিস্থিতি মনিটর করলেন প্রধানমন্ত্রী, প্রশাসন ও দলীয় নেতাকর্মীদের দিলেন জরুরি নির্দেশনা
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা