আদিবাসীরা সভ্যতার বরপুত্র

মাহবুব রেজা
 | প্রকাশিত : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১১:৫১

এক ।।

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এই অঞ্চলের মানুষ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তার অস্তিত্ব রক্ষায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন সংগ্রামে , যুদ্ব–বিগ্রহে এক থেকেছে। নিজেদের মধ্যে গড়ে তুলেছে এক অলিখিত মানবতার সেতু বন্ধন। মিলিত ঐক্যে তারা কল্যাণের পথে, মঙ্গলের পথে এগিয়ে গেছে। সভ্যতার ইতিহাস আমাদের এই সাক্ষ্যই দেয় যে, একটি জাতির এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাস হল সেই জাতির ভেতরে বসবাস করা সব ধরনের মানুষের সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাস। বাংলাদেশও এই ইতিহাসের বাইরে নয়। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬ (২)-এ লেখা আছে, ‘বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি’, (সংবিধান [পঞ্চদশ সংশোধন] আইন, ২০১১)।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আইএলও কনভেনশন নং ১০৭ অনুসমর্থন করেন। ওই কনভেনশনে আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমি ও বনের ওপর সনাতনী অধিকারের স্বীকৃতি আছে। বঙ্গবন্ধু তাঁর ঔদার্য দিয়ে একথা বুঝতে পেরেছিলেন যে দেশের মধ্যে থাকা শত শত বছরের জনগোষ্ঠীকে বিচ্ছিন্ন রেখে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তিনি আদিবাসীদের সনাতনী অধিকারসহ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা দিতে বদ্ধপরিকর ছিলেন এবং এক্ষেত্রে তিনি কাজও শুরু করেছিলেন। কিন্তু ‘৭৫ পরবর্তী সরকারগুলোর স্বেচ্ছাচারী মনোভাব এবং আদিবাসীদের ব্যাপারে সীমাহীন উপেক্ষার কারণে আদিবাসীরা তাদের অধিকার থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত ছিল।

আদিবাসী বলতে আমরা কাদেরকে বুঝি কিংবা এই আদিবাসী শব্দটিই বা আমরা কেনো ব্যবহার করি? নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় জানা যায়, ১৭৯৮ সালে ইংরেজরা উপজাতি না বলে ‘নেশন’লিখতো। ১৮০০ শতকে ইউরোপীয় সমাজবিজ্ঞানীরা উপজাতি শব্দটি ব্যবহার করতে শুরু করেন। উপজাতি শব্দটি বাংলা ভাষায় এসেছে ইংরেজি ‘ট্রাইবাল’ শব্দকে ভিত্তি করে। পশ্চিমের সমাজ-নৃবিজ্ঞানীদের জাতি গবেষণা ও এথনোগ্রাফ রচনার ভেতর দিয়ে ‘ট্রাইবাল’ শব্দটি এই জনপদে হাজির হয়। সাঁওতাল হুলের সময় ব্রিটিশরা বিদ্রোহী সাঁওতালদের ‘অপরাধী ট্রাইব’ হিসেবে আখ্যায়িত করতো। হাজংদের টংক আন্দোলনের সময় ‘বিধর্মী কমিউনিস্ট’ বলে গালি দেয়া হতো। হাতিখেদা আন্দোলনের সময় হাজংদের বলা হতো ‘রাজা অবাধ্য’। লোধা/শবর আদিবাসীদের সবসময় ব্রিটিশরা বলতো ‘ক্রিমিনাল ট্রাইব’। ঔপনিবেশিক-বৈষম্যমূলক-কর্তৃত্ববাদী এই অপর করে রাখার ‘ট্রাইব্যুনাল’ শব্দটিই বাংলায় পরবর্তী সময়ে ‘উপজাতি’ হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।

জানা যায় , ব্রিটিশ আমলে চাকমাদের আমন্ত্রণে বাঙালিরা ১৮১৮ সাল থেকে ১৮২০ সালের মধ্যে জুম চাষের জন্য প্রথম রাঙ্গামাটি আসে। এ সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০ অনুযায়ী শাসিত হয়। ১৭৯৮ সালে একটি সরকারি কাজে পার্বত্য চট্টগ্রামে আগত ফ্রান্সিস বুকানন সর্বপ্রথম পার্বত্য চট্টগ্রামের ১০ ভাষাভাষী জুম্ম জনগোষ্ঠীর ভাষাগুলোর নমুনা শব্দ সংগ্রহ করেন। তারপর ফেইরি (১৮৪১), হান্টার (১৮৬৮) এবং লেউইন (১৮৬৯) পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আরাকানের কয়েকটি জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন শব্দ সংগ্রহ করলেও ড. জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসন প্রথম পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী ভাষাগুলোর তথ্যাদি সংগ্রহ করে প্রকাশ করেন। লিঙ্গুয়েস্টিক সার্ভে অব ইন্ডিয়ায় তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী ভাষাগুলোর মধ্যে চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা ভাষাকে ইন্দো-এরিয়ান এবং অন্য ভাষাগুলোকে তিব্বতি-চীন পরিবারভুক্ত করে শ্রেণিকরণ করেন। তিব্বতি-চীন পরিবারভুক্ত ভাষাগুলোর মধ্যে মারমা ভাষাকে টিবেটো-বর্মি দল; ত্রিপুরা ভাষাকে বোডো দল, লুসাই, পাংখোয়া, বুম খিয়াং, খুমী, ম্রো ও চাক ভাষাগুলোকে কুকি-চীন দলভুক্ত করেন।

দুই।।

লাখ লাখ বছর আগে থেকে আজ পর্যন্ত সভ্যতা তার আপন গতিতে ধাবমান। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, আদিবাসীরা হল সভ্যতার বরপুত্র। গবেষণায় দেখা যায়, জ্ঞান বিজ্ঞান আর তথ্য প্রযুক্তির এই উৎকর্ষতার যুগে পৃথিবীর কোথাও কোথাও আদিবাসীদের আর আগের মত মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। নানাভাবে তারা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সে কারণে পরিবর্তিত ধ্যান ধারণার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পৃথিবীর নানাপ্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আদিবাসীদের ভূমি, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অধিকার, শিল্প সংস্কৃতি সংরক্ষণসহ সব বিষয়কে আরও সংহত করতে প্রায় দুই দশকের নানান কার্যক্রমের বিচার বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে জাতিসংঘের মাধ্যমে একটি আন্তর্জাতিক সনদ তৈরি করা হয়েছে। ১৯৮২ সালে জাতিসংঘে প্রথম আদিবাসী বিষয়ক আলোচনা শুরু হয় এবং এর অস্তিত্ব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকার করা হয়। প্রায় একদশক পরে দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তিতে ১৯৯৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রতি বছর ৯ আগস্টকে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়া হয় (রেজ্যুলেশন ৪৯/২১৪)। ৯ আগস্টকে তারিখ হিসেবে নির্ধারণ করার পেছনে প্রধান কারণ ছিল ১৯৮২ সালের এই দিনেই জাতিসংঘ সর্বপ্রথম আদিবাসীদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়। তারপরের বছর থেকে ১৯৯৫-২০০৪ ‘প্রথম আদিবাসী দশক’এবং ২০০৫-২০১৪ ‘দ্বিতীয় আদিবাসী দশক’ঘোষণা করা হয়।

‘প্রথম আদিবাসী দিবসে’র লক্ষ্য ছিল আদিবাসীদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, ভূমি, পরিবেশ, উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের সমস্যা দূরীকরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা শক্তিশালীকরণ। ‘দ্বিতীয় আদিবাসী দিবসে’র লক্ষ্য ছিল আদিবাসীদের জীবনের নানান রিসোর্সের কার্যকর প্রয়োগ ও সম্মানের জায়গা নিশ্চিতকরণের জন্য অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা। অবশেষে ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আদিবাসী অধিকার সনদ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে পাস হয়। যেখানে চারটি দেশ (আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড) এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে এবং ১১টি দেশ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের বিরত রাখে।

২০১৬ সালের জাতিসংঘের ঘোষণায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকারের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। জাতিসংঘ তার ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করেছে, ‘২০৩০ সালের জন্য যে টেকসই উন্নয়নের এজেন্ডা (Sustainable Development Goal 2030) গ্রহণ করা হয়েছে এবং ২০১৫ সালে প্যারিসে জলবায়ু চুক্তি (Paris Climate Agreement 2015) স্বাক্ষরিত হয়েছে। সেখানে এ পৃথিবীর বসবাসকারী সকলের জন্য একটি সমমর্যাদার সহাবস্থান নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এ দুটি এজেন্ডায় প্রথমবারের মতো এরকম একটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে একটি স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং সকলের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও স্বীকার করা হয়েছে যে, বিশ্বব্যাপী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অনেকেই এখনও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।’

বাংলাদেশ রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ঐতিহ্যগতভাবে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মূল্যায়নে বদ্ধপরিকর। এরই ধারাবাহিকতায় দেশে আদিবাসীদের স্বার্থ সংরক্ষণে সরকার আন্তরিক।

নৃতাত্ত্বিক গবেষক ও সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, একথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, বাংলাদেশ একটি বহু জাতি, বহু ধর্ম, বহু ভাষাভাষীদের রাষ্ট্র। সংবিধানেও এর স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে সকল জাতিগোষ্ঠীর অবদান ও আত্মত্যাগকে সমভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এছাড়া দেশের ভেতরে বসবাসরত সকল জাতিগোষ্ঠীর কথা স্মরণে রেখে আমাদের সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছে। যে কারণে সংবিধানে দেশের নাম ‘পিপলস রিপাবলিক’ বলা হয়েছে। তাই তারা বলছেন দেশের আদিবাসীদের জন্য যেসব অধিকারের উল্লেখ আছে তার শতভাগ বাস্তবায়ন করে এদেশে বসবাসকারী আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেয়া জরুরি। এক্ষেত্রে আদিবাসী-বান্ধব একটি জাতীয় পলিসিও প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করছেন। বর্তমান সরকার ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আদিবাসীদের ন্যায্য দাবি ও অধিকার রক্ষায় আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে দেশে বিদেশে বিভিন্ন ফোরামে আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় উচ্চকণ্ঠ। বর্তমান সরকার বিশ্বাস করে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে গেলে কাউকে বাদ দিয়ে নয় বরং সবাইকে সাথে নিয়ে একযোগে কাজ করে যেতে হবে। সেক্ষেত্রে সবার আগে আদিবাসীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।  

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত