প্রতিদিন সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষের দারিদ্র্যমুক্তি

জহির রায়হান, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৬ মার্চ ২০১৮, ২২:১২ | প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৮, ০৭:৩৬

দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্বে বলা হচ্ছে ‘বাংলাদেশ প্যারাডক্স’। সবশেষ পরিসংখ্যান হিসেবে প্রতি দিনে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বের হচ্ছে।

১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পশ্চিমা অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন ছিল বাংলাদেশ টিকে থাকতে পারবে না এবং এটা হবে দরিদ্র রাষ্ট্রের উদাহরণ।

আর আর এখন বাংলাদেশশের উন্নয়নকে বলা হচ্ছে বিস্ময়। দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশকে উদাহরণ হিসেবেও দেখছে জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।

৯০ এর দশকেও বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে সবচেয়ে বেশি লোক বাস করত। ১৯৯১ সালে এই হার ছিল ৫৮ শতাংশ। ২০০৫ সালে এই হার নেমে আসে ৪১ শতাংশের মতো। আর গত ১৩ বছরে এটা আরও প্রায় অর্ধেকে নেমেছে।

ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন, রপ্তানি আয়, বৈদেশিক শ্রমবাজার, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, সামাজিক বৈষম্য নিরসনসহ প্রায় সব সূচকেই অগ্রগতি করছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৭ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী আগের ছয় বছরে দারিদ্র্যের হার ৭.২ শতাংশ কমেছে। ২০১৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত এই খানা জরিপ চালায় বিবিএস; তার আগের জরিপটি চালানো হয়েছিল ২০১০ সালে।

২০১৭ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশের দারিদ্যের হার ছিল ২৪.৩ শতাংশ। ২০১০ সালে যা ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০০৫ এ ছিল ৪০ শতাংশ।

এই প্রতিবেদন অনুযায়ী অতি দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০১০ সালে ছিল ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সরকার ২০২০ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েছে। ওই সময়ে চরম দারিদ্র্য হার ৮ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশা করছে সরকার।

এই লক্ষ্যের দিকেও সঠিক পথেই আছে বাংলাদেশ। কারণ দারিদ্রের বর্তমান হার ২২.৪ শতাংশ বলে জানিয়েছে সরকার। অর্থাৎ এই প্রতিবেদন প্রকাশের পরও প্রায় দুই শতাংশ কমেছে দারিদ্র্য।

২০১৭ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ১৭ লাখ। প্রতি বছর ২০ লাখ মানুষ বাড়লে এই সংখ্যা এখন ১৬ কেটি ৩৭ লাখের কাছাকাছি।

আর প্রতি বছর দারিদ্র্যমুক্তি হচ্ছে এর ১.২ শতাংশ হারে। অর্থাৎ বছরে ১৯ লাখ ৬৫ হাজারের মতো মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাচ্ছে। প্রতি দিনের হিসাবে এটা হয় পাঁচ হাজার ৩৮১ জন।

তারপরও এখনও বাংলাদেশে তিন কোটি ৬৬ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে রয়েছে। আর এই মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনাকে চ্যালেঞ্চ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।

উন্নত হচ্ছে আবাসন, শিক্ষায়

দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে আসার পাশাপাশি অন্যান্য সূচকেও বাংলাদেশের অগ্রগতি হচ্ছে। এর একটি হলো আবাসন।

২০১০ সালে ছিল যেখানে ২৫ দশমিক ১২ শতাংশ পাকাবাড়ি ছিল সেটা ২০১৬ সালে বেড়ে হয় ৩০.৫ শতাংশ।

২০১০ সালে  টিন ও কাঠের বাড়ি ছিল ৩৮.৪৬ ভাগ ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয় ৪৯.১২ ভাগ।

২০১০ সালে বিদ্যুৎ সংযোগ আছে এমন পরিবার ছিল ৫৫.২৬ ভাগ। ২০১৬ সালে এই হার বেড়ে হয় ৭৫.৯২ শতাংশ। সেটি আরও বেড়ে হয়েছে ৯০ শতাংশ।

২০১০ সালে স্বাক্ষরতার হার ছিল ৫৭.৯ শতাংশ; সেটি এখন বেড়ে হয়েছে ৭২.৩ শতাংশ।

সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচিতে উপকারভোগী ২০১০ সালে ছিল ২৪.৬ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা বেড়ে ২৮.৭ ভাগে উন্নীত হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬১০ ডলারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার ৮০০ টাকা। ২০০৬ সালে এটি ছিল ৫৪৩ ডলার।

স্বাধীনতার পর খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের সাফল্য বিস্ময়কর। যে সাত কোটি মানুষকে বাংলাদেশ খাওয়াতে পারবে না বলা হচ্ছিল, সেই দেশ এখন ১৬ কোটি মানুষকে অবলীলায় খাদ্য দিচ্ছে।

বিশ্বে এখন সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়, মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। ছাগল উৎপাদনেও বাংলাদেশ চতুর্থ স্থানে অবস্থান করছে। আম উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে আছে সাত নম্বরে।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের ধানের উৎপাদন তিন গুণেরও বেশি, গম দ্বিগুণ, সবজি পাঁচ গুণ এবং ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে দশ গুণ। দুই যুগ আগেও দেশের অর্ধেক এলাকায় একটি ও বাকি এলাকায় দুটি ফসল হতো। বর্তমানে দেশে বছরে গড়ে দুটি ফসল হচ্ছে। স্বাধীনতার পর দেশে প্রতি হেক্টর জমিতে দুই টন চাল উৎপাদিত হতো। এখন হেক্টর প্রতি উৎপাদন হচ্ছে চার টনেরও বেশি। তাছাড়া হেক্টরপ্রতি ভুট্টা উৎপাদনে বিশ্বে গড় ৫ দশমিক ১২ টন। বাংলাদেশে এ হার ৬ দশমিক ৯৮ টন। খাদ্যশস্যে প্রতি হেক্টরে ১০ দশমিক ৩৪ টন উৎপাদন করে বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর এভাবেই প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ।

উন্নয়নে পেছনে পাকিস্তান

পূর্ব বাংলাকে বঞ্চিত করে পশ্চিম পাকিস্তানে উন্নয়ন করার বৈষম্যের কারণেই মূলত বিদ্রোহ করে বাঙালিরা।

সে সময় এই অঞ্চলের থেকে পাকিস্তান উন্নয়নের দিক থেকে বহুগুলে এগিয়ে ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানিদের ৪০ শতাংশ ছিল বাঙালিদের। কিন্তু এখন বাস্তবতা ভিন্ন। পাকিস্তানেও নানা আলোচনায় বাংলাদেশকে উদাহরণ হিসেবে মানা হচ্ছে।

বাংলাদেশে প্রতি পাঁচ জনের একজন দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকলেও পাকিস্তানে এই হার দ্বিগুণ। সে দেশের প্রতি ১০০ জন মানুষের মধ্যে এখন ৪০ জনই দরিদ্র।

সবশেষ জাতিসংঘ মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ থেকে আট ধাপ পেছনে পাকিস্তান। বাংলাদেশের অবস্থান যেখানে ১৩৯ তম, সেখানে পাকিস্তানের অবস্থান ১৪৭।

মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনের দিক দিয়েও এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে মাথাপিছু জিডিপির পরিমাণ ছিল এক হাজার ৫৩৮ ডলার, পাকিস্তানে সেই জিডিপি এক হাজার ৪৭০ ডলার।  একই সাথে বেড়েছে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়ও। পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় এখন এক হাজার ৩৮০ ডলার।  সেখানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এক হাজার ৬০২ ডলার। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ৩৩ বিলিয়ন ডলার যা পাকিস্তান থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার বেশি।

বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসায় দেশের অর্থনীতিতে বাড়ছে শিল্পের অবদান। এখানেও বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে আছে পাকিস্তান।  পাকিস্তানের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির শতকরা ২৪ শতাংশ আসে শিল্পখাত থেকে।  অথচ বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের ৩০ শতাংশ আসে শিল্পখাত থেকে।

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল বেশি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি উল্টো হয়ে গেছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন প্রায় ১৬ কোটি। কিন্তু পাকিস্তানের জনসংখ্যা এখন প্রায় ২০ কোটি। দুই বছর আগে হিসাবে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৭, পাকিস্তানে এটা ২.২। বাংলাদেশে মা প্রতি সন্তানের গড় সংখ্যা ২.১৪। কিন্তু পাকিস্তানে এই সংখ্যা ৩.৫৫টি।

অর্থনীতিবিদরা যা বলছেন

দারিদ্র্য বিমোচনে এই সাফল্যের বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলিকুজ্জমান আহমদ ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘অনেকে এক সময় বলেছে আমাদের দেশের কোন ভবিষ্যৎ নেই। কিন্তু আমরা তো সেটাকে ভুল প্রমাণ করলাম।’

‘আমরা গত আট নয় বছরে ধারাবাহিকভাবে অগ্রগতি করেছি। অর্থনৈতিক, সামাজিক সূচকসহ প্রতিটি সূচকেই আগ্রগতি করেছি। এখন আমরা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করা দেশ।’

‘যারা আমাদের নিয়ে বিরুপ মন্তব্য করেছিল তারা হয়ত আমাদের পছন্দ করতো না, হিংসা করত।’

খলীকুজ্জমান বলেন, ‘আমাদের প্রায় সব খাতেই উন্নয়ন হয়েছে। বিশেষ করে কৃষি গ্রামীণ অর্থনীতি, রপ্তানি, রেমিটেন্স এসব দিকে বেশি অগ্রগতি হয়েছে।’

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘বাংলাদেশকে নিয়ে সন্দিহান লোকেরা বিভিন্ন দৃষ্টিতে দেখত। কিন্তু আমরা চার দশক পরে আমাদের শক্তিমত্তার  দিলাম।’

‘স্বাধীনতার পর যারা বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে সমালোচনা করেছে সেটা ওই সময়ের বাস্তবতায় বলেছে। এখনের বাস্তবতা ভিন্ন। আমরা এখন অর্থনৈতিক অগ্রগতি করেছি। এটাতে কেউ সন্দেহ পোষণ করবে না।’

বাংলাদেশের লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হতে গেলে আরও দ্রুত অগ্রগতি করতে হবে জানিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘আমাদের উৎপাদনশীলাতা বাড়াতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে হবে। নারীদের আরও শ্রমবাজারে নিয়ে আসতে হবে। সুশাসন মেনে চলতে হবে।’

(ঢাকাটাইমস/জেআর/২৬মার্চ/ডব্লিউবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত